গণ-অভ্যুত্থানের পর সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচারের এক নতুন যুগের সূচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমকে স্বাগত জানায় জনগণ ও বিভিন্ন দেশ। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পার হতে না হতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তথাকথিত এই সংস্কারগুলো আসলে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়।
বুধবার (১৫ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দেয় লন্ডন গ্লোব।
- উপদেষ্টাদের অর্থ পাচারসহ রেকর্ড অভিযোগ দুদকে
- সংস্কারের নামে নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুবিধা
- সরকারি সেবা পেতে ৬১ শতাংশ মানুষ ঘুষের শিকার
প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ইউনূস সরকারের আমলের দুর্নীতিবিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, সংস্কারক হিসেবে প্রশংসিত হওয়া সত্ত্বেও ড. ইউনুস ক্ষমতায় থাকার সময় দুর্নীতির পরিস্থিতি আসলে আরও অবনতি হয়। দেশের ৮১ শতাংশ পরিবার মনে করত মৌলিক সরকারি সেবা পেতেও তাদের ঘুষ দিতে হবে এবং ঘুষ দেওয়া ৬১ শতাংশ মানুষই বিষয়টি কোথাও জানায়নি। এমনকি ঘুষ ও দুর্নীতি দমনের দায়িত্বে থাকা সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পর্কে ৩০ শতাংশেরও কম মানুষ জানত।
লন্ডন গ্লোব জানায়, ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম এবং ক্ষমতার পদ পাইয়ে দিতে ঘুষ গ্রহণের রেকর্ডসংখ্যক অভিযোগ জমা পড়েছিল দুদকে। কিন্তু উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধে। দুদক সূত্র জানায়, আশার কথা–তাদের দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তের ব্যাপারে একটি ইতিবাচক আগ্রহ বা তাগিদ রয়েছে। দুদক ড. ইউনূস সরকারের এসব দুর্নীতির অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করতে প্রস্তুত। কিন্তু দুদকের শীর্ষ পদটি শূন্য থাকায় তারা তা করতে পারছে না। বর্তমান সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরাও সংসদীয় পর্যায়ে ইউনূস প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
লন্ডন গ্লোব আরও জানায়, ইউনূস প্রশাসন অন্যান্য ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও তিনি নিজে যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নরের বিরুদ্ধেও তহবিল অপব্যবহারের তদন্ত শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় ড. ইউনূস ও তার দুর্নীতিপরায়ণ সহযোগীদের প্রচার করা ত্রুটিপূর্ণ আর্থিক সংস্কারগুলোকে বিএনপি সরকার যদি সমর্থন দেয়, তবে তা হবে সরকারের জন্য একটি বড় ভুল। ড. ইউনূসের শাসনামলে যে দুর্নীতি ও ঘুষের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল, তা মোকাবিলায় একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন এবং সরকারের উচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এখনই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
এ ছাড়া কোনো স্পষ্ট বা গণতান্ত্রিকভাবে নির্ধারিত জনরায় ছাড়াই তারা ব্যাংকিংব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের মতো অত্যন্ত বিতর্কিত সব সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেয়। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের দায় তারা বেক্সিমকো, ওরিয়ন গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ ও নাবিল গ্রুপের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান মনসুরের নেতৃত্বে পরিচালিত এসব সংস্কার ও পদক্ষেপ সে সময় আর্থিক খাতের অনেকের মধ্যেই উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এখন সেই পদক্ষেপগুলোর পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্যও ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে বলে জানায় লন্ডন গ্লোব।