পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে নেই সমন্বয়। নির্ধারিত তিন বছরের পর ৫ বার সংশোধন করে সময় বাড়ানো হয়েছে ১৩ বছর ৬ মাস। কাজ কমলেও খরচ বেড়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি। তারপরও সন্তোষজনক কাজ হয়নি।
২০১০ সালে কাজ শুরু হয়। এ পর্যন্ত সাড়ে ১৬ বছরে আর্থিক অগ্রগতি বা খরচ হয়েছে মাত্র ৫৬ শতাংশ। ২৩টি অডিট আপত্তির মধ্যে এখনো ১৪টি অনিষ্পন্ন রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে শুধু এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ দিয়ে জীবিত রাখা হয়েছে। লেকের স্যুয়ারেজ লাইন বিচ্ছিন্নকরণ এবং বিকল্প নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পুরো লেকে সড়কবাতি স্থাপন না করায় চুরি, ছিনতাই, মাদক সেবন হচ্ছে। এটি যেনতেন কোনো প্রকল্প নয়, ‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন’ প্রকল্পের বাস্তব চিত্র।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল লেকের পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, জলপথের উন্নয়ন ও লেকের চারপাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে পথচারীদের বিনোদন দেওয়া। এ জন্য ২০১০ সালের ৬ জুলাই প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। ২০১০ সালের জুলাইয়ে এর কাজ শুরু হয়। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালের জুনে। কিন্তু ৫ বার বাড়ানো হয় সময়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৭ মে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। সময় বেড়েছে প্রায় ৪৫০ শতাংশ। প্রকল্পের প্রথমে খরচ ধরা হয়েছিল ৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে করা হয় ৫৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। মূল খরচের তুলনায় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এ পর্যন্ত প্রকল্পে ৩০৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৫৬ শতাংশ।
লেকের পানি খুবই নোংরা
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। ফলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কাজের পরিধি, নকশা, ভূমির চাহিদা ও খরচ নির্ধারণ বাস্তবতার আলোকে করা সম্ভব হয়নি। নকশার পরিবর্তন করতে হয়েছে। ফলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে বড় ধরনের ব্যবধান দেখা যায়। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রধান প্রধান কাজ কম হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ৯ লাখ ৫১ হাজার বর্গমিটারের বিপরীতে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক খনন করা হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬৭ বর্গমিটার। লেকের পাশে বসার ব্যবস্থা ও বিশ্রাম সুবিধা নেই। বনানী কবরস্থান, চেয়ারম্যানবাড়ী, কড়াইল বস্তিসহ ৭টি স্থানে স্যুয়ারেজ ও ড্রেনের মাধ্যমে অপরিশোধিত বর্জ্য লেকে পড়ছে। ফলে লেকের পানি খুবই নোংরা, দূষিত ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিক ও বর্জ্য অবাধে ফেলা হচ্ছে।
লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার মিটার থাকলেও তীর সংরক্ষণ হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪৩৮ মিটার। ৩ লাখ ৫১ হাজার ঘনমিটারের বিপরীতে মাটি ভরাট করা হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৬১ ঘনমিটার। হাতিরঝিল থেকে মরিয়ম টাওয়ার পর্যন্ত ২ হাজার ৬৮২ মিটারের পরিবর্তে লেক ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে ২ হাজার ৪৩৮ মিটার। তবে প্রকল্পে ৬ হাজার ২০০ মিটার থাকলেও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৮৫৮ মিটার। অনেক স্থানে ভেঙে গেছে এই ওয়াকওয়ে।
প্রথমে ডিপিপিতে ৮০ একর ভূমি অধিগ্রহণের লক্ষ্য ধরা হলেও পরে কমিয়ে বাড্ডা ও ভাটারা মৌজায় ভূমি অধিগ্রহণ লক্ষ্য ধরা হয় ১৪ একর। ২০১০ সালে কাজ শুরু হলেও এখনো ৩ দশমিক ২১ একর ভূমি অধিগ্রহণ হয়নি। লেকের পাড়ে ৪ হাজার বৃক্ষ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। মেয়াদ শেষ পর্যায়ে এলেও লেকের উন্নয়ন কাজ হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার। কিন্তু খরচ ঠিকই বেড়েছে। ওয়াকওয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সড়কবাতি স্থাপন করা হয়নি। ফলে ব্যবহারকারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এখনো ঝুলছে ১৪টি অডিট আপত্তি
প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে। তবে সেগুলো থেকে মিলছে না প্রত্যাশিত সুফল। তারপরও গত মে মাসে অনুষ্ঠিত পিএসসি সভার ৩ দশমিক ২১ একর জমি প্রকল্প থেকে বাদ দিয়ে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প কার্যালয়ের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট সোসাইটির মধ্যে ছিল না সমন্বয়। নিয়মিত তদারকিও হয়নি। প্রকল্পে ২৩টি অডিট আপত্তি ওঠে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯টি। বাকি ১৪টি এখনো ঝুলে আছে।
প্রকল্পের কাজ ভালো মতো হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য ৩ মাস পর পর ৪৮টি করে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিআইসি) হওয়ার কথা। কিন্তু করা হয়েছে মাত্র ৮টি বা ১৬ শতাংশ। ২০১০ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ৩ জন পিডি দায়িত্ব পালন করেছেন। ৪ জনের মধ্যে ৩ জনই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে মাঠপর্যায়ে মনিটরিং ছিল দুর্বল। ২০২১ সালের ২৫ মার্চ থেকে প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দায়িত্বে রয়েছেন রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. ছাবের আহমেদ।
সার্বিক ব্যাপারে পিডি খবরের কাগজকে বলেন, ‘যা কাজ হওয়ার আগেই হয়েছে। সিটি করপোরেশনের কাছে তা হস্তান্তর করা হয়েছে। অনেক দিন বন্ধ ছিল। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর তেমন কোনো কাজ হয়নি। সামনে তেমন কাজও বাকি নেই। সিস্টেমের কারণে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। ’
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, এত লম্বা সময়েও প্রকল্পটি ঠিকভাবে হচ্ছে না। এ জন্য জলাবদ্ধতা কমছে না। এটা দুঃখজনক। তাই যারাই এর অপব্যবহারে জড়িত, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাহলে অন্যরা ভয় পাবে। দ্রুত শেষ করতে হবে নির্ধারিত কাজ।’