অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। তার নেতৃত্বকে ঘিরে ট্রাম্প, পুতিনসহ বিশ্বের প্রভাবশালী নেতারা কী ভাবছেন, তা বিশ্লেষণ উঠে এসেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে। ইউরোপ, রাশিয়া, ইউক্রেন ও এশিয়ায় নিযুক্ত বিবিসির সংবাদদাতারা এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্পকে জয় করার সুযোগ রয়েছে বার্নহ্যামের
এখন পর্যন্ত অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোভাব বেশ তাচ্ছিল্যপূর্ণ। বার্নহাম প্রধানমন্ত্রী হলে যুক্তরাজ্যের অভিবাসননীতি এবং উত্তর সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান– স্টারমার সরকারের বিরুদ্ধে তার এই দুটি প্রধান সমালোচনার পরিবর্তন হবে কি না, তা নিয়েও ট্রাম্পের সংশয় রয়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের কাছে বার্নহ্যামের পরিচয় মূলত একজন শহরের মেয়র এবং উদারপন্থি রাজনীতিক হিসেবেই সীমিত। এর বাইরে তাকে নিয়ে ট্রাম্পের তেমন ধারণা আছে বলে মনে হয় না। তাই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বার্নহ্যাম এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিচিত মুখ। এ জন্য ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ থাকবে, তেমনি তৈরি হবে নতুন সুযোগও। রাজনৈতিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে, স্যার কিয়ার স্টারমারের মতো তিনিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করতে পারেন।
চীন: নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনে হতাশা
উত্তর ইংল্যান্ডের উন্নয়নে এক সময় চীনের দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কের প্রশংসা করেছিলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাকে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। তাই তার প্রতি চীনের দৃষ্টিভঙ্গির দিকে নজর রাখছেন দেশটির কর্মকর্তারা। বেইজিং আশা করছে, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করবে। তবে লন্ডনে ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন নিয়ে চীনে হতাশারও সৃষ্টি হয়েছে। চীনা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ যুক্তরাজ্যের এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অস্থিতিশীলতার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ব্রেক্সিটের পর দেশটি এক ধরনের ‘পরিচয় সংকটে’ ভুগছে। এমন মন্তব্য করেছেন চায়না ইনস্টিটিউটস অব কনটেম্পোরারি ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের বিশ্লেষক ঝাং জিয়ান।
রাশিয়া: যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কে পরিবর্তনের আশা নেই
মস্কো দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যকে ক্রেমলিনের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম রাশিয়ার কড়া সমালোচক এবং মস্কোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি বারবার আহ্বান জানিয়েছেন। বার্নহ্যামও সম্প্রতি স্মরণ করিয়ে দেন, তিনি ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের বিরোধিতা করেছিলেন, ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ আয়োজনের সমালোচনা করেছিলেন এবং ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেন ও দেশটির মেয়রদের সমর্থন করে আসছেন। তবে ক্রেমলিনের ধারণা, যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও রাশিয়াবিষয়ক ব্রিটিশ নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন হবে না। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের মতে, বার্নহ্যামের অবস্থান স্যার কিয়ার স্টারমারের থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ইউক্রেন: যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে কিয়েভে উদ্বেগ
রাশিয়ার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পঞ্চম বছরে ইউক্রেন পেতে যাচ্ছে তার পঞ্চম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। নেতৃত্বে পরিবর্তন হলেও কিয়েভের মূল প্রত্যাশা, যুক্তরাজ্য যেন সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা আগের মতোই অব্যাহত রাখে। বরিস জনসন থেকে কিয়ার স্টারমার– সব ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আমলেই ইউক্রেনের প্রতি লন্ডনের সমর্থন অবিচল ছিল। বার্নহ্যামের অতীত অবস্থানও ইঙ্গিত দেয়, তার নেতৃত্বে এ নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। যদিও বার্নহ্যামের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ইউক্রেনের প্রত্যাশা তিনি রাশিয়ার হুমকিকে গুরুত্ব দিয়ে ইউক্রেনের আত্মরক্ষা এবং ইউরোপের নিরাপত্তায় যুক্তরাজ্যের সমর্থন অব্যাহত রাখবেন।
ইউরোপীয়রা যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দিকে উদ্বেগের সঙ্গে নজর রাখছে
ইউরোপের দৃষ্টিতে যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়; জার্মানি, ফ্রান্স ও ডেনমার্কসহ অনেক দেশই একই ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নজর এখন অ্যান্ডি বার্নহ্যামের দিকে। ইইউ জানতে চায়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি কিয়ার স্টারমারের মতোই আগ্রহী হবেন কি না এবং অবাধ চলাচল, ইইউ শুল্ক ইউনিয়ন বা একক বাজারের মতো ইস্যুতে লেবার পার্টির বর্তমান অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনবেন কি না। এদিকে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় মিত্রদের প্রত্যাশা, যুক্তরাজ্য ন্যাটোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াবে। একই সঙ্গে তাদের বড় প্রশ্ন– দেশীয় অগ্রাধিকারের পাশাপাশি বার্নহ্যাম ইউরোপের নিরাপত্তা ও ইউক্রেন ইস্যুকেও সমান গুরুত্ব দেবেন কি না।
ফ্রান্স: প্যারিস আশা করে বার্নহ্যামের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি স্টারমারের মতো হবে
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিচিত। বিশেষ করে ফ্রান্সে তার পররাষ্ট্রনীতি ও বৈদেশিক অগ্রাধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে প্যারিসের ধারণা, বার্নহ্যাম ইউরোপপন্থি হলেও যুক্তরাজ্যের ইইউতে পুনরায় যোগদানের পক্ষে নন। সে কারণে ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তার অবস্থান কিয়ার স্টারমারের নীতির ধারাবাহিকতাই বজায় রাখতে পারে। ফ্রান্সের প্রত্যাশা, ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। একই সঙ্গে ইউক্রেন ও হরমুজ প্রণালির মতো নিরাপত্তা ইস্যুতেও যুক্তরাজ্য-ফ্রান্সের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। সূত্র: বিবিসি