দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে কখনোই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার দেখেছে, এক সরকার অন্য সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে একই ধরনের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে। এ চক্র ভাঙতে হলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে।...
সম্প্রতি টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতি ও ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে। এই সূত্র ধরেই অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে হওয়া দুর্নীতি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সবকিছুর (তদন্তের) জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশনা দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলছি না, পত্রিকাটি এখন আমার কাছে নেই; সবাই দেখেছেন।... তারা তো দায়মুক্তি পেতে পারে না।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেকেই নতুন আশায় বুক বেঁধেছিল। তারা মনে করেছিল, এবার হয়তো রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা আসবে, প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দুর্নীতির দীর্ঘ ছায়া কিছুটা হলেও সরে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো হিসেবে এখন আমাদের সামনে তথ্য আসছে। তারা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বললেও কিছুদিন পরেই তাদের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে। ফলে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে–সমস্যা কি ব্যক্তি, নাকি পুরো ব্যবস্থার?
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তাকে ঘিরে দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ এই সরকারের প্রধান ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ব্যবসা, দারিদ্র্যবিমোচন এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ফলে অনেকেই মনে করেছিলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। কিন্তু ওই সরকারের দেড় বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার, স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার অস্বচ্ছ ব্যবহারের অভিযোগ জনপরিসরে বারবার আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু অভিযোগগুলোর ব্যাপকতা এবং জনমনে সৃষ্ট সংশয় উপেক্ষা করার সুযোগও নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন টকশো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নিয়োগ ও পদায়ন, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, উপদেষ্টাদের ভূমিকা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ওই সরকারের সমর্থকরা দাবি করেছেন, এসব অভিযোগের বড় অংশই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট–অভিযোগের উৎস যাই হোক না কেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভিযোগের জবাব তদন্ত ও তথ্যের মাধ্যমে দিতে হয়, রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে নয়।
বাংলাদেশে কখনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, কখনো প্রশাসনিক প্রভাব, কখনো ব্যবসায়িক স্বার্থ–বিভিন্ন রূপে দুর্নীতি টিকে থেকেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির প্রশ্নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে এ সরকারকে স্বাগত জানিয়েছিল, সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, যদি পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতি তদন্ত করা হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কারণ আইনের শাসনের মূলনীতি হলো–কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ব্যক্তি যত জনপ্রিয়ই হোন না কেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তও জনসমালোচনা ও জবাবদিহির আওতায় থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। সেসব অভিযোগও এখন তদন্ত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। দুর্নীতির অভিযোগ শুধু রাজনৈতিকভাবে যেমন হওয়া উচিত নয়, তেমনি শুধু রাজনৈতিক কারণে এড়িয়ে যাওয়াও উচিত নয়।
দুর্নীতির আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চাঁদাবাজি ও প্রভাব-বাণিজ্য। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ আশা করেছিল যে, দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজির সংস্কৃতি ভেঙে পড়বে। কিন্তু ড. ইউনূস সরকারের সময় সব রেকর্ড ভঙ্গ করে চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, পরিবহন খাত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো বন্ধ করতে পদক্ষেপ নেয়নি বললেই চলে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও জনগণের প্রত্যাশা ছিল অনেক। ব্যাংক খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে নামতে সুযোগ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার দৃশ্যমান প্রভাব সীমিত ছিল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা জনগণের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। সেখান থেকে জনগণ এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সমস্যা হলো আমরা প্রায়ই ব্যক্তিনির্ভর মূল্যায়ন করি। কোনো নেতা জনপ্রিয় হলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে চাই না, আবার কোনো নেতা অজনপ্রিয় হলে অভিযোগ প্রমাণের আগেই তাকে দোষী ধরে নিই। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা, তদন্ত সংস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি নয়, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। কারও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের স্তূপ গড়ে ওঠে আবার কাউকে কাউকে ছেড়ে দেওয়া হয় হাজার অভিযোগ থাকলেও। তাছাড়া আমরা সহজেই অতীতের কথা ভুলে যাই। আমারা যথাযথ মূল্যায়ন করতে জানি না। কে আমাদের জন্য কল্যাণকর, আর কে আমাদের জন্য কম কল্যাণকর, সে মূল্যায়নও আমরা যথাযথ করতে পারি না। সবকিছুই রাজনৈতিক বিবেচনায় চিন্তা করি।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিযোগগুলোর যে স্বাধীন তদন্ত হওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। এমন সব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত। সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো কোনো এমপি বলেন, তার নামে এক টাকারও দুর্নীতি নেই, অন্যদিকে কোনো কোনো গণমাধ্যম তার বিরুদ্ধেই অনবরত দুর্নীতির খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে। তাহলে সেগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত। আর আমাদের মনে রাখতে হবে, তদন্তের উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়; বরং সত্য উদ্ঘাটন করা। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তাহলে তদন্ত সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। আর যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে কখনোই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার দেখেছে, এক সরকার অন্য সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে একই ধরনের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে। এ চক্র ভাঙতে হলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


.jpg)