বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি গোলেরই আলাদা গল্প থাকে। কোনো গোল ইতিহাস বদলে দেয়, কোনোটি স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে, আবার কোনো গোল কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায় নিখাদ ভালোবাসার স্পর্শে। স্পেনের ডিফেন্ডার পেদ্রো পোরোর সেমিফাইনালের গোলটি ছিল ঠিক তেমনই, যেখানে ফুটবলের উত্তেজনার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে একজন বাবার আবেগ।
ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার গোলটি করেন টটেনহ্যাম হটস্পারের এই রাইট ব্যাক। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে দানি ওলমোর নিখুঁত পাস থেকে জালে বল জড়িয়ে স্পেনকে ফাইনালের আরও কাছে পৌঁছে দেন তিনি। সতীর্থদের সঙ্গে উল্লাস শেষ করে হঠাৎই মাঠে বসে পড়লেন পোরো। এর পর ডান হাত মুঠো করে আকাশের দিকে উঁচু করলেন।
মুহূর্তটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় নানা জল্পনা। কেউ ভাবলেন এটি হয়তো কোনো রাজনৈতিক বার্তা, কেউ মনে করলেন ব্যক্তিগত কোনো প্রতীকী উদযাপন। কিন্তু সত্যিটা ছিল অনেক বেশি সুন্দর, অনেক বেশি মানবিক। সেই উদযাপন ছিল তার ছোট ছেলে পেদ্রোর জন্য। মার্কাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পোরো জানিয়েছিলেন, বাড়িতে যখন ছেলেকে জিজ্ঞেস করা হয়– ‘তোমার বাবা গোল করলে কীভাবে উদযাপন করেন? তখন ছোট্ট পেদ্রো কোনো কথা না বলে ডান হাত মুঠো করে উঁচু করে ধরে। ছেলের সেই নিষ্পাপ ভঙ্গিই এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে অনুসরণ করলেন বাবা।’
ডালাসে স্টেডিয়ামের গ্যালারির সামনের সারিতেই বসে ছিল তার পরিবার। বাবা-মা, স্ত্রী এবং দুই সন্তান– সবাই চোখের সামনে দেখছিলেন পোরোর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি। পোরো বলেন, ‘ও যখন আমাকে গোল উদযাপন করতে দেখে, তখন ঠিক এভাবেই হাত তোলে। ও সামনের সারিতেই ছিল। তাই গোল করার পর আমি ওর জন্যই এই উদযাপন করেছি।’
মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন পোরো। সেই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে আজ তিনি বিশ্বকাপের ফাইনালের দ্বারপ্রান্তে। আর সেই যাত্রায় পরিবারই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। পোরো বলেন, ‘আমার বাবা-মা, স্ত্রী আর সন্তানরা এখানে আছে– এটাই আমাকে বাড়তি শক্তি দেয়। ভবিষ্যতে আমার ছেলে যখন বুঝবে, বিশ্বকাপের গ্যালারিতে তাকে সামনে রেখেই আমি গোল উদযাপন করেছিলাম, তখন সেটি আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে।’
২০২৬ বিশ্বকাপ পোরোর ক্যারিয়ারেও এনে দিয়েছে এক নতুন পরিচয়। স্পেনের দ্বিতীয় ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার বিশ্বকাপ যাত্রার। শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে করেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম গোল। আর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে করেন দ্বিতীয়টি। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ২০২১ সালে স্পেনের জার্সিতে অভিষেক হওয়ার পর এখন পর্যন্ত তার করা দুটি আন্তর্জাতিক গোলই এসেছে বিশ্বকাপের এই আসরে।
রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হয়েও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করে দলের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন টটেনহাম হটস্পারের এই ফুটবলার। তার দুটি গোলই এসেছে স্পেনের বিশ্বকাপ অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বে, যা প্রমাণ করে বড় মঞ্চে নিজেকে মেলে ধরতে তিনি কতটা প্রস্তুত।
ফ্রান্সকে হারিয়ে স্পেন এখন দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন দেখছে। ২০১০ সালে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ১৬ বছরের অপেক্ষা শেষে আবারও তারা ফাইনালে। সামনে আর মাত্র একটি ম্যাচ। সেই ম্যাচ জিততে পারলে স্পেনের জার্সিতে যুক্ত হবে দ্বিতীয় তারকা। আর যদি সেই স্বপ্ন পূরণ হয়, তবে বিশ্বকাপের ট্রফির পাশাপাশি পেদ্রো পোরোর পরিবারের অ্যালবামেও চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে আরেকটি ছবি– একজন বাবা গোল করার পর আকাশের দিকে মুঠোবদ্ধ হাত তুলে জানিয়ে দিচ্ছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চেও তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার নাম পরিবার।