কাতারের ‘ফাদার আমির’ শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি গত রবিবার (১২ জুলাই) ৭৪ বছর বয়সে মারা গেছেন। প্রায় ১৮ বছরের শাসনামলে তিনি জ্বালানিনির্ভর ছোট উপসাগরীয় রাষ্ট্র কাতারকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনীতি ও বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তিও গড়ে তোলেন।
১৯৯৫ সালে ক্ষমতায় আসার সময় কাতারের অর্থনীতি মূলত তেলনির্ভর ছিল। তবে দুই দশকেরও কম সময়ে দেশটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক এবং মাথাপিছু আয়ের শীর্ষ দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
ক্ষমতায় বসার আগেই ১৯৮৯ সালে শেখ হামাদ ‘সুপ্রিম কাউন্সিল ফর প্ল্যানিং’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব পান। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তার অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করে।
গ্যাসসম্পদকে অর্থনীতিতে রূপান্তর
কাতারের অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা হয় বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র ‘নর্থ ফিল্ড’-এর উন্নয়নের মাধ্যমে। নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে গ্যাস উত্তোলন ও এলএনজি প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ দেশটির জ্বালানি খাতে নতুন যুগের সূচনা করে।
১৯৯৬ সালে প্রথম এলএনজি চালান রপ্তানির পর মাত্র ১৫ বছরের কম সময়ে কাতার বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারকে পরিণত হয়। এর ফলে শুধু রাষ্ট্রীয় আয়ই বাড়েনি, বরং এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তায় কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও কাতারের অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে।
নজিরবিহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
গ্যাস খাতের এই উত্থান কাতারের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হামাদের শাসনামলে কাতারের জিডিপি প্রায় ২০ গুণ বেড়ে ২০১৩ সালে প্রায় ১৯ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশগুলোর একটি ছিল কাতার।
গ্যাসের আয়ের বাইরে বৈশ্বিক বিনিয়োগ
অর্থনৈতিক রূপান্তর শুধু উৎপাদন ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও বড় পরিবর্তন আসে। ২০০১ সালে শেখ হামাদের নেতৃত্বে ‘সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট’ গঠন করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বৃদ্ধি এবং আয়ের উৎস বহুমুখীকরণ।
এর চার বছর পর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি’ (কিউআইএ), যা তেল ও গ্যাস থেকে অর্জিত অর্থ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ব্যবহার হয়। পরবর্তী সময়ে কিউআইএ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে পরিণত হয়।
নাগরিকদের জীবনমানে উন্নয়ন
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনমানেও। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হামাদের আমলে মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে কাতার বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে উঠে আসে। ক্রয়ক্ষমতা সমতার (পিপিপি) হিসাবে মাথাপিছু আয় ৯০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং বেকারত্বের হার নেমে আসে খুবই নিম্ন পর্যায়ে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ
জ্বালানি খাতের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নেও জোর দেন শেখ হামাদ। ১৯৯৫ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কাতার ফাউন্ডেশন ফর এডুকেশন’, ‘সায়েন্স অ্যান্ড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট’। শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি কাজ শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি, টেক্সাস এঅ্যান্ডএম, কার্নেগি মেলনসহ বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় কাতারে ক্যাম্পাস স্থাপন করে, যা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্বকাপ ও ভবিষ্যতের অর্থনীতি
শেখ হামাদের শাসনামলে গ্যাস থেকে অর্জিত আয় থেকে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। এ সময় হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হামাদ বন্দর, লুসাইল সিটি, আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক এবং পরবর্তী সময়ে দোহা মেট্রোর ভিত্তি স্থাপনকারী প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু হয়। এসব উন্নয়ন কাতারকে ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের সক্ষমতা এনে দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার
২০০৮ সালে চালু করা হয় ‘কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০’। যার লক্ষ্য ছিল জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। এই নীতিমালাই এখনো কাতারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি, কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০ এবং শিক্ষা-অবকাঠামো খাতে তার নেওয়া উদ্যোগগুলো আজও দেশটির অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তি হিসেবে অনুসরণ করছেন তার ছেলে ও বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। সূত্র: আল-জাজিরা