২০২২ সালের ৬ নভেম্বরের ঘটনা। পরিযায়ী জলচর ও ঝোপঝাড়ের শাখাচারী পাখির সন্ধানে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ‘বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়াশ্রম’-এ এসেছি। হাঁটতে হাঁটতে অভয়াশ্রমের অফিস পেরিয়ে হিজল-করচের বাগানে চলে এলাম। ওখান থেকে সামনের দিকে এগোলাম ওয়াচ টাওয়ারে যাওয়ার জন্য। কিন্তু টাওয়ারের নিচ ও আশপাশে প্রচুর পানি থাকায় ওপরে উঠতে পারলাম না। কাজেই বাধ্য হয়ে পেছন ফিরে অভয়াশ্রমের অফিসের সামনে চলে এলাম। বিলে এখনো যথেষ্ট পানি। অতএব সিদ্ধান্ত নিলাম নৌকায় করে বিলময় ঘুরে ঘুরে পাখির ছবি তুলব।
অফিসের সামনে থেকে নৌকায় চড়ে টাওয়ারের দিকে এগোলাম। বিলে বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, সাপগলা, জলময়ূর, জলমুরগি, কালেম ও সরালি হাঁস দেখা যাচ্ছে। সরালির ডাকে পুরো বিল মুখরিত হলেও অন্যান্য প্রজাতির হাঁস চোখে পড়ল না। এমনকি এ দেশের আবাসিক বালিহাঁসেরও সন্ধান পেলাম না। আকাশে খানিক পরপর সরালি ও ছোট পানকৌড়ির ঝাঁক উড়ছে, মাঝেমধ্যে ছোট বা ধূপ বকের ঝাঁকও উড়ছে। কখনোবা জলময়ূরের ছোট ঝাঁক। মাঝেমধ্যে দু-একটি ভুবন ও শঙ্খচিলকেও উড়তে দেখা যাচ্ছে। মোট কথা, পরিচিত পাখি ছাড়া শীতের পরিযায়ী বা নতুন কোনো পাখির দেখা মিলল না।
তবে নতুন পাখির খোঁজ তেমন একটা না মিললেও বিলভর্তি উড়ন্ত রঙিন কীটপতঙ্গের কোনো কমতি ছিল না। সরু দেহের রঙিন পতঙ্গগুলো বিলজুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল। আর মাঝে মাঝে ওরা বসছিল নানা প্রজাতির জলজ আগাছা, কচুরিপানা, টোপাপানা, শাপলা, পদ্ম ও শালুক ফুল-পাতায়। কখনোবা বাতাসে স্থির হয়ে উড়ছিল। দেখতে দারুণ লাগছিল। আবার দু-একটি পতঙ্গ এসে আমাদের নৌকাতেও বসছিল। যেহেতু পরিযায়ী বা নতুন কোনো পাখি পাচ্ছি না, তাই এসব উড়ন্ত পতঙ্গগুলোর ছবি তুলেই সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। ছবি তোলার জন্য ওদের পিছু পিছু নৌকা ছোটাতে ছোটাতে একসময় পাখির কথা ভুলেই গেলাম। ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নানা আকার, বর্ণ ও প্রজাতির পতঙ্গ নিয়ে। ওদের মধ্যে নীল রঙের সরু দেহের
একটি পতঙ্গ বারবার আমাদের নৌকার কাছাকাছি আসছিল। ওর নাম দিয়েছি নীল পরী। খানিক পরে এক জোড়া নীল পরীকে সঙ্গমরত অবস্থায়ও দেখা গেল। ওদের ছবি তুলে সামনের দিকে এগোতেই কচুরিপানার ওপর হলুদ রঙের সরুদেহী একটি পতঙ্গকে বসে থাকতে দেখে নৌকা থামালাম। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ওর ছবি তুললাম। নতুন পাখি না পেয়ে শুরুতে মন খারাপ হলেও বিলজুড়ে ঘুরে ঘুরে রঙিন পতঙ্গগুলোর ছবি তোলায় সেই মন খারাপ ভাবটা তো থাকলই না, বরং ওদের সঙ্গে সময়টা ভালোই কাটল।
শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়াশ্রমে দেখা এই হলদে পতঙ্গটি এ দেশের এক অনিন্দ্য সুন্দর সরু দেহের ফড়িং বা সুচফড়িং, যার ইংরেজি নাম Yellow Waxtail. সচরাচর দৃশ্যমান ও স্বল্পঝুঁকিসম্পন্ন এই সুচফড়িংটি Coromandel Marsh Dart নামেও পরিচিত। এর কোনো বাংলা নাম নেই। তাই ইংরেজি নামের অনুবাদে ওর নাম রেখেছি হলুদ মোমলেজি। সিনাগ্রিওনিডি (Coenagrionidae) গোত্রের সুচফড়িংটির বৈজ্ঞানিক নাম Ceriagrion coromandelianum (সেরিয়াগ্রিওন করোম্যান্ডেলিয়ানাম)। বাংলাদেশ ছাড়াও এটিকে পাকিস্তান, নেপাল, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় দেখা যায়।
হলুদ মোমলেজি মাঝারি আকারের সুচফড়িং। পুরুষের তুলনায় স্ত্রী আকারে লম্বা ও হৃষ্টপুষ্ট হয়। স্ত্রীর উদরের দৈর্ঘ্য ২৯ থেকে ৩০ দশমিক ৫ মিলিমিটার। অন্যদিকে পুরুষের উদরের দৈর্ঘ্য ২৮-২৯ মিলিমিটার। স্ত্রী ও পুরুষের পেছনের ডানার আকার যথাক্রমে ১৮-১৯ ও ২০ মিলিমিটার। পুরুষের উদরের রং উজ্জ্বল হলুদ। স্ত্রীর উদর সোনালি-হলুদ থেকে বাদামি, তবে ফ্যাকাশে। বক্ষ সবুজাভ। চোখ হলদেটে-সবুজ।
এদের দেশের সর্বত্র ঘাস ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদসম্পন্ন অগভীর জলাশয়ে দেখা যায়। পুরুষগুলো জলাশয়ের কিনারায় ঘাস ও লতাপাতার ওপর বসে থাকে। আর স্ত্রীগুলো প্রায়ই উড়ে দূরে চলে যায়। ওরা মাছি ও ডাঁশজাতীয় পতঙ্গ শিকার করে খায়। সারা বছর ওড়াউড়ি করে।
হলুদ মোমলেজি বছরজুড়েই প্রজনন করে। এদের বংশবৃদ্ধি ও জীবনচক্র অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। প্রজননকালে পুরুষগুলো সচরাচর আগাছাপূর্ণ পুকুর, খাদ বা জলাশয় ও ধানখেতের কাছাকাছি নির্দিষ্ট কিছু এলাকা দখলে রেখে আধিপত্য বিস্তার করে। সেখানে কোনো দীর্ঘ পূর্ব-প্রণয় ছাড়াই দ্রুত মিলনে ইচ্ছুক স্ত্রীকে আঁকড়ে ধরে একটি যুগল বন্ধন তৈরি করে। এরপর সম্পূর্ণ সঙ্গম চক্র সম্পন্ন করার জন্য জোড়াটি কাছাকাছি কোনো নিরাপদ গাছপালার দিকে উড়ে যায় এবং বাতাসের মধ্যে ডানা ঝাপটে তৈরি করে বিশেষ এক ভঙ্গি, যাকে ইংরেজিতে ‘Mating wheel’ বলা হয়।
সঙ্গম শেষে পুরুষটির কড়া পাহারায় স্ত্রীটি পানিতে ভাসমান কিংবা পানি থেকে জেগে ওঠা জলজ উদ্ভিদের ওপর ডিম পাড়ে। কিছুদিন পর সেই ডিম ফুটে জন্ম নেয় অপূর্ণাঙ্গ সুচফড়িং বা Nymph শাব্দিক অর্থে যাকে ‘জলপরী’ বলা যায়। ডানাবিহীন এই জলপরীগুলোকে দেখলে মোটেও মনে হবে না যে এরা সুচফড়িং। বরং অন্য কোনো প্রজাতির জলজ পতঙ্গ বলেই মনে হবে। নিজেদের খোলস কেটে ডানাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ সুচফড়িং রূপে বেরিয়ে আসার আগে জলপরীদের পুরোটা জীবন পানিতেই বিকশিত হয়। পূর্ণবয়স্ক সুচফড়িং দুই থেকে আট সপ্তাহ এবং অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দুই মাস থেকে এক-দুই বছর বাঁচতে পারে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর