কখনো কখনো একজন গোলরক্ষক একাই একটি দলের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠেন। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি যেন বুক পেতে ঠেকিয়ে দেন প্রতিপক্ষের সব ঝড়। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে জর্ডান পিকফোর্ড ছিলেন ঠিক তেমনই এক প্রহরী। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তার দৃঢ়তা, ক্ষিপ্রতা আর অবিশ্বাস্য সব সেভ ইংল্যান্ডকে বারবার বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো- সব প্রাচীরেরই একদিন ভাঙন ধরে।
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বুধবার রাতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে সেই ভাঙনের সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব। শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা হয়নি পিকফোর্ডের ইংল্যান্ডের। অদম্য আর্জেন্টাইনদের কাছে হেরে ফাইনাল খেলার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছিল। কিন্তু প্রতিবারই তাদের সামনে অদম্য হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইংলিশ ক্লাব এভারটনে খেলা পিকফোর্ড। কখনো ডান দিকে ঝাঁপিয়ে, কখনো দুই হাত প্রসারিত করে, আবার কখনো বিদ্যুৎগতির প্রতিক্রিয়ায় নিশ্চিত গোল ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। যেন গোলপোস্টের সামনে একজন গোলরক্ষক নন, দাঁড়িয়ে ছিলেন এক অবিচল প্রাচীর।
ইংল্যান্ডও সেই আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে যায় ১-০ গোলে। সময় যত গড়িয়েছে, ইংলিশ সমর্থকদের স্বপ্ন ততই রঙিন হয়েছে। ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, বহু প্রতীক্ষার আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল বুঝি হাতছানি দিচ্ছে। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে সময়ের হিসাব মানে না। কয়েক মিনিটেই বদলে যায় ইতিহাসের রং। শেষ সাত মিনিটে যেন জেগে উঠে আর্জেন্টিনা। হঠাৎ করেই ম্যাচের ছন্দ বদলে যায়। একের পর এক আক্রমণে চাপ বাড়তে থাকে ইংল্যান্ডের রক্ষণে। এতক্ষণ যিনি একাই সব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, সেই পিকফোর্ডও শেষ পর্যন্ত আর পারেননি।
প্রথম গোলটি যেন ভেঙে দিয়েছিল ইংল্যান্ডের আত্মবিশ্বাস। আর দ্বিতীয় গোলটি নিভিয়ে দেয় ফাইনালের স্বপ্ন। পিকফোর্ডের গ্লাভস ছুঁয়ে যাওয়া বলও আর থামানো যায়নি। কয়েক মিনিটের ঝড়ে ভেসে গেছে ৮৪ মিনিট ধরে গড়ে তোলা সব আশা। তবু এই পরাজয় পিকফোর্ডের অবদানকে ম্লান করতে পারে না। স্কোরলাইন হয়তো বলবে ইংল্যান্ড হেরেছে ২-১ ব্যবধানে। কিন্তু যারা ম্যাচটি দেখেছেন, তারা জানেন ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। পিকফোর্ডের একের পর এক দুর্দান্ত সেভই ইংল্যান্ডকে এতক্ষণ লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছিল।
গোলরক্ষকের জীবনটাই এমন। অসংখ্য অসাধারণ সেভের পরও শেষ মুহূর্তে একটি বল জালে জড়ালেই সব আলো চলে যায় অন্যদিকে। অথচ সেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার গল্পটি অনেক সময় ফলাফলের আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
২০২৬ বিশ্বকাপে ৩২ বছর বয়সী পিকফোর্ডের যাত্রা তাই কেবল একটি হারের গল্প নয়। এটি একজন যোদ্ধার গল্প, যিনি শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন। ভাগ্য শেষ পর্যন্ত তার পাশে দাঁড়ায়নি। কিন্তু তার সাহস, লড়াই আর আত্মনিবেদন বিশ্বকাপের স্মৃতিতে আলাদা জায়গা করে নেবে। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ওঠা হয়নি ইংল্যান্ডের। শেষ রক্ষা হয়নি পিকফোর্ডেরও। তবু গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাওয়া সেই প্রহরীর নাম বিশ্বকাপের অধ্যায়ে শ্রদ্ধার সঙ্গেই উচ্চারিত হবে।
তবে পুরো ম্যাচজুড়েই পিকফোর্ডকে ঘিরে উত্তেজনা ছিল চোখে পডার মতো। আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডাও হয়। অ্যান্থনি গর্ডন গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেওয়ার পর পিকফোর্ড উসকানিমূলক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তবে এনজো ফার্নান্দেজ সমতা ফেরানোর পর আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো তার কাছে দৌড়ে গিয়ে গোল উদযাপন করেন, যা ছিল পিকফোর্ডের আগের সেই উচ্ছ্বাসের জবাব।
ম্যাচজুড়ে বেশ কয়েকটি ভালো সেভ করলেও শেষ পর্যন্ত হার সঙ্গী হয়েছে ইংলিশদের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়া এই গোলরক্ষকের। ম্যাচ শেষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিকফোর্ড বলেন, ‘আমি বিধ্বস্ত। ছেলেদের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। দল, স্টাফ এবং ভক্ত সবার জন্যই আমি ভীষণ দুঃখিত। আমরা ম্যাচের সিংহভাগ সময় দারুণ ফুটবল খেলেছি। কিন্তু একবার যখন আমরা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেলাম, আমরা কেবল সেই ব্যবধান ধরে রাখার চেষ্টা করতে লাগলাম; যা এই সর্বোচ্চ স্তরের ফুটবলে মোটেও যথেষ্ট নয়। তাই আমি খুবই হতাশ। আমরা এখানে আসার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম। ছেলেরা তাদের দৌড়, ঘাম, রক্ত আর চোখের জল সব উজাড় করে দিয়েছিল। তাই এভাবে শেষ মুহূর্তে এসে হেরে যাওয়াটা সত্যিই বুক ভাঙার মতো।’
ম্যাচটি শুরুর আগে পিকফোর্ড বলেছিলেন তারা লিওনেল মেসি এবং পুরো আর্জেন্টিনা দলের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং মাথা ঠাণ্ডা রেখে ম্যাচটি জিততে চান। ব্যক্তিগতভাবে ম্যাচে তিনি বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও মেসির জাদুকরী দুটি অ্যাসিস্ট এবং আর্জেন্টিনার শেষ মুহূর্তের আক্রমণভাগের তীব্রতার কাছে শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হতে হয়েছে পিকফোর্ড ও তার রক্ষণভাগকে। ফলে ১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার স্বপ্ন আরও একবার অধরাই থেকে গেল।