ঢাকা ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
জুয়ার জালে সর্বস্ব হারাচ্ছেন পেকুয়ার তরুণরা মিরপুর বিআরটিএ’তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান: ২ দালালের জেল, ৩ জনের জরিমানা ২৬ কার্যদিবসের বাজেট অধিবেশনে ১০টি সরকারি বিল পাস এক কুকুরের কামড়েই শেরপুরে আহত ২৯ সফর মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ১২ আগস্ট আখেরি চাহার সোম্বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো প্রাইভেটকারে মিলল ৬ হাজার ইয়াবা সোনারগাঁয়ে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর একই স্থানে সভাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা রংপুরে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ, তারপর... শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সময় বেঁধে দিয়ে শাহবাগ ছাড়লেন শিক্ষার্থীরা টি-টোয়েন্টি সিরিজেও হারে শুরু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে চট্টগ্রাম চেম্বারের ১ কোটি টাকা অনুদান রেকর্ড তাপমাত্রায় পুড়ছে যুক্তরাজ্য ‘আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই, গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা হবে শেখ হাসিনার’ হাঁটার অভ্যাসটিই হতে পারে পাপমোচন সবচেয়ে বড় উপায়? চরমপন্থা ও উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না সরকার: প্রধানমন্ত্রী ফাইনালের আগে ইয়ামালের বার্তা: 'নিউইয়র্ক' আমরা আসছি জনগণের নির্বাচিত সরকার তাদের পাশেই রয়েছে: ত্রাণমন্ত্রী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট আবারও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত সাজেক ভ্যালি জনবল নেবে ব্যাংক এশিয়া, দ্রুত আবেদন করুন ডেঙ্গুতে ২ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে  ৩৯১ সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী: আসক হেলথকেয়ার ডায়াগনস্টিক ইউনিট-২-এর যাত্রা শুরু ২৬ ক্রীড়া ফেডারেশনের নতুন কমিটির সুপারিশ ডব্লিউইউবি-তে বিজনেস আইডিয়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ সম্পন্ন নীল-সাদা জার্সির ভাঁজে সময় কুকুরের আতঙ্কে ইবির শিক্ষার্থীরা বহিষ্কারের মুখে আর্জেন্টিনা? ৭৮ লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ রাস্তা কেন ভাগাড় হবে উচ্চশিক্ষার বিতর্কে করণীয় কী

ভারতীয় রুপির চাহিদা ও বাংলাদেশ-ভারত পারস্পরিক নির্ভরশীলতা

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
ভারতীয় রুপির চাহিদা ও বাংলাদেশ-ভারত পারস্পরিক নির্ভরশীলতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

দীর্ঘ দুই বছর পরে, গত ২৮ জুন ভারতীয় হাইকমিশন নতুন করে বাংলাদেশিদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করল। যেখানে প্রায় দেড় লাখ লোক ভিসার আবেদন করেছেন। এত ভারতবিরোধী আন্দোলন, মিছিল-মিটিং, ‘দিল্লি না ঢাকা’, আবার ভারতের পক্ষ থেকে পুশইন, কথায় কথায় আলু, পেঁয়াজ বন্ধ করতে চাওয়া, কথায় কথায় বাংলাদেশ দখলের হুমকি দেওয়া এবং অষ্টম সিস্টার্স বা উপনিবেশবাদ মনে করত প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র। সুতরাং বাংলাদেশ ও ভারত দেশ দুটি ভৌগোলিকভাবে বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। যেখানে ভারতকে যেমন বাংলাদেশের প্রয়োজন, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশের প্রয়োজন। প্রয়োজন বলেই দুই বছর পর হলেও পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগ ও কার্যক্রম।

গত ১ জুলাই ইন্ডিয়া টুডে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, উত্তেজনাপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেও ভারত পুনরায় পর্যটক ভিসা চালু করতেই বাংলাদেশের বিভিন্ন ভিসা আবেদন কেন্দ্রে দীর্ঘ সারি লক্ষ করা যায় এবং ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি আবেদন জমা পড়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। এই বিপুল সাড়া প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক অবস্থান, চিকিৎসাসেবা এবং পারিবারিক সম্পর্ক–এসব বাস্তব প্রয়োজন এখনো দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সেই সময় ঢাকায় ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোয় হামলা হয় এবং কর্মীরা হুমকির মুখে পড়েন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভারত পর্যটক ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তবে সীমিত পরিসরে চিকিৎসা ভিসা চালু ছিল বলে দাবি করে প্রতিবেদনটিতে।

প্রতিবেদনটি সংক্ষেপ করলে আরও দেখা যায়, ভৌগোলিকভাবে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটারের মতো দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে রয়েছে দেশ দুটির। বাংলাদেশের প্রায় পুরো অংশে ভারতের সীমান্ত জড়িয়ে রয়েছে। যেখানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে জড়িয়ে রয়েছে দেশ দুটি। আবার আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশেরই ভারত হচ্ছে একমাত্র লক্ষ্য। যেখানে তুলনামূলকভাবে অন্যান্য দেশের তুলনায়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বাংলাদেশের তুলনায় কম মূল্যে সেবা পাওয়া যায়। আবার ভিসা কেন্দ্রের ভিড়ের ব্যাখ্যা করে বলা হয়, পূর্বে ১৬টি ভিসা কেন্দ্র চালু থাকলেও বর্তমানে পাঁচটি ভিসা কেন্দ্র চালু করা হয় এবং বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা চাহিদা একসঙ্গে প্রকাশ পাওয়ায় এমনটা ভিড় লক্ষ করা যায়।

প্রতিবেদনটিতে পরিসংখ্যানগত যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ২১ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ভারত সফর করেছেন, যা ভারতের মোট বিদেশি পর্যটকের প্রায় ২০ শতাংশ। পর্যটক ভিসা বন্ধ হওয়ার পর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজারে। তাদের অধিকাংশই চিকিৎসা ভিসায় ভারত যান। সম্পর্কের অবনতির আগে ভারত যে চিকিৎসা ভিসা দিত, তার ৭০-৭৫ শতাংশই ছিল বাংলাদেশিদের জন্য। এরপর অনেক বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য চীন, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে যেতে শুরু করেন। কিন্তু এসব দেশের চিকিৎসা ব্যয় মধ্যবিত্ত বাংলাদেশিদের জন্য অনেক বেশি হওয়ায় ভারতই এখনো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও সাশ্রয়ী গন্তব্য। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জন্য ভারত শুধু প্রতিবেশী নয়; ভৌগোলিক অবস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ।

প্রতিবেদনটিতে অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীদের জন্য গত দুই বছরে কলকাতার নিউ মার্কেট-সংলগ্ন ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও আতিথেয়তা এলাকায় ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্যবসায়ীদের প্রায় ১ হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোর সামনে মানুষের উপচেপড়া ভিড় শুধু ভিসার আবেদন নয়; এটি দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতারও প্রতিচ্ছবি।

প্রতিবেদনটিতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, দেশ দুটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বেশ জোরালো এবং একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। নির্ভরশীলতার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় বেশ ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও ভারতের দিক থেকেও একেবারেই বাংলাদেশকে দুর্বলভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, অক্টোবর ২০২৪ সালে ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে অবস্থান করে। আবার খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং এক বছর পর ওই মূল্যস্ফীতিই হয় ঋণাত্মক ৫ দশমিক ০২ শতাংশ। কারণ হিসেবে খুব সহজেই বলা যায়, তারা তাদের খাদ্যপণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করতে পারেনি। আবার ‘ভারতের রপ্তানি বাণিজ্য বাজারের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ নম্বর এবং প্রায় ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের বাজার এটি। যা ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় ১৪ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের বাজারের মধ্যে ভারতের অবস্থান নবম স্থানে এবং প্রায় ১৫৭ কোটি মার্কিন ডলারের বাজার এটি। যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ (তথ্য: ইপিবি ও ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)।

২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত বৈধ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ভারতীয় নাগরিক, ৩৭ হাজার ৪৬৪ জন (সূত্র: স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ)। যা রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে ভারতের কাছে বাংলাদেশ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত। সুতরাং এই পরিস্থিতিতে ভারতের বাংলাদেশকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।

কারণ পরিসংখ্যান বলে, ভারতের বিশাল এক বাণিজ্যিক ক্রেতা হলো বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ভারত থেকে নিত্যপণ্য কিনতে না পারলে, বাংলাদেশের যেমন খরচ বৃদ্ধি পাবে, তেমনি ভারতও তার বড় ক্রেতা হারাবে। তাই বাংলাদেশ বিকল্প রাষ্ট্র পেলে তার যেমন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশে রপ্তানি করতে না পারায় ঋণাত্মক মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা উভয় দেশের জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

কিন্তু বাংলাদেশের একটি বিষয় ভাবতে হবে, ভারত ভৌগোলিকগতভাবে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ। ভারতের গোলামি না করে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে, এটি যেমন সত্য, তেমনি ভারতের প্রতি শ্রদ্ধাশীলও থাকতে হবে। ইতোমধ্যেই খোলা বাজারে ভারতীয় রুপির চাহিদা অনেক বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ ‘দেশে খোলাবাজারে তথা মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখন ভারতীয় মুদ্রা রুপির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, চিকিৎসা, পর্যটনসহ নানামাত্রিক সম্পর্কের কারণে ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গ্রাহকদের বেশি পরিমাণে রুপি লেনদেন করতে হয়’ (১০ জুলাই ২০২৬, প্রথম আলো)। এর অন্যতম কারণ দুই বছর পর পর্যটন খাতে ভারতীয় ভিসা চালু হওয়া।

অতএব দেশ দুটির মধ্যে থাকতে হবে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমতার ভিত্তিতে একটি সুন্দর সম্পর্ক। যে সম্পর্কে কেউ কাউকে ছোট করে না দেখে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করবে। তবেই সম্পর্ক হবে দীর্ঘস্থায়ী।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট
[email protected]

বন্যায় সবচেয়ে বেশি জরুরি শিশু সুরক্ষা

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:০০ পিএম
বন্যায় সবচেয়ে বেশি জরুরি শিশু সুরক্ষা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিবারই আমরা একই ভুল করি, ত্রাণের হিসাব করি চাল, ডাল, পানি আর শুকনো খাবারে, অথচ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, অর্থাৎ শিশুদের সুরক্ষাকে আলাদা অগ্রাধিকার দিই না। অথচ দুর্যোগ-পরবর্তী মৃত্যুর বড় অংশ ঘটে বন্যার পানিতে নয়, বরং অনিরাপদ আশ্রয়, দূষিত পানি, অপুষ্টি, রোগব্যাধি, মানসিক আঘাত এবং অবহেলার কারণে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এখন শুধু প্রাণ রক্ষা যথেষ্ট নয়, দুর্যোগ-পরবর্তী শিশু সুরক্ষাকেও সমান অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে।

চলমান বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও সিলেটের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। একই সময়ে উত্তরবঙ্গে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদনদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলেও বন্যা ও নতুন করে প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৮ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বিভিন্নভাবে দুর্ভোগে পড়েছেন। হাজার হাজার বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক পানির নিচে চলে গেছে, বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানির সরবরাহ বিচ্ছিন্ন। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে।

এ সংকটের কেন্দ্রে আছে শিশুরা। কারণ বন্যা তাদের জন্য শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার সংকট। ইউনিসেফ বহুবার সতর্ক করেছে, বন্যার সময় শিশুদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পানিতে ডুবে মৃত্যু, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ, অপুষ্টি, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, নির্যাতন এবং শিক্ষা থেকে ছিটকে যাওয়া। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে শিশুরা সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ শিশু অন্তত একটি জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখে এবং প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ শিশু একই সঙ্গে একাধিক জলবায়ু অভিঘাতের মধ্যে বসবাস করছে। নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহ–সব মিলিয়ে শিশুরাই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও শিশু সুরক্ষা এখনো ত্রাণ কার্যক্রমের মূলধারায় আসেনি। আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের প্রতিটি পর্যায়ে শিশুকেন্দ্রিক পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক না হলে একই সংকট বারবার ফিরে আসবে।

এ অবস্থায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য শিশু সুরক্ষাকে ত্রাণ কার্যক্রমের কেন্দ্রে নিয়ে আসা জরুরি।

প্রথমত, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও পৃথক ‘চাইল্ড-ফ্রেন্ডলি স্পেস’ রাখতে হবে, যেখানে তারা নিরাপদে থাকতে, খেলতে এবং মনোসামাজিক সহায়তা পেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, কোনো শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেওয়া যাবে না, বিচ্ছিন্ন হলে দ্রুত শনাক্তকরণ ও পুনর্মিলনের ব্যবস্থা করতে হবে। 

তৃতীয়ত, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, সাবান, হাইজিন কিট এবং শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য বিশেষ পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক শিশু তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

পঞ্চমত, বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দ্রুত অস্থায়ী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে, কারণ দীর্ঘদিন শিক্ষা বন্ধ থাকলে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও বিদ্যালয়ত্যাগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ত্রাণের ব্যাগে চাল-ডালের সঙ্গে শিশুদের জন্য উচ্চপুষ্টিসম্পন্ন খাবার, স্থানীয় মৌসুমি ফল, নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থা, ওরস্যালাইন, সাবান, স্যানিটারি সামগ্রী এবং শিশুদের প্রয়োজনীয় উপকরণও রাখতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য আলাদা ত্রাণ প্যাকেজ প্রণয়নের বিষয়টিও সরকার ও মানবিক সংস্থাগুলোর বিবেচনায় আনা উচিত। কারণ একজন শিশুর জন্য এক প্যাকেট বিস্কুটের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ পানি, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ পরিবেশ।

বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বে সফল উদাহরণ। ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুহার কমানোর মতোই বন্যা ব্যবস্থাপনায়ও এখন নতুন লক্ষ্য হওয়া উচিত-কোনো শিশুর মৃত্যু যেন প্রতিরোধযোগ্য কারণে না হয়, কোনো শিশু যেন ক্ষুধা, রোগ, নির্যাতন বা শিক্ষাবিচ্ছিন্নতার শিকার না হয়।

বন্যা একদিন শেষ হবে। কিন্তু আজ আমরা যদি শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তবে এই দুর্যোগের ক্ষত তাদের জীবনে বহু বছর ধরে থেকে যাবে। তাই এবারের বন্যায় ত্রাণের পরিমাণ নয়, শিশু সুরক্ষার মানই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সাফল্যের প্রকৃত সূচক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

বদ্বীপ থেকে ডিজিটাল ক্যানভাস: বাংলাদেশি লোকশিল্পের রূপান্তর

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
বদ্বীপ থেকে ডিজিটাল ক্যানভাস: বাংলাদেশি লোকশিল্পের রূপান্তর
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

কয়েক দশক ধরে ঢাকার চাক্ষুষ পরিচয় বা ভিজ্যুয়াল ল্যান্ডস্কেপ জুড়েই রয়েছে এক তীব্র রঙের মেলা। এই দৃশ্যপট মূলত গড়ে উঠেছে স্পর্শযোগ্য কিছু ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে—চলন্ত রিকশার পেছনে এনামেল রঙের উজ্জ্বল আভা, গ্রামীণ উঠানে পরম যত্নে বোনা জীর্ণ নকশিকাঁথার খাঁটি বুনন, কিংবা ব্যস্ত মোড়ে মোড়ে ঝুলে থাকা সিনেমা ব্যানার। এটিই মূলত গাঙ্গেয় বদ্বীপের শৈল্পিক হৃদস্পন্দন—যা একই সাথে প্রায়োগিক, স্পর্শগ্রাহ্য এবং সামষ্টিক জীবনের গল্পে মোড়ানো।

অথচ আজ শহরের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেই একই চেনা মোটিফগুলো ভেসে উঠছে এলইডি বিলবোর্ডে, ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠছে আধুনিক টেক স্টার্টআপের ব্র্যান্ডিংয়ে, কিংবা জায়গা করে নিচ্ছে ডিজিটাল ইলাস্ট্রেটরদের ক্যানভাসে। আমরা এখন এক বিশাল সাংস্কৃতিক স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের লোকশিল্প যখন ক্যানভাস বা টিনের পাত ছেড়ে পিক্সেল, ভেক্টর পাথ আর নিউরাল নেটওয়ার্কে রূপান্তর হচ্ছে, তখন এটি ডানা মেলছে বৈশ্বিক মঞ্চেও। এই বিবর্তন যেমন একদিকে এনেছে অফুরন্ত সৃজনশীল স্বাধীনতা, তেমনি আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে নৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সংরক্ষণের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ।

ডিজিটাল দুনিয়ায় এই রূপান্তরের গভীরতা বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের লোকশিল্পের আদি গঠনশৈলী বা ডিএনএ-র দিকে তাকাতে হবে। এই শিল্প কখনো চার দেয়ালের গ্যালারিতে বন্দী থাকার জন্য তৈরি হয়নি; এর জন্ম হয়েছিল ছোঁয়া পাওয়ার জন্য, রাস্তায় চলার জন্য এবং প্রাত্যহিক জীবনে মিশে থাকার জন্য।

রিকশা আর্ট : এটি মূলত নাগরিক পপ আর্টের এক দুর্দান্ত রূপ। রিকশা মালিকদের মধ্যকার তীব্র প্রতিযোগিতার খাতিরেই এর জন্ম। জমকালো বৈপরীত্য এবং চড়া এনামেল রঙের নিখুঁত টানে এখানে ফুটে ওঠে সিনেমার নায়ক-নায়িকা, তাজমহলের কাল্পনিক দৃশ্য, ময়ূর কিংবা বাহারি ফুল-পাতা। গতি আর প্রতিফলনের এক অনন্য মেলবন্ধন এই শিল্প।

নকশিকাঁথা: রিকশা আর্ট যদি হয় কোলাহলময় রাজপথের গল্প, তবে নকশিকাঁথা হলো অন্দরের নিভৃত আবেগের প্রকাশ। যুগের পর যুগ ধরে গ্রামীণ নারীসমাজ পুরোনো সুতি শাড়ি স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাধারণ ফোঁড় আর সুতোর টানে বুনে গেছেন এক একটি আখ্যান। প্রতিটি কাঁথা যেন তাদের যাপিত জীবনের ব্যক্তিগত ডায়েরি, যেখানে মিশে থাকে লোকগাথা, অন্তরের সুখ-দুঃখ, পদ্ম, জীবনবৃক্ষ (ট্রি অফ লাইফ) কিংবা চেনা পাখির অবয়ব।

সিনেমা ব্যানার: মধুমিতা বা বলাকার মতো আইকনিক সিনেমা হলের সামনে এক সময় বিশাল আকৃতির এই হাতে আঁকা ব্যানারগুলো ছিল নিয়মিত দৃশ্য। অতিশয়োক্তি বা বাড়াবাড়ির এক অনন্য নিদর্শন ছিল এই ব্যানারগুলো—যেখানে অতিরঞ্জিত অবয়ব, চড়া রঙ আর নাটকীয় আলোর ব্যবহারে ঢালিউড সিনেমার চিরচেনা আবেগ ফুটিয়ে তোলা হতো।

শোলা ও মৃৎশিল্প: গ্রামীণ মেলাগুলোতে উৎসবের মুকুট তৈরিতে ব্যবহৃত শোলার সূক্ষ্ম কারুকাজ কিংবা মাটির পুতুল ও তৈজসপত্রের যে আবহ দেখা যায়, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই বদ্বীপের মানুষকে মাটির সাথে এক নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছে।
                  
রূপান্তরের রূপরেখা: এনামেল থেকে পিক্সেলে: কারিগরদের গ্রামীণ কর্মশালা থেকে ডিজিটাল ক্যানভাসে এই উত্তরণ কোনো একক পথে হয়নি, বরং প্রযুক্তির তিনটি ভিন্ন ধারায় এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ভেক্টরাইজেশন এবং টাইপোগ্রাফি: গ্রাফিক ডিজাইনের হাত ধরেই ডিজিটাল মাধ্যমের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে। বর্তমান প্রজন্মের বাংলাদেশি ডিজাইনাররা রিকশা বা ট্রাকের পেছনে থাকা জটিল নকশাগুলোকে ডিজিটাল ভেক্টরে (SVG) রূপান্তর করছেন, যা মান অক্ষুণ্ণ রেখে যেকোনো আকারে ব্যবহার করা সম্ভব। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাড়ির পেছনে হাতে লেখা আকর্ষণীয় বাংলা টাইপোগ্রাফি—যার বিশেষ বাঁক, অলংকরণ আর উজ্জ্বল বর্ডার চিরচেনা—সেগুলোকে এখন ডিজিটাল ফন্টে রূপ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে জন্ম নেওয়া লোকজ ক্যালিগ্রাফি আজ অনায়াসেই কম্পিউটারের কীবোর্ডে টাইপ করা যাচ্ছে।

টেক্সচার এবং ডিজিটাল পেইন্টিং: ডিজিটাল ট্যাবলেটের সাহায্যে এ দেশের তরুণ ইলাস্ট্রেটররা সফটওয়্যারের সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। কাস্টম ব্রাশ ইঞ্জিনের মাধ্যমে তারা মেটালের ওপর এনামেল রঙের যে ঘন ভাব বা উজ্জ্বলতা, তা হুবহু ফুটিয়ে তুলছেন। একইভাবে, কাপড়ের বুনন বা সুতোর যে অসম টান, তার টেক্সচার ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে "ডিজিটাল নকশিকাঁথা", যা স্ক্রিনেও আসল কাঁথার অনুভূতি বাঁচিয়ে রাখছে।

জেনারেটিভ এআই এবং "বেঙ্গল ফিউচারিজম": একদল তরুণ ও দূরদর্শী ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট এখন নিউরাল নেটওয়ার্ক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে লোকজ নন্দনতত্ত্বের সাথে ভবিষ্যৎমুখী ভাবনার মেলবন্ধন ঘটাচ্ছেন। মঙ্গল শোভাযাত্রার পেঁচা, মাটির পুতুল কিংবা আলপনার মোতিফ দিয়ে এআই মডেলকে ট্রেন আপ করে তারা তৈরি করছেন এক সাইবারপাঙ্ক ঘরানার ঢাকা। এই নতুন ধারাকে বলা হচ্ছে "বেঙ্গল ফিউচারিজম" বা "বাঙালি ফিউচারিজম"—যা প্রমাণ করে যে লোক ঐতিহ্য কেবল অতীতের উপাদান নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎকে কল্পনা করার এক জীবন্ত ভাষা।

বর্তমান বাস্তবতা: দৃশ্যমানতা বনাম অর্থনৈতিক সংকট: ডিজিটাল যুগ যে আমাদের লোকজ মোতিফগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পহেলা বৈশাখের মতো বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে আমাদের পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেম লোকজ রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের ব্র্যান্ডিং, খাবারের প্যাকেজিং কিংবা বনানী-ধানমন্ডির অভিজাত ফ্যাশন হাউজের ফিউশন পোশাকে এখন লোক শিল্পের জয়জয়কার।

আজকের দিনে একটি শহুরে এজেন্সি বা ই-কমার্স ব্র্যান্ড রিকশার বাঘ বা সিংহের একটি ভেক্টর ফাইল ব্যবহার করে বড় কর্পোরেট ক্যাম্পেইন থেকে বিপুল লভ্যাংশ ঘরে তুলছে। অথচ পুরান ঢাকার কোনো এক গলিতে বসে যে কারিগর ৪০ বছর ধরে এনামেলের ক্ষতিকর গন্ধ সয়ে এই মোতিফটি সৃষ্টি করেছেন, তিনি অর্থনৈতিকভাবে অদৃশ্যই থেকে যাচ্ছেন। শিল্পের নান্দনিকতা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও, যে হাত এই শিল্পের জন্ম দিয়েছে, তা আজ এক নীরব আর্থিক সংকটের মুখোমুখি।

আর্কাইভিং সংকট: ডিজিটাল ভল্টের শূন্যতা: আমরা যত দ্রুত আমাদের সংস্কৃতিকে ডিজিটাল করছি, ততটাই বড় হয়ে উঠছে এর সংরক্ষণ বা আর্কাইভিংয়ের চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্কাইভিংয়ের বর্তমান অবস্থা বেশ বিক্ষিপ্ত, যা আমাদের ঐতিহ্য রক্ষায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করছে।

ডিজিটাল সংরক্ষণের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ: স্পর্শের অনুভূতির অবলুপ্তি: একটি নকশিকাঁথার ৪কে (4K) স্ক্যান হয়তো তার নকশাকে নিখুঁতভাবে ধারণ করতে পারে, কিন্তু এটি কাঁথাটিকে পুরোপুরি সমতল বা ফ্ল্যাট বানিয়ে ফেলে। কাপড়ের সেই ত্রিমাত্রিক ভাঁজ, পুরোনো শাড়ির ওম কিংবা একজন নারীর সুই-সুতোর ফোঁড়ের ভেতরের যে আবেগ ও গতি—তা এই ডিজিটাল ফাইলে হারিয়ে যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অস্থায়ী গ্রিড: সমসাময়িক ডিজিটাল লোকশিল্পের একটি বিশাল অংশ কেবল ইনস্টাগ্রাম, বিহান্স বা ফেসবুকের মতো বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে সীমাবদ্ধ। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক এবং উন্মুক্ত সেন্ট্রাল রিপোজিটরি বা আর্কাইভ না থাকায়, এই ডিজিটাল পুনর্জাগরণ যেকোনো সময় অ্যালগরিদমের পরিবর্তন বা প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

মেটাডেটার অনুপস্থিতি: কোনো লোকজ মোতিফকে যখন ভেক্টরে রূপ দেওয়া হয়, তখন অনেক সময়ই তার শিকড়ের তথ্য হারিয়ে যায়। ইন্টারনেটে একটি মোতিফ হয়তো কেবল "বাঙালি লোকজ পাখি" নামে আপলোড করা হচ্ছে, যার ফলে এটি যশোর, রাজশাহী নাকি ময়মনসিংহের ঐতিহ্য—সেই আঞ্চলিক পরিচয়টি মুছে যাচ্ছে। একই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে এর মূল রূপকারের নামও।

বর্তমানে, ত্রিমাত্রিক ফটোগ্রামমেত্রির মাধ্যমে গ্রামীণ মন্দিরের পোড়ামাটির ফলক সংরক্ষণ কিংবা হারিয়ে যাওয়া সিনেমা ব্যানারের হাই-ফিডেলিটি ডিজিটাইজেশনের মতো কাজগুলো মূলত হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ বা তৃণমূলের সাংস্কৃতিক কর্মীদের মাধ্যমে। এই সম্পদগুলোকে স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখতে একটি সুপরিকল্পিত এবং রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত জাতীয় ডিজিটাল পরিকাঠামো এখন সময়ের দাবি।

আগামী দিনের পথ: একটি সমতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগরি
লোকশিল্পকে ডিজিটাল শিল্পে রূপান্তর করার অর্থ কেবল স্ক্রিনে কিছু পুরোনো নকশা কপি করা নয়। এই ডিজিটাল স্থানান্তরকে টেকসই করতে হলে আমাদের গ্রামের মূল কারিগরদের সাথে শহরের ডিজিটাল উদ্ভাবকদের একটি নৈতিক ও সৃজনশীল সেতু তৈরি করতে হবে।
               
আমাদের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে অভিনব সমন্বয়ের মাঝে। বর্তমানে ইমার্সিভ মিডিয়াতে লোকজ নন্দনতত্ত্বের ব্যবহার শুরু হয়েছে—যেমন দেশীয় ভিডিও গেমের ব্যাকগ্রাউন্ডে ঐতিহ্যবাহী মোতিফের ব্যবহার, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রদর্শনী, কিংবা উৎসবের জন্য ইন্টারেক্টিভ অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) ফিল্টার তৈরি। কল্পনা করুন এমন একটি এআর অ্যাপ্লিকেশনের কথা, যা উৎসবের দিনগুলোতে ঢাকার পিচঢালা রাস্তায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলপনার রঙিন নকশা ফুটিয়ে তুলছে—প্রযুক্তি আর ঐতিহ্যের এ এক অপূর্ব মিলনমেলা।

এর পাশাপাশি, ডিজিটাল মালিকানার নতুন মডেল বা ব্লকচেইন প্রযুক্তি রয়্যালটি নিশ্চিতের পথ সুগম করতে পারে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে, ডিজিটাল ইলাস্ট্রেটরদের সাথে মূল কারিগরদের কোলাবোরেশন বা চুক্তি হতে পারে, যার ফলে ডিজিটাল ডাউনলোড, কাপড়ে প্রিন্ট বা কর্পোরেট লাইসেন্সিং ফির একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি চলে যাবে গ্রামীণ কারিগরদের তহবিলে। সর্বোপরি, ডিজিটাল ইন্টারফেসগুলো কারিগরদের নিজস্ব ডিজাইনের একটা এক্সপেরিমেন্টাল ক্ষেত্র বা "স্যান্ডবক্স" হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে তারা সুঁই-সুতো বা তুলি ছোঁয়ার আগেই স্ক্রিনে রঙের সামঞ্জস্য পরীক্ষা এবং নিজেদের কাজের পোর্টফোলিও তৈরি করে রাখতে পারবেন।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশি লোকশিল্পের এই ডিজিটাল রূপান্তর আমাদের ঐতিহ্যকে পেছনে ফেলে যাওয়ার কোনো প্রয়াস নয়। এটি মূলত একটি সফল ভাষান্তর। এই বদ্বীপের মানুষের লড়াই, তাদের রঙের দর্শন এবং গভীর জীবনবোধকে একটি বৈশ্বিক ডিজিটাল ভাষায় রূপান্তরের মাধ্যমেই আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে—বাংলার আত্মা কেবল টিকেই থাকবে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়বে ডিজিটাল বিশ্বের এই অনন্ত ক্যানভাসে।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]

রাজনীতির প্রতিশ্রুতি বৃক্ষরোপণ ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
রাজনীতির প্রতিশ্রুতি বৃক্ষরোপণ ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

একটা দেশ ও জাতির অনাগত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে হলে সবার আগে রাজনীতিবিদদের দূরদৃষ্টি, দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বড় স্বপ্ন দেখা অপরিহার্য। স্বপ্ন ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা প্রায় নিরর্থক। স্বপ্ন থাকতেই হবে। ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ এই উক্তিটি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক  অধ্যাপক  আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রায়ই বলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের অস্তিত্ব ও মহত্ত্ব তার স্বপ্নের বিশালতার ওপর নির্ভরশীল। আর দেশ রাজনীতিবিদদের স্বপ্নের সমান বড়। সুতরাং স্বপ্নের বিশালতার ওপর নির্ভর করে রাজনীতিবিদদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করার অবিচল ব্রত ও অঙ্গীকার থাকা অপরিহার্য। দেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণে রাজনীতিবিদদের মাঝে দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও কর্ম সম্পাদনের উন্মাদ প্রেরণা সৃষ্টির মাধ্যমে একটি দেশ, একটি জাতি পৃথিবীর মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হয়। 

আধুনিক চীন মাও সেতুংয়ের স্বপ্নের ডালি। টেংকু আব্দুর রহমানের স্বপ্ন এবং মাহাথির মোহাম্মদ ও তার ডেপুটি আনোয়ার ইব্রাহিমের কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের ফসল আজকের মালয়েশিয়া। বর্তমানের সিঙ্গাপুর লি কুয়ানের দৃঢ়সংকল্প ও স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ। নেলসন ম্যান্ডেলার স্বপ্ন ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বর্ণবাদের নিপাত করা। তিনি বর্ণবাদ নিপাত করতে পেরেছিলেন দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের মহিমা উদ্ভাসিত হয়ে  ২৯ বছর জেল জীবনের ঘানি টানার পর। এমনিভাবে রাজনীতিবিদদের নিজ দেশ ও জাতিকে দেওয়া  প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞার হাজারো উদাহরণ আছে। অপরপক্ষে, নিজ দেশ-জাতিকে অন্য দেশের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার উদাহরণ নেহায়েত কম নেই।

১৯৭১ সালের অব্যবহিত পর হতে গত ৫৫ বছরে এ দেশের জনগণের কাছে রাজনীতিবিদরা কমবেশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এ যাবৎ  জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তার ফিরিস্তি টেনে শেষ করা যাবে না। প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা জারি রেখে ২০২৬ সালের নির্বাচনে সব দল নির্বাচনি ইশতেহারে কমবেশি চটকদার ও জনতুষ্টিমূলক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাস্তবায়ন কতটুকু হবে তা আল্লাহ মালুম। জনগণকে আকৃষ্ট করতে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে সব রাজনৈতিক দল ধানাই-পানাই কম করে না। মাদক, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ বন্ধ করা, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রতিরোধ, লাগামহীন দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ আরও কত শত প্রতিশ্রুতিই না দেয়। অর্থনীতি নিয়ে যেসব ভারী ভারী শব্দ ব্যবহার করে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের ভালোমতো বুঝতে বা গলাধঃকরণ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়, সেখানে গ্রামের হতদরিদ্র শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত মানুষগুলো কি-বা বুঝবে। 

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার বেশ কিছু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতিগুলোর  মধ্যে অন্যতম বললে ভুল হবে না। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু  গত ১১ মার্চ বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে অগ্রাধিকারভিত্তিতে  ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, বন, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’ নামে পাঁচ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।’ 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করার কথা জানা যায়। ১৯৬০-এর দশকে আলজেরিয়ার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুয়ারি বৌমেদিয়েন, মরুকরণ প্রতিরোধ, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও টেকসই ভূমি ব্যবহারের জন্য ‘আলজেরিয়া গ্রিন ড্যাম’ নামে প্রকল্প শুরু করেছিলেন। কিন্তু বড় ধরনের লক্ষ্য, ভুল গাছ নির্বাচন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, মাঝেমধ্যে কাজ বন্ধ রাখা  এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ’৯০-এর গৃহযুদ্ধের জন্য এ প্রকল্প আশানুরূপ সফলতা পায়নি। তবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও সাহারা মরুভূমির লু হাওয়া থেকে বাঁচতে এ প্রকল্প ২০০০ সালে পুনরায় চালু করা হয়েছে। আলজেরিয়ার মতো একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিশেষত সাহারা মরুভূমির মরুকরণ প্রতিরোধে ২০০৫ সালে আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃত্বে সাহারা ও সাহেল অঞ্চলে ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল জিবুতির রাজধানী জিবুতি থেকে সেনেগালের ডাকার পর্যন্ত সমগ্র সাহেলজুড়ে একটি বৃক্ষ প্রাচীর তৈরি  করা। ‘গ্রেট গ্রিনওয়াল বা সবুজ মহাপ্রাচীর’ প্রকল্পের  অংশ হিসেবে ১৯৭৮ সাল থেকে চীন প্রায় ৬৬ বিলিয়ন বৃক্ষরোপণ করেছে। এ কাজের প্রধানতম লক্ষ্য হলো গোবি ও তাকলামাকান মরুভূমি বিস্তারকে ধীর করে দেওয়া। এ ছাড়া চীন ২০৫০ সালের মধ্যে আরও ৩৪ বিলিয়ন বৃক্ষরোপণের  প্রাক্কলন করেছে। চীনের বৃক্ষরোপণ  প্রকল্পের বয়স ৪৮ বছর, আলজেরিয়া ৫৬ বছর এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের ২১ বছর হয়েছে। আমাদের দেশে এ প্রকল্প  সবেমাত্র শুরু হয়েছে। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের আন্দাজ করা  হলে, ২০২৬ সালের মধ্যে ৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করতে হবে। বর্ষার মৌসুম বৃক্ষরোপণের উপযুক্ত সময়। কিন্তু কত কোটি চারা রোপণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে বা আদৌ প্রস্তুত আছে কি না, এ ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ৫ কোটি সংখ্যা একেবারে ছোটও না। এটা নির্মম সত্য যে, আমাদের দেশে দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের হার খুবই কম। এই প্রকল্পগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিজ্ঞার শিকলে বন্দি থাকে। কোনো প্রকল্পের সুফল পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার বিকল্প নেই। অন্যান্য দেশে ‘হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না।’ কিন্তু আমাদের দেশে হাকিম এবং হুকুম দুটোই নড়ে যায়। সঙ্গত কারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের ফলাফল শূন্য থেকে যায়।

বাংলাদেশে বর্তমান বনভূমির পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে বনভূমির পরিমাণ দেশের অন্যান্য বিভাগ থেকে সর্বনিম্নে আছে। শুষ্ক মৌসুমে এই দুই বিভাগে  অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে  কৃষি খাতও  মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সুতরাং, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণ মোটাদাগে সফলতা বয়ে আনবে বলে আশা করা যায়। আবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে। শীতকাল ও গ্রীষ্মকালে ফারাক্কা ও তিস্তা দিয়ে পানি প্রবাহ হ্রাস পেলেও বৃষ্টির কারণে পানি-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো  অনেকাংশে পুষিয়ে নেওয়া যাবে। ফলে নদী খননপূর্বক নাব্য বৃদ্ধি করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে পরিবেশগত ঝুঁকি, অত্যধিক তাপমাত্রা রোধ এবং কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। অবশ্যই সবকিছু নির্ভর করছে  বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সফলতার ওপর। 

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার হলেও এটাকে দলমতনির্বিশেষে সমর্থন করে জাতীয় ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা ও খরা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঋতু পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখ্য  নিয়ামক হলো  বৃক্ষনিধন এবং পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকা। সুতরাং এখনই দীর্ঘমেয়াদে পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে সামনের দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়ে অনেকেই নানাভাবে সমালোচনা করছে। কিন্তু বৃক্ষরোপণ ছাড়া পরিবেশে ভারসাম্য নিয়ে আসা সম্ভব নয়। এ  উদ্যোগের সফলতা ও ব্যর্থতা  নির্ভর করছে রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা, দূরদর্শিতা, দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা এবং কর্ম সম্পাদনের উন্মাদ প্রেরণায়। তা না হলে বৃক্ষরোপণের এই মহান উদ্যোগও ইতিহাসে ‘তুঘলকি কাণ্ড’ হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে।

লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
[email protected]

টেকসই সবুজায়ন ও শতবর্ষী বৃক্ষ সংরক্ষণে শুধু রোপণ নয়, চাই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
টেকসই সবুজায়ন ও শতবর্ষী বৃক্ষ সংরক্ষণে শুধু রোপণ নয়, চাই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিক

আমাদের চাক্ষুষ উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক বিনাশের মধ্যবর্তী ধূসর রেখাটি দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণের এক বিশাল মহোৎসব শুরু হয়। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে লাখ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়, ব্যানার-ফেস্টুন আর প্রচারণায় মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু প্রচারের আলো নিভে যাওয়ার পর সেই চারাগুলোর কী দশা হলো, তার তদারকি করার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে একটি চরম সত্য আমাদের স্বীকার করতেই হবে–আমরা রোপণকে যতটা উদযাপনে রূপ দিতে পেরেছি, রোপণ-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণকে ততটা প্রাতিষ্ঠানিক বা নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি।

সম্প্রতি বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান-২০২৬-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠিক এই সংকটের দিকেই আঙুল তুলেছেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, পরিবেশ মেলা বা বৃক্ষমেলা কেবল বাৎসরিক কোনো আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এটিকে আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসে রূপ দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের পুরো প্রশাসনিক এবং নাগরিক ‘মাইন্ডসেট’ বা মানসিকতা কি এই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিপালনের জন্য প্রস্তুত? 

রোপণ-পরবর্তী ঔদাসীন্য: যেখানে আটকে আছে গলদ
এখানেই আমাদের আসল গলদ। আমাদের বনায়ন নীতি আজ পর্যন্ত মূলত ‘সংখ্যা-ভিত্তিক’ (Number-driven), ‘ফলাফল-ভিত্তিক’ (Outcome-driven) নয়। উদাহরণস্বরূপ, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি চারা রোপণের একটি বিশাল মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উদ্যোগটি দারুণ, কিন্তু এই ২৫ কোটির মধ্যে কতটি চারা শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে রূপ নেবে, তার কোনো বৈজ্ঞানিক হিসাব বা জবাবদিহির কাঠামো আমাদের আছে কি? 

কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, মাটির গুণাগুণ না বুঝে কিংবা জলবায়ুর সামঞ্জস্য না রেখে শুধু সংখ্যা পূরণের জন্য গাছ লাগালে আখেরে কোনো লাভ হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার চারা লাগানো হলো, অথচ কয়েক সপ্তাহ পরেই পানির অভাবে বা গবাদিপশুর পেটে গিয়ে সেগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এর অর্থ হলো, রোপণের পেছনে যে বিপুল অর্থ ও শ্রম ব্যয় হলো, তার বড় অংশই অপচয়। 

কিউরেটেড বা পরিকল্পিত বনায়ন ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গাছ লাগানোর বাজেটেই অন্তত তিন বছরের জন্য সেই গাছের পানি, সার এবং নিরাপত্তার (বেড়া বা খাঁচা) খরচ বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে কোন মাটিতে কোন প্রজাতির গাছ টিকবে, যেমন–ফলদ, বনজ, ঔষধি কিংবা বিপন্ন দেশীয় প্রজাতি–সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে বনায়নের প্রধান ভিত্তি বানাতে হবে। ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণির মতো ক্ষতিকর বিদেশি প্রজাতি বর্জন করে মাটির স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম রক্ষা করা এখন আর বিলাসিতা নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন। 

‘মাদার ট্রি’ নিধন: উন্নয়নের নামে আত্মঘাতী খেলা
নতুন গাছ রোপণের চেয়েও বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় এবং নীরব অপরাধটি হলো দেশের প্রাচীন ও শতবর্ষী বৃক্ষ নিধন। তথাকথিত আধুনিকায়ন, রাস্তা প্রশস্তকরণ কিংবা নতুন আবাসন প্রকল্পের দোহাই দিয়ে এক রাতেই কেটে ফেলা হচ্ছে শতবর্ষী বট, পাকুড় বা রেইনট্রি।

পরিবেশবিজ্ঞানের সাধারণ সমীকরণ বলে, একটি শতবর্ষী প্রাচীন গাছ প্রকৃতিকে যে পরিমাণ অক্সিজেন দেয়, যে মাত্রায় কার্বন শোষণ করে এবং স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে যেভাবে ভূমিকা রাখে, তা হাজারটি নতুন চারা গাছ দিয়েও রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এই প্রাচীন বৃক্ষগুলো কেবল কাঠের কোনো কঙ্কাল নয়; এগুলো একেকটি স্থানীয় ইকোসিস্টেমের প্রাণভোমরা, পরিবেশের ভাষায় যাদের বলা হয় ‘মাদার ট্রি’। এগুলো বহু প্রজাতির পাখি, অনন্য কীটপতঙ্গ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের প্রধান উৎস। 

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের এই মাদার ট্রিগুলো রক্ষার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইনের ফাঁক গলে কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপে এই গাছগুলো প্রতিনিয়ত কাটা পড়ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি প্রাচীন গাছ কেটে সেখানে ১০টি চারা রোপণের আশ্বাস দেওয়া আর একজন সুস্থ মানুষকে হত্যা করে ১০টি শিশুর জন্মের প্রতিশ্রুতি দেওয়া একই রকম হাস্যকর। উন্নয়ন পরিকল্পনা এমনভাবে সাজাতে হবে যেন একটিও প্রাচীন গাছ না কেটেও রাস্তার নকশা বা অবকাঠামো তৈরি করা যায়। প্রয়োজনে রাস্তা বাঁকা হবে, কিন্তু শতবর্ষী গাছ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে–এই নীতিগত অবস্থান রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

সমন্বিত পরিবেশ ভাবনা: বিচ্ছিন্ন কোনো খাত নয়
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে পরিবেশকে আর আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম মূল ভিত্তি। তীব্র তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, আকস্মিক বন্যা আর লবণাক্ততার মতো ভয়াবহ দুর্যোগগুলো আমাদের অর্থনীতি, কৃষি এবং পানির নিরাপত্তাকে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

একটি পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে গাছ লাগানোর পাশাপাশি আমাদের নদী, পাহাড়, জলাভূমি এবং নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে তাকাতে হবে। নদী ও খাল ভরাট বন্ধ না করতে পারলে এবং সারা দেশে শুরু হওয়া ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনঃখননের মতো কর্মসূচিগুলো সফল করতে না পারলে শুধু গাছ লাগিয়ে মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করা যাবে না। ঠিক একইভাবে, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় পর্যায়ে ‘থ্রি আর’ (Reduce, Reuse, Recycle) নীতি বাস্তবায়ন না করতে পারলে চারা গাছের গোড়াগুলো বিষাক্ত প্লাস্টিকে দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে।

যুবশক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক আন্দোলন
গাছ বাঁচানোর এই লড়াইয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ফ্রন্টলাইনে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম’ চালুর যে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি শিক্ষার্থীর একাডেমিক মূল্যায়নের অংশ করা যেতে পারে। একজন শিক্ষার্থী তার স্কুল বা কলেজ জীবনে অন্তত একটি গাছ রোপণ করবে এবং তার পুরো শিক্ষাবর্ষে সেই গাছটির পরিচর্যা করবে–এমন নিয়ম করা গেলে তা এক যুগান্তকারী সামাজিক আন্দোলন তৈরি করবে। এর পাশাপাশি ‘ক্লাইমেট ইউথ ফেলোশিপ’ কিংবা ‘এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ড’-এর মতো উদ্যোগগুলো পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণার জন্ম দেবে। 

প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রস্তাবনা এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও মানবিক: পরিবারে কোনো নতুন সন্তানের জন্ম হলে সেই মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি করে গাছ লাগানো। নবজাতকের বাড়ন্ত বয়সের সঙ্গে সঙ্গে গাছটিও বড় হবে। এটি কেবল সবুজের সংখ্যা বাড়াবে না, বরং সেই সন্তানের মনে শৈশব থেকেই প্রকৃতির প্রতি এক নিবিড় আত্মিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করবে।

প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতির উন্নয়ন
উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি রেখেই টেকসই সমৃদ্ধি গড়ে তোলা সম্ভব। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে আমাদের জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ ছাড়া প্রকৃতি বাঁচতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। দেশ হোক সব প্রাণী ও প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল–এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু রোপণের সংখ্যার পেছনে না ছুটে, প্রতিটি রোপণকৃত গাছের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে হবে এবং শতবর্ষী বৃক্ষ হত্যা কঠোর আইন ও সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। তবেই এই প্রিয় বাংলাদেশ আগামী প্রজন্মের জন্য এক নিরাপদ, চিরসবুজ ও জলবায়ু-সহনশীল টেকসই বাসযোগ্য ভূমি হিসেবে টিকে থাকবে।

লেখক: উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত)
প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ; ইয়্যাস সভাপতি, ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়
[email protected]

আড়াই বছরে ১০ হাজার ৮৩০ ধর্ষণ মামলা: শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ কোথায়

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম
আড়াই বছরে ১০ হাজার ৮৩০ ধর্ষণ মামলা: শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ কোথায়
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিক

খবরের কাগজ ১১ জুলাই ২০২৬ তারিখের খবর পড়লাম ‘ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে, গত আড়াই বছরে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ১০ হাজার ৮৩০টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২টি মামলা। এটি শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি কঠিন প্রশ্নও উত্থাপন করে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মামলার উল্লেখযোগ্য অংশের ভুক্তভোগী শিশু।

বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, এটি এখন জাতীয় শিশু সুরক্ষা সংকটে রূপ নিয়েছে। গত কয়েক বছরে প্রকাশিত পুলিশ সদর দপ্তর, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এবং ইউনিসেফের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার প্রকৃতি যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে এর ভয়াবহতাও। উদ্বেগজনকভাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা শিশুর পরিচিত কেউ। অর্থাৎ, যে পরিবেশ শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিবেশই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শুধু ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসেই শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে; তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ নির্যাতনের মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদনও একই ধরনের প্রবণতার কথা বলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকাশিত সংখ্যাই প্রকৃত চিত্র নয়। যৌন সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক চাপ, ভয়ভীতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থার কারণে থানায় পৌঁছায় না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যান বাস্তব পরিস্থিতির কেবল দৃশ্যমান অংশমাত্র।

প্রশ্ন হচ্ছে, শিশুরা কেন এত বেশি ঝুঁকির মধ্যে? এর উত্তর শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সবকিছু মিলিয়েই ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক পরিবার এখনো শিশুদের শরীরের নিরাপত্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কিংবা যৌন নির্যাতন সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা দিতে সংকোচ বোধ করে। বিদ্যালয়গুলোর বড় অংশেও কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি নেই। ফলে শিশুরা অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে সে অপরাধের শিকার হয়েছে, কিংবা বুঝলেও কাকে জানাবে, সেটা জানে না।

ইউনিসেফ বহু বছর ধরে বলে আসছে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা কেবল অপরাধ দমন দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত Child Protection System। অর্থাৎ পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠান–সবগুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশে জাতীয় শিশু সুরক্ষা নীতি থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা কমিটি নেই, শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক সেফগার্ডিং প্রশিক্ষণ নেই, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন ব্যবস্থা নেই এবং নির্যাতিত শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও অত্যন্ত সীমিত।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারব্যবস্থা। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ কমছে না। কারণ, অপরাধ প্রতিরোধে আইনের কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা অনেক বেশি কার্যকর। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোয় হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন। তদন্তে বিলম্ব, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সাক্ষী সুরক্ষার দুর্বলতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া অনেক ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরুৎসাহিত করে। এর ফলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা নতুন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। আমরা সাধারণত একটি ঘটনা ঘটার পর অপরাধীকে গ্রেপ্তার, বিচার এবং শাস্তির প্রশ্নে মনোযোগ দিই। কিন্তু কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত–অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং তা প্রতিরোধ করা। উন্নত দেশগুলোর শিশু সুরক্ষা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতেই আছে এই প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশেও এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যাওয়ার এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগ INSPIRE Framework শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে সাতটি অগ্রাধিকারমূলক কৌশলের কথা বলেছে। এর মধ্যে আছে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহায়তা, শিশুদের জীবনদক্ষতা শিক্ষা এবং সহজলভ্য সেবা ব্যবস্থা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সাতটি কৌশলের অধিকাংশই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর নয়, বরং তার আগেই ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা নীতিতেও এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন।

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন করে ভাবতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা শারীরিক অবকাঠামো বা প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ একটি বিদ্যালয় তখনই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ হয়, যখন সেখানে শিশু সুরক্ষা নীতি কার্যকর থাকে, শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আচরণবিধি থাকে, অভিযোগ জানানোর গোপন ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকে এবং প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আসে। উন্নত বিশ্বের বহু দেশে শিক্ষক নিয়োগের আগে Child Safeguarding Screening বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও শিশুদের সঙ্গে কাজ করেন–এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
পরিবারের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের সমাজে যৌনতা ও শরীর নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনো অনেকাংশে নিষিদ্ধ বিষয়। এর ফলে শিশুরা নিজের শরীর সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ছাড়াই বড় হয়। তারা জানে না কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কোনটি নয়; কোথায় আপত্তি জানাতে হবে, কাকে জানাতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও শিশুরা ঘটনাটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে না। এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।

শিশু সুরক্ষাকে তাই শুধু নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কল্যাণ বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় শিশুবান্ধব কাউন্সেলিং সেবা, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা, দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একজন নির্যাতিত শিশুর জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, তার মানসিক পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক বিতর্ক বা সাময়িক আলোচনার বিষয় বানানো যাবে না। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নীতি বদলাতে পারে, কিন্তু শিশু সুরক্ষা রাষ্ট্রের স্থায়ী অঙ্গীকার হওয়া উচিত। আজ যে শিশু নিরাপদ নয়, আগামীকাল সেই রাষ্ট্রও নিরাপদ থাকবে না। কারণ, সহিংসতার অভিজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের সামাজিক ও মানসিক মূল্য চুকাতে হয় পুরো জাতিকেই।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একটি পথ হলো, প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর কয়েক দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে আবার আগের মতো নীরব হয়ে যাওয়া। অন্য পথটি হলো, এই ১০ হাজার ৮৩০টি মামলাকে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলা। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় পথটি আমাদের বেছে নিতে হবে। কারণ, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তার অধিকার রক্ষা নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষারও পূর্বশর্ত।

লেখক: কথাসাহিত্যিক