ঢাকা ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে চট্টগ্রাম চেম্বারের ১ কোটি টাকা অনুদান রেকর্ড তাপমাত্রায় পুড়ছে যুক্তরাজ্য ‘আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই, গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা হবে শেখ হাসিনার’ হাঁটার অভ্যাসটিই হতে পারে পাপমোচন সবচেয়ে বড় উপায়? চরমপন্থা ও উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না সরকার: প্রধানমন্ত্রী ফাইনালের আগে ইয়ামালের বার্তা: 'নিউইয়র্ক' আমরা আসছি জনগণের নির্বাচিত সরকার তাদের পাশেই রয়েছে: ত্রাণমন্ত্রী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট আবারও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত সাজেক ভ্যালি জনবল নেবে ব্যাংক এশিয়া, দ্রুত আবেদন করুন ডেঙ্গুতে ২ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে  ৩৯১ সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী: আসক হেলথকেয়ার ডায়াগনস্টিক ইউনিট-২-এর যাত্রা শুরু ২৬ ক্রীড়া ফেডারেশনের নতুন কমিটির সুপারিশ ডব্লিউইউবি-তে বিজনেস আইডিয়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন নীল-সাদা জার্সির ভাঁজে সময় কুকুরের আতঙ্কে ইবির শিক্ষার্থীরা বহিষ্কারের মুখে আর্জেন্টিনা? ৭৮ লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ রাস্তা কেন ভাগাড় হবে উচ্চশিক্ষার বিতর্কে করণীয় কী বাংলাদেশকে ১৭১ রানের লক্ষ্য দিল জিম্বাবুয়ে বরিশালে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সড়ক অবরোধ পরীক্ষা না আন্দোলন: সপ্তম দিনে অনুপস্থিত ২০০৫২ পরীক্ষার্থী জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার নিয়ম উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করল ব্রিটিশ হাইকমিশনের মানবিক সহায়তা দল ‘ডায়াবেটিস রোগীদের চোখের সেবায় রেটিনোপ্যাথি স্ক্রিনিং সেবা চালু হচ্ছে’ ভারতীয় রুপির চাহিদা ও বাংলাদেশ-ভারত পারস্পরিক নির্ভরশীলতা একদিনে হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর প্রাণহানি ভূমিরূপ পরিবর্তন অধ্যায়ের ১০টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৫ম পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র চট্টগ্রামে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভ

উচ্চশিক্ষার বিতর্কে করণীয় কী

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম
উচ্চশিক্ষার বিতর্কে করণীয় কী
ড. মো. আব্দুল মোমেন

আমরা সবাই একই পতাকার মানুষ, একই স্বপ্নের অংশীদার। তাই বিভাজন নয়, আমাদের প্রয়োজন ঐক্য; তর্ক নয়, আমাদের প্রয়োজন উৎকর্ষ; এবং পরিচয়ের অহংকার নয়, আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিশ্বমানের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।...

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নতুন করে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একটি মন্তব্যকে ঘিরে শুরু হওয়া আলোচনা খুব দ্রুতই দুই পক্ষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। কেউ বলছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রকৃত মেধার প্রতীক, আবার কেউ বলছেন আধুনিক শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে।

এ বিতর্কের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেন হারিয়ে যাচ্ছে–বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি সত্যিই পাবলিক বনাম প্রাইভেট? বাস্তবতা হলো, এ প্রশ্নের উত্তর ‘না’। বরং এ ধরনের বিতর্ক আমাদের প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়। যে সময়ে বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, সে সময়ে আমরা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়ে তর্ক করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক হয়তো সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কোনো গবেষণাগার তৈরি করে না, কোনো নতুন আবিষ্কার জন্ম দেয় না এবং কোনো শিক্ষার্থীকে আরও দক্ষ করে তোলে না।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, গত তিন দশকে এ খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় উচ্চশিক্ষা প্রধানত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিক্ষার চাহিদা এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকাশ ঘটে। আজ দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। লাখো শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নেতৃত্বদানকারী অসংখ্য ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে এসেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান অপরিসীম।

একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ করেছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিল্পখাতমুখী পাঠক্রম এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের করপোরেট খাত, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বহু পেশাজীবী আজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সাফল্যের গল্পে উভয় ধারার প্রতিষ্ঠানেরই অবদান রয়েছে। তাই একটিকে অন্যটির প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও আমাদের একই শিক্ষা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীনের মতো দেশগুলো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘পাবলিক বনাম প্রাইভেট’ বিভাজনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করেনি। তারা গুরুত্ব দিয়েছে শিক্ষার মান, গবেষণার গুণগত উৎকর্ষ, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সমাজে প্রভাব সৃষ্টির সক্ষমতাকে। ফলে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে বেশি গবেষণা করবে, কে বেশি উদ্ভাবন করবে এবং কে বিশ্বমানের জ্ঞান উৎপাদনে বেশি অবদান রাখবে তা নিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি।

আমাদের নিজেদের কাছে কিছু কঠিন প্রশ্ন রাখা উচিত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর কতগুলো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে? কতগুলো পেটেন্ট তৈরি হচ্ছে? শিল্প খাতের সঙ্গে কতগুলো কার্যকর গবেষণা অংশীদারি গড়ে উঠছে? কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়তে আসছে? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা উদ্ভাবন সৃষ্টি করছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখতে পারে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যতটা আলোচনা হওয়া উচিত, ততটা হয় না।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গবেষণায় বিনিয়োগ সীমিত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সংযোগ এখনো দুর্বল, এবং অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে একটি ব্যবধান রয়ে গেছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো শুধু সরকারি বা শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; এগুলো পুরো উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আচরণের গুরুত্ব অনেক বেশি। সমাজে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের মন্তব্য শুধু একটি মতামত নয়; তা তরুণদের চিন্তা, মনোভাব এবং সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। তাই এমন কোনো বক্তব্য, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন সৃষ্টি করে বা একে অপরকে ছোট করে দেখার প্রবণতা বাড়ায়, তা কাম্য নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।

আজকের বিশ্বে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় দিয়ে নয়; বরং তার জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ দিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির যুগে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিয়োগদাতারা ক্রমশ সনদের চেয়ে সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত গবেষণার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সহযোগিতা জোরদার এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একা জয়ী হয় না, আবার একা পরাজিতও হয় না। যখন একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞান উৎপাদনে এগিয়ে যায়, তখন পুরো দেশই লাভবান হয়। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কে পাবলিক আর কে প্রাইভেট–সেই বিতর্ক নয়; বরং কীভাবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, যেখানে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার আত্মবিশ্বাস আমরা অর্জন করতে পারি।

বাংলা ভাষার একটি প্রবাদ আছে–‌‘বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়।’ এই প্রবাদটি আজও সমানভাবে সত্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় তার নাম বা পরিচয়পত্রে নয়; বরং তার শিক্ষার মান, গবেষণার অবদান, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নিহিত।

দিন শেষে একজন সফল গবেষক, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর দিনশেষে আমরা সবাই একই পতাকার মানুষ, একই স্বপ্নের অংশীদার। তাই বিভাজন নয়, আমাদের প্রয়োজন ঐক্য; তর্ক নয়, আমাদের প্রয়োজন উৎকর্ষ; এবং পরিচয়ের অহংকার নয়, আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিশ্বমানের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, মার্কেটিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

উচ্চশিক্ষার বিতর্কে করণীয় কী

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম
উচ্চশিক্ষার বিতর্কে করণীয় কী
ড. মো. আব্দুল মোমেন

আমরা সবাই একই পতাকার মানুষ, একই স্বপ্নের অংশীদার। তাই বিভাজন নয়, আমাদের প্রয়োজন ঐক্য; তর্ক নয়, আমাদের প্রয়োজন উৎকর্ষ; এবং পরিচয়ের অহংকার নয়, আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিশ্বমানের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।...

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নতুন করে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একটি মন্তব্যকে ঘিরে শুরু হওয়া আলোচনা খুব দ্রুতই দুই পক্ষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। কেউ বলছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রকৃত মেধার প্রতীক, আবার কেউ বলছেন আধুনিক শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে।

এ বিতর্কের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেন হারিয়ে যাচ্ছে–বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি সত্যিই পাবলিক বনাম প্রাইভেট? বাস্তবতা হলো, এ প্রশ্নের উত্তর ‘না’। বরং এ ধরনের বিতর্ক আমাদের প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়। যে সময়ে বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, সে সময়ে আমরা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়ে তর্ক করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক হয়তো সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কোনো গবেষণাগার তৈরি করে না, কোনো নতুন আবিষ্কার জন্ম দেয় না এবং কোনো শিক্ষার্থীকে আরও দক্ষ করে তোলে না।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, গত তিন দশকে এ খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় উচ্চশিক্ষা প্রধানত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিক্ষার চাহিদা এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকাশ ঘটে। আজ দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। লাখো শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নেতৃত্বদানকারী অসংখ্য ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে এসেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান অপরিসীম।

একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ করেছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিল্পখাতমুখী পাঠক্রম এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের করপোরেট খাত, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বহু পেশাজীবী আজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সাফল্যের গল্পে উভয় ধারার প্রতিষ্ঠানেরই অবদান রয়েছে। তাই একটিকে অন্যটির প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও আমাদের একই শিক্ষা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীনের মতো দেশগুলো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘পাবলিক বনাম প্রাইভেট’ বিভাজনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করেনি। তারা গুরুত্ব দিয়েছে শিক্ষার মান, গবেষণার গুণগত উৎকর্ষ, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সমাজে প্রভাব সৃষ্টির সক্ষমতাকে। ফলে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে বেশি গবেষণা করবে, কে বেশি উদ্ভাবন করবে এবং কে বিশ্বমানের জ্ঞান উৎপাদনে বেশি অবদান রাখবে তা নিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি।

আমাদের নিজেদের কাছে কিছু কঠিন প্রশ্ন রাখা উচিত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর কতগুলো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে? কতগুলো পেটেন্ট তৈরি হচ্ছে? শিল্প খাতের সঙ্গে কতগুলো কার্যকর গবেষণা অংশীদারি গড়ে উঠছে? কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়তে আসছে? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা উদ্ভাবন সৃষ্টি করছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখতে পারে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যতটা আলোচনা হওয়া উচিত, ততটা হয় না।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গবেষণায় বিনিয়োগ সীমিত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সংযোগ এখনো দুর্বল, এবং অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে একটি ব্যবধান রয়ে গেছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো শুধু সরকারি বা শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; এগুলো পুরো উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আচরণের গুরুত্ব অনেক বেশি। সমাজে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের মন্তব্য শুধু একটি মতামত নয়; তা তরুণদের চিন্তা, মনোভাব এবং সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। তাই এমন কোনো বক্তব্য, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন সৃষ্টি করে বা একে অপরকে ছোট করে দেখার প্রবণতা বাড়ায়, তা কাম্য নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।

আজকের বিশ্বে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় দিয়ে নয়; বরং তার জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ দিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির যুগে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিয়োগদাতারা ক্রমশ সনদের চেয়ে সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত গবেষণার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সহযোগিতা জোরদার এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একা জয়ী হয় না, আবার একা পরাজিতও হয় না। যখন একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞান উৎপাদনে এগিয়ে যায়, তখন পুরো দেশই লাভবান হয়। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কে পাবলিক আর কে প্রাইভেট–সেই বিতর্ক নয়; বরং কীভাবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, যেখানে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার আত্মবিশ্বাস আমরা অর্জন করতে পারি।

বাংলা ভাষার একটি প্রবাদ আছে–‌‘বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়।’ এই প্রবাদটি আজও সমানভাবে সত্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় তার নাম বা পরিচয়পত্রে নয়; বরং তার শিক্ষার মান, গবেষণার অবদান, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নিহিত।

দিন শেষে একজন সফল গবেষক, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর দিনশেষে আমরা সবাই একই পতাকার মানুষ, একই স্বপ্নের অংশীদার। তাই বিভাজন নয়, আমাদের প্রয়োজন ঐক্য; তর্ক নয়, আমাদের প্রয়োজন উৎকর্ষ; এবং পরিচয়ের অহংকার নয়, আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিশ্বমানের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, মার্কেটিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার
মাসুদ আহমেদ

জনসংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়াও মানুষের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সে জিনিসপত্র ভোগ করছে আগের চেয়ে বেশি এবং ফেলে দিচ্ছে অল্প ব্যবহারের পরই। এতে বর্জ্য ফেলার স্থান কমে গিয়ে তার একটি অংশ স্তূপকৃত হচ্ছে রাস্তায় ও খোলা স্থানে। একটি অংশ পড়ছে পয়ঃপ্রণালির ভেতর। এগুলো সবই তরল নয় যে, জলীয় অংশের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। শক্ত, আঠালো অংশ ও মৃত্তিকা স্থবির থেকে পয়ঃপ্রণালির আয়তন দিন দিন সংকুচিত করছে।...

একই বিষয় বারবার বলাকে পুনরুক্তি বলে। পুনরুক্তি করলে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য হারায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ যদি বারবার ঘটে তাহলে পুনরুক্তি না করে উপায় নেই। এতে বোঝা যায় পুনরুক্ত বিষয় বা ঘটনাবলি হয় গুরুত্বপূর্ণ নয় অথবা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোর সমাধান করা হয়নি। এর আবার দুটি দিক থাকতে পারে। এক. অবহেলাজনিত কারণে সমাধান হয়নি, দুই. সমাধানের সামর্থ্য নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে। ষড়ঋতুর এই দেশে শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে বারিপাত তথা ‘বরিষধারা মাঝে শান্তির বারি’র আগমনকে অবধারিত হিসেবে ধরে তার প্রস্তুতি ও প্রাক-প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। গত বছর বা আরও ২০ বছর আগে এমনি ডম্বরু দিনের কথা যদি মনে করি তাহলে দেখতে পাব সারা দেশের প্রায় সর্বত্র বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা শহরে তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে এসেছে জলাবদ্ধতা। তা মৌসুমি বৃষ্টির একাদিক্রমের কারণে নয়, আধা বা এক ঘণ্টার হঠাৎ বারিপাতজনিত কারণে। তার মানে এমন ঘটনার স্বাভাবিকতা আমাদের রোজনামচার বিষয়। আধ ঘণ্টা বা ৪০ মিনিটের ৫০ মিমি বৃষ্টিতে শহরের নিম্নাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এবারও হয়েছে।

প্রথমে পয়ঃপ্রণালির পানি ফুটপাথে, তার পর সুয়ারেজের পানি পথচারীর পায়ের পাতা ছাপিয়ে জুতা পার হয়ে হাঁটু অবধি উঠে আসছে। এর মধ্যে বৃষ্টির স্থায়িত্ব বেশি হলে পানি রওনা দিচ্ছে দোকানের নিচতলার ওপরে। তৈজসপত্র, জেনারেটর, গদি ভিজে নষ্ট হচ্ছে। আর রাস্তায় যানবাহন নাকসমান পানিতে ডুবসাঁতার দিয়ে চলছে। কারণ পানি নামতে পারছে না। কেন? মাদানি সাহেব শহরের যে জনসংখ্যা ও তার ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি হিসাব করে পয়ঃপ্রণালি বানিয়ে ছিলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তার চেয়ে ১২ গুণ। লভ্য খালি জমিতে পরবর্তী সরকারগুলো সাধ্যমতো পয়ঃপ্রণালি সম্প্রসারিত করেছে কিন্তু ৩৬৫ লাখ মানুষের ময়লা ফেলা ও তা জলাশয়ে ধাবিত করার চাহিদার চেয়ে তা অনেক কম। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়াও মানুষের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সে জিনিসপত্র ভোগ করছে আগের চেয়ে বেশি এবং ফেলে দিচ্ছে অল্প ব্যবহারের পরই। এতে বর্জ্য ফেলার স্থান কমে গিয়ে তার একটি অংশ স্তূপকৃত হচ্ছে রাস্তায় ও খোলা স্থানে। একটি অংশ পড়ছে পয়ঃপ্রণালির ভেতর। এগুলো সবই তরল নয় যে, জলীয় অংশের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। শক্ত, আঠালো অংশ ও মৃত্তিকা স্থবির থেকে পয়ঃপ্রণালির আয়তন দিন দিন সংকুচিত করছে।

পলিথিন, প্লাস্টিক, রাবার, চামচ, কাঁটা চামচ, জুতা, জায়নামাজ, খাবার প্লেট, কলম, পাইপ, ফাইল কভার, রেইনকোট, রিকশার কভার, লাখ লাখ রিকশাভ্যান ও ট্রাকের পলিথিন কভার, সেমিনারের ব্যানার, সোফা, গার্মেন্টের কভার, গাড়ির চাকা, কাচ, মেডিকেল বর্জ্য, বিয়ে বাড়ির বর্জ্য ইত্যাদির অধিকাংশই অনুপযোগী হওয়ার পর রাস্তায়, খোলা স্থানে ও শেষে ড্রেনে স্থান পাচ্ছে। কারণ এর সামান্য অংশই রিসাইকেল করা সম্ভব এবং নির্ধারিত বিনে ময়লা ফেলার পর উদ্বৃত্ত ময়লা সমস্যার সৃষ্টি করছে। কারণ সর্বোচ্চ বহন আয়তনের চেয়ে সাত গুণ বেশি মানুষ বহন করার ফলে তার উৎপাদিত নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা স্তূপ পানিকে আর ড্রেনে ঢুকতে দিতে পারছে না। তা উঠে আসছে পানির প্লাবতাতত্ত্ব অনুসরণ করে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, ঊর্ধ্ব দিকে; কিন্তু অধঃতে নয়। গতকাল বৃষ্টিতে সে দৃশ্যের পুনর্মঞ্চায়ন দেখেছে নগরবাসী। দোতালা সড়ক থেকে যানবাহন এসে নামছে নাকডোবা খালে। তার পর সাইলেন্সারে পানি ঢুকে দুর্বল গাড়ি অচল হচ্ছে। চিটাগাং শহরেও একই দৃশ্য ও কার্যকারণ। বিশ্লেষণ করে উপকার হবে না।

চাকতাই খাল খনন শেষ হলে উন্নতি হবে, এটা একান্তই অবাস্তব ধারণা। মূল কথা পানি সরবারহ স্থান কম, আবর্জনা বেশি, কারণ মানুষ বেশি। সব নির্মাণকাজ বন্ধ করতে হবে, তাহলেই সমস্যা লঘু হতে পার। পয়ঃপ্রণালির ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমানো ছাড়া কখনোই জলাবদ্ধতা কমবে না। অপ্রাসঙ্গিক হবে না, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করি। ঘটনাটি গতকালের। সরকারপ্রধান উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে এক ছাত্রী স্রোতবিরোধী আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ঢাকা মেডিকেলে একটি করে গ্রুপে ৩০ জন ছাত্রছাত্রীর ভিড়ে কিছু বিষয় শেখানো হয়। এই ভিড়ে এগুলো ঠিকভাবে শেখা সম্ভব নয়। আপনি এই মেডিকেলের আসন সংখ্যা কমানোর পদক্ষেপ নিন।’ 

সারা দেশে প্রাইমারি স্কুলকে মাধ্যমিক, মাধ্যমিককে হাই স্কুল, কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়, আসনসংখ্যা বৃদ্ধির তথা মনোনয়নের (নোয়াখালী বিভাগ চাই) দাবির এই সমুদ্র স্রোতের মধ্যে এমন দাবি কেন এল? নিজের স্বার্থের অসুবিধা হচ্ছে বলেই। জনচাপে কোথাও আরাম নেই, স্বস্তি নেই। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির এই লগ্নে গণবিরোধী এক্সক্লুসিভ রাজনীতির দাবি ওই ছাত্রী করেছেন। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি লেক ও উত্তরায়ও তেমনি পানি উঠেছে। বৃষ্টি হলে আবার তা হবে। এটা না চাইলে বা কমাতে চাইলে বসবাসকারীর সংখ্যা কমাতে হবে, যেমন ভালো চিকিৎসক চাইলে শিক্ষার্থী আসনসংখ্যা কমাতে হবে। ১ লাখ ঘনমিটারের চৌবাচ্চায় ২ লাখ ঘনমিটার পানি রাখার সুযোগ নেই। আমরা সেই চেষ্টা করছি। স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার, করপোরেশন–কেউ কোনো কাজ বোঝেন না, বুঝি শুধু আমরা–এটা ঠিক না। তারা বরাবরই জলাবদ্ধতা দূরীকরণে যথেষ্ট করছেন।

পানিতে অর্ধেক ডুবে যাওয়া ছোট ব্যবসায়ীর ৫ লাখ টাকা ক্ষতি, রিকশাচালকের ৩০০ টাকা ক্ষতি, মজুরের সম্পূর্ণ আয় বন্ধ, যাত্রীদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচের কষ্ট বোধগম্য কিন্তু ৩৩০০ বছর ধরে টিকে থাকা থিওরি–ত্রিভুজের যেকোনো দুই বাহুর সমষ্টি তৃতীয় বাহুর চেয়ে বেশি হবে–এক অমোঘ, অকাট্য, অপরিহার্য সত্যি। তাই, ‘সরকার একটা কিছু কইরা দেক, অনেক কথা শুনছি কিন্তু এই পানির সমস্যাটা যায় নাই, ড্রেন কাইটা দিক’ ধরনের আবেদনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা ও তজ্জনিত সমস্যা ও ক্ষয় দূর হবে না। কারণ, কারিগরিভাবে বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান নেই। মানুষ যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলে–কথাটা অন্যায়। সত্যি হচ্ছে, আবর্জনা ফেলার পর্যাপ্ত স্থান নেই।

রাজারবাগ মোড়ে একবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা এবং আবার সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা গৃহস্থালি আবর্জনা যেভাবে সংগৃহীত হচ্ছে তা প্রশংসার কারণ। এর চেয়ে শ্রেয় কিছু করা অবাস্তব। ওই সময়ের অসাধারণ সুগন্ধ গবাদিপশু সুলভ। এর মধ্যদিয়েই যেতে হয়। ১৯৯০ সালে এ অবস্থা ছিল না। পরিবেশ সচেতন হোন, যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলেবেন না তখন বলতে হতো না। কারণ অধিবাসী সংখ্যা এমন ছিল যে, আবর্জনা নিঃশব্দে, গোপনীয়তা ও শিল্পের সঙ্গে যথাস্থানে চলে যেত। যথেষ্ট স্থান ছিল। ওয়াশিং ডার্টি লিনেন ইন দ্য পাবলিক-এর মতো কাজ করার দরকার হতো না। জলাবদ্ধতাও হতো না। কনসালট্যান্টের পেছনে অর্থ অপচয় করতে হতো না। সে অবস্থায় ফেরা সম্ভব। অধিবাসীর সংখ্যা কমান। ঢামেকের আসনসংখ্যা কমানোর আবেদন আরামে পড়াশোনার জন্য। জলাবদ্ধতা কমানোর জন্য অধিবাসী তথা আবর্জনা উৎপাদকের সংখ্যা কমানো সমীচীন।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]

দুর্নীতির প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের হিসাব-নিকাশ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
দুর্নীতির প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের হিসাব-নিকাশ
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে কখনোই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার দেখেছে, এক সরকার অন্য সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে একই ধরনের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে। এ চক্র ভাঙতে হলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে।...

সম্প্রতি টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতি ও ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে। এই সূত্র ধরেই অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে হওয়া দুর্নীতি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮  মাসের সবকিছুর (তদন্তের) জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশনা দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলছি না, পত্রিকাটি এখন আমার কাছে নেই; সবাই দেখেছেন।... তারা তো দায়মুক্তি পেতে পারে না।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেকেই নতুন আশায় বুক বেঁধেছিল। তারা মনে করেছিল, এবার হয়তো রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা আসবে, প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দুর্নীতির দীর্ঘ ছায়া কিছুটা হলেও সরে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো হিসেবে এখন আমাদের সামনে তথ্য আসছে। তারা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বললেও কিছুদিন পরেই তাদের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে। ফলে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে–সমস্যা কি ব্যক্তি, নাকি পুরো ব্যবস্থার?

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তাকে ঘিরে দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ এই সরকারের প্রধান ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ব্যবসা, দারিদ্র্যবিমোচন এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ফলে অনেকেই মনে করেছিলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। কিন্তু ওই সরকারের দেড় বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার, স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার অস্বচ্ছ ব্যবহারের অভিযোগ জনপরিসরে বারবার আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু অভিযোগগুলোর ব্যাপকতা এবং জনমনে সৃষ্ট সংশয় উপেক্ষা করার সুযোগও নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন টকশো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নিয়োগ ও পদায়ন, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, উপদেষ্টাদের ভূমিকা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ওই সরকারের সমর্থকরা দাবি করেছেন, এসব অভিযোগের বড় অংশই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট–অভিযোগের উৎস যাই হোক না কেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভিযোগের জবাব তদন্ত ও তথ্যের মাধ্যমে দিতে হয়, রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে নয়।

বাংলাদেশে কখনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, কখনো প্রশাসনিক প্রভাব, কখনো ব্যবসায়িক স্বার্থ–বিভিন্ন রূপে দুর্নীতি টিকে থেকেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির প্রশ্নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে এ সরকারকে স্বাগত জানিয়েছিল, সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, যদি পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতি তদন্ত করা হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কারণ আইনের শাসনের মূলনীতি হলো–কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ব্যক্তি যত জনপ্রিয়ই হোন না কেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তও জনসমালোচনা ও জবাবদিহির আওতায় থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। সেসব অভিযোগও এখন তদন্ত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। দুর্নীতির অভিযোগ শুধু রাজনৈতিকভাবে যেমন হওয়া উচিত নয়, তেমনি শুধু রাজনৈতিক কারণে এড়িয়ে যাওয়াও উচিত নয়।

দুর্নীতির আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চাঁদাবাজি ও প্রভাব-বাণিজ্য। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ আশা করেছিল যে, দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজির সংস্কৃতি ভেঙে পড়বে। কিন্তু ড. ইউনূস সরকারের সময় সব রেকর্ড ভঙ্গ করে চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, পরিবহন খাত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো বন্ধ করতে পদক্ষেপ নেয়নি বললেই চলে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও জনগণের প্রত্যাশা ছিল অনেক। ব্যাংক খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে নামতে সুযোগ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার দৃশ্যমান প্রভাব সীমিত ছিল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা জনগণের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। সেখান থেকে জনগণ এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সমস্যা হলো আমরা প্রায়ই ব্যক্তিনির্ভর মূল্যায়ন করি। কোনো নেতা জনপ্রিয় হলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে চাই না, আবার কোনো নেতা অজনপ্রিয় হলে অভিযোগ প্রমাণের আগেই তাকে দোষী ধরে নিই। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা, তদন্ত সংস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি নয়, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। কারও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের স্তূপ গড়ে ওঠে আবার কাউকে কাউকে ছেড়ে দেওয়া হয় হাজার অভিযোগ থাকলেও। তাছাড়া আমরা সহজেই অতীতের কথা ভুলে যাই। আমারা যথাযথ মূল্যায়ন করতে জানি না। কে আমাদের জন্য কল্যাণকর, আর কে আমাদের জন্য কম কল্যাণকর, সে মূল্যায়নও আমরা যথাযথ করতে পারি না। সবকিছুই রাজনৈতিক বিবেচনায় চিন্তা করি।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিযোগগুলোর যে স্বাধীন তদন্ত হওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। এমন সব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত। সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো কোনো এমপি বলেন, তার নামে এক টাকারও দুর্নীতি নেই, অন্যদিকে কোনো কোনো গণমাধ্যম তার বিরুদ্ধেই অনবরত দুর্নীতির খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে। তাহলে সেগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত। আর আমাদের মনে রাখতে হবে, তদন্তের উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়; বরং সত্য উদ্ঘাটন করা। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তাহলে তদন্ত সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। আর যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে কখনোই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার দেখেছে, এক সরকার অন্য সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে একই ধরনের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে। এ চক্র ভাঙতে হলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও হেফাজতের আবির্ভাব

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম
যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও হেফাজতের আবির্ভাব
আনু মুহাম্মদ

সমাজের ভেতরে নানা সংশয় ও প্রশ্ন নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে তখন তৈরি হয় তরুণদের নেতৃত্বে ‘শাহবাগ আন্দোলন’ গণজাগরণ মঞ্চ এবং তা ব্যাপক জনসমর্থন পায়। কয়েক মাস এ আন্দোলন সমাজের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। কিছু হঠকারী তৎপরতা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতার রাজনীতির বলয়ে আটকে গিয়ে এ আন্দোলন কিছুদিনের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা সরকার এটাকে গিলে ফেলে।...

১৯৯০-এ এরশাদের পতন ঘটে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল  ও বাম পাঁচ দল মিলে সরকার পতন-পরবর্তী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য ‘তিন জোটের রূপরেখা’ দেয়। যদিও এই রূপরেখা বাস্তবায়নে পরের সরকারগুলোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এরশাদ পতনের পর জামায়াতে ইসলামীও বিজয়ী শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থিত করে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। কিন্তু তাদের সরকার গঠনে যথেষ্ট আসন ছিল না, দুটো আসন বাকি ছিল। বিএনপির সরকার গঠনে সেই সমর্থন দিয়ে জামায়াত তার রাজনৈতিক অবস্থান পোক্ত করে। এরপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই তাদের নিজ নিজ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর জন্য গোলাম আজমের কাছে সমর্থনের জন্য দোয়া চাইতে যায়। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নাগরিকত্ব হারানো গোলাম আজম তখনো নাগরিকত্ব ফেরত পাননি। পরিস্থিতি অনুকূল দেখে ১৯৯১ সালের শেষ দিকে জামায়াত গোলাম আজমকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের আমির ঘোষণা করে। সমাজে এসবের  প্রতিক্রিয়া হয় ব্যাপক। তার কারণেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন আবারও নতুনভাবে শুরু হয়।

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় ১০১ সদস্য বিশিষ্ট ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। আহ্বায়ক হন শহিদ জননী জাহানারা ইমাম। পরে এই কমিটি সম্প্রসারিত করে আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন বাম দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। ১৯৯২-এর ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গণ-আদালত অনুষ্ঠিত হয়। সরকার এই গণ-আদালতের প্রধান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে। কিন্তু এই আন্দোলন এত বিস্তৃত হয় যে, সারা দেশেই জামায়াতে ইসলামী কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এ পর্যায়ে একটি মহাবিপর্যয় থেকে জামায়াতকে কার্যত প্রথমে উদ্ধার করে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সাম্প্রদায়িক সহিংস কর্মসূচি, পরে আওয়ামী লীগের ‘বৃহত্তর ঐক্য’। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ভারতে বিজেপির বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা ঘটে। এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। এই জনবিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের আবার জোরগলায় পুনর্বাসন করতে সক্ষম হয়। এর দেড় বছরের মধ্যে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে জাহানারা ইমাম মৃত্যুবরণ করেন। একই সময়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সমঝোতার খবর প্রকাশিত হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১৯৯৫ সালে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির যুগপৎ আন্দোলনের সূচনা হয়। এই ঐক্য জামায়াতকে বিরাট স্বস্তি দেয় এবং তার কর্মসূচির সম্প্রসারণ অনেক সহজ হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায়। একপর্যায়ে অধিকতর দর কষাকষির মাধ্যমে জামায়াত আবারও যুক্ত হয় বিএনপির সঙ্গে। গঠিত হয় বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে এই জোট বিপুলসংখ্যক আসন নিয়ে বিজয়ী হয় এবং সেভাবেই জামায়াত সরকারের অংশীদার হয়। স্বাধীনতার ৩০ বছর পর, গণ-আদালত আন্দোলনের ১০ বছর পর, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে এরকম দুজন ব্যক্তি বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জামায়াতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও সম্প্রসারিত হয়।

বস্তুত, আশির দশক থেকে অর্থনৈতিক নীতি, দুর্নীতি, লুণ্ঠন এবং অগণতান্ত্রিক শাসন-পীড়নে দেশ যেভাবে চলেছে তাতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির কোনো ফারাক করা যায় না। তবে ১৯৭১ সালের বিচার নিষ্পত্তি না হওয়ায় আওয়ামী লীগের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে একটি ভিন্ন সমর্থন বলয় তৈরির সুযোগ তখনো অবশিষ্ট ছিল। আর ২০০৮ সালের নির্বাচনে এটাই ছিল তার শেষ অবলম্বন। সুতরাং, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রতিশ্রুতি নিয়েই তাকে এবার জনগণের সামনে যেতে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে পরিচিত দুই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মন্ত্রী হওয়ার কারণে সমাজে যে ক্ষোভ তৈরি হয় তার ওপরই ভর করে আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতা গ্রহণের পর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে গেছে আওয়ামী লীগ, ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। চিহ্নিত কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হলেও প্রথম থেকেই বিভিন্ন কারণে জনগণের মধ্যে সংশয় দেখা যায়। কারণ প্রথমত, এই আশঙ্কা বরাবরই থেকেছে যে, যেহেতু আওয়ামী লীগ একবার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য করেছে, বারবার নানা আপস প্রবণতা দেখিয়েছে, তাদের একটি মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে, সেহেতু যেকোনো সময় ভোট বা অন্য কোনো বিবেচনায় আবারও এরকম কিছু করতে পারে। দ্বিতীয়ত, শুধু ১৯৭১ নয়, এর আগে থেকেই জামায়াত বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, লবিং ইত্যাদি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে পরেও নানাভাবে সক্রিয় থেকেছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে ধনিক শ্রেণি গঠনের প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ মুছে দখল-লুণ্ঠন-জালিয়াতির একটি শক্তিশালী চক্র তৈরি হয়েছে দেশে। এই শ্রেণি মৈত্রীর শক্তি যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক তৎপরতা ছাড়াও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জমি দখল, নির্যাতনেও এ ঐক্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

প্রথম থেকেই এই বিচার কাজে সরকারের অদক্ষতা, অযত্ন, শৈথিল্য, দুর্বলতা নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া ছাত্রলীগ-যুবলীগ হামলা হত্যা জখম সন্ত্রাস চাঁদাবাজি করে সমাজে বিক্ষোভ বাড়িয়েছে। খুণি-সন্ত্রাসীদের ক্ষমা-প্রশ্রয় ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী নানা চুক্তি করে সরকার জনবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। দখল, নির্যাতন, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী অপকর্মের বিরুদ্ধে জনগণের নানা আন্দোলনের সামনে না দাঁড়াতে পেরে যখন তখন যে কোনো আন্দোলনকে ‘যুদ্ধাপরাধী বিচার নস্যাতের আন্দোলন’ কিংবা ‘জামায়াতী চক্রান্ত’ বলে সরকারি লোকজন প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের শক্তি জুগিয়েছে, তাদের গৌরবান্বিত করেছে। সামনে তখন ২০১৪ সালের নির্বাচন। নানা রহস্যজনক ঘটনায় ভোটের হিসাব-নিকাশে সরকার জামায়াতের সঙ্গে আবারও নতুন আঁতাতের পথে যাচ্ছে, এই সন্দেহ ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে।

সমাজের ভেতরে নানা সংশয় ও প্রশ্ন নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে তখন তৈরি হয় তরুণদের নেতৃত্বে ‘শাহবাগ আন্দোলন’ গণজাগরণ মঞ্চ এবং তা ব্যাপক জনসমর্থন পায়। কয়েক মাস এ আন্দোলন সমাজের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। কিছু হঠকারী তৎপরতা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতার রাজনীতির বলয়ে আটকে গিয়ে এ আন্দোলন কিছুদিনের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা সরকার এটাকে গিলে ফেলে।

এ সময়েই আবির্ভাব ঘটে হেফাজতে ইসলামসহ আরও নানা গোষ্ঠীর। গঠনের তিন বছরের মাথায় ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের বিশাল সমাবেশ বিস্ময়কর এবং রহস্যজনক মনে হতে পারে কিন্তু তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এর আগের তিন দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিধারায়, যার বিস্তৃত ব্যাখ্যা আগে দিয়েছি।

এই বছর শাহবাগে আন্দোলন ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, অথচ এই আন্দোলনকে কতিপয় গোষ্ঠী ‘নাস্তিকতা প্রচার’, ‘ইসলামবিদ্বেষী’ হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ’৭১-এর গণহত্যায় নিহত মানুষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই মুসলিম, সে কারণেও ইসলামপন্থিদের তো আরও সক্রিয়ভাবে এই গণহত্যার অপরাধীদের বিচার দাবি করার কথা। কিন্তু দেখা গেছে এই দাবি তুললেই তাকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলে কোনো কোনো গোষ্ঠী হুলস্থুল শুরু করে। বোঝা যায় যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করাই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। এসব মিথ্যা প্রচারের ওপর ভর করেই হেফাজত নেতৃত্ব সারা দেশের মাদ্রাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমবেত করে। সরকার তাদের প্রথমে অনুমতি দিয়েও পরে ‘এই সমাবেশকে বিএনপি-জামায়াত কাজে লাগাতে পারে’ এই ভয়ে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানে বাধা দেয়। রক্তক্ষয়ী যৌথ সামরিক অভিযানে হেফাজতের সমাবেশ শেষ হয়। সেই অভিযানে নিহতদের সংখ্যা বা তালিকা এখনো কেউ স্পষ্ট করেনি।

এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার আগে থেকেই হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মাত্রার যোগাযোগের কথা জানা যায়। সমাবেশ-উত্তরকালে এই যোগাযোগ ও সমঝোতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। পাইকারিভাবে লেখক-ব্লগারদের গ্রেপ্তার, একের পর এক ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সুরাহা করতে সরকারের অনীহা, আইসিটি আইনের মাধ্যমে কার্যত ‘ব্লাশফেমি’ আইনচর্চা ইত্যাদি পর্দার পেছনের সমঝোতার প্রমাণ দেয়। শুধু তাই নয়, হেফাজতের দাবি অনুযায়ী স্কুলের পাঠ্যপুস্তক রাতারাতি পরিবর্তনসহ একের পর এক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা তাদের আস্থাভাজন হন। হেফাজতের প্রকাশ্য সমাবেশে, মূল নেতাদের উপস্থিতিতে, তাকে ‘কওমি জননী’ খেতাব দেওয়া হয়।  আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন আওয়ামী ওলামা লীগও হেফাজতের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বিভিন্ন দাবি ও কর্মসূচি হাজির করতে থাকে।

গত দশকে দেশে গুম-খুনের আরও বিস্তার ঘটে, সব প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ চরম আকার নেয়, নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। নির্বাচনকে সরকার প্রহসনে পরিণত করে, গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার দিকে যত এগোতে থাকে ততই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নানা ধরনের সন্ত্রাসী ও ধর্মপন্থিসহ বিভিন্ন বৈষম্যবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়তে থাকে। 

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং 
ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

ডিজিটাল জুয়ার মরণফাঁদ

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম
ডিজিটাল জুয়ার মরণফাঁদ
আলম শাইন

দেশের তরুণদের মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্ন যেন কোনো প্রতারণার ফাঁদে নষ্ট না হয়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে তরুণরা নিজেদের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। তরুণদের শক্তিকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি দক্ষ, সচেতন ও সমৃদ্ধ প্রজন্ম।...

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু এর অপব্যবহার নতুন কিছু সংকটও তৈরি করেছে। অনলাইন জুয়া তারই একটি ভয়াবহ উদাহরণ। একসময় জুয়া ছিল নির্দিষ্ট কিছু স্থান ও মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েক ক্লিকেই তা মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই ফাঁদের প্রধান শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার একসময় নীরবে ঘটলেও বর্তমানে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, খেলাধুলার ম্যাচ ঘিরে বাজির প্রলোভন এবং অনলাইন গেমের নামে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেখিয়ে অনেক তরুণকে এতে যুক্ত করা হচ্ছে। শুরুতে অল্প অর্থ দিয়ে বড় লাভের স্বপ্ন দেখানো হয়। কেউ কেউ সামান্য লাভ করলেও পরে সেই আশাই তাদের আরও বড় ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে একসময় তারা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে।

এই প্রবণতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো আসক্তি। মাদকের মতো এটিও ধীরে ধীরে মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। দ্রুত ধনী হওয়ার মোহে অনেক তরুণ পড়াশোনা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে দূরে সরে যায়। সারাক্ষণ বাজির হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাড়ে মানসিক চাপ ও হতাশা। অনেক ক্ষেত্রে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

অনলাইন জুয়ার প্রভাব পড়ে পারিবারিক জীবনেও। অনেক তরুণ পরিবারের অজান্তে টাকা খরচ করে, ঋণ করে কিংবা গোপনে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করে। কেউ কেউ পরিবারের সঞ্চিত অর্থও ব্যবহার করে। সেই সত্য গোপন করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ায় পারিবারিক বিশ্বাস নষ্ট হয় এবং তৈরি হয় অশান্তি।

শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, সমাজও এ সমস্যার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সহজে অর্থ উপার্জনের মানসিকতা তরুণদের পরিশ্রম ও সৎ উপার্জনের মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কেউ কেউ আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে গিয়ে প্রতারণা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। অথচ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তরুণদের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার ওপর। সেই শক্তি যদি ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অনলাইন জুয়া ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো এর সহজলভ্যতা এবং এ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। অনেকেই এটিকে নিছক বিনোদন বা সহজে অর্থ আয়ের মাধ্যম মনে করেন। বাস্তবে অধিকাংশ জুয়ার প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে পরিচালিত হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয় এর পরিচালকরাই। ব্যবহারকারীরা সাময়িকভাবে কিছু অর্থ পেলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশই ক্ষতির মুখে পড়ে।

এই অবৈধ ব্যবসার বিস্তারে বিদেশি সার্ভারনির্ভর ওয়েবসাইট ও অ্যাপের ভূমিকাও রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্ম দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হওয়ায় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেনের সহজ ব্যবস্থার কারণে অল্প সময়ে অর্থ জমা ও উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। তাই শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই হবে না, এর সঙ্গে জড়িত অর্থ লেনদেনের পথও চিহ্নিত করে বন্ধ করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে এসব প্ল্যাটফর্মের প্রচারণা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। জনপ্রিয় ব্যক্তিদের প্রচারণা দেখে অনেক তরুণ এসবকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে যুক্ত হয়। অথচ এর পেছনে থাকে বাণিজ্যিক স্বার্থ। তাই ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আইনের কার্যকর প্রয়োগ অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অবৈধ ওয়েবসাইট, অ্যাপ এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যম বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং যুক্তি, সচেতনতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ডিজিটাল নিরাপত্তা, আর্থিক সচেতনতা এবং অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করা দরকার।

নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষাও এ সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। জুয়া মানুষের মধ্যে পরিশ্রম ছাড়া অর্থ লাভের প্রবণতা তৈরি করে, যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সততা, পরিশ্রম এবং দায়িত্বশীলতার শিক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

গণমাধ্যমেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনলাইন জুয়ার প্রকৃত চিত্র ও এর ক্ষতিকর দিক সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি এসব প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

তরুণদের এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে তাদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিকচর্চা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়ানো গেলে তারা নিজেদের দক্ষতা বিকাশে মনোযোগী হবে। নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের সুযোগ পেলে ভাগ্যনির্ভর আয়ের প্রতি আকর্ষণ কমে আসবে।

অনলাইন জুয়ার আসক্তিতে যারা ইতোমধ্যে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের প্রতিও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শুধু তিরস্কার বা শাস্তি দিয়ে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। কাউন্সেলিং, মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

অনলাইন জুয়া কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটেরও একটি কারণ। তরুণ সমাজকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আইনের প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত নজরদারি, পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ–এই বিষয়গুলো কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা গেলে এর বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

দেশের তরুণদের মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্ন যেন কোনো প্রতারণার ফাঁদে নষ্ট না হয়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, ভালো পরিবেশ এবং গঠনমূলক কাজে যুক্ত করার সুযোগ দিতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে তরুণরা নিজেদের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, শিক্ষা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তরুণদের শক্তিকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি দক্ষ, সচেতন ও সমৃদ্ধ প্রজন্ম।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও 
জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট