২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা জেতার লড়াইয়ে টিকে আছে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন ও ইংল্যান্ড। এবার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও স্পেন এবং ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। এর আগে খবরের কাগজ পাঠকদের জন্য বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের অদ্ভুত কিছু গল্প তুলে ধরা হলো-
ফ্রান্স ১৯৩৮
ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে ইতালি। জয়ের গোলটি আসে গুইসেপ্পে মেজ্জার পেনাল্টি থেকে। তবে সেদিন শুধু স্নায়ুই নয়, আরও একটি জিনিস সামলে রাখতে হয়েছিল ‘ইল বালিলা’কে (দ্য লিটল বয়)।
মেজ্জা যখন পেনাল্টি নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন ম্যাচের আগেই ছিঁড়ে যাওয়া তার শর্টসের ইলাস্টিক আবারও ছিঁড়ে যায়। ইন্টার মিলানের এই তারকা এক হাতে শর্টস ধরে রেখে অন্য হাতে নয়, বরং এক হাতেই ভারসাম্য রেখে বলটি ঠাণ্ডা মাথায় পেনাল্টি ঠেকানোর বিশেষজ্ঞ ওয়াল্টারের নাগালের বাইরে জালে পাঠান।
চিলি ১৯৬২
সান্তিয়াগোতে গারিঞ্চারই হওয়ার কথা ছিল এক নম্বর ‘জনশত্রু’। দুরন্ত এই উইঙ্গার তার কমিকসের চরিত্রের মতো ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে বারবার নাকাল করেছিলেন। তিনি দুটি গোল করেন, আরেকটি গোলে সহায়তা করেন এবং লাল কার্ডও দেখেন– ব্রাজিল স্বাগতিক চিলিকে ৪-২ গোলে হারানোর ম্যাচে। কিন্তু চিলির মানুষ ‘দ্য জয় অব দ্য পিপল’কে ঘৃণা নয়, বরং ভালোবেসেই বিদায় জানায়।
যখন তারা জানতে পারে, লাল কার্ডের কারণে গারিঞ্চা ফাইনালে খেলতে পারবেন না, তখন দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এমনকি চিলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে আলেসান্দ্রিও গারিঞ্চাকে ফাইনালে খেলার অনুমতি দেওয়ার দাবিতে করা আবেদনের নেতৃত্ব দেন। শেষ পর্যন্ত সেই আবেদন সফল হয়, যার জন্য চেক স্লোভাকিয়াকে পরে মূল্য দিতে হয়েছিল ফাইনাল হেরে।
স্পেন ১৯৮২
টোনি শুমাখার নিজের গোলপোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে নির্মমভাবে ধাক্কা মারেন প্যাট্রিক বাত্তিস্তোনকে। মাত্র কয়েক মিনিট আগে মাঠে নামা ফ্রান্সের ৩ নাম্বার খেলোয়াড়ের দুটি দাঁত ভেঙে যায়, তিনটি পাঁজরের হাড়ে ফাটল ধরে এবং মেরুদণ্ডের একটি কশেরুকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ পশ্চিম জার্মানির এক নম্বর গোলরক্ষক কোনো শাস্তিই পাননি। ফরাসিদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয় শুমাখারের আচরণ। আহত বাতিস্তোনকে কয়েক মিনিট ধরে চিকিৎসা দিয়ে স্ট্রেচারে মাঠের বাইরে নেওয়া হচ্ছিল, আর শুমাখার বিরক্তি প্রকাশ করে অধৈর্য আচরণ করছিলেন। এর পর টাইব্রেকারে দিদিয়ের সিক্স ও ম্যাক্সিম বোসিসের শট ঠেকিয়ে দেন শুমাখার। পশ্চিম জার্মানি উঠে যায় সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে।
ইতালি ১৯৯০
যে দেশ এক সময় ‘বিটল ম্যানিয়া’য় মেতেছিল, সেই দেশ তখন ডুবে ছিল ‘গাজ্জাম্যানিয়া’য়। পল গ্যাসকোইন (গাজ্জা) ছিলেন দুর্দান্ত ছন্দে। তার অনুপ্রেরণায় ২৪ বছর পর প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড। কিন্তু পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচের ৯৮ মিনিটে তিনি হলুদ কার্ড দেখেন। তখনই বুঝে যান, ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠলেও তিনি খেলতে পারবেন না। সঙ্গে সঙ্গেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ‘গাজ্জা’।
তিনি পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম এবং আমি যুব ক্লাবে খেলতাম, তখন প্রতি রাতেই স্বপ্ন দেখতাম বিশ্বকাপে ফুটবল খেলব। ইতালিতে আমি সেই স্বপ্ন পূরণ করেছিলাম। কিন্তু হলুদ কার্ড দেখার পর বুঝে গিয়েছিলাম, সেই স্বপ্নের এখানেই সমাপ্তি।’
ইংল্যান্ডের কোচ ববি রবসন যোগ করেন, ‘আমার হৃদয় যেন পায়ের জুতায় নেমে গিয়েছিল। কারণ আমি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝেছিলাম, পল গ্যাসকোইনের জন্য এটাই শেষ– সে আর ফাইনালে নেই। এটা তার জন্য, আমার জন্য, দলের জন্য, দেশের জন্য, পুরো ফুটবলের জন্যই এক ট্র্যাজেডি। কারণ সে এতটাই ভালো ছিল, আর ওই ম্যাচে সে ছিল অসাধারণ।’
তবে এই ঘটনাই গ্যাসকোইনের জনপ্রিয়তাকে আকাশচুম্বী করে তোলে। দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছিল, ‘পল গ্যাসকোইনের আগে কি কেউ শুধু কেঁদে জাতীয় বীর এবং নিশ্চিত কোটিপতি হয়ে উঠেছিল? অবিশ্বাস্য। তুমি কাঁদো, আর পৃথিবীও তোমার সঙ্গে কাঁদে।’
ফ্রান্স ১৯৯৮
ফ্রান্সের হয়ে ১৪২ ম্যাচে লিলিয়ান থুরাম গোল করেছিলেন মাত্র একটিতে। আরও অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, ক্লাব ফুটবলে ১১ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মাত্র একটি গোল করা এই ডিফেন্ডার সেই ম্যাচেই করে বসেন দুটি গোল! রাইট-ব্যাক থুরাম গোলদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর বেছে নিতে পারতেন না। ডান পায়ে একটি এবং বাঁ পায়ে আরেকটি গোল করে তিনি ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও ফ্রান্সকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দেন।
তখন থুরাম বলেছিলেন, ‘আমার মা গ্যালারিতে ছিলেন। তাকে যখন বলা হলো, তার ছেলে প্রথম গোলটি করেছে, তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি। এর পর যখন বলা হলো আমি আবার গোল করেছি, তখন তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। আমি মজা করছি না।’ মজার ব্যাপার হলো, শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে বুকমেকাররা থুরামের যেকোনো সময় গোল করার সম্ভাবনার জন্য ৪০/১ অডস দিয়েছিল, যা প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক হোসে লুইস চিলাভার্টের (৬/১) তুলনায় সাড়ে ছয় গুণেরও বেশি!
কোরিয়া/জাপান ২০০২
‘আমার পায়ের চোট নিয়ে সবাই কথা বলেই যাচ্ছিল। সবাই প্রশ্ন তুলছিল, আমি সেমিফাইনালে খেলতে পারব কি না,’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়ার পরের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন রোনালদো নাজারিও। ‘এসব শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই আমি ওই রকম করে চুল কেটে ফেললাম। এর পর সতীর্থদের জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লাগছে? তারা বলল, ভয়ঙ্কর! তুমি এটা এভাবে রেখ না। আমি ভাবলাম, এটা কাজে লাগতে পারে। সত্যিই তাই হলো। সাংবাদিকরা সঙ্গে সঙ্গে আমার চোটের কথা ভুলে গেল। তারা শুধু আমার চুল নিয়েই প্রশ্ন করতে লাগল। আমি স্বস্তি পেলাম।’
রিজার্ভ গোলরক্ষক দিদার ক্লিপারের ‘কীর্তি’ মাথায় নিয়েও রোনালদো তুরস্কের বিপক্ষে একমাত্র গোলটি করে ব্রাজিলকে ফাইনালে তুলে দেন।
পরে তিনি বলেন, ‘এটা ছিল ভয়াবহ! যেসব মা তাদের ছেলেদের একই রকম চুল কাটতে দেখেছেন, তাদের সবার কাছে আমি ক্ষমা চাইছি।’
জার্মানি ২০০৬
উচ্চতার দিক থেকে বিচার করলে ফাবিও কান্নাভারো চাইলে হয়তো পরবর্তী ফ্র্যাঙ্কি ডেট্টোরি (সাবেক ইতালিয়ান জকি) হতে পারতেন। আর ‘বিএফজি’ নামে পরিচিত পার মের্তেসাকারকে বাস্কেটবল কোর্টে ডির্ক নোভিৎসকির পাশেও বেমানান লাগত না। কিন্তু ওয়েস্টফালেনস্টাডিয়নের ঘাসে ফুটবল যুক্তির সব হিসাব পাল্টে দেয়। ২২ সেন্টিমিটারের উচ্চতার পার্থক্য উপেক্ষা করে স্টপেজ টাইমে মের্তেসাকারের বিপক্ষে হেডে বল জিতে নেন কান্নাভারো।
এর পর নিজের ক্লিয়ার করা বলের পেছনে ছুটে গিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে লুকাস পোদলস্কির সামনে থেকে আবারও হেড করে বল সরিয়ে দেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় ইতালির পাল্টা আক্রমণ, যার শেষটা করেন আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো। সেটিই ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে দেরিতে করা গোল, যা নিশ্চিত করে দেয় ফাইনালে ইতালির জায়গা।