ঢাকা ১ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে এগিয়ে মেসি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ে পর যা বললেন মেসি ইরান ইস্যুতে প্রতিরক্ষা বিল আটকালেন ডেমোক্র্যাটরা চাপের মুখেই আর্জেন্টিনা নিজেদের সেরা ফুটবল খেলে: স্কালোনি মেট্রোরেলের ৭৩০ বিয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ, পিয়ার হেডে ফাটল ইরান যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া ট্রাম্প প্রকল্প ব্যয় সাড়ে ১৬ বছরে বরাদ্দের ৫৬ শতাংশ খরচ আবু সাঈদ হত্যার রায়: ৫ যুক্তিতে খালাস চেয়ে ৪ আসামির আপিল আজ মিঠামইনে বিএনপি সভাপতি জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যা ৮৫ ফুটের মেসি এই আন্দোলন শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা মেজাজ হারিয়ে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়কে চড় দিলেন বেলিংহাম করোনাকাল ও কোচিং সেন্টার দায়ী থাকতে পারে আল-আরাফাহ ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন বাংলাদেশ রেলওয়ের ১ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কিনতে ব্যয় হয় ৮ কোটি, লোপাট ৭ কোটি টাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে ছিদ্র রয়ে গেছে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হলো সাজেক ২৬ বছরেও সাংবাদিক শামছুর রহমান হত্যার বিচার হয়নি ব্যবস্থাপনার সংকটে ডুবছে ঢাকা কু‌ড়িগ্রামে দুই সপ্তাহে তিস্তার পেটে ২৫ ঘর সাতকানিয়ায় সাঙ্গু নদীতে অন্ধকার নামলে শুরু হয় বালু লুট রায় কার্যকর না হওয়ায় পরিবারের ক্ষোভ বাইক্কা বিলের হলুদ মোমলেজি ঈশ্বরগঞ্জে পুরোনো কৃষিযন্ত্রের হাট ব্যাপক দুর্নীতি: প্রশ্নের মুখে ইউনূস সরকার ১৬ জুলাই: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ১৬ জুলাই: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল ১৮ বিশ্বকাপের সাক্ষী ৯১ বছরের ম্যাকাইয়া ফুটবল থামিয়ে মঞ্চে উঠবেন তারকারা

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে ছিদ্র রয়ে গেছে

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৬ এএম
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে ছিদ্র রয়ে গেছে
মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলাকালে চলা এই আন্দোলন শুধুই আন্দোলন নয়। আমি মনে করি, এটি বড় রোগের একটি ছোট লক্ষণ। দীর্ঘদিন যে আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে যত্ন নেইনি, এটি তার ছোট্ট লক্ষণ। আরেকটি সমস্যা হলো শিক্ষা প্রশাসনের দুর্বলতা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এখন শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। এই ব্যবস্থায় অনেক ছিদ্র রয়ে গেছে, যার মেরামত এখনও শুরু হয়নি। বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল শিক্ষা কমিশন গঠন করবে। ক্ষমতায় আসার ৫ মাস পরও এ বিষয়ে উদ্যোগ দেখা যায়নি। মন্ত্রীরা কেউ স্মার্ট বোর্ড, ট্যাব ও তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলকের কথা বলছেন। এগুলো তাদের কাছে কে চেয়েছে? আমাদের শিক্ষক সংকট রয়েছে। যারা আছেন, তারা কতটা মানসম্পন্ন? সত্যি কথা বলতে শিক্ষায় কোনো সমন্বয় নেই। জগাখিচুড়ির মধ্যে চলছে।

মন্ত্রণালয় বলছে, ডিসি-এসপিদের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষা চালিয়ে গেছে। এই যে দায় চাপানোর সংস্কৃতি। তাহলে কতজন এসপি-ডিসিকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এই সংকট তো তাদের জন্যই। মন্ত্রী বলছেন, পদার্থবিজ্ঞান আগের সরকারের প্রশ্নপত্র। তবে আপনি এ কয় মাস কী করলেন? সরকার বলছে, পরীক্ষা পুনরায় নেওয়া হতে পারে। মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশটাও দায়সারা। এমন হলে এ আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। আমি মনে করি, সরকারকে এই জেনারেশন রিড করতে হবে। সরকারকে সমস্যা সমাধান করে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। এটি যত দেরি হবে সংকট তত বাড়বে।

অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত
ডা. ইকবাল আনোয়ার, লেখক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, সাবেক সভাপতি, বিএমএ, কুমিল্লা

সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর এ কেন্দ্রে গিয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে, যা তাদের শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেহেতু বিষয়টি সামনে চলে এসেছে: তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা; পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। তার চেয়েও সহজ উপায় আমার কাছে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলো বর্ষাকালের পরিবর্তে শুষ্ক মৌসুমে নেওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই চিন্তাভাবনার মধ্যে রাখা উচিত ছিল। আশা রাখছি সামনে এমনটিই হবে।

এখন এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখছি বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের কারণে আমাদের আগামী প্রজন্মের কিশোর তরুণরা ক্ষোভে রাস্তায় নেমে এসেছে। বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিচ্ছে; এমনকি মন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে।

তাদের এ গণতান্ত্রিক চর্চা কোনো অসুস্থ আচরণ নয়; তবে তাদের মুখের ভাষা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চোখ রাঙানোসহ আরও অনেক কিছু এই কিশোর বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়; তেমনভাবে ধমকের সুরে কথা বলা কাম্য নয়। আমি মনে করি, পানির মধ্যে বসে পরীক্ষা দেওয়ার চাইতেও তাদের মনে কষ্ট লেগেছে মন্ত্রীর একটি উক্তি। উক্তিটি ম্যাচের শলাকার মতো কাজ করেছে।

এমনকি তারা অতীতের একটি বন্দোবস্তের নমুনায় ‘তুমি কে আমি কে’ বলে ওই উক্তিটি প্রতিস্থাপন করছে আগের উক্তিটির বদলে, এর মাধ্যমে কি তারা কোনো কিছু অর্জন করতে চায়? এই বিষয়টি নিয়ে কি ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে কেউ ঢুকে পড়েছে?

এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের আরেকটি অভিযোগ আমার কানে এসেছে–সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার দুটি প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের মতে সিলেবাসের বাইরে থেকে এসেছে। মুক্তচিন্তা এবং সৃজনশীলতার বাতাবরণে আমরা যখন চিন্তা করছি; তখন ‘সিলেবাসের বাইরে’ বলতে কী বোঝায়–এ নিয়ে প্রশ্ন রাখা যায়। প্রশ্ন কমন না পড়লেই তা সিলেবাসের বাইরে এমনটা বলাও যুক্তিযুক্ত নয়। আর যদি প্রশ্নটি সত্যিই সিলেবাসের বাইরে হয়ে থাকে বা প্রশ্নের বক্তব্যের ভুলে তা অস্পষ্টতা ও অর্থহীনতার বেড়াজালে আক্রান্ত একটি প্রশ্ন হয়, তাহলে অবশ্যই এটি নিন্দনীয়। আমরা জানি যে প্রশ্ন করার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ও মডারেটর থাকেন এবং এটাকে বারবার মূল্যায়ন করা হয়। এ প্রসঙ্গে যারা এ জন্য  দায়ী, তদন্ত করে তাদের অবশ্যই যথাযথ বিচার করতে হবে। কারণ দেশের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় কোনোভাবেই গাফিলতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এটি জাতি গঠনের সঙ্গে জড়িত। সামগ্রিক বিষয়টি মূল্যায়ন করে এর অতিসত্বর সমাধান জরুরি। আমাদের শিশুরা বিবেকবান; তাদের ভালোবাসা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা দিলে সহজেই নমনীয় হতে দেখেছি।

এমনিতেই আমাদের দেশে কিশোর-তরুণদের উপযুক্ত নার্সিং করা যাচ্ছে না। বিশ্বের যেসব দেশ উন্নতি করেছে, তারা তাদের সবচেয়ে প্রধান বিনিয়োগ, সবচেয়ে সুন্দর সম্ভাষণ, সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা, সুনজর, সু-সেবা দিয়েছে তাদের শিশু-কিশোরদের।

কিশোর-তরুণদের মনে আশার আলো জ্বালাতে হবে। তাদের পজিটিভ মটিভেশনের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মনস্তত্ব বুঝে তাদের বুকে টেনে নিতে হবে। তারা কচি মনের। তাদের আবেগ বেশি। তাদের রক্ত চঞ্চল। তাদের যা ইচ্ছা তা বলা যায় না, যাবে না। তারা অভিমানী। এমনিতেই তারা ভেতরে ভেতরে নীরব কান্না বুকে পুষে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলে।

শিশু চিকিৎসক হিসেবে তাদের চোখে তাকিয়ে আমি পড়তে চেষ্টা করি। সেখানে  হাসি, স্বতঃস্ফূর্ততা আমি দেখি না। সংসদে তাদের নিয়ে কথা তেমন হতে দেখি না। তাদের মধ্যে বহু শিশু-কিশোর-তরুণ ডিপ্রেশনের রোগী। তারা অনেকে আছে, ভেতরে জ্বলছে, বাইরে ধীর থাকতে মনকে কোনো রকম শাসিয়ে রাখছে। বড়রা দুর্নীতি করে, শিশু-কিশোররা এর জন্য  দায়ী নয়, তবু তাদের ভুগতে হয় সবচেয়ে বেশি। প্রথমে সবচে বড় ধাক্কাটা লাগে তাদের গায়ে।

তাদের বাড়ন্ত দেহ। তারা বিষযুক্ত খাদ্য খেতে বাধ্য হয়। কিছুদিন পরপর তাদের ওপর দিয়ে নানা গবেষণা–এভাবে নয়, ওভাবে! নানা রকম পরিবর্তন, নানা পদ্ধতি! এমনকি তাদের বইয়ের বিষয়, বিশ্বাস এবং ইতিহাসও বদলে যায়। অসম ব্যবস্থায় তারা ‘মন খারাপের সময়’ পার করে।

একদম না বোঝা বয়সে শিশুরা হাসে, ছোটাছুটি করে। তারা বড় হলেই তো এ হাসিটা আর হাসতে পারবে না। তারা দেখবে একটা দরিদ্র দেশ। তার চেয়ে বেশি দেখবে একটা দুর্নীতির দেশ। মারামারির দেশ। দেখবে, যারা দুর্নীতি করে তাদেরই পোয়াবারো। দেখবে, স্কুল-কলেজসহ সবখানে দ্বিচারিতা। তাদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কী ভাষা ব্যবহার করতে হবে, তা না জেনে, মুখ ফসকে কিছু বলে ফেলা উচিত না। তারাই আমাদের সম্পদ।

একজন শিক্ষার্থীর বাবা 

এই আন্দোলন শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
এই আন্দোলন শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা
জিয়াউল কবির দুলু, সভাপতি, অভিভাবক ঐক্য ফোরাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ছাত্রদলকে যেতে দেখলাম। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের সেভাবে দেখিনি। এই ভিড়ের মধ্যে আমি শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের খুঁজেছি। বোর্ড চেয়ারম্যানদেরও খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও দেখতে পাইনি। সোমবার (১৩ জুলাই) সরকারের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। আর কাদের ফার্মের মুরগি বলা হলো। তারা কাদের সন্তান? আমাদেরই তো। বাচ্চাদের এভাবে বললে আমাদের খারাপ লাগে। বাচ্চাদের মধ্যেও এ মন্তব্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র ভুল হয়। এই ঘটনায় চার শিক্ষককে কারণ দর্শানো হয়। কিন্তু ভুল প্রশ্ন কেন? এই সময়ে এটাও সম্ভব! প্রশ্ন সংশোধন-পরিমার্জনের দায়িত্বে যারা ছিলেন এটা তাদের চরম গাফিলতির প্রমাণ। গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা রয়েছেন তাদের কাছ থেকে এমন দায়িত্বহীন আচরণ মোটেও কাম্য নয়। অতীতেও প্রশ্নপত্রে ভুলের ঘটনা আমরা দেখেছি। অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন গড়ে ওঠা শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

সভাপতি, অভিভাবক ঐক্য ফোরাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা

করোনাকাল ও কোচিং সেন্টার দায়ী থাকতে পারে

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৫ এএম
করোনাকাল ও কোচিং সেন্টার দায়ী থাকতে পারে
আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার, সাবেক অধ্যক্ষ, ঢাকা কলেজ

করোনার সময় থেকেই শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রান্তিকাল চলছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রভাব ক্লাসরুমেও পড়েছে। করোনার পর থেকে সে ভাবে লেখাপড়াই হয়নি। এর জন্য একটি বড় কারণ শিক্ষকসংকট। আমি দেখছি মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে ১ লাখ শিক্ষক পদ খালি। এগুলো তো পূরণের উদ্যোগ দেখছি না। আবার প্রাথমিকে ৩৫ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ খালি। একটি প্রতিষ্ঠানে প্রধান না থাকলে সেখানে লেখাপড়া হয় না। আমি ঢাকা কলেজে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানে এক দিন না গেলেই খবর পেয়েছি ক্লাস হয়নি। আমার মনেও প্রশ্ন ওঠে-প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে কীভাবে? পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় এক শিক্ষার্থীকে বলতে শুনলাম, এসব বিষয় তো শিক্ষক আমাকে পড়াননি, আমি উত্তর দেব কীভাবে। এ ঘটনা তো সত্যি। এসব কলেজের কমিটিপ্রধান ইউএনওরা। তারা কী জবাব দিতে পারবেন? তবে এই আন্দোলনে কোচিং সেন্টারের ইন্ধন থাকবে, আমার অভিজ্ঞতা এটাই বলে।

সাবেক অধ্যক্ষ, ঢাকা কলেজ 

উচ্চশিক্ষার বিতর্কে করণীয় কী

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম
উচ্চশিক্ষার বিতর্কে করণীয় কী
ড. মো. আব্দুল মোমেন

আমরা সবাই একই পতাকার মানুষ, একই স্বপ্নের অংশীদার। তাই বিভাজন নয়, আমাদের প্রয়োজন ঐক্য; তর্ক নয়, আমাদের প্রয়োজন উৎকর্ষ; এবং পরিচয়ের অহংকার নয়, আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিশ্বমানের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।...

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নতুন করে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একটি মন্তব্যকে ঘিরে শুরু হওয়া আলোচনা খুব দ্রুতই দুই পক্ষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। কেউ বলছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রকৃত মেধার প্রতীক, আবার কেউ বলছেন আধুনিক শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে।

এ বিতর্কের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেন হারিয়ে যাচ্ছে–বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি সত্যিই পাবলিক বনাম প্রাইভেট? বাস্তবতা হলো, এ প্রশ্নের উত্তর ‘না’। বরং এ ধরনের বিতর্ক আমাদের প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়। যে সময়ে বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, সে সময়ে আমরা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নিয়ে তর্ক করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক হয়তো সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কোনো গবেষণাগার তৈরি করে না, কোনো নতুন আবিষ্কার জন্ম দেয় না এবং কোনো শিক্ষার্থীকে আরও দক্ষ করে তোলে না।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, গত তিন দশকে এ খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় উচ্চশিক্ষা প্রধানত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিক্ষার চাহিদা এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকাশ ঘটে। আজ দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। লাখো শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নেতৃত্বদানকারী অসংখ্য ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে এসেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান অপরিসীম।

একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ করেছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিল্পখাতমুখী পাঠক্রম এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের করপোরেট খাত, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বহু পেশাজীবী আজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সাফল্যের গল্পে উভয় ধারার প্রতিষ্ঠানেরই অবদান রয়েছে। তাই একটিকে অন্যটির প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও আমাদের একই শিক্ষা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীনের মতো দেশগুলো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘পাবলিক বনাম প্রাইভেট’ বিভাজনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করেনি। তারা গুরুত্ব দিয়েছে শিক্ষার মান, গবেষণার গুণগত উৎকর্ষ, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সমাজে প্রভাব সৃষ্টির সক্ষমতাকে। ফলে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে বেশি গবেষণা করবে, কে বেশি উদ্ভাবন করবে এবং কে বিশ্বমানের জ্ঞান উৎপাদনে বেশি অবদান রাখবে তা নিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি।

আমাদের নিজেদের কাছে কিছু কঠিন প্রশ্ন রাখা উচিত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর কতগুলো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে? কতগুলো পেটেন্ট তৈরি হচ্ছে? শিল্প খাতের সঙ্গে কতগুলো কার্যকর গবেষণা অংশীদারি গড়ে উঠছে? কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়তে আসছে? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা উদ্ভাবন সৃষ্টি করছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখতে পারে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যতটা আলোচনা হওয়া উচিত, ততটা হয় না।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গবেষণায় বিনিয়োগ সীমিত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সংযোগ এখনো দুর্বল, এবং অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে একটি ব্যবধান রয়ে গেছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো শুধু সরকারি বা শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; এগুলো পুরো উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আচরণের গুরুত্ব অনেক বেশি। সমাজে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের মন্তব্য শুধু একটি মতামত নয়; তা তরুণদের চিন্তা, মনোভাব এবং সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। তাই এমন কোনো বক্তব্য, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন সৃষ্টি করে বা একে অপরকে ছোট করে দেখার প্রবণতা বাড়ায়, তা কাম্য নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।

আজকের বিশ্বে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় দিয়ে নয়; বরং তার জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ দিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির যুগে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিয়োগদাতারা ক্রমশ সনদের চেয়ে সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত গবেষণার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সহযোগিতা জোরদার এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একা জয়ী হয় না, আবার একা পরাজিতও হয় না। যখন একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞান উৎপাদনে এগিয়ে যায়, তখন পুরো দেশই লাভবান হয়। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কে পাবলিক আর কে প্রাইভেট–সেই বিতর্ক নয়; বরং কীভাবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, যেখানে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার আত্মবিশ্বাস আমরা অর্জন করতে পারি।

বাংলা ভাষার একটি প্রবাদ আছে–‌‘বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়।’ এই প্রবাদটি আজও সমানভাবে সত্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় তার নাম বা পরিচয়পত্রে নয়; বরং তার শিক্ষার মান, গবেষণার অবদান, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নিহিত।

দিন শেষে একজন সফল গবেষক, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর দিনশেষে আমরা সবাই একই পতাকার মানুষ, একই স্বপ্নের অংশীদার। তাই বিভাজন নয়, আমাদের প্রয়োজন ঐক্য; তর্ক নয়, আমাদের প্রয়োজন উৎকর্ষ; এবং পরিচয়ের অহংকার নয়, আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যা বাংলাদেশকে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিশ্বমানের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, মার্কেটিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার
মাসুদ আহমেদ

জনসংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়াও মানুষের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সে জিনিসপত্র ভোগ করছে আগের চেয়ে বেশি এবং ফেলে দিচ্ছে অল্প ব্যবহারের পরই। এতে বর্জ্য ফেলার স্থান কমে গিয়ে তার একটি অংশ স্তূপকৃত হচ্ছে রাস্তায় ও খোলা স্থানে। একটি অংশ পড়ছে পয়ঃপ্রণালির ভেতর। এগুলো সবই তরল নয় যে, জলীয় অংশের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। শক্ত, আঠালো অংশ ও মৃত্তিকা স্থবির থেকে পয়ঃপ্রণালির আয়তন দিন দিন সংকুচিত করছে।...

একই বিষয় বারবার বলাকে পুনরুক্তি বলে। পুনরুক্তি করলে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য হারায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ যদি বারবার ঘটে তাহলে পুনরুক্তি না করে উপায় নেই। এতে বোঝা যায় পুনরুক্ত বিষয় বা ঘটনাবলি হয় গুরুত্বপূর্ণ নয় অথবা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোর সমাধান করা হয়নি। এর আবার দুটি দিক থাকতে পারে। এক. অবহেলাজনিত কারণে সমাধান হয়নি, দুই. সমাধানের সামর্থ্য নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে। ষড়ঋতুর এই দেশে শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে বারিপাত তথা ‘বরিষধারা মাঝে শান্তির বারি’র আগমনকে অবধারিত হিসেবে ধরে তার প্রস্তুতি ও প্রাক-প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। গত বছর বা আরও ২০ বছর আগে এমনি ডম্বরু দিনের কথা যদি মনে করি তাহলে দেখতে পাব সারা দেশের প্রায় সর্বত্র বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা শহরে তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে এসেছে জলাবদ্ধতা। তা মৌসুমি বৃষ্টির একাদিক্রমের কারণে নয়, আধা বা এক ঘণ্টার হঠাৎ বারিপাতজনিত কারণে। তার মানে এমন ঘটনার স্বাভাবিকতা আমাদের রোজনামচার বিষয়। আধ ঘণ্টা বা ৪০ মিনিটের ৫০ মিমি বৃষ্টিতে শহরের নিম্নাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এবারও হয়েছে।

প্রথমে পয়ঃপ্রণালির পানি ফুটপাথে, তার পর সুয়ারেজের পানি পথচারীর পায়ের পাতা ছাপিয়ে জুতা পার হয়ে হাঁটু অবধি উঠে আসছে। এর মধ্যে বৃষ্টির স্থায়িত্ব বেশি হলে পানি রওনা দিচ্ছে দোকানের নিচতলার ওপরে। তৈজসপত্র, জেনারেটর, গদি ভিজে নষ্ট হচ্ছে। আর রাস্তায় যানবাহন নাকসমান পানিতে ডুবসাঁতার দিয়ে চলছে। কারণ পানি নামতে পারছে না। কেন? মাদানি সাহেব শহরের যে জনসংখ্যা ও তার ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি হিসাব করে পয়ঃপ্রণালি বানিয়ে ছিলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তার চেয়ে ১২ গুণ। লভ্য খালি জমিতে পরবর্তী সরকারগুলো সাধ্যমতো পয়ঃপ্রণালি সম্প্রসারিত করেছে কিন্তু ৩৬৫ লাখ মানুষের ময়লা ফেলা ও তা জলাশয়ে ধাবিত করার চাহিদার চেয়ে তা অনেক কম। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়াও মানুষের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সে জিনিসপত্র ভোগ করছে আগের চেয়ে বেশি এবং ফেলে দিচ্ছে অল্প ব্যবহারের পরই। এতে বর্জ্য ফেলার স্থান কমে গিয়ে তার একটি অংশ স্তূপকৃত হচ্ছে রাস্তায় ও খোলা স্থানে। একটি অংশ পড়ছে পয়ঃপ্রণালির ভেতর। এগুলো সবই তরল নয় যে, জলীয় অংশের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। শক্ত, আঠালো অংশ ও মৃত্তিকা স্থবির থেকে পয়ঃপ্রণালির আয়তন দিন দিন সংকুচিত করছে।

পলিথিন, প্লাস্টিক, রাবার, চামচ, কাঁটা চামচ, জুতা, জায়নামাজ, খাবার প্লেট, কলম, পাইপ, ফাইল কভার, রেইনকোট, রিকশার কভার, লাখ লাখ রিকশাভ্যান ও ট্রাকের পলিথিন কভার, সেমিনারের ব্যানার, সোফা, গার্মেন্টের কভার, গাড়ির চাকা, কাচ, মেডিকেল বর্জ্য, বিয়ে বাড়ির বর্জ্য ইত্যাদির অধিকাংশই অনুপযোগী হওয়ার পর রাস্তায়, খোলা স্থানে ও শেষে ড্রেনে স্থান পাচ্ছে। কারণ এর সামান্য অংশই রিসাইকেল করা সম্ভব এবং নির্ধারিত বিনে ময়লা ফেলার পর উদ্বৃত্ত ময়লা সমস্যার সৃষ্টি করছে। কারণ সর্বোচ্চ বহন আয়তনের চেয়ে সাত গুণ বেশি মানুষ বহন করার ফলে তার উৎপাদিত নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা স্তূপ পানিকে আর ড্রেনে ঢুকতে দিতে পারছে না। তা উঠে আসছে পানির প্লাবতাতত্ত্ব অনুসরণ করে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, ঊর্ধ্ব দিকে; কিন্তু অধঃতে নয়। গতকাল বৃষ্টিতে সে দৃশ্যের পুনর্মঞ্চায়ন দেখেছে নগরবাসী। দোতালা সড়ক থেকে যানবাহন এসে নামছে নাকডোবা খালে। তার পর সাইলেন্সারে পানি ঢুকে দুর্বল গাড়ি অচল হচ্ছে। চিটাগাং শহরেও একই দৃশ্য ও কার্যকারণ। বিশ্লেষণ করে উপকার হবে না।

চাকতাই খাল খনন শেষ হলে উন্নতি হবে, এটা একান্তই অবাস্তব ধারণা। মূল কথা পানি সরবারহ স্থান কম, আবর্জনা বেশি, কারণ মানুষ বেশি। সব নির্মাণকাজ বন্ধ করতে হবে, তাহলেই সমস্যা লঘু হতে পার। পয়ঃপ্রণালির ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমানো ছাড়া কখনোই জলাবদ্ধতা কমবে না। অপ্রাসঙ্গিক হবে না, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করি। ঘটনাটি গতকালের। সরকারপ্রধান উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে এক ছাত্রী স্রোতবিরোধী আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ঢাকা মেডিকেলে একটি করে গ্রুপে ৩০ জন ছাত্রছাত্রীর ভিড়ে কিছু বিষয় শেখানো হয়। এই ভিড়ে এগুলো ঠিকভাবে শেখা সম্ভব নয়। আপনি এই মেডিকেলের আসন সংখ্যা কমানোর পদক্ষেপ নিন।’ 

সারা দেশে প্রাইমারি স্কুলকে মাধ্যমিক, মাধ্যমিককে হাই স্কুল, কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়, আসনসংখ্যা বৃদ্ধির তথা মনোনয়নের (নোয়াখালী বিভাগ চাই) দাবির এই সমুদ্র স্রোতের মধ্যে এমন দাবি কেন এল? নিজের স্বার্থের অসুবিধা হচ্ছে বলেই। জনচাপে কোথাও আরাম নেই, স্বস্তি নেই। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির এই লগ্নে গণবিরোধী এক্সক্লুসিভ রাজনীতির দাবি ওই ছাত্রী করেছেন। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি লেক ও উত্তরায়ও তেমনি পানি উঠেছে। বৃষ্টি হলে আবার তা হবে। এটা না চাইলে বা কমাতে চাইলে বসবাসকারীর সংখ্যা কমাতে হবে, যেমন ভালো চিকিৎসক চাইলে শিক্ষার্থী আসনসংখ্যা কমাতে হবে। ১ লাখ ঘনমিটারের চৌবাচ্চায় ২ লাখ ঘনমিটার পানি রাখার সুযোগ নেই। আমরা সেই চেষ্টা করছি। স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার, করপোরেশন–কেউ কোনো কাজ বোঝেন না, বুঝি শুধু আমরা–এটা ঠিক না। তারা বরাবরই জলাবদ্ধতা দূরীকরণে যথেষ্ট করছেন।

পানিতে অর্ধেক ডুবে যাওয়া ছোট ব্যবসায়ীর ৫ লাখ টাকা ক্ষতি, রিকশাচালকের ৩০০ টাকা ক্ষতি, মজুরের সম্পূর্ণ আয় বন্ধ, যাত্রীদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচের কষ্ট বোধগম্য কিন্তু ৩৩০০ বছর ধরে টিকে থাকা থিওরি–ত্রিভুজের যেকোনো দুই বাহুর সমষ্টি তৃতীয় বাহুর চেয়ে বেশি হবে–এক অমোঘ, অকাট্য, অপরিহার্য সত্যি। তাই, ‘সরকার একটা কিছু কইরা দেক, অনেক কথা শুনছি কিন্তু এই পানির সমস্যাটা যায় নাই, ড্রেন কাইটা দিক’ ধরনের আবেদনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা ও তজ্জনিত সমস্যা ও ক্ষয় দূর হবে না। কারণ, কারিগরিভাবে বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান নেই। মানুষ যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলে–কথাটা অন্যায়। সত্যি হচ্ছে, আবর্জনা ফেলার পর্যাপ্ত স্থান নেই।

রাজারবাগ মোড়ে একবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা এবং আবার সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা গৃহস্থালি আবর্জনা যেভাবে সংগৃহীত হচ্ছে তা প্রশংসার কারণ। এর চেয়ে শ্রেয় কিছু করা অবাস্তব। ওই সময়ের অসাধারণ সুগন্ধ গবাদিপশু সুলভ। এর মধ্যদিয়েই যেতে হয়। ১৯৯০ সালে এ অবস্থা ছিল না। পরিবেশ সচেতন হোন, যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলেবেন না তখন বলতে হতো না। কারণ অধিবাসী সংখ্যা এমন ছিল যে, আবর্জনা নিঃশব্দে, গোপনীয়তা ও শিল্পের সঙ্গে যথাস্থানে চলে যেত। যথেষ্ট স্থান ছিল। ওয়াশিং ডার্টি লিনেন ইন দ্য পাবলিক-এর মতো কাজ করার দরকার হতো না। জলাবদ্ধতাও হতো না। কনসালট্যান্টের পেছনে অর্থ অপচয় করতে হতো না। সে অবস্থায় ফেরা সম্ভব। অধিবাসীর সংখ্যা কমান। ঢামেকের আসনসংখ্যা কমানোর আবেদন আরামে পড়াশোনার জন্য। জলাবদ্ধতা কমানোর জন্য অধিবাসী তথা আবর্জনা উৎপাদকের সংখ্যা কমানো সমীচীন।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]