টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর জনজীবন। বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে সড়ক, অলিগলি। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে নগরবাসী। তীব্র যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অধিকাংশ এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
নাগরিক সেবাদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, এই জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল ইউজ) প্লাস্টিক ও পলিথিনে নালা-নর্দমা বন্ধ হয়ে যাওয়া। পাশাপাশি অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনার ঘাটতি–সবগুলোই ভূমিকা রাখছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতু খবরের কাগজকে বলেন, এজন্য দায়ী মূলত জনসচেতনতার অভাব। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে দেওয়ার কারণে ড্রেনে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তাই যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেললে ভালো ফল পাওয়া যাবে। তাছাড়া নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের প্রস্তাব তৈরি করা আছে। এখানে ভবন তৈরির সময় কতটুকু খালি রাখতে হবে, রাজধানীর কোথায় বন্যা প্রবাহ এলাকা থাকতে হবে বলা আছে। পরিকল্পনা ও নীতিমালা থাকলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় যা আছে তাও ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি মনিটরিংয়ের অভাব আছে। মূল কথা জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। মনিটরিং করতে হবে। তাহলেই অবস্থার উন্নতি ঘটবে বলে আশা করতে পারি।
শাম্মী আক্তার বলেন, জলাবদ্ধতার জন্য সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকও দায়ী। ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলে দেওয়া, সঠিক উপায়ে রিসাইক্লিং না করাতে জলাবদ্ধতা তৈরির পাশাপাশি পরিবেশ ও দেশের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের সঙ্গে জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সবাইকে যার যা দায়িত্ব তা সঠিকভাবে পালন করতে হবে।
এদিকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, পলিথিনের ব্যবহার কমাতে শুধু নিষেধাজ্ঞা বা বিকল্প পণ্য বাজারে সরবরাহ করা যথেষ্ট নয়। এজন্য মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে কার্যকর সমাধান।
কর্মকর্তারা বলেছেন, অনেকের ধারণা পাট পলিথিনের একমাত্র বিকল্প। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। পাট পলিথিনের পরিপূরক হতে পারে। বিকল্প নয়। বিশ্বে যে পরিমাণ প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়, তার তুলনায় পাটজাত পণ্যের উৎপাদন এখনো অনেক কম। বাংলাদেশে বছরে ১২ থেকে ১৭ লাখ মেট্রিক টন পাট উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ মেট্রিক টন দেশের শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে ব্যবহৃত হয়। উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে ৬ থেকে ৮ লাখ মেট্রিক টন কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চাহিদার জন্য ২ থেকে ৩ লাখ মেট্রিক টন পাট মজুত রাখা হয়। ফলে সব ধরনের পলিথিনের বিকল্প হিসেবে শুধু পাটের ওপর নির্ভর করা বাস্তবসম্মত নয়।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর একসময় দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল কাঁচা পাট। এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়। এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার রপ্তানিতে ১০ থেকে ১২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ, পাটপণ্য মেলা এবং বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করছে সরকার।
মন্ত্রণালয় জানায়, পাটের ব্যবহার বাড়াতে নতুন প্রজন্মকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পাইলট প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাটের স্কুলব্যাগ দেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে এসব ব্যাগ তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে দেশের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এভাবে দেশের প্রায় দেড় কোটি প্রাইমারি শিক্ষার্থীর হাতে পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ পৌঁছে দেবে সরকার। সরকার মনে করছে ছোটবেলা থেকেই পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার শিখলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবেই পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব উপলব্ধি করে এর ব্যবহার কমিয়ে আনবে।
তবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু পাটের ব্যাগ বিতরণ বা কম দামে সরবরাহ করলেই মানুষ পলিথিন ব্যবহার ছেড়ে দেবে না। বাজারে যাওয়ার সময় নিজের ব্যাগ সঙ্গে নেওয়ার অভ্যাস, যত্রতত্র প্লাস্টিক না ফেলা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলার মতো নাগরিক আচরণ গড়ে তুলতে হবে। বেসরকারি খাত ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে সরকারকে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর জলাবদ্ধতার জন্য কোনো একটি সংস্থাকে দায়ী করার সুযোগ নেই। স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০২১ প্রণয়ন করেছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর)’ নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র আধুনিকায়ন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নগর বনায়ন এবং সার্কুলার ইকোনমিভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজও এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে ‘থ্রি-আর’ (রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল) নীতির আওতায় প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৭ ধরনের সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে স্ট্র, স্টিরার ও কটন বাডের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহার ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সহজলভ্য বিকল্প পণ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। কারণ, নাগরিকরা নিজেরাই যদি পলিথিন ব্যবহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে পরিবেশ রক্ষা যেমন সহজ হবে, তেমনি রাজধানীর জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাও অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।