সমাজের ভেতরে নানা সংশয় ও প্রশ্ন নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে তখন তৈরি হয় তরুণদের নেতৃত্বে ‘শাহবাগ আন্দোলন’ গণজাগরণ মঞ্চ এবং তা ব্যাপক জনসমর্থন পায়। কয়েক মাস এ আন্দোলন সমাজের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। কিছু হঠকারী তৎপরতা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতার রাজনীতির বলয়ে আটকে গিয়ে এ আন্দোলন কিছুদিনের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা সরকার এটাকে গিলে ফেলে।...

১৯৯০-এ এরশাদের পতন ঘটে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল ও বাম পাঁচ দল মিলে সরকার পতন-পরবর্তী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য ‘তিন জোটের রূপরেখা’ দেয়। যদিও এই রূপরেখা বাস্তবায়নে পরের সরকারগুলোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এরশাদ পতনের পর জামায়াতে ইসলামীও বিজয়ী শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থিত করে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। কিন্তু তাদের সরকার গঠনে যথেষ্ট আসন ছিল না, দুটো আসন বাকি ছিল। বিএনপির সরকার গঠনে সেই সমর্থন দিয়ে জামায়াত তার রাজনৈতিক অবস্থান পোক্ত করে। এরপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই তাদের নিজ নিজ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর জন্য গোলাম আজমের কাছে সমর্থনের জন্য দোয়া চাইতে যায়। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নাগরিকত্ব হারানো গোলাম আজম তখনো নাগরিকত্ব ফেরত পাননি। পরিস্থিতি অনুকূল দেখে ১৯৯১ সালের শেষ দিকে জামায়াত গোলাম আজমকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের আমির ঘোষণা করে। সমাজে এসবের প্রতিক্রিয়া হয় ব্যাপক। তার কারণেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন আবারও নতুনভাবে শুরু হয়।
১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় ১০১ সদস্য বিশিষ্ট ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। আহ্বায়ক হন শহিদ জননী জাহানারা ইমাম। পরে এই কমিটি সম্প্রসারিত করে আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন বাম দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। ১৯৯২-এর ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গণ-আদালত অনুষ্ঠিত হয়। সরকার এই গণ-আদালতের প্রধান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে। কিন্তু এই আন্দোলন এত বিস্তৃত হয় যে, সারা দেশেই জামায়াতে ইসলামী কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
এ পর্যায়ে একটি মহাবিপর্যয় থেকে জামায়াতকে কার্যত প্রথমে উদ্ধার করে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সাম্প্রদায়িক সহিংস কর্মসূচি, পরে আওয়ামী লীগের ‘বৃহত্তর ঐক্য’। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ভারতে বিজেপির বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা ঘটে। এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। এই জনবিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের আবার জোরগলায় পুনর্বাসন করতে সক্ষম হয়। এর দেড় বছরের মধ্যে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে জাহানারা ইমাম মৃত্যুবরণ করেন। একই সময়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সমঝোতার খবর প্রকাশিত হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১৯৯৫ সালে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির যুগপৎ আন্দোলনের সূচনা হয়। এই ঐক্য জামায়াতকে বিরাট স্বস্তি দেয় এবং তার কর্মসূচির সম্প্রসারণ অনেক সহজ হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায়। একপর্যায়ে অধিকতর দর কষাকষির মাধ্যমে জামায়াত আবারও যুক্ত হয় বিএনপির সঙ্গে। গঠিত হয় বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে এই জোট বিপুলসংখ্যক আসন নিয়ে বিজয়ী হয় এবং সেভাবেই জামায়াত সরকারের অংশীদার হয়। স্বাধীনতার ৩০ বছর পর, গণ-আদালত আন্দোলনের ১০ বছর পর, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে এরকম দুজন ব্যক্তি বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জামায়াতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও সম্প্রসারিত হয়।
বস্তুত, আশির দশক থেকে অর্থনৈতিক নীতি, দুর্নীতি, লুণ্ঠন এবং অগণতান্ত্রিক শাসন-পীড়নে দেশ যেভাবে চলেছে তাতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির কোনো ফারাক করা যায় না। তবে ১৯৭১ সালের বিচার নিষ্পত্তি না হওয়ায় আওয়ামী লীগের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে একটি ভিন্ন সমর্থন বলয় তৈরির সুযোগ তখনো অবশিষ্ট ছিল। আর ২০০৮ সালের নির্বাচনে এটাই ছিল তার শেষ অবলম্বন। সুতরাং, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রতিশ্রুতি নিয়েই তাকে এবার জনগণের সামনে যেতে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে পরিচিত দুই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মন্ত্রী হওয়ার কারণে সমাজে যে ক্ষোভ তৈরি হয় তার ওপরই ভর করে আওয়ামী লীগ।
ক্ষমতা গ্রহণের পর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে গেছে আওয়ামী লীগ, ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। চিহ্নিত কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হলেও প্রথম থেকেই বিভিন্ন কারণে জনগণের মধ্যে সংশয় দেখা যায়। কারণ প্রথমত, এই আশঙ্কা বরাবরই থেকেছে যে, যেহেতু আওয়ামী লীগ একবার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য করেছে, বারবার নানা আপস প্রবণতা দেখিয়েছে, তাদের একটি মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে, সেহেতু যেকোনো সময় ভোট বা অন্য কোনো বিবেচনায় আবারও এরকম কিছু করতে পারে। দ্বিতীয়ত, শুধু ১৯৭১ নয়, এর আগে থেকেই জামায়াত বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, লবিং ইত্যাদি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে পরেও নানাভাবে সক্রিয় থেকেছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে ধনিক শ্রেণি গঠনের প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ মুছে দখল-লুণ্ঠন-জালিয়াতির একটি শক্তিশালী চক্র তৈরি হয়েছে দেশে। এই শ্রেণি মৈত্রীর শক্তি যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক তৎপরতা ছাড়াও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জমি দখল, নির্যাতনেও এ ঐক্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
প্রথম থেকেই এই বিচার কাজে সরকারের অদক্ষতা, অযত্ন, শৈথিল্য, দুর্বলতা নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া ছাত্রলীগ-যুবলীগ হামলা হত্যা জখম সন্ত্রাস চাঁদাবাজি করে সমাজে বিক্ষোভ বাড়িয়েছে। খুণি-সন্ত্রাসীদের ক্ষমা-প্রশ্রয় ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী নানা চুক্তি করে সরকার জনবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। দখল, নির্যাতন, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী অপকর্মের বিরুদ্ধে জনগণের নানা আন্দোলনের সামনে না দাঁড়াতে পেরে যখন তখন যে কোনো আন্দোলনকে ‘যুদ্ধাপরাধী বিচার নস্যাতের আন্দোলন’ কিংবা ‘জামায়াতী চক্রান্ত’ বলে সরকারি লোকজন প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের শক্তি জুগিয়েছে, তাদের গৌরবান্বিত করেছে। সামনে তখন ২০১৪ সালের নির্বাচন। নানা রহস্যজনক ঘটনায় ভোটের হিসাব-নিকাশে সরকার জামায়াতের সঙ্গে আবারও নতুন আঁতাতের পথে যাচ্ছে, এই সন্দেহ ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে।
সমাজের ভেতরে নানা সংশয় ও প্রশ্ন নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে তখন তৈরি হয় তরুণদের নেতৃত্বে ‘শাহবাগ আন্দোলন’ গণজাগরণ মঞ্চ এবং তা ব্যাপক জনসমর্থন পায়। কয়েক মাস এ আন্দোলন সমাজের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। কিছু হঠকারী তৎপরতা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতার রাজনীতির বলয়ে আটকে গিয়ে এ আন্দোলন কিছুদিনের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা সরকার এটাকে গিলে ফেলে।
এ সময়েই আবির্ভাব ঘটে হেফাজতে ইসলামসহ আরও নানা গোষ্ঠীর। গঠনের তিন বছরের মাথায় ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের বিশাল সমাবেশ বিস্ময়কর এবং রহস্যজনক মনে হতে পারে কিন্তু তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এর আগের তিন দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিধারায়, যার বিস্তৃত ব্যাখ্যা আগে দিয়েছি।
এই বছর শাহবাগে আন্দোলন ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, অথচ এই আন্দোলনকে কতিপয় গোষ্ঠী ‘নাস্তিকতা প্রচার’, ‘ইসলামবিদ্বেষী’ হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ’৭১-এর গণহত্যায় নিহত মানুষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই মুসলিম, সে কারণেও ইসলামপন্থিদের তো আরও সক্রিয়ভাবে এই গণহত্যার অপরাধীদের বিচার দাবি করার কথা। কিন্তু দেখা গেছে এই দাবি তুললেই তাকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলে কোনো কোনো গোষ্ঠী হুলস্থুল শুরু করে। বোঝা যায় যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করাই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। এসব মিথ্যা প্রচারের ওপর ভর করেই হেফাজত নেতৃত্ব সারা দেশের মাদ্রাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমবেত করে। সরকার তাদের প্রথমে অনুমতি দিয়েও পরে ‘এই সমাবেশকে বিএনপি-জামায়াত কাজে লাগাতে পারে’ এই ভয়ে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানে বাধা দেয়। রক্তক্ষয়ী যৌথ সামরিক অভিযানে হেফাজতের সমাবেশ শেষ হয়। সেই অভিযানে নিহতদের সংখ্যা বা তালিকা এখনো কেউ স্পষ্ট করেনি।
এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার আগে থেকেই হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মাত্রার যোগাযোগের কথা জানা যায়। সমাবেশ-উত্তরকালে এই যোগাযোগ ও সমঝোতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। পাইকারিভাবে লেখক-ব্লগারদের গ্রেপ্তার, একের পর এক ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সুরাহা করতে সরকারের অনীহা, আইসিটি আইনের মাধ্যমে কার্যত ‘ব্লাশফেমি’ আইনচর্চা ইত্যাদি পর্দার পেছনের সমঝোতার প্রমাণ দেয়। শুধু তাই নয়, হেফাজতের দাবি অনুযায়ী স্কুলের পাঠ্যপুস্তক রাতারাতি পরিবর্তনসহ একের পর এক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা তাদের আস্থাভাজন হন। হেফাজতের প্রকাশ্য সমাবেশে, মূল নেতাদের উপস্থিতিতে, তাকে ‘কওমি জননী’ খেতাব দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন আওয়ামী ওলামা লীগও হেফাজতের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বিভিন্ন দাবি ও কর্মসূচি হাজির করতে থাকে।
গত দশকে দেশে গুম-খুনের আরও বিস্তার ঘটে, সব প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ চরম আকার নেয়, নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। নির্বাচনকে সরকার প্রহসনে পরিণত করে, গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার দিকে যত এগোতে থাকে ততই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নানা ধরনের সন্ত্রাসী ও ধর্মপন্থিসহ বিভিন্ন বৈষম্যবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়তে থাকে।
লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং
ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

.jpg)