আর্জেন্টিনার খেলা মানেই এখন আর শুধু একটা ফুটবল ম্যাচ নয়। প্রতিটা ম্যাচের সঙ্গে যেন একটু একটু করে ফুরিয়ে যাচ্ছে একটা সময়। আর্জেন্টিনার ম্যাচ মানেই একটা সময় ছিল প্রতিপক্ষ, ট্যাকটিকস, জয়-পরাজয়ের হিসাব। এখন আর তা নয়। এখন ম্যাচের মাঝখানেও মনে করিয়ে দেয়, আর কতটা সময় নীল-সাদা জার্সিতে বিশ্বকাপের এই মাঠে দেখতে পাবো তাকে? হয়তা এটাই বা আরও একটা।
লিওনেল মেসির ক্যারিয়ার নিয়ে যা বলার, ফুটবল অনেক আগেই বলে ফেলেছে। ট্রফি, রেকর্ড, ব্যক্তিগত অর্জন- সবকিছুর হিসাবই প্রায় শেষ। কিন্তু এই বিশ্বকাপে তাকে দেখার অনুভূতিটা অন্যরকম। এখানে তিনি শুধু বিশ্বের সেরা ফুটবলারই নন, তিনি একটা সময়ের শেষ সাক্ষী। হয়তো এ কারণেই এখন আর্জেন্টিনার প্রতিটা ম্যাচের দিকে একটু অন্যভাবে তাকানো হয়। শুধু ফলাফলের জন্য নয়, মুহূর্তগুলোর জন্যও। একটা পাস, একটা কর্নার, কিছু ছোট কাজ, একটা ফ্রি-কিক, কিংবা বল ছাড়া হেঁটে যাওয়া একজন মানুষ; সবকিছুই যেন অকারণেই একটু বেশি মন দিয়ে দেখা হয়।
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের গল্পটাও আসলে সময়ের গল্প। ১৯৭৮-এ প্রথম শিরোপা। ১৯৮৬-তে দিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় বিশ্বজয়। ১৯৯০-এ ফাইনালে হার। তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা। ২০১৪-তে আরেকবার শিরোপার এত কাছে গিয়েও স্বপ্নভঙ্গ। সেই আক্ষেপের ভার নিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে।
অবশেষে ২০২২ সালে কাতারে লিওনেল মেসির হাতে আবার বিশ্বকাপ ওঠে। ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান হয়। সেই রাত শুধু একটা ট্রফি জয়ের রাত ছিল না, একটা অসমাপ্ত গল্পের পূর্ণতাও ছিল।
তাই আজকের আর্জেন্টিনাকে শুধু বর্তমান দিয়ে বিচার করা কঠিন। এই নীল-সাদা জার্সির ভাঁজে লুকিয়ে আছে ম্যারাডোনার ছায়া, বাতিস্তুতার গোল, রিকেলমের শিল্প, আইমারের সৌন্দর্য, ২০১৪-র আক্ষেপ আর ২০২২-এর উল্লাস। প্রতিটা প্রজন্ম এই জার্সিতে নিজের একটা স্মৃতি রেখে গেছে। আজ মেসির আর্জেন্টিনা সেই স্মৃতিরই নতুন অধ্যায় লিখছে।
এটি হয়তো স্ক্যালোনির নিখুঁত দল নয়। অনেক জায়গায় সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক ম্যাচেই কাঙ্ক্ষিত খেলাটা খেলতে পারেনি। ২০২২ সালের দলের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্য চোখে পড়ে। অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া নেই। অনেক পজিশনে আগের মতো গভীরতা নেই। উইংয়ে আগের সেই ধার নেই, ফুল-ব্যাক পজিশনেও প্রশ্ন আছে। তবু দলটা লড়ছে এবং এখন শেষ চারে। কারণ গত কয়েক বছরে স্কালোনি আর্জেন্টিনাকে শুধু একটি দলই গড়েননি, একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন। যেখানে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়, বরং একসঙ্গে লড়ে যাওয়ার মানসিকতা। যেখানে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কেউ হাল ছাড়ে না।
আজ আবার সেই পরীক্ষার দিন। হয়তো এই যাত্রা আরেকটি স্বপ্নের দিকে এগোবে, হয়তো থেমেও যাবে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত- আজকের রাতটাও একটা স্মৃতি হয়ে যাবে। বহু বছর পর ফিরে তাকালে মনে হবে, আমরা শুধু একটা ফুটবল ম্যাচ দেখিনি, আমরা একটা সময়কে ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যেতে দেখেছিলাম।
রিফাত/