বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈদ্যুতিক বিভাগের জন্য ডয়েজ ডিজেল ইঞ্জিন স্পেয়ার পার্টস কেনাকাটায় ৭ কোটি টাকার লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। রেলের যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় এই অনিয়মের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে তৎপর হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, রেলের এসব যন্ত্রাংশের বাজারমূল্য ছিল ১ কোটি টাকা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও রেলের অসাধু কর্মকর্তারা সেসব যন্ত্রাংশ কিনতে ৮ কোটি টাকা বিল উঠিয়ে নিয়েছেন। অতিরিক্ত ৭ কোটি টাকা এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই কেনাকাটায় প্রধান ভূমিকা পালন করে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর। তাই এই কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নজরদারিতে রেখেছে দুদক। রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কাছে যন্ত্রাংশ কেনাকাটাসংক্রান্ত সব নথি চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক।
গত ২১ জুন দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব নথিপত্র চেয়ে পাঠানো হয়েছে। নথি জমা দেওয়ার জন্য আগামী ২২ জুলাই পর্যন্ত রেলওয়েকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ চিঠি খবরের কাগজের হাতে এসেছে।
দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈদ্যুতিক বিভাগের জন্য ১৪ আইটেম ডয়েজ ডিজেল ইঞ্জিন স্পেয়ার পার্টস কেনার ক্ষেত্রে এই নজিরবিহীন জালিয়াতি করা হয়েছে। ১ কোটি টাকার বাজারমূল্যের মালামাল ৮ কোটি টাকায় কেনা দেখিয়ে সরকারের ৭ কোটি টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। অতিরিক্ত মূল্যে কেনার মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত এই অর্থ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও রেলওয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়েছে মর্মে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সরঞ্জাম বিভাগ থেকে তিনটি ই-জিপি টেন্ডার আইডির মাধ্যমে এই কেনাকাটা করা হয়।
অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে চারটি টেন্ডারের নথি চেয়ে চিঠি দিয়েছে।
দুদকের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে যে বিষয়গুলো চাওয়া হয়েছে সেগুলো হলো–দরপত্র পদ্ধতি অনুমোদনের পরিপত্র; বাজারদর এবং অনুমোদিত দাপ্তরিক প্রাক্কলনের চিঠি; বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা; দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন; কৃতকার্য দরদাতার ট্রেড লাইসেন্স, দরদাতার আয়কর-ভ্যাট-জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সাধারণ অভিজ্ঞতার সনদপত্র।
কৃতকার্য দরদাতাকে দেওয়া রেলওয়ের স্বীকৃতিপত্র (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড), চুক্তিপত্র ও মালামাল সরবরাহসংক্রান্ত সব তথ্যসহ যাবতীয় কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি চেয়েছে দুদক।
নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তথ্য সরবরাহ না করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল হোসেন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবরের কাগজ। তাকে ফোন করা হয়; বার্তা পাঠানো হয় হোয়াটসঅ্যাপে। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি।
রেলওয়ের সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০২৩ সালে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে রেলের কেনাকাটায় ৭ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগে অনুসন্ধান চালায় দুদক। ২০২৪ সালে একই কার্যালয় অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ কিনে সরকারের দেড় কোটি টাকা অপচয় করেছে বলে পরিবহন অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে (সিআরবি) বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিনে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠছে তিন বছর ধরে। ২০২৪ সালে লিফটিং জ্যাক, ড্রিলিং মেশিন ও কাটিং জ্যাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে ১ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে ১৭-১৮ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করার অভিযোগও এসেছে অডিট প্রতিবেদনে। এ ছাড়া পণ্যের বাজারমূল্য নির্ধারণে অনিয়ম, টেন্ডারে জালিয়াতির অভিযোগে চট্টগ্রাম জেলা দুদক কার্যালয় একাধিকবার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কার্যালয়ে (সিআরবি) অভিযান পরিচালনা করেছে।
রেলের অভ্যন্তরীণ তদন্তে একাধিক কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হলেও পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে ও কথা বলতে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিনের দপ্তরে যাওয়ার অনুমতি চান এই প্রতিবেদক। তবে তিনি সাড়া দেননি।