দীর্ঘ দুই বছর পরে, গত ২৮ জুন ভারতীয় হাইকমিশন নতুন করে বাংলাদেশিদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করল। যেখানে প্রায় দেড় লাখ লোক ভিসার আবেদন করেছেন। এত ভারতবিরোধী আন্দোলন, মিছিল-মিটিং, ‘দিল্লি না ঢাকা’, আবার ভারতের পক্ষ থেকে পুশইন, কথায় কথায় আলু, পেঁয়াজ বন্ধ করতে চাওয়া, কথায় কথায় বাংলাদেশ দখলের হুমকি দেওয়া এবং অষ্টম সিস্টার্স বা উপনিবেশবাদ মনে করত প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র। সুতরাং বাংলাদেশ ও ভারত দেশ দুটি ভৌগোলিকভাবে বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। যেখানে ভারতকে যেমন বাংলাদেশের প্রয়োজন, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশের প্রয়োজন। প্রয়োজন বলেই দুই বছর পর হলেও পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগ ও কার্যক্রম।
গত ১ জুলাই ইন্ডিয়া টুডে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, উত্তেজনাপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেও ভারত পুনরায় পর্যটক ভিসা চালু করতেই বাংলাদেশের বিভিন্ন ভিসা আবেদন কেন্দ্রে দীর্ঘ সারি লক্ষ করা যায় এবং ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি আবেদন জমা পড়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। এই বিপুল সাড়া প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক অবস্থান, চিকিৎসাসেবা এবং পারিবারিক সম্পর্ক–এসব বাস্তব প্রয়োজন এখনো দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সেই সময় ঢাকায় ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোয় হামলা হয় এবং কর্মীরা হুমকির মুখে পড়েন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভারত পর্যটক ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তবে সীমিত পরিসরে চিকিৎসা ভিসা চালু ছিল বলে দাবি করে প্রতিবেদনটিতে।
প্রতিবেদনটি সংক্ষেপ করলে আরও দেখা যায়, ভৌগোলিকভাবে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটারের মতো দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে রয়েছে দেশ দুটির। বাংলাদেশের প্রায় পুরো অংশে ভারতের সীমান্ত জড়িয়ে রয়েছে। যেখানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে জড়িয়ে রয়েছে দেশ দুটি। আবার আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশেরই ভারত হচ্ছে একমাত্র লক্ষ্য। যেখানে তুলনামূলকভাবে অন্যান্য দেশের তুলনায়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বাংলাদেশের তুলনায় কম মূল্যে সেবা পাওয়া যায়। আবার ভিসা কেন্দ্রের ভিড়ের ব্যাখ্যা করে বলা হয়, পূর্বে ১৬টি ভিসা কেন্দ্র চালু থাকলেও বর্তমানে পাঁচটি ভিসা কেন্দ্র চালু করা হয় এবং বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা চাহিদা একসঙ্গে প্রকাশ পাওয়ায় এমনটা ভিড় লক্ষ করা যায়।
প্রতিবেদনটিতে পরিসংখ্যানগত যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ২১ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ভারত সফর করেছেন, যা ভারতের মোট বিদেশি পর্যটকের প্রায় ২০ শতাংশ। পর্যটক ভিসা বন্ধ হওয়ার পর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজারে। তাদের অধিকাংশই চিকিৎসা ভিসায় ভারত যান। সম্পর্কের অবনতির আগে ভারত যে চিকিৎসা ভিসা দিত, তার ৭০-৭৫ শতাংশই ছিল বাংলাদেশিদের জন্য। এরপর অনেক বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য চীন, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে যেতে শুরু করেন। কিন্তু এসব দেশের চিকিৎসা ব্যয় মধ্যবিত্ত বাংলাদেশিদের জন্য অনেক বেশি হওয়ায় ভারতই এখনো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও সাশ্রয়ী গন্তব্য। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জন্য ভারত শুধু প্রতিবেশী নয়; ভৌগোলিক অবস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ।
প্রতিবেদনটিতে অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীদের জন্য গত দুই বছরে কলকাতার নিউ মার্কেট-সংলগ্ন ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও আতিথেয়তা এলাকায় ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্যবসায়ীদের প্রায় ১ হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোর সামনে মানুষের উপচেপড়া ভিড় শুধু ভিসার আবেদন নয়; এটি দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতারও প্রতিচ্ছবি।
প্রতিবেদনটিতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, দেশ দুটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বেশ জোরালো এবং একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। নির্ভরশীলতার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় বেশ ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও ভারতের দিক থেকেও একেবারেই বাংলাদেশকে দুর্বলভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, অক্টোবর ২০২৪ সালে ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে অবস্থান করে। আবার খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং এক বছর পর ওই মূল্যস্ফীতিই হয় ঋণাত্মক ৫ দশমিক ০২ শতাংশ। কারণ হিসেবে খুব সহজেই বলা যায়, তারা তাদের খাদ্যপণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করতে পারেনি। আবার ‘ভারতের রপ্তানি বাণিজ্য বাজারের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ নম্বর এবং প্রায় ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের বাজার এটি। যা ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় ১৪ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের বাজারের মধ্যে ভারতের অবস্থান নবম স্থানে এবং প্রায় ১৫৭ কোটি মার্কিন ডলারের বাজার এটি। যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ (তথ্য: ইপিবি ও ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)।
২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত বৈধ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ভারতীয় নাগরিক, ৩৭ হাজার ৪৬৪ জন (সূত্র: স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ)। যা রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে ভারতের কাছে বাংলাদেশ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত। সুতরাং এই পরিস্থিতিতে ভারতের বাংলাদেশকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।
কারণ পরিসংখ্যান বলে, ভারতের বিশাল এক বাণিজ্যিক ক্রেতা হলো বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ভারত থেকে নিত্যপণ্য কিনতে না পারলে, বাংলাদেশের যেমন খরচ বৃদ্ধি পাবে, তেমনি ভারতও তার বড় ক্রেতা হারাবে। তাই বাংলাদেশ বিকল্প রাষ্ট্র পেলে তার যেমন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশে রপ্তানি করতে না পারায় ঋণাত্মক মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা উভয় দেশের জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
কিন্তু বাংলাদেশের একটি বিষয় ভাবতে হবে, ভারত ভৌগোলিকগতভাবে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ। ভারতের গোলামি না করে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে, এটি যেমন সত্য, তেমনি ভারতের প্রতি শ্রদ্ধাশীলও থাকতে হবে। ইতোমধ্যেই খোলা বাজারে ভারতীয় রুপির চাহিদা অনেক বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ ‘দেশে খোলাবাজারে তথা মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখন ভারতীয় মুদ্রা রুপির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, চিকিৎসা, পর্যটনসহ নানামাত্রিক সম্পর্কের কারণে ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গ্রাহকদের বেশি পরিমাণে রুপি লেনদেন করতে হয়’ (১০ জুলাই ২০২৬, প্রথম আলো)। এর অন্যতম কারণ দুই বছর পর পর্যটন খাতে ভারতীয় ভিসা চালু হওয়া।
অতএব দেশ দুটির মধ্যে থাকতে হবে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমতার ভিত্তিতে একটি সুন্দর সম্পর্ক। যে সম্পর্কে কেউ কাউকে ছোট করে না দেখে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করবে। তবেই সম্পর্ক হবে দীর্ঘস্থায়ী।
লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট
[email protected]