আমরা সবাই একই পতাকার মানুষ, একই স্বপ্নের অংশীদার। তাই বিভাজন নয়, আমাদের প্রয়োজন ঐক্য; তর্ক নয়, আমাদের প্রয়োজন উৎকর্ষ; এবং পরিচয়ের অহংকার নয়, আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিশ্বমানের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।...

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নতুন করে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একটি মন্তব্যকে ঘিরে শুরু হওয়া আলোচনা খুব দ্রুতই দুই পক্ষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। কেউ বলছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রকৃত মেধার প্রতীক, আবার কেউ বলছেন আধুনিক শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে।
এ বিতর্কের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেন হারিয়ে যাচ্ছে–বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি সত্যিই পাবলিক বনাম প্রাইভেট? বাস্তবতা হলো, এ প্রশ্নের উত্তর ‘না’। বরং এ ধরনের বিতর্ক আমাদের প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়। যে সময়ে বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, সে সময়ে আমরা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়ে তর্ক করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক হয়তো সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কোনো গবেষণাগার তৈরি করে না, কোনো নতুন আবিষ্কার জন্ম দেয় না এবং কোনো শিক্ষার্থীকে আরও দক্ষ করে তোলে না।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, গত তিন দশকে এ খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় উচ্চশিক্ষা প্রধানত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিক্ষার চাহিদা এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকাশ ঘটে। আজ দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। লাখো শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নেতৃত্বদানকারী অসংখ্য ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে এসেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান অপরিসীম।
একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ করেছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিল্পখাতমুখী পাঠক্রম এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের করপোরেট খাত, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বহু পেশাজীবী আজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সাফল্যের গল্পে উভয় ধারার প্রতিষ্ঠানেরই অবদান রয়েছে। তাই একটিকে অন্যটির প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও আমাদের একই শিক্ষা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীনের মতো দেশগুলো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘পাবলিক বনাম প্রাইভেট’ বিভাজনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করেনি। তারা গুরুত্ব দিয়েছে শিক্ষার মান, গবেষণার গুণগত উৎকর্ষ, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সমাজে প্রভাব সৃষ্টির সক্ষমতাকে। ফলে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে বেশি গবেষণা করবে, কে বেশি উদ্ভাবন করবে এবং কে বিশ্বমানের জ্ঞান উৎপাদনে বেশি অবদান রাখবে তা নিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি।
আমাদের নিজেদের কাছে কিছু কঠিন প্রশ্ন রাখা উচিত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর কতগুলো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে? কতগুলো পেটেন্ট তৈরি হচ্ছে? শিল্প খাতের সঙ্গে কতগুলো কার্যকর গবেষণা অংশীদারি গড়ে উঠছে? কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়তে আসছে? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা উদ্ভাবন সৃষ্টি করছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখতে পারে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যতটা আলোচনা হওয়া উচিত, ততটা হয় না।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গবেষণায় বিনিয়োগ সীমিত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সংযোগ এখনো দুর্বল, এবং অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে একটি ব্যবধান রয়ে গেছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো শুধু সরকারি বা শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; এগুলো পুরো উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আচরণের গুরুত্ব অনেক বেশি। সমাজে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের মন্তব্য শুধু একটি মতামত নয়; তা তরুণদের চিন্তা, মনোভাব এবং সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। তাই এমন কোনো বক্তব্য, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন সৃষ্টি করে বা একে অপরকে ছোট করে দেখার প্রবণতা বাড়ায়, তা কাম্য নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।
আজকের বিশ্বে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় দিয়ে নয়; বরং তার জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ দিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির যুগে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিয়োগদাতারা ক্রমশ সনদের চেয়ে সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত গবেষণার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সহযোগিতা জোরদার এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একা জয়ী হয় না, আবার একা পরাজিতও হয় না। যখন একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞান উৎপাদনে এগিয়ে যায়, তখন পুরো দেশই লাভবান হয়। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কে পাবলিক আর কে প্রাইভেট–সেই বিতর্ক নয়; বরং কীভাবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, যেখানে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার আত্মবিশ্বাস আমরা অর্জন করতে পারি।
বাংলা ভাষার একটি প্রবাদ আছে–‘বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়।’ এই প্রবাদটি আজও সমানভাবে সত্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় তার নাম বা পরিচয়পত্রে নয়; বরং তার শিক্ষার মান, গবেষণার অবদান, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নিহিত।
দিন শেষে একজন সফল গবেষক, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর দিনশেষে আমরা সবাই একই পতাকার মানুষ, একই স্বপ্নের অংশীদার। তাই বিভাজন নয়, আমাদের প্রয়োজন ঐক্য; তর্ক নয়, আমাদের প্রয়োজন উৎকর্ষ; এবং পরিচয়ের অহংকার নয়, আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিশ্বমানের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, মার্কেটিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

