মেঘের গর্জন থামেনি তখনো। আকাশের মুখভার। কিন্তু মাতামুহুরি নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি ঢলের সেই হিংস্র গর্জন এখন কিছুটা শান্ত। কক্সবাজারের চকরিয়ার গত কয়েকদিনের ভয়াবহ বন্যায় মাতামুহুরি নদীর পানি বিপদসীমার নিচে নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই বেরিয়ে আসছে এক মহাধ্বংসযজ্ঞের কঙ্কাল। ঢলের জল শুধু জনপদ ধুয়ে নিয়ে যায়নি, নিয়ে গেছে শত পরিবারের স্বপ্ন, শেষ সম্বল আর মাথা গোঁজার ঠাঁই। রেখে গেছে কেবল এক বুক হাহাকার আর কখনো না শুকাতে চাওয়া এক গভীর ক্ষত।
সোমবার (১৩ জুলাই) চকরিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব কোচপাড়া এলাকায় যখন পা রাখলাম, চারপাশের বাতাস তখন ভারী হয়ে আছে এক স্তব্ধ কান্নায়।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নির্বাক, জলভরা চোখে শূন্য নদীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন তাসমিন জন্নাত। কয়েকদিনে মাতামুহুরির রাক্ষুসী স্রোত গিলে খেয়েছে তাঁর বসতঘরের শেষ চিহ্নটুকু। যখন তাঁর ঘরটি নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছিল, তাসমিন তখন কেবল দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদেছেন, কিছুই করার ছিল না তাঁর।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তাসমিন বলেন, ঢলের পানি তো চলে গেল ভাই, কিন্তু আমাদের সব কেড়ে নিয়ে গেল। আমার স্বামী বাজারে সবজি বিক্রি করে দিনরাত এক করে, অল্প অল্প সঞ্চয় জমিয়ে এই ঘরটা গড়েছিল। চোখের সামনে সেটা আজীবনের জন্য নদীতে তলিয়ে গেল, কিচ্ছু করতে পারলাম না। প্রকৃতির এই ক্ষত আমরা সারা জীবন কীভাবে বয়ে বেড়াব?
নদীপাড়ের মানুষগুলোর এখন দম ফেলার ফুসরত নেই। তবে এই ব্যস্ততা বেঁচে থাকার নয়, এই ব্যস্ততা নিজের ধ্বংসাবশেষ কুড়ানোর। মাতামুহুরি নদী তীরবর্তী মানুষগুলো এখন হন্যে হয়ে ঘর ভেঙে আসবাবপত্র, টিন আর কাঠ সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। কিন্তু এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করছে তাদের মনে। যে জমিটাই নদী কেড়ে নিয়েছে, সেখানে এই কাঠের টুকরো আর টিনের চালগুলো নিয়ে তারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই কারো।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেল, শুধু তাসমিন জন্নাতই নন, মাতামুহুরির এই রুদ্রমূর্তির কারণে চরম নদীগর্ভে বিলীনের সব।
বসতবাড়ি রয়েছেন পূর্ব কোচপাড়ার নুরুল আবছার, নুরুল হুদা, নুরুল ইসলাম, আমির উদ্দিন, ওসমান, আব্দুল আজিজ পুতু এবং মানিকের মতো বহু মানুষ। নদী ভাঙন এত দ্রুত ছড়াচ্ছে যে, যেকোনো মুহূর্তে আরও বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছে। আতঙ্ক এতটাই তীব্র যে, ক্লান্ত শরীরেও গ্রামবাসী রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বাঁচানোর আকুতিতে। গৃহহীন হওয়া পরিবারগুলো এখন খোলা আকাশের নিচে অথবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
ত্রাণের লাইন কিংবা সরকারি সাহায্য- কোনো কিছুই এখন আর টানছে না এই সর্বস্বান্ত মানুষগুলোকে। তারা চান স্থায়ী মুক্তি।
নদীপাড়ের বাসিন্দা রাবেয়া বেগম বলেন, আমরা সরকারি চাল-ডাল চাই না, আমরা শুধু একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই। মাতামুহুরি নদীর তীরে একটি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ দেওয়া হোক, যেন আমাদের আর প্রতি বছর এভাবে ঘর হারিয়ে রাস্তায় বসতে না হয়। প্রতি বর্ষায় আসে, আর মাতামুহুরির বুক গ্রাস করে নেয় এক-একটা সাজানো সংসার। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুরতার কাছে হেরে যাওয়া এই মানুষগুলোর কান্না এখন নদীপাড়ের বাতাসে ভাসছে। কিন্তু এই কান্নার শেষ কোথায়?
পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মুজিবুল হক জানালেন এক দীর্ঘ উপেক্ষার গল্প। তাঁর মতে, মাতামুহুরির তীব্র স্রোতে পৌরসভায় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাঁশঘাটা, কোচপাড়া, পূর্ব কোচপাড়া, মজিদিয়া দারুচ্ছুন্নাহ্ পৌর দাখিল মাদ্রাসাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন- গত ১০ থেকে ১৫ বছরে সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার এই এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ছবি তুলেছেন, ফাইল ভারী হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হয়নি। প্রতি বর্ষা মৌসুমে ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবারকে এই ভাঙন আতঙ্কে চোখ থেকে ঘুম বিসর্জন দিতে হয়।
এ বিষয়ে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভাঙন রোধে ইতিমধ্যে একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে। জিও ব্যাগের বদলে কংক্রিটের ব্লক দিতে যতটুকু ঢাল দরকার, ততটুকু ঢাল সেখানে নেই। তবে কংক্রিটের ব্লক দেওয়ার বিষয়টি আমাদের ভাবনায় রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের এই 'ভাবনা' কবে বাস্তবে রূপ নেবে, তা জানা নেই নদীপাড়ের মানুষের। চকরিয়ার মাতামুহুরির স্রোত এখনো প্রমত্তা। আর তার তীরে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ এখন শুধু একটা টেকসই বাঁধের অপেক্ষায় দিন গুনছে, যেন আগামী বর্ষায় তাদের আবার নতুন করে নিঃস্ব হতে না হয়।##
রাজু দাশ/এসএন