রাজধানীতে গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে রাজধানীজুড়ে দিনমজুর, হকার, নির্মাণশ্রমিক, ফেরিওয়ালা ও রিকশাচালকদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমনকি নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সব শ্রেণি-পেশার মানুষকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বস্তিবাসী এ দুর্দিনে খাদ্য ও পানিসংকটে রয়েছে। যাদের প্রত্যেক দিনের আয় নির্ভর করে প্রতিদিনের কাজের ওপর। টানা বর্ষণে একদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে উন্নয়ন কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করা সড়কগুলো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে জনদুর্ভোগকে আরও বাড়িয়েছে। খবরের কাগজের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে অধিকাংশ সড়কে হাঁটু ও কোমরসমান পানি জমেছে। কোথাও ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তায় উঠে এসেছে। আবার কোথাও উন্নয়নকাজের জন্য খুঁড়ে রাখা সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে যানবাহন চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এর ফলে রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট, আর নগরবাসীকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে থাকায় মোটরসাইকেল, রিকশা ও ছোট যানবাহন প্রায়ই গর্তে পড়ছে। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অনেকে। বিভিন্ন স্থানে গর্তের কারণে পথচারীদেরও পথ চলতে নাজেহাল হতে হচ্ছে। অনেক স্থানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অফিসগামী মানুষের অফিসে পৌঁছাতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। ড্রেনের নোংরা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ায় সেটা মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে কর্মজীবী মানুষকে।
টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর ফুটপাতগুলো প্রায় ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে। হকাররা দোকান খুলতে পারছেন না। হকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে ৬ লাখেরও বেশি মানুষ ফুটপাতকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের অধিকাংশই দৈনিক বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। ফলে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে তাদের জীবিকা চরম সংকটে পড়েছে। অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় আয়হীন দিন কাটাচ্ছেন নির্মাণশ্রমিকরা। রিকশাচালকদের অবস্থা আরও শোচনীয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি জুলাইয়ের প্রথম ১১ দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তা এ মাসের গড় বৃষ্টির ৭৫ শতাংশ। আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, নিম্নচাপ, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা, বায়ুপ্রবাহের ভিন্ন গতি এবং এল নিনোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে এত বৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবছর বর্ষা এলে রাজধানীবাসীকে একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যদিও সিটি করপোরেশন থেকে বরাবরই সংকট সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি পরিদর্শনে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির প্রশাসকরা সরেজমিন পরিদর্শন করছেন। পরিদর্শনকালে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন তারা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে কুইক সার্ভিস টিম মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। বৃষ্টির পর কোথাও পানি জমে গেলে তা দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য কুইক সার্ভিস টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে বলে তারা জানান। তবে নগরীর বিদ্যমান ড্রেনেজব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অতিবৃষ্টিতে অনেক এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে পানি নিষ্কাশনের লাইন প্রয়োজনের তুলনায় কম। এ কারণে দ্রুত পানি সরানোর ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অচল ড্রেনগুলো সচল করার কাজও চলমান রয়েছে।
এ অবস্থায় সংকট নিরসনে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আহ্বান জানিয়েছেন যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলে খাল-বিল রক্ষা করার। তাই নগরবাসীর উচিত যার যার বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। ড্রেন ও ম্যানহোলগুলো পলিথিন, প্লাস্টিক ও আবর্জনায় পরিপূর্ণ হয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলে। এ জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারকে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত কাজ করতে হবে।