হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা শুরু হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা জোরদার করেছে ইরান। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি আবারও বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার জবাবে তারা বাহরাইন ও কুয়েতের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ওমানে অবস্থিত মার্কিন রাডারব্যবস্থা ধ্বংস এবং জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে জ্বালানি ট্যাংক ও গোলাবারুদের ডিপোতে আঘাত হেনেছে।
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা গত রবিবার বিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং ড্রোন ব্যবহার করে ইরানের সামরিক বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার সাইট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং ছোট নৌকার ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের তথ্যমতে, গতকাল হরমুজ প্রণালির বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস এবং কাছাকাছি কেশম দ্বীপে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বাহরাইন জানিয়েছে, গতকাল ভোরে তারা ইরানের বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং আরও ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধাবসান ঘটানো। তবে এই নতুন সহিংসতা সেই চুক্তির ভবিষ্যৎকে পুরোপুরি অনিশ্চিত করে তুলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার এক সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা ওদের কড়া জবাব দিচ্ছি।’ গত সপ্তাহে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি শেষ বলে ঘোষণা করলেও আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানিয়েছিলেন।
এদিকে ইরানের শীর্ষ পরমাণু পরিকল্পনাকারী ও আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘একতরফা চুক্তির দিন শেষ। আমরা আপনাদের বলেছিলাম, কথা রাখুন, অন্যথায় মূল্য চোকান। বাস্তব পরিস্থিতি এখন সামনে।’
গতকাল আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায় হলো এই জলসীমায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। তারা আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে বিশ্ব তেল ও গ্যাস খাতে আরও বড় ধরনের ‘দুর্ঘটনা’ ঘটতে পারে।
হামলার খবরের পর গতকাল বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে এই দাম যুদ্ধের শুরুর দিকের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা কম রয়েছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে পেট্রল ও জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিপ-ট্যাকিং সাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৫২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্য একটি ট্র্যাকিং সাইট কেপলার জানিয়েছে, রবিবার মাত্র ছয়টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা গত পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই রুট দিয়ে পরিবহন করা হতো। ইরান এখন এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে ফি আদায়ের ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে। তারা ঘোষণা করেছে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ যেন এখানে চলাচল না করে। গত শনিবার ইরান একটি অনুমোদনহীন জাহাজকে লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়ে নৌপথটি বন্ধ করে দেয় এবং রবিবার দ্বিতীয় আরেকটি জাহাজকে অচল করে দেওয়ার দাবি করে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বেসামরিক নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে তারা এ সপ্তাহে তিন রাতে ৩০০টিরও বেশি এবং শনিবার ১৪০টি ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড দাবি করেছে, তারা জর্ডানে মার্কিন মিত্রদের একটি কমান্ড সেন্টার ও ড্রোন হ্যাঙ্গার, কুয়েতে মার্কিন রাডার ও রকেট লঞ্চার সিস্টেম, ওমানে মার্কিন বিমানবাহী রণতরির জ্বালানি প্ল্যাটফর্ম এবং কাতারে একটি জেট রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ধ্বংস করেছে। সূত্র: রয়টার্স, সিএনএন