চারদিকে থৈ থৈ করছে নোংরা পানি। মূল সড়কের বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলেও প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে রেখে গেছে গভীর ক্ষতের চিহ্ন। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মুন্সী মুরা লামার পাড়া এলাকার চিত্রটি আরও করুণ। ঢলের পানি নামলেও এখনও গ্রামীণ রাস্তা ও বাড়ির উঠানে কোমর সমান পানি। এর মধ্যেই জীবনের চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছে এক ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকের পরিবার।
ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ার এক সপ্তাহ পর সোমবার (১৩ জুলাই) ওই এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বুকভরা ক্ষোভ আর চোখে জল নিয়ে এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা মাইমুনা বেগম।
তিনি জানান, তার স্বামী মোহাম্মদ ফুরকান পেশায় একজন অটোরিকশা চালক। এক সপ্তাহ আগে মুষলধারে বৃষ্টির সময় ব্যাটারিচালিত রিকশাটি বাড়ির পাশে নিরাপদে রেখেছিলেন। কিন্তু পাহাড়ি ঢলের পানি যে তাদের ঘরের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে যাবে এবং রাস্তা ও উঠানে প্রায় ছয় ফুট পানি হয়ে যাবে, তা তারা কল্পনাও করতে পারেননি। চোখের সামনেই বন্যার পানিতে তলিয়ে বিকল হয়ে যায় ফুরকানের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যমটি। সোমবার বিকেলে পানি কিছুটা কমলে প্রতিবেশীদের সহায়তায় নষ্ট হয়ে যাওয়া গাড়িটি ঠেলে গ্যারেজে নিয়ে গেছেন ফুরকান। তবে গাড়ি ঠিক হলেও তা বাড়িতে আনার উপায় নেই, কারণ ভেতরের রাস্তায় এখনও কোমর সমান পানি।
মাইমুনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক সপ্তাহ ধরে আমরা পানিবন্দি। আমরা বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি, কেউ খবরও নেয়নি। ঘরে যা ছিল খেয়েছি, না খেয়ে উপবাসও থেকেছি।
জানা গেছে, রবিবার বিকেলে শিলখালী ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুর রশিদের মাধ্যমে খবর পেয়ে ইউনিয়ন পরিষদে যান ফুরকান। সেখান থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পক্ষ থেকে শুকনা খাবার দেওয়া হয়। এই এক সপ্তাহে ওই একমুঠো শুকনা খাবার ছাড়া আর কোনো সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য তাদের ভাগ্যে জোটেনি।
আরেক স্থানীয় নারী হুরে জান্নাত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজকাল ফেসবুক আর মিডিয়ায় যে সব জায়গায় বেশি প্রচার হচ্ছে, সবাই সেখানেই গিয়ে খাবার দিচ্ছে। আমাদের এই কোমর পানিতে কেউ আসতে চায়নি।
এ দিকে ফুরকানের পরিবারের কাছে বন্যার কারণে উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ার চেয়েও এখন বড় আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে এনজিওর ঋণের কিস্তি। পরিবারটির বর্তমানে বিভিন্ন এনজিওর প্রায় ৬ লাখ টাকার ঋণের বোঝা রয়েছে।
মাইমুনা বলেন, ‘আজকে এই চরম বিপদের মধ্যেও এনজিওর অফিসাররা এসে কিস্তির টাকার জন্য চাপ দিয়েছেন। টাকা দিতে না পারায় হুমকি দিয়েছেন। ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে এখন পানির ভয় করব, নাকি কিস্তির টাকার চিন্তা করব?’
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে মানুষ চরম অমানবিক জীবনযাপন করছে। আকাশ পরিষ্কার হওয়ায় প্রধান সড়কগুলো সচল হলেও পেকুয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কষ্ট এখনও কমেনি। উপার্জনের বাহন বিকল হওয়া এবং মাথার ওপর ৬ লাখ টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক ফুরকানের মতো পরিবারগুলোর এখন একটাই দাবি অবিলম্বে সরকারি পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান এবং এনজিওর কিস্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হোক।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, আমরা সারাদিন উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে গিয়ে বন্যাকবলিত মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছি এবং রান্না করা খাবার ও শুকনা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছি। আজও বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এই পরিবারটির বিষয়েও আমরা অবগত রয়েছি। তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অবশ্যই করা হবে। সকালে আমি নিজেই ওই পরিবারের কাছে যাব। তাদের খোঁজখবর নেব এবং পাশে থাকার চেষ্টা করব।
রকিবুল হাসান/থিওটোনিয়াস/