কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান-
ফ্রান্স-স্পেনের শুধু ফুটবলের সবুজ জমিনেই সমানে সমান নয়; ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতির দিক দিয়েও দুই দেশ অনেকটা সমানে সমান। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ফ্রান্স একে, স্পেন তিনে। আবার ভাষার দিক দিয়ে ফরাসি ভাষার ওপরে স্প্যানিশ ভাষা। বিশ্বের জনপ্রিয় ভাষাগুলোর মাঝে স্প্যানিশ ভাষা চারে, ফরাসি ভাষা পাঁচে। বিশ্বের অনেক জনপ্রিয় ফুটবলারও এই দুই ভাষায় কথা বলে থাকেন। ফ্রান্সের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্ব জুড়ে বিখ্যাত। ইতালির নাগরিক লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির সৃষ্টি ‘মোনালিসা’ শিল্প কর্ম ফ্রান্সের ল্যুভর জাদুঘরে সংরক্ষিত।
এটি এখন ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় সম্পদ। ‘কান’ চলচিত্র উৎসবের জন্য জগৎ জুড়ে ফ্রান্সের আলাদা একটি সুখ্যাতি আছে। রাজধানী প্যারিসে ৩৩০ মিটার উচ্চতার ‘আইফেল টাইওয়ার’ বিশ্ববাসীর কাছে দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। স্পেনের আছে ‘পাবলো পিকাসো’ নামে বিশ্ব বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। তাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিও বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। রোমানদের স্পেন শাসনের সময় রেখে যাওয়া স্থাপত্য আজও বিদ্যমান। সবার উপরে থাকা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের পরই স্পেনের লা-লিগা বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা জনপ্রিয় ফুটবল লীগ।
বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদে খেলে থাকেন জগৎ সেরা সব ফুটবলার। এই দুই ক্লাবের সমর্থকরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। ফ্রান্সের লিগ-ওয়ান আছে পাঁচে। এমন দুটি দেশ আজ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালের মঞ্চে উঠার মহারণে নামবে। দুই দেশ সেমিতে মুখোমুখি চূড়ান্ত হওয়ার পর বিশ্ব ফুটবলে ভেসে বেড়াচ্ছে ‘ফাইনালের আগে ফাইনাল।’ ডালাসে আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় মঞ্চস্থ হবে এমন উত্তাপ ছড়ানো হাইভোল্টেজ ম্যাচ।
ফ্রান্স-স্পেন দুই দলই তারকায় ঠাসা। ফ্রান্সের এমবাপ্পে, স্পেনের ইয়ামাল। ফ্রান্সের আছে দেম্বেলে, স্পেনের আছে ওয়ারজাবাল। এমনি করে দুই দলের লম্বা স্কোয়াড তারকায় ঠাসা। যারা বিশ্বের শীর্ষ লিগের সেরা সব ক্লাবে খেলে থাকেন। ৯০ মিনিটের ম্যাচে তাই চোখের পলক ফেলা দায়। প্রতিটি মুহূর্তই উত্তেজনায় ভরপুর। চোখের পলক সরানো মানেই অনেক কিছু মিস। আবার এমন ম্যাচ দেখার জন্য শক্ত মনোবল লাগে। দুর্বল চিত্তের দর্শকদের জন্য উত্তাপ ছড়ানো ম্যাচের তাপ নেওয়া কঠিনই হবে। বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক কী আজ ফরাসি সৌরভে বিমোহিত হবেন, নাকি স্প্যানিশ সৌন্দর্য অবলোকন করবেন? ‘ফাইনালের আগে ফাইনাল’ তাই ফুটবল জ্বরে কাঁপছে বিশ্ব। সেই জ্বরের তাপমাত্রা কত পর্যন্ত উঠে কে জানে?
৪৮ দলের বিশ্বকাপে এবারই প্রথম ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল সেমিতে উঠে এসেছে। অপর সেমির দুই দল আর্জেন্টিনা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দুইয়ে, ইংল্যান্ড তিনে। এই দুই দল আগামীকাল মুখোমুখি হবে আটলান্টায়। সেমিতে উঠে আসা দলগুলোর মাঝে যেমন শক্তির ব্যবধান খুব একটা থাকে না। ফিফা র্যাঙ্কিংও যেন সেটিই জানান দিচ্ছে। এই পর্যন্ত উঠে আসতে ফ্রান্সের চেয়ে স্পেনকে দিতে হয়েছে কঠিন পরীক্ষা। ‘আই’ গ্রুপ থেকে ফ্রান্স রাজকীয়ভাবে গ্রুপ সেরা হয়ে উঠে আসে নকআউট পর্বে।
গ্রুপের তিন দল সেনেগাল (৩-১), ইরাক (৩-০) ও নরওয়ে (৪-১) পাত্তাই পায়নি। সেখানে স্পেন নিজেদের ‘এইচ’ গ্রুপে নবাগত কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্যভাবে খেলা শেষ করে হতাশায় যাত্রা শুরু করে। তবে শুরুর এই ধাক্কা তাদের হৃদয়ে বেশ ভালোই ধাক্কা দিয়েছিল। যার প্রভাব দেখা যায় গ্রুপের বাকি ম্যাচগুলোতে। সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর দুইবারের সাবেক বিশ্ব চ্যাাম্পিয়ন উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়েই শেষ বত্রিশে নাম লেখায়।
নকআউট পর্বে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স অপ্রতিরোধ্য গতিই ধরে রাখে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন ফিরে পায় ছন্দ। গতির সঙ্গে ছন্দের লড়াইয়ের আগে ফিফা র্যাঙ্কিং বিবেচনায় নকআউট পর্বে ফ্রান্সের তুলনায় স্পেনের প্রতিপক্ষ ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। যেমন শেষ বত্রিশে ফ্রান্স ৩-০ গোলে হারিয়েছিল র্যাঙ্কিংয়ে ৩৮ নম্বরে থাকা সুইডেনকে। এখানে স্পেন একই ব্যবধানে হারিয়েছিল অস্ট্রিয়াকে। তাদের র্যাঙ্কিং ২৪। প্রি কোয়ার্টারে ফ্রান্স র্যাঙ্কিংয়ের ৪১ নম্বরে থাকা প্যারাগুয়েকে (১-০) হারাতে ঘাম ঝরিয়েছিল।
স্পেনের প্রতিপক্ষ ছিল শিরোপাপ্রত্যাশী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। র্যাঙ্কিংয়ে ৫ নম্বরে থাকা দলটিকে স্পেনও হারিয়েছিল ১-০ গোলে। পরের রাউন্ডে স্পেন পেয়েছিল ৯ নম্বর র্যাঙ্কিংয়ে থাকা বেলজিয়ামকে। জয়ী হয়েছিল ২-১ গোলে। এই রাউন্ডে ফ্রান্স পেয়েছিল শক্তিশালী প্রতিপক্ষ র্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বরে থাকা মরক্কোকে। ২-০ গোলে হারিয়ে উঠে আসে সেমিতে। শুরু থেকে সৌরভ ছিটানো লেস ব্লুজদের টানা তৃতীয়বার ফাইনালে উঠার হাতছানি। আগের দুইবারের মাঝে তারা একবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
অধিনায়ক এমবাপ্পের এ নিয়ে নেই আত্মতুষ্টি। ৮ গোল করে টানা দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বুট জেতার লক্ষ্যে থাকা এমবাপ্পে বলেন, ‘আমরা ২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। ২০২২ সালে রানার্সআপ ছিলাম। কিন্তু এই দল এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই অর্জন করতে পারেনি। এর মাঝেও অনেক বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। দলে এত ভালো মানের প্লেয়ার আছে যে, তারা আপনাকে স্বপ্ন দেখাতে উৎসাহিত করে তুলবে। আমরা সেমিতে উঠেছি। কিন্তু কাজ শেষ হয়ে যায়নি। সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।’ ২০১০ সালে প্রথমবার ফাইনালে উঠেই শিরোপা জেতা লা রোজারদের এবার দ্বিতীয়বার ফাইনালে উঠার সুযোগ। কোচ লুইস দা লে ফুয়েন্তের কণ্ঠে ছিল সে রকমই আভাস,’ আমরা ফাইনালে খেলার সুযোগ পাওয়া দলগুলোর মাঝে অন্যতম। আমরাই একমাত্র দল, যারা সেমিফাইনালে দুইবার ফ্রান্সকে হারিয়েছিলাম।’
ফুয়েন্তে যে দুটি সেমি ফাইনালের কথা উল্লেখ করেছেন, তার একটি ছিল গত বছর উয়েফা ন্যাশনস লিগ। নির্ধারিত সময়ের খেলায় স্পেন জিতেছিল ৫-৪ গোলে। অপরটি ছিল তার আগের বছর ২০০৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে। স্পেন জয়ী হয়েছিল ২-১ গোলে। দুই দলের মুখোমুখি দেখায় স্পেনের জয়ের পাল্লা ভারী। ৩৮ বারের দেখায় জয়ী হয়েছে ১৮ বার। ফ্রান্সের জয় ১৩ বার। বাকি ৭ বার ড্র হয়েছে। স্পেন দলে কোনো কার্ড বা ইনজুরি সমস্যা নেই। সেরা একাদশ নিয়েই তারা নামবে। এখানে আবার ফ্রান্স নির্ভার না। কার্ডজনিত সমস্যা না থাকলেও ইনুজরির শঙ্কা রয়ে গেছে রক্ষণের সাবিলা ও উপামেকানো এবং মধ্যমাঠে কোনে ও চুয়ামেনির। তবে তারা খেলবেনই না এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
ফ্রান্সের শক্তি গতি। স্পেনের শক্তি ছন্দ। গতি আর ছন্দে মিলে ডালাসে ফুটবলের কী সুর লহরি তৈরি হয়, সেই অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে গোটা ফুটবল বিশ্ব।