তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রতীক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না। তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করলেই বুক কেঁপে ওঠে নদীপাড়ের মানুষের। লালমনিরহাটে তিস্তা নদীতে স্থায়ী নদীশাসনের কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে অস্থায়ী প্রকল্প এবং বাঁধ নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। একই ধরনের বিড়ম্বনার শিকার নীলফামারী জেলার তিস্তাপাড়ের মানুষ।
নদীপাড়ের বাসিন্দাদের দাবি, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা, বাঁধ মেরামত ও অস্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া হলেও পানি বাড়লেই ক্ষতির শিকার হন নদীপাড়ের মানুষ। ফলে একই ধরনের কাজের জন্য বারবার সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও কার্যকর সুফল মিলছে না। স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় বন্যা ও নদীভাঙনের দুর্ভোগ থেকেও মুক্তি মিলছে না লাখো মানুষের। এতে প্রতিবছর কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। হঠাৎ পানিতে কৃষকের ফসল ডুবে যায়। ধান, গম, ভুট্টা, বাদাম, পাট, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুনসহ নানাবিধ ফসলের ক্ষতি হয়। গবাদিপশু নিয়েও চরম দুশ্চিন্তা পোহাতে হয়। সামান্য পানি এলেই প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। আর বাড়িঘরে পানি উঠলে গবাদিপশু নিয়ে উঁচু স্থানে অবস্থান করতে হয়।
আদিতমারী এলাকার ষাটোর্ধ্ব কাউয়ুম মিয়া বলেন, ‘৮-১০ বার বাড়ি-ভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিবছর নিজেকে স্বাবলম্বী করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা থাকলেও বর্ষায় তা ব্যর্থ হয়ে যায়। কখন পানি আসবে, সবকিছু ডুবিয়ে নিঃস্ব করে দেবে, সেই আতঙ্কে থাকি। তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা বছরের পর বছর শুনলেও এখন আর আশা জাগে না।’ একই এলাকার ইউপি সদস্য মতি মিয়া বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতি বর্ষায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত ও ভাঙন মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। শুকনো মৌসুমে কিছুটা চাষাবাদ করে ঘুরে দাঁড়ালেও আবারও বর্ষায় নিঃস্ব হয় সাধারণ মানুষ। চক্রাকারে এভাবেই চলে নদীপাড়ের মানুষের জীবন।’
২০২২ সালে আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নে প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বন্যা প্রতিরক্ষা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল, বাঁধটি তিস্তার বন্যা ও ভাঙনের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, তিস্তার পানি সামান্য বাড়লেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ বুকসমান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে বাঁধের পেছনের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ শেষ হয় না। বাঁধের কারণে ভেতরে ঢুকে পড়া পানি সহজে বের হতে না পারায় দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ থাকে এলাকা। এতে কৃষিজমি, বসতভিটা, গ্রামীণ সড়ক ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে স্থায়ী নদীশাসনের অভাবে ভাঙনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
নদী গবেষক রিভারাইন পিপলসের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তিস্তা নদীর বয়স মাত্র ২৩৮ বছর। এখনো সে থিতু বা স্থায়ী হয়নি। এর আচরণ ও রূপ বোঝাও খুব মুশকিল। এ জন্য তিস্তাকে পাগলী নদীও বলা হয়। তিস্তার মাটির কণা বালুকণার থেকে ছোট ও পাড়ের মাটি নরম হওয়ায় ভাঙন বেশি দেখা দেয়। দেশে ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর বিশাল চরাঞ্চল ও শুষ্ক মৌসুমে পানি কম থাকায় এর স্রোত খাড়া হয়। ফলে নিমেষেই সব ভেঙেচুরে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, যখন থেকে মহাপরিকল্পনার কথা উঠেছে, পাউবো স্থায়ী কাজের দিকে মনোনিবেশ কমিয়ে এনেছে। কিন্তু অস্থায়ী কাজ দিয়ে তিস্তাকে আটকানো যাবে না। বিজ্ঞানসম্মতভাবে সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের জন্য কাজ করতে হবে। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় সঠিক পরিকল্পনা করে প্রয়োজনে ধাপে ধাপে কাজ কতে হবে। এতে তিস্তাপাড়ের কোটি মানুষের সুফল মিলবে।
সার্বিক বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, ‘তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি ওঠানামা করছে, এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যা তৈরি হতে পারে। ফলে আমরা সার্বক্ষণিক নদী এলাকায় খোঁজখবর রাখছি। নদীতীরের মানুষকে বন্যা নিয়ে বিভিন্নভাবে সচেতন করা হচ্ছে।’
বর্ষায় তাণ্ডব, খরায় হাহাকার
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা এলেই শুরু হয় তাদের আতঙ্কের দিন। পানি বাড়ার খবর শুনে অনেক পরিবার আগেভাগেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখে। কেউ গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন, কেউ আবার রাত জেগে পাহারা দেন ভিটেমাটি। আর শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে গেলে কৃষকের চোখে ভেসে ওঠে নতুন দুশ্চিন্তা- কীভাবে সেচ দেবেন, কীভাবে বাঁচাবেন বছরের একমাত্র ফসল।
জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাইর রংপুর বিভাগীয় কমিটির সদস্য জাফর খান বলেন, ‘তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা শুনলেও বাস্তবে নদীপাড়ের মানুষের ভাগ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বর্ষা এলেই বন্যা ও নদীভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়, আর খরা মৌসুমে পানির অভাবে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়। আমাদের দাবি, মহাপরিকল্পনা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে সেই প্রকল্পের অপেক্ষার অজুহাতে নদীশাসন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ বন্ধ রাখা যাবে না। তিস্তাপাড়ের মানুষের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তার ভাঙনে আমার বাড়ি দুবার ভেঙে গেছে। একবার ভাঙনের শিকার হওয়ার পর আবার নতুন করে ঘর তৈরি করেছিলাম, কিন্তু নদী সেটিও কেড়ে নিয়েছে। এখন সব সময় আতঙ্কে থাকি, কখন আবার বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যায়। আমরা স্থায়ী সমাধান চাই। একটি টেকসই বাঁধ নির্মাণ হলে শুধু আমার মতো পরিবার নয়, হাজারও মানুষ ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।’
গৃহবধূ আসমা বেগম বলেন, ‘বর্ষার সময় পানি বাড়লে আমাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। ঘরের চারপাশে পানি জমে যায়, অনেক সময় চুলার মধ্যেও পানি ঢুকে যায়। তখন রান্না করা সম্ভব হয় না। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হয়। বাধ্য হয়ে শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করে চলতে হয়। শিশুসন্তানদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।’
এদিকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় তিস্তাপাড়ের শিক্ষার্থীদের। বর্ষাকালে অনেক গ্রামের সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। নৌকা ছাড়া স্কুল-কলেজে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হতে পারে না। বিশেষ করে পরীক্ষার সময় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলে, ‘আমার বন্ধুরা নিয়মিত স্কুলে যায়, কিন্তু আমরা অনেক সময় যেতে পারি না। বর্ষার সময় রাস্তা ডুবে যায়, নৌকা না পেলে বাড়ি থেকে বের হওয়া সম্ভব হয় না।’ টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম সাহিন বলেন, ‘তিস্তা নদীর পানি বাড়লেই আমাদের ইউনিয়নের হাজারও মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন।’
নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি ওঠানামা করছে। এ কারণে কখনো কখনো পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ উজানের পানি নিয়ন্ত্রণ। উজানে গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করা হলে ভাটির দিকে পানির প্রবাহ কমে আসে। এর প্রভাব বাংলাদেশের তিস্তা অববাহিকার মানুষ ও কৃষির ওপর পড়ে। প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলে, বর্তমানে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা বা নতুন কোনো প্রকল্প চলমান নেই। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী নদী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।