মেট্রোরেলের ৭৩০টি বিয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া একাধিক স্থানে পিয়ার হেড (থামের উপরিভাগ) এবং কংক্রিটের বেজ বা ভিতে উল্লেখযোগ্য ফাটল দেখা দিয়েছে। মরিচা ধরা রেললাইন, ফাস্টেনিং (আটকানোর সরঞ্জাম) এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশেও ত্রুটি পাওয়া গেছে। মেট্রোরেলের নিরাপত্তা অডিটে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট স্টেশনের কাছে স্থানচ্যুত একটি লোড-বেয়ারিং প্যাড নিচে খুলে পড়ে একজন পথচারী নিহত হন। এরপর হাইকোর্ট ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এই নিরাপত্তা অডিট কমিটি গঠন করে।
গত মে মাসে সর্বশেষ নিরাপত্তা অডিট প্রতিবেদনটি ডিএমটিসিএলের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং আগের নির্দেশনা অনুযায়ী উচ্চ আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। চুয়েটের সাবেক উপাচার্য মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে গঠিত ৯ সদস্যের এই কমিটি এই প্রতিবেদন তৈরি করে।
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি-৬ লাইনে ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইনে নানা ত্রুটি শনাক্ত করেছে অডিট কমিটি।
এমআরটি লাইন-৬-এর পরিচালন ঝুঁকি ও কাঠামোগত অখণ্ডতা পরীক্ষা করেছে নিরাপত্তা অডিট কমিটি। কমিটি বলেছে, কম্পন, ঝাঁকুনি, ট্র্যাক-সাপোর্ট সমস্যা, ত্রুটিপূর্ণ বিয়ারিং প্যাড এবং সাময়িক গতিসীমা সংকোচনের কারণে মেট্রোরেলের গতি ব্যাহত হচ্ছে, রাইড কোয়ালিটি কমছে। মেট্রোরেল চলাচলের সময় ট্র্যাক কাঁপছে, এই অতিরিক্ত কম্পনের কারণে মেট্রোরেল নির্ধারিত গতিসীমায় চলাচল করতে পারছে না।
এই সমস্যা সমাধানে ক্র্যাক গেজ ও সেটেলমেন্ট মার্কার স্থাপন এবং বিশেষ করে ৪২৩, ৪৪২, ৪৪৬ এবং ৪৪৮ নম্বর পিয়ারের ত্রুটিপূর্ণ বিয়ারিং প্যাডগুলো প্রতিস্থাপন করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
মেট্রোরেলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমের (ওসিএস) ইনসুলেটেড ওভারল্যাপগুলোতে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ বা স্পার্কিং শনাক্ত হয়েছে; যার ফলে অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অডিট রিপোর্টে বলা হয়, এমআরটি লাইন-৬-এ মেট্রোরেল সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে। কিন্তু ট্রেনগুলো এখন ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলছে। এমনকি কিছু কিছু সেকশনে ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটার গতিতে চলছে। ১০টি স্পটে সাময়িক গতিসীমা সংকোচনের কারণে প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক কম্পন ও ঝাঁকুনি তৈরি হচ্ছে।
কমিটি সতর্ক করেছে, যদি এখনই এসব ত্রুটি মেরামত করা না যায় তবে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও মেট্রোরেল ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেট্রোরেল চলাচলের সময় ৪৪২, ৪৪৬ এবং ৪৪৮ নম্বর পিয়ারের বিয়ারিং প্যাডগুলো সজোরে ধাক্কা খাচ্ছে। ৪২৩ নম্বর পিয়ারে একটি বিয়ারিং প্যাডের স্থানচ্যুতি রেকর্ড করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত বা স্থানচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের পাশাপাশি পিয়ার হেড, কংক্রিট বেজ এবং বক্স গার্ডারে দৃশ্যমান ফাটলগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৪১ নম্বর পিয়ারে ১ মিলিমিটারের চেয়ে বড় একটি ফাটল দৃশ্যমান হয়েছে।
সব কটি বিয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইনকে দায়ী করেছে কমিটি। এ বিষয়ে জাপানি ডিজাইন কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েটসের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিটি। কমিটি এসব বিয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপন বা সংশোধনের সুপারিশ করেছে।
বিভিন্ন স্টেশনের ট্রান্সফরমারের ত্রুটি, বৈদ্যুতিক ও সিগনালিং রুমে পানি চুইয়ে পড়া এবং ওভারহেড ক্যাটেনারি তারে ক্রমাগত স্ফুলিঙ্গ তৈরির বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে শর্ট সার্কিট, অগ্নিকাণ্ড, তার ছিঁড়ে যাওয়া, যাত্রী আটকে পড়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কমিটি।
মেট্রোরেল প্রায় তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে নির্ধারিত স্টপেজের আগে থেমে যায়। এতে ট্রেনের দরজা এবং প্ল্যাটফর্মের স্ক্রিন ডোরের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা বা মিসঅ্যালাইনমেন্ট তৈরি হয়। এমন ত্রুটির জন্য ইতোমধ্যে পাঁচটি ট্রেন সেট পরিষেবা বা অপারেশন থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। কমিটি সতর্ক করেছে যে, চাকার এই ত্রুটিগুলো সমাধান না করা হলে তা ট্রেন লাইনচ্যুতির কারণ হতে পারে।
এ সমস্যা সমাধানে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পুরো লাইনে ডাইনামিক ভাইব্রেশন টেস্টিংয়ের পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। পাশাপাশি মেট্রোরেলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য আগামী দুই বছরের মধ্যে একটি স্থায়ী স্মার্ট স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম চালু করা, একটি স্বাধীন সেফটি স্টিয়ারিং কমিটি এবং ডিজিটাল ত্রুটি ব্যবস্থাপনা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
মেট্রোরেলের ১৬টি স্টেশনের মধ্যে ১২টি বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক স্টেশনের কলাম বা খুঁটি পর্যাপ্ত ল্যাটারাল ব্রেসিং (পার্শ্বীয় বন্ধনী) ছাড়াই সিঙ্গেল-পাইল ফাউন্ডেশনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এতে আরও বলা হয়েছে যে, স্থায়ী পাইলগুলোর লোড ভার বহন ক্ষমতা যাচাই করা হয়নি।
পরিদর্শন যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতি এবং রিয়েল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম না থাকার কথা উল্লেখ করেছে কমিটি। সব সাব-স্টেশন ও সিগনালিং রুম পানিনিরোধক করা; বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য জরুরি বহির্গমন বা ইভাকুয়েশন প্ল্যান তৈরি করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
ডিএমটিসিএলের কোম্পানি সচিব খোন্দকার এহতেশামুল কবীর খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফার্মগেটের সেই দুর্ঘটনার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে সেফটি সার্ভে বা অডিট রিপোর্ট করতে হয়েছে। এখানে বিশেষজ্ঞরা মেট্রোরেলের অবকাঠামোতে নানা ত্রুটির কথা বলেছেন। আমরা সেই রিপোর্ট উচ্চ আদালতে পেশ করেছি। আদালতের নির্দেশনা ও কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’