বউ বলল, দল পাল্টে ব্রাজিলে চলে আসো। আত্মিক ও আর্থিক–দুই দিক দিয়েই লাভ হবে।
আত্মিক লাভের বিষয়টি না হয় বুঝলাম। শ্বশুরের সুদৃষ্টি থাকবে আমার ওপর। জামাইকে নিজের দলে পেয়ে খুশি হবেন, প্রশংসা করবেন। শ্বশুরের প্রশংসায় ভিজে আমারও খানিকটা ভালো লাগবে। কিন্তু আর্থিক লাভের বিষয়টি মাথায় ঢুকল না।
জিজ্ঞেস করলাম, আর্থিক লাভটা একটু বুঝিয়ে বলো তো।
বউ আহ্লাদিত গলায় বলল, ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হলে বাবা তার সব ব্রাজিল সাপোর্টার আত্মীয়কে সোনার চেইন উপহার দেয়। সেমিফাইনালে উঠলে পাঞ্জাবি, কোয়ার্টারে শার্ট, আর সেকেন্ড রাউন্ডে গেলে লুঙ্গি।
আমি শান্ত গলায় বললাম, তা বুঝলাম। কিন্তু তাই বলে দল পাল্টাব?
– এখন সোনার যা দাম! এত দিনে একটা সোনার জিনিসও তো কিনে দিতে পারোনি। দল পাল্টে ব্রাজিলে গেলে অন্তত একটা সোনার চেইন তো দিতে পারবে।
বললাম, ব্রাজিল যে দল! চ্যাম্পিয়ন হবে, এমন ভরসাও তো নেই। বড়জোর লুঙ্গিটুঙ্গি পাওয়া যেতে পারে।
বউ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, তবু একটা চান্স তো থাকবে। আর আর্জেন্টিনা জিতলে? ঘোড়ার ডিমও পাবে না।
কথাটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর্জেন্টিনা জিতলে লাভ বলতে কয়েক দিন ব্রাজিল সমর্থক বন্ধুদের
খোঁচা দিয়ে একটু শান্তি। কিন্তু ব্রাজিল সমর্থক সেজে যদি বউকে কয়েক মাস শান্ত রাখা যায়, তাহলে হিসাব-নিকাশে ব্রাজিলই এগিয়ে।
গাট্টি-বোচকা বেঁধে রওনা দিলাম শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে। এই মাসটা অফিসও ওখান থেকেই করব। রাতে শ্বশুরের পাশে বসে খেলা দেখব, ব্রাজিল গোল করলে বুক চাপড়ে হাততালি দেব।
গিয়ে দেখি, এ যেন শ্বশুরবাড়ি নয়–বিশ্বকাপ ক্যাম্প। মামা, খালু, ফুপা, চাচা–সবাই পরিবার নিয়ে হাজির। বাড়িতে উৎসবের আমেজ।
আমাকে ব্রাজিলের জার্সি পরে ঢুকতে দেখে শ্বশুর বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, হেক্সা আসবেই!
আমাদের জায়গা হলো চিলেকোঠায়। কারণ আমরা নাকি অনেক দেরিতে এসেছি। ছোট মামা তো বিশ্বকাপ শুরুর এক মাস আগেই এসে সিট দখল করে বসে আছে! যাই হোক, সোনার চেইনের জন্য চিলেকোঠাও মেনে নেওয়া যায়।
তবে বিপদ বাঁধল খাওয়া নিয়ে। শ্বশুরের ঘোষণা, ব্রাজিল বিশ্বকাপে যত দিন থাকবে, তত দিন রান্না হবে ব্রাজিলের পতাকার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে শুধু খিচুড়ি আর সবুজ শাক।
খেলা শুরু হলে শ্বশুর আরও ভয়ংকর। কখনো টিভির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছেন, কখনো খেলোয়াড়কে উদ্দেশ করে বলছেন, ‘ওর গালে একটা চড় মার!’ কখনো আবার পর্দার দিকে ঘুষি ছুড়ছেন। মনে হচ্ছিল ফুটবল ম্যাচ না, অ্যাকশন সিনেমা দেখছি।
প্রথম ম্যাচে ব্রাজিল ড্র করল। মনে হলো, এরা সেকেন্ড রাউন্ডেই উঠতে পারবে তো? তখনই হিসাব কষতে শুরু করলাম–এখন যদি আবার আর্জেন্টিনায় ফিরে যাই, অন্তত ব্রাজিলভক্ত বন্ধুদের খোঁচা দেওয়ার অধিকারটা ফিরে পাব। কিন্তু বউয়ের শান্তির কথা ভেবে ব্রাজিলের সঙ্গেই রয়ে গেলাম। কষ্টেসৃষ্টে ব্রাজিল সেকেন্ড রাউন্ডে উঠল। হাতে এল লুঙ্গি। কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে পেলাম হলুদ শার্ট। সেমিফাইনালে উঠতেই হাতে এল ক্যাটক্যাটে হলুদ পাঞ্জাবি। এবার শুধু সোনার চেইনটা বাকি।
মনে মনে ভাবছি, ব্রাজিল ফাইনালে খুব একটা হারে না। ইতিহাসও তাই বলে, পরিসংখ্যানও তাই বলে। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন। আমার চোখে তখন আর বিশ্বকাপ নেই–শুধু সোনার চেইন ভাসছে।
ওদিকে ট্রফি দেওয়ার আগে বক্তৃতা চলছে। এদিকে শ্বশুরও গলা খাঁকারি দিয়ে বক্তব্য শুরু করলেন।
– হেক্সা চলে এসেছে। সবাই আনন্দ করো। তবে আগে আমার উপহার গ্রহণ করো।
উত্তেজনায় বুক ধড়ফড় করছে। অবশেষে বউকে একটা সোনার গহনা দিতে পারব!
শ্বশুর বললেন, আগে নিয়মটা বলি। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী একসময় কোনো দল তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে আসল ট্রফি স্থায়ীভাবে পেত। এখন বিজয়ী দলও রেপ্লিকা ট্রফি পায়। আমাদের বাড়িতেও সেই নিয়ম চালু করছি।
আমরা সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছি।
– তাই আসল সোনার চেইন পাবে শুধু বড় মামা। ১৯৯৪, ২০০২ আর ২০২৬–এই তিনটি বিশ্বকাপ সে আমার সঙ্গে একসঙ্গে উপভোগ করেছে। বাকিরা পাবে...চেইনের রেপ্লিকা।
আমার মাথার ভেতর যেন বাঁশি বাজতে লাগল। এত দিন খিচুড়ি খেলাম, চিলেকোঠায় পড়ে রইলাম, নিজের দল ছেড়ে ব্রাজিল করলাম! শেষে পেলাম রেপ্লিকা চেইন!
চেইনটা হাতে নিয়ে শুধু একটা কথাই মনে হলো, চেইনটা যেমন রেপ্লিকা, আমার সমর্থনটাও তেমন রেপ্লিকা।