সাত বছরের ছোট্ট আল-রাফির জীবনে মায়ের স্নেহ নেই। সেই শূন্যতা নিয়েই বাবার হাত ধরে তার স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে মানুষ হওয়ার। নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় বাবা তাকে ভর্তি করেছিলেন স্থানীয় এক মাদরাসায়। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানে আদর, শিক্ষা আর মানবিকতা পাওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকেই সে ফিরে এল কান্না, ফুলে যাওয়া হাত আর ভয়াবহ মানসিক আতঙ্ক নিয়ে।
অভিযোগ উঠেছে, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার চরতিল্লি দারুল উলুম মাদরাসা ও এতিমখানার সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে। বেত্রাঘাতে আল-রাফির (৭) বাম হাতের কনুইয়ের ওপরের হাড় ফেটে গেছে তারই বেতের আঘাতে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত শনিবার (১১ জুলাই) সকালে। ঘটনার দিনই অভিযুক্ত শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মো. ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে সাটুরিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেন আল-রাফির বাবা মো. মিজানুর রহমান।
শিশুটির বাবা জানান, প্রতিদিনের মতো সেদিনও ছেলে মাদরাসায় গিয়েছিল। কিন্তু সকাল পৌনে ৯টার দিকে কান্নাকাটি করতে করতে বাড়ি ফিরে আসে। আর এসেই বলে আমি আর জীবনে মাদরাসায় যাবো না। পরে ছেলে আমাকে ঘটনা খুলে বলে। পরে দেখি ছেলের বাম হাত ফুলে গেছে, সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। আর পিঠে বেতের আঘাতে দাগ হয়ে গেছে। পরে দ্রুত মানিকগঞ্জ শহরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হলে এক্স-রে পরীক্ষায় দেখা যায়, তার বাম হাতের কনুইয়ের ওপরের হাড় ফেটে গেছে।
আল-রাফি জানায়, পড়া ঠিকমতো না পারায় সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ মোটা বেত দিয়ে প্রথমে পিঠে, পরে হাতে আঘাত করেন এবং গালে একটি থাপ্পড় দেন। ব্যথায় চিৎকার করে কাঁদতে থাকলে তার মুখে একটি কলম গুঁজে দিয়ে বলা হয়, ২০ থেকে ২৫ মিনিটের আগে সেটি মুখ থেকে পড়ে গেলে আবারও মারধর করা হবে।
এ ঘটনার পর শিশুটি শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছে বলে জানান তার বাবা। এখন মাদরাসার নাম শুনলেই সে ভয় পায়। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম শুনলেও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
আল রাফির দাদা ও দাদির সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, আমার নাতিটি মা-হারা। পড়া না পারায় তাকে এমনভাবে পিটিয়েছে যে হাতের হাড় ফেটে গেছে। মারধরের পর যাতে সে কান্না করতে না পারে, সেজন্য মুখে কলম গুঁজে দিয়েছিল। এলাকার মুরুব্বি ও মাদরাসার কর্তৃপক্ষের কাছে বিচার চেয়ে কোনো প্রতিকার পাইনি। উল্টো অভিযুক্ত শিক্ষককে পালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমি চাই এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক। আর কোনো শিশুকে যেন এভাবে নির্যাতনের শিকার হতে না হয়। ওর দিকে তাকালেই কান্নায় বুকটা ফেটে যায়।
অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ ঘটনার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘ছেলেটি পড়ার সময় অমনোযোগী ছিল। তাই তাকে দুটি বাড়ি দিয়েছি। একটি হাতে লেগেছে, আরেকটি নড়াচড়া করায় অন্য জায়গায় লেগেছে। তখন বুঝতে পারিনি, পরে শুনেছি হাতের হাড় ফেটে গেছে। এটা আমার অনেক বড় অন্যায় হয়েছে। আমি অধ্যক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি এবং সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. ওমর ফারুক ঘটনাটিকে অন্যায় স্বীকার করে বলেন, ‘আব্দুল্লাহ হুজুর নিজের দোষ স্বীকার করেছেন। বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে। আগামী শুক্রবার বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। বিচার শেষে অভিযুক্ত শিক্ষককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
সাটুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ায় পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। মামলা করার জন্য তাদেরকে আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু তারা এখনও আসেনি। তারা আসলে মামলা করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আসাদ/নাঈম