টানা কয়েকদিনের মুষলধারে বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তাণ্ডব শেষে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে আকাশ মেঘমুক্ত হয়েছে, কমতে শুরু করেছে মাতামুহুরী নদীর পানি। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই লোকালয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যার রেখে যাওয়া ক্ষতচিহ্ন। নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় চরম মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
টানা বর্ষণ আর ঢলের পানিতে লোকালয়ের হাজার হাজার নলকূপ ও শৌচাগার তলিয়ে গেছে। ফলে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে এখন এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার চলছে। দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও স্যানিটেশন সংকট। অধিকাংশ ঘরে কয়েকদিন ধরে চুলা না জ্বালিয়ে শুকনা খাবার খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন তারা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণের আশ্বাস দেওয়া হলেও দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনও সরকারি সাহায্য না পৌঁছানোর অভিযোগ করেছেন চরম সংকটে থাকা ভুক্তভোগীরা।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে বন্যাকবলিত বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে সরেজমিনে দেখা যায়, বন্যার দূষিত পানি চারদিকে থৈ থৈ করলেও পানযোগ্য এক ফোঁটাও পানি নেই। নলকূপগুলো পানির নিচে নিমজ্জিত থাকায় বিশুদ্ধ পানির উৎস সম্পূর্ণ অচল। জীবন বাঁচাতে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বন্যার নোংরা ও দূষিত পানি ব্যবহার করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, জরুরি চিকিৎসাসেবা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা গেলে বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পাহাড়ি ঢলে গ্রামীণ সড়কগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ভেঙে পড়ায় চকরিয়া উপজেলার কাকারা, বরইতলী, রসুলাবাদ, ডেইঙ্গাকাটা, বিবিরখীল ও হারবাং ইউনিয়নের বিশাল এলাকা এখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোতে নৌকাই এখন যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় বন্যাকবলিত মানুষের পক্ষে বাজারে গিয়ে চাল, ডাল বা শিশুখাদ্য সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, মানুষ ঘরের ভেতর বন্দি হয়ে আছে। হাতে কোনো টাকা পয়সা নেই। বাজার থেকে কোনোকিছু কিনে খাওয়ার উপায়ও নেই। বেশিরভাগ পরিবার অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। দুর্গম এলাকায় দ্রুত সরকারি ত্রাণ না এলে মানুষের দুর্ভোগ ও ক্ষুধা আরও চরম আকার ধারণ করবে। আশ্রয়হীন হাজারও পরিবার বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে থাকায় রান্নার কোনো পরিবেশ নেই। দুর্গতদের দিন কাটছে কেবল শুকনো খাবার খেয়ে।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন, আমার ইউনিয়নের বেশিরভাগ ঘরের ভেতরে এখনও পানি। রাতে একটু শান্তিতে ঘুমানোর জায়গা পর্যন্ত নেই। চুলা জ্বলছে না কয়েকদিন ধরে। নলকূপ আর শৌচাগার তলিয়ে থাকায় নারীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন। এই মুহূর্তে আমাদের জরুরি ভিত্তিতে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছরই বন্যার পানি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট (জলকপাট) ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতা দায়ী। স্থানীয়দের দাবি, উপকূলীয় এলাকার কিছু স্লুইসগেট ইজারা নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল মাছ চাষ করছে। ফলে বন্যার সময়ও তারা সময়মতো গেট খোলে না।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা শাহীন দেলোয়ার দৈনিক খবরে কাগজকে জানান, বন্যাকবলিত এলাকার জন্য পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণ বরাদ্দ মিলেছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো হয়েছে। যে সমস্ত দুর্গম এলাকায় যাতায়াত কঠিন, সেখানে নৌকার মাধ্যমে ত্রাণ পাঠানোর কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবারই সহায়তার বাইরে থাকবে না। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির জন্য জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজু দাশ/থিওটোনিয়াস/