মাত্র দুই বছর বয়সেই হাতে নয়, পায়ে লেগেছিল ফুটবলের স্পর্শ। অন্য শিশুরা যখন খেলনা নিয়ে ব্যস্ত, তখন হুলিয়ান আলভারেজের সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী ছিল একটি জিনিস; ফুটবল। স্কুলে শিক্ষকরা বড় হয়ে কী হতে চাও জানতে চাইলে প্রতিবারই একই উত্তর দিতেন; ‘ফুটবলার।’
আর্জেন্টিনার কর্দোবার ছোট্ট শহর কালচিন। মাত্র সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসবাস। এই জনপদেই জন্ম হুলিয়ান আলভারেজের। এখানেই শুরু হয়েছিল তার ফুটবল-পাগল হয়ে ওঠার গল্প। শৈশবের বন্ধুরা যখন ইংরেজি শেখা, টেনিস কিংবা বাড়ির পথে হাঁটত, তখন আলভারেজ নিমগ্ন অনুশীলনে। কোচ রাফায়েল ভারাসের কাছে কয়েকটি বল চাইতেন। এরপর শুরু হতো নিজের অনুশীলন। কখনো দুই দিক থেকে আসা ক্রসে দুই পায়ে শট, কখনো ফ্রি-কিক, পেনাল্টি, হেড, ড্রিবলিং, স্প্রিন্ট কিংবা প্রথম স্পর্শের অনুশীলন। তখনো তাঁর বয়স ১০ বছরও হয়নি।
কোচ রাফায়েল ভারাস ফিফাকে বলেন, ‘একদিন ওর দাদির দিকে তাকিয়ে মজা করেই বলেছিলাম, এই ছেলেটা একদিন আমাদের সবার ভাগ্য বদলে দেবে। কিন্তু কথাটা বলেছিলাম ওর অসাধারণ সম্ভাবনা দেখেই।’ চার থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত আলভারেজকে কোচিং করিয়েছেন ভারাস। তাঁর মতে, ছোটবেলা থেকেই আলভারেজ অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিলেন। প্রতিটি বয়সভিত্তিক দলে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন তিনি।
১১ বা ১২ বছর বয়সে এক ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে চার গোল করেছিলেন আলভারেজ। কিন্তু সবার মনে জায়গা করে নেয় তার পঞ্চম মুহূর্তটি। দুই ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে রাবোনা শটে বল জালে পাঠান তিনি। ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রাও এসে করমর্দন করেছিলেন তার সঙ্গে।
ছোটবেলায় আলভারেজের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল স্থানীয় ফুতুরাস এসত্রেয়িতাস ফুটবল স্কুল। মাত্র দুই বছর বয়স থেকেই দুই বড় ভাই আগুস্তিন ও রাফায়েলের সঙ্গে সেখানে যেতেন। বাবা-মা কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রায়ই তাদের নিয়ে যেতেন দাদি টিটা। বল পেলেই শুরু হয়ে যেত খেলা। মা মারিয়ানা ছিলেন একটি নার্সারি স্কুলের শিক্ষক। বাবা গুস্তাভো কৃষিকাজ করতেন, পরে পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত হন। সাধারণ, পরিশ্রমী একটি পরিবারেই বেড়ে উঠেছেন আলভারেজ। স্কুলে শিক্ষকরা ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে তার উত্তর কখনো বদলায়নি; ‘আমি ফুটবলার হব।’
তাঁর প্রতিভার খবর পৌঁছে গিয়েছিল রিভার প্লেট, বোকা জুনিয়র্সসহ বড় ক্লাবগুলোর কাছেও। কিন্তু পরিবার তাড়াহুড়ো করেনি। তারা চেয়েছিল ছেলে স্বাভাবিক পরিবেশেই বড় হোক। ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত কালচিনেই ছিলেন আলভারেজ। এরপর নিজেই সিদ্ধান্ত নেন, পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে রিভার প্লেটে যোগ দেবেন।
২০১৮ সালে কিংবদন্তি কোচ মার্সেলো গালিয়ার্দোর অধীনে রিভার প্লেটের মূল দলে অভিষেক। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ম্যানচেস্টার সিটি আলোকিত করে এখন খেলছেন আতলেতিকো মাদ্রিদে। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়কও ছিলেন তিনি।
ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শৈশবের স্মৃতি মনে করে আলভারেজ বলেন, ‘কালচিনের নাম শুনলেই আমার বন্ধু, পরিবার আর শৈশবের কথা মনে পড়ে। আমি ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোর একটি কেটেছে সেখানে। সেই স্মৃতিগুলো আজও আমার কাছে অমূল্য।’
আলভারেজের সাফল্যে বদলে গেছে তার শৈশবের ক্লাবও। রিভার প্লেট, ম্যানচেস্টার সিটি ও আতলেতিকো মাদ্রিদে তার দলবদল থেকে পাওয়া অর্থে ক্লাবটি এখন আধুনিক ঘাসের মাঠ, স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা ও নানা সুযোগ-সুবিধা তৈরি করেছে।
ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে তার একটি ডাকনামও জন্ম নেয়; ‘স্পাইডার’। মাঠজুড়ে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে বেড়াতেন, যেন একসঙ্গে অনেক জায়গায় উপস্থিত থাকতে পারেন। সেই থেকেই ‘মাকড়সা’। আজও সেই নামেই তাকে চেনে ফুটবলবিশ্ব। বিশ্বকাপজয়ী তারকা হওয়ার পরও বদলে যাননি আলভারেজ। কালচিনের মেয়র ক্লদিও কাওনের ভাষায়, ‘সে যখন বাড়ি ফেরে, খুব নীরবে বন্ধু আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়। খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো শহর তার বাড়ির সামনে ভিড় করত। আর হুলিয়ানকে আমি চিনি; সে সবার জন্যই দরজা খুলে দিত।’
আজও কালচিনের শিশুরা বড় হয়ে হুলিয়ান আলভারেজ হতে চায়। আর আলভারেজ? তিনি কখনো ভোলেন না, তার ফুটবল-স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল সেই ছোট্ট শহরের ধুলোমাখা মাঠেই।