কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনাল ম্যাচে ফ্রান্স ও স্পেনের লড়াইকে কেন্দ্র করে বসেছিল কোটি টাকার অবৈধ জুয়ার আসর। অনলাইন বেটিং সাইট ও স্থানীয়ভাবে বাজি ধরে রাতারাতি লাখ লাখ টাকা হেরে নিঃস্ব হয়েছেন উপজেলার শত শত তরুণ। বাদ যায়নি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলও। গোলের উল্লাসের আড়ালে চলা এই জুয়ার জালে জড়িয়ে ধ্বংসের মুখে পড়ছে স্থানীয় যুবসমাজ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত রাত ১টায় অনুষ্ঠিত সেমিফাইনাল ম্যাচটি দেখার জন্য পেকুয়ার টৈটং বাজারের বিভিন্ন দোকানে ভিড় জমান স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীরা। তবে এই ভিড়ের আড়ালে চলে জমজমাট জুয়ার কারবার।
টৈটং বাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাত ১টার সময় খেলা শুরু হলে আমার দোকানে বসে অনেকে খেলা দেখেছে। খেলা দেখার পাশাপাশি সেখানে প্রকাশ্য ও গোপনে বাজি ধরা চলে। কেউ ১০ হাজার, কেউ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই ম্যাচের ওপর বাজি ধরেছেন। চোখের সামনে অনেকেই এক রাতে লাখ টাকা হারিয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরেছেন।
পেকুয়ার স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ এই সর্বনাশা আসক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই অনলাইন জুয়া আর বাজির কারণে এলাকার অনেক তরুণের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে অনেকের সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হতে দেখেছি। যুবসমাজকে বাঁচাতে এখনই প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
শিলখালী ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ রিয়াজ জানান, জুয়ার এই ভয়াবহ বিষবাষ্প শুধু নির্দিষ্ট কোনো বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। উপজেলার মগনামা, রাজাখালী, উজানটিয়া, বারবাকিয়া ও শিলখালী এলাকাতেও প্রতিনিয়ত বসছে ডিজিটাল ও অ্যানালগ জুয়ার আসর। বিশেষ করে স্মার্টফোনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জুয়ার অ্যাপস ব্যবহার করে এই সর্বনাশা খেলায় মেতে উঠছে উঠতি বয়সের তরুণেরা।
এই অনলাইন জুয়া ও বাজির কারণে পেকুয়া ও চকরিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে পারিবারিক কলহ চরম আকার ধারণ করেছে। জুয়ার লোভ ও আসক্তি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, অনেকে নিজের শেষ সম্বল জমি পর্যন্ত বিক্রি করে দিচ্ছেন।
জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকে ঋণের জালে জড়াচ্ছেন। ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জুয়ায় হেরে টাকা শোধ করতে না পেরে বা নতুন করে টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ঘরে-বাইরে অশান্তি তৈরি হচ্ছে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে অনেক সুখী সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, জুয়ার টাকা জোগাড়ের জন্য এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
এলাকার সচেতন মহল ও অভিভাবকেরা এই পরিস্থিতিতে চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দ্রুত এই জুয়াড়ি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিলে উপজেলার তরুণ সমাজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। টৈটং, মগনামা, রাজাখালীসহ পুরো পেকুয়া উপজেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাত্রিকালীন টহল জোরদার এবং জুয়ার স্পটগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানোর জন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সর্বস্তরের জনগণ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান বলেন, অনলাইন ও অফলাইনে যেকোনো ধরনের জুয়া খেলার বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে কেউ যেন জুয়ার আসর না বসাতে পারে, সে বিষয়েও পুলিশ সতর্ক রয়েছে। কেউ জুয়া আয়োজন বা অংশগ্রহণ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রকিবুল হাসান/রিফাত/