বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতিহাস যেন বারবার একই নির্মম গল্প শোনায় ইংল্যান্ডকে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেখেও শেষ পর্যন্ত ২–১ গোলে হেরে ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙে যায় থ্রি লায়ন্সদের। আর এই পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কোচ টমাস টুচেলের অতিরক্ষণাত্মক কৌশল।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল কৌশলনির্ভর এবং রক্ষণাত্মক। দুই দলই খুব কম সুযোগ তৈরি করতে পারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম ৪৫ মিনিটে ইংল্যান্ডের প্রত্যাশিত গোল (এক্সজি) ছিল ০.০৫, আর আর্জেন্টিনার ০.০৩। মাঝমাঠের লড়াই ও শারীরিক দ্বৈরথই ছিল ম্যাচের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫তম মিনিটে ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে। মরগান রজার্সের নিখুঁত ক্রস থেকে অ্যান্থনি গর্ডন গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। গোলের পর কিছু সময় আর্জেন্টিনাকে ছন্দহীন মনে হচ্ছিল। ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণের শঙ্কায় তারা খুব বেশি খেলোয়াড় তুলে আক্রমণে যেতে পারছিল না। তাছাড়া দুই সেন্টার-ব্যাক লিসান্দ্রো মার্তিনেস ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরো হলুদ কার্ড নিয়ে খেলায় বাড়তি সতর্ক ছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে আর্জেন্টিনার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার পরিবর্তে ইংল্যান্ড নিজেদেরই রক্ষণাত্মক খোলসে বন্দি করে ফেলে।
টুচেলের সিদ্ধান্তই বদলে দেয় ম্যাচের চিত্র
৭২তম মিনিটে টমাস টুখেল ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত নেন। গোলদাতা অ্যান্থনি গর্ডনকে তুলে ডিফেন্ডার এজরি কনসাকে নামিয়ে ইংল্যান্ডকে পাঁচ ডিফেন্ডারের রক্ষণভাগে সাজান। এর ফলে ইংল্যান্ড কার্যত নিজেদের অর্ধেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ গড়ে তোলার সুযোগ পায়।
৮২তম মিনিটে টুখেল আরও রক্ষণাত্মক পরিবর্তন আনেন। রিশ জেমস ও ডেক্লান রাইসের জায়গায় ড্যান বার্ন ও নিকো ও'রাইলিকে নামিয়ে তিনি যেন স্পষ্ট করে দেন, দলের লক্ষ্য আর আক্রমণ নয়, কেবল লিড ধরে রাখা।
কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে এমন কৌশল কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সেটাই প্রমাণিত হয় শেষ কয়েক মিনিটে।
মেসির জাদু, আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তন
৮৫তম মিনিটে লিওনেল মেসির নেওয়া শর্ট কর্নার থেকেই সমতার গোলটি আসে। বক্সের বাইরে সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকা এনজো ফার্নান্দেসকে বল বাড়িয়ে দেন মেসি। পর্যাপ্ত সময় ও জায়গা পেয়ে এনজো দুর্দান্ত শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে ম্যাচে সমতা ফেরান।
ইনজুরি সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আসে ম্যাচের নির্ধারক মুহূর্ত। ডান প্রান্তে বল পেয়ে মেসি তার স্বভাবসুলভ নিখুঁত ক্রসে লাউতারো মার্তিনেসকে খুঁজে নেন। জন স্টোনসের নজর এড়িয়ে মার্তিনেস শক্তিশালী হেডে বল জালে জড়িয়ে আর্জেন্টিনাকে ২–১ গোলে এগিয়ে দেন। সেই গোলেই নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল।
পরিসংখ্যানও বলছে একই গল্প
ওপ্টার তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ৫৫তম মিনিটে এগিয়ে যাওয়ার পর থেকে ম্যাচের শেষ পর্যন্ত মাত্র ১২ শতাংশ সময় বলের দখল ধরে রাখতে পেরেছিল। অর্থাৎ গোল করার পর পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কার্যত আর্জেন্টিনার হাতেই তুলে দেয় তারা।
ম্যাচ শেষে হতাশ অধিনায়ক হ্যারি কেনও দলের মানসিকতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘১–০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর আমরা শুধু ব্যবধান ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। এই পর্যায়ের ফুটবলে শুধু লিড রক্ষা করার মানসিকতা কখনোই যথেষ্ট নয়।’
ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় এখন আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সামনে রয়ে গেল আরেকটি অপূর্ণ স্বপ্ন এবং প্রশ্ন-রক্ষণাত্মক কৌশলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কি তাদের আরেকটি সম্ভাব্য শিরোপা থেকে বঞ্চিত করল?
পাপ্পু/অন্তরা/