ঢাকা ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিল পাস শাবিপ্রবির আশরাফুলের জন্য চ্যারিটি রান আখাউড়ায় নতুন বরিশল ইউনিয়নের প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু কেরানীগঞ্জে শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে খুনসুটি, বদলি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ভাইরাল ভিডিও ঘিরে চাঞ্চল্য, শিশুর পা ভাঙার অভিযোগ অস্বীকার ‘নকল ডিম-চাল ও কেমিক্যালে পাকানো ফল নিয়ে সংসদে উদ্বেগ’ সোনারগাঁয়ে ডিজিএফআই পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে দুইজন গ্রেপ্তার কোর্ট রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক ফল উৎসব অনুষ্ঠিত ইবির প্রধান ফটকে জুলাইয়ের স্মৃতি যা আছে তাই থাকবে: ইবি ভিসি সাতকানিয়ায় সুপারি গাছ থেকে অজগর ও ঘর থেকে গোখরা সাপ উদ্ধার এআইয়ের প্রভাবে বাড়ল মাইক্রোসফটের কার্বন নিঃসরণ রাজশাহীতে বাস চলাচল স্বাভাবিক, স্বস্তি যাত্রীদের রাজারহাটে সরকারি রাস্তা নিয়ে সংঘর্ষে প্রাণ গেল জিন্নাত আলীর জলাবদ্ধ রাস্তায় গাড়ি-বাইক চালাবেন যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে কেউ ইট নিক্ষেপ করেনি: মাদারীপুর পুলিশ সুপার ভেজাল খাদ্য শনাক্তে জেলাভিত্তিক ভ্রাম্যমাণ ল্যাবভ্যান চালু হবে: খাদ্য প্রতিমন্ত্রী গাড়ির ইঞ্জিনে পানি ঢুকলে কী করবেন ঢাবি অ্যালামনাই ১৯৯৯ থেকে ২০০০-এর রজত জয়ন্তীর প্রস্তুতি শুরু এনভিডিয়া উন্মোচন করল জিফোর্স ট্রেডিং কার্ডস পূর্বাচল ভ্যালিতে দ্বিতীয় ধাপের প্লট হস্তান্তর সম্পন্ন, আস্থার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন স্থগিত পরীক্ষা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত, দুঃখ প্রকাশ শিক্ষামন্ত্রীর দেশে বিওয়াইডির ১ হাজারের বেশি নিউ এনার্জি ভেহিকেল বিক্রির মাইলফলক খেলাধুলার প্রসারে প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত ৮ বিঘা জমি বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ‘হেলথ ফেস্ট ২০২৬’ উদ্বোধন চার মন্ত্রীর পরিবর্তন চাইলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বেতের আঘাতে ফেটে গেল শিশুর হাত, কান্না থামাতে মুখে কলম বন্যাদুর্গত এলাকায় অ্যান্টিভেনম ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর: তথ্য উপদেষ্টা এক সপ্তাহে সাপে কেটেছে ১০৫জন ডে-কেয়ার নয়, শিশুদের সময় দিন

যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও হেফাজতের আবির্ভাব

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম
যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও হেফাজতের আবির্ভাব
আনু মুহাম্মদ

সমাজের ভেতরে নানা সংশয় ও প্রশ্ন নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে তখন তৈরি হয় তরুণদের নেতৃত্বে ‘শাহবাগ আন্দোলন’ গণজাগরণ মঞ্চ এবং তা ব্যাপক জনসমর্থন পায়। কয়েক মাস এ আন্দোলন সমাজের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। কিছু হঠকারী তৎপরতা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতার রাজনীতির বলয়ে আটকে গিয়ে এ আন্দোলন কিছুদিনের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা সরকার এটাকে গিলে ফেলে।...

১৯৯০-এ এরশাদের পতন ঘটে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল  ও বাম পাঁচ দল মিলে সরকার পতন-পরবর্তী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য ‘তিন জোটের রূপরেখা’ দেয়। যদিও এই রূপরেখা বাস্তবায়নে পরের সরকারগুলোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এরশাদ পতনের পর জামায়াতে ইসলামীও বিজয়ী শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থিত করে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। কিন্তু তাদের সরকার গঠনে যথেষ্ট আসন ছিল না, দুটো আসন বাকি ছিল। বিএনপির সরকার গঠনে সেই সমর্থন দিয়ে জামায়াত তার রাজনৈতিক অবস্থান পোক্ত করে। এরপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই তাদের নিজ নিজ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর জন্য গোলাম আজমের কাছে সমর্থনের জন্য দোয়া চাইতে যায়। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নাগরিকত্ব হারানো গোলাম আজম তখনো নাগরিকত্ব ফেরত পাননি। পরিস্থিতি অনুকূল দেখে ১৯৯১ সালের শেষ দিকে জামায়াত গোলাম আজমকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের আমির ঘোষণা করে। সমাজে এসবের  প্রতিক্রিয়া হয় ব্যাপক। তার কারণেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন আবারও নতুনভাবে শুরু হয়।

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় ১০১ সদস্য বিশিষ্ট ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। আহ্বায়ক হন শহিদ জননী জাহানারা ইমাম। পরে এই কমিটি সম্প্রসারিত করে আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন বাম দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। ১৯৯২-এর ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গণ-আদালত অনুষ্ঠিত হয়। সরকার এই গণ-আদালতের প্রধান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে। কিন্তু এই আন্দোলন এত বিস্তৃত হয় যে, সারা দেশেই জামায়াতে ইসলামী কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এ পর্যায়ে একটি মহাবিপর্যয় থেকে জামায়াতকে কার্যত প্রথমে উদ্ধার করে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সাম্প্রদায়িক সহিংস কর্মসূচি, পরে আওয়ামী লীগের ‘বৃহত্তর ঐক্য’। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ভারতে বিজেপির বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা ঘটে। এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। এই জনবিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের আবার জোরগলায় পুনর্বাসন করতে সক্ষম হয়। এর দেড় বছরের মধ্যে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে জাহানারা ইমাম মৃত্যুবরণ করেন। একই সময়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সমঝোতার খবর প্রকাশিত হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১৯৯৫ সালে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির যুগপৎ আন্দোলনের সূচনা হয়। এই ঐক্য জামায়াতকে বিরাট স্বস্তি দেয় এবং তার কর্মসূচির সম্প্রসারণ অনেক সহজ হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায়। একপর্যায়ে অধিকতর দর কষাকষির মাধ্যমে জামায়াত আবারও যুক্ত হয় বিএনপির সঙ্গে। গঠিত হয় বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে এই জোট বিপুলসংখ্যক আসন নিয়ে বিজয়ী হয় এবং সেভাবেই জামায়াত সরকারের অংশীদার হয়। স্বাধীনতার ৩০ বছর পর, গণ-আদালত আন্দোলনের ১০ বছর পর, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে এরকম দুজন ব্যক্তি বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জামায়াতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও সম্প্রসারিত হয়।

বস্তুত, আশির দশক থেকে অর্থনৈতিক নীতি, দুর্নীতি, লুণ্ঠন এবং অগণতান্ত্রিক শাসন-পীড়নে দেশ যেভাবে চলেছে তাতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির কোনো ফারাক করা যায় না। তবে ১৯৭১ সালের বিচার নিষ্পত্তি না হওয়ায় আওয়ামী লীগের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে একটি ভিন্ন সমর্থন বলয় তৈরির সুযোগ তখনো অবশিষ্ট ছিল। আর ২০০৮ সালের নির্বাচনে এটাই ছিল তার শেষ অবলম্বন। সুতরাং, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রতিশ্রুতি নিয়েই তাকে এবার জনগণের সামনে যেতে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে পরিচিত দুই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মন্ত্রী হওয়ার কারণে সমাজে যে ক্ষোভ তৈরি হয় তার ওপরই ভর করে আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতা গ্রহণের পর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে গেছে আওয়ামী লীগ, ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। চিহ্নিত কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হলেও প্রথম থেকেই বিভিন্ন কারণে জনগণের মধ্যে সংশয় দেখা যায়। কারণ প্রথমত, এই আশঙ্কা বরাবরই থেকেছে যে, যেহেতু আওয়ামী লীগ একবার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য করেছে, বারবার নানা আপস প্রবণতা দেখিয়েছে, তাদের একটি মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে, সেহেতু যেকোনো সময় ভোট বা অন্য কোনো বিবেচনায় আবারও এরকম কিছু করতে পারে। দ্বিতীয়ত, শুধু ১৯৭১ নয়, এর আগে থেকেই জামায়াত বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, লবিং ইত্যাদি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে পরেও নানাভাবে সক্রিয় থেকেছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে ধনিক শ্রেণি গঠনের প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ মুছে দখল-লুণ্ঠন-জালিয়াতির একটি শক্তিশালী চক্র তৈরি হয়েছে দেশে। এই শ্রেণি মৈত্রীর শক্তি যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক তৎপরতা ছাড়াও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জমি দখল, নির্যাতনেও এ ঐক্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

প্রথম থেকেই এই বিচার কাজে সরকারের অদক্ষতা, অযত্ন, শৈথিল্য, দুর্বলতা নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া ছাত্রলীগ-যুবলীগ হামলা হত্যা জখম সন্ত্রাস চাঁদাবাজি করে সমাজে বিক্ষোভ বাড়িয়েছে। খুণি-সন্ত্রাসীদের ক্ষমা-প্রশ্রয় ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী নানা চুক্তি করে সরকার জনবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। দখল, নির্যাতন, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী অপকর্মের বিরুদ্ধে জনগণের নানা আন্দোলনের সামনে না দাঁড়াতে পেরে যখন তখন যে কোনো আন্দোলনকে ‘যুদ্ধাপরাধী বিচার নস্যাতের আন্দোলন’ কিংবা ‘জামায়াতী চক্রান্ত’ বলে সরকারি লোকজন প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের শক্তি জুগিয়েছে, তাদের গৌরবান্বিত করেছে। সামনে তখন ২০১৪ সালের নির্বাচন। নানা রহস্যজনক ঘটনায় ভোটের হিসাব-নিকাশে সরকার জামায়াতের সঙ্গে আবারও নতুন আঁতাতের পথে যাচ্ছে, এই সন্দেহ ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে।

সমাজের ভেতরে নানা সংশয় ও প্রশ্ন নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে তখন তৈরি হয় তরুণদের নেতৃত্বে ‘শাহবাগ আন্দোলন’ গণজাগরণ মঞ্চ এবং তা ব্যাপক জনসমর্থন পায়। কয়েক মাস এ আন্দোলন সমাজের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। কিছু হঠকারী তৎপরতা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতার রাজনীতির বলয়ে আটকে গিয়ে এ আন্দোলন কিছুদিনের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা সরকার এটাকে গিলে ফেলে।

এ সময়েই আবির্ভাব ঘটে হেফাজতে ইসলামসহ আরও নানা গোষ্ঠীর। গঠনের তিন বছরের মাথায় ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের বিশাল সমাবেশ বিস্ময়কর এবং রহস্যজনক মনে হতে পারে কিন্তু তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এর আগের তিন দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিধারায়, যার বিস্তৃত ব্যাখ্যা আগে দিয়েছি।

এই বছর শাহবাগে আন্দোলন ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, অথচ এই আন্দোলনকে কতিপয় গোষ্ঠী ‘নাস্তিকতা প্রচার’, ‘ইসলামবিদ্বেষী’ হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ’৭১-এর গণহত্যায় নিহত মানুষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই মুসলিম, সে কারণেও ইসলামপন্থিদের তো আরও সক্রিয়ভাবে এই গণহত্যার অপরাধীদের বিচার দাবি করার কথা। কিন্তু দেখা গেছে এই দাবি তুললেই তাকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলে কোনো কোনো গোষ্ঠী হুলস্থুল শুরু করে। বোঝা যায় যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করাই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। এসব মিথ্যা প্রচারের ওপর ভর করেই হেফাজত নেতৃত্ব সারা দেশের মাদ্রাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমবেত করে। সরকার তাদের প্রথমে অনুমতি দিয়েও পরে ‘এই সমাবেশকে বিএনপি-জামায়াত কাজে লাগাতে পারে’ এই ভয়ে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানে বাধা দেয়। রক্তক্ষয়ী যৌথ সামরিক অভিযানে হেফাজতের সমাবেশ শেষ হয়। সেই অভিযানে নিহতদের সংখ্যা বা তালিকা এখনো কেউ স্পষ্ট করেনি।

এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার আগে থেকেই হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মাত্রার যোগাযোগের কথা জানা যায়। সমাবেশ-উত্তরকালে এই যোগাযোগ ও সমঝোতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। পাইকারিভাবে লেখক-ব্লগারদের গ্রেপ্তার, একের পর এক ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সুরাহা করতে সরকারের অনীহা, আইসিটি আইনের মাধ্যমে কার্যত ‘ব্লাশফেমি’ আইনচর্চা ইত্যাদি পর্দার পেছনের সমঝোতার প্রমাণ দেয়। শুধু তাই নয়, হেফাজতের দাবি অনুযায়ী স্কুলের পাঠ্যপুস্তক রাতারাতি পরিবর্তনসহ একের পর এক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা তাদের আস্থাভাজন হন। হেফাজতের প্রকাশ্য সমাবেশে, মূল নেতাদের উপস্থিতিতে, তাকে ‘কওমি জননী’ খেতাব দেওয়া হয়।  আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন আওয়ামী ওলামা লীগও হেফাজতের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বিভিন্ন দাবি ও কর্মসূচি হাজির করতে থাকে।

গত দশকে দেশে গুম-খুনের আরও বিস্তার ঘটে, সব প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ চরম আকার নেয়, নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। নির্বাচনকে সরকার প্রহসনে পরিণত করে, গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার দিকে যত এগোতে থাকে ততই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নানা ধরনের সন্ত্রাসী ও ধর্মপন্থিসহ বিভিন্ন বৈষম্যবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়তে থাকে। 

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং 
ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

দুর্নীতির প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের হিসাব-নিকাশ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
দুর্নীতির প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের হিসাব-নিকাশ
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে কখনোই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার দেখেছে, এক সরকার অন্য সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে একই ধরনের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে। এ চক্র ভাঙতে হলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে।...

সম্প্রতি টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতি ও ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে। এই সূত্র ধরেই অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে হওয়া দুর্নীতি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮  মাসের সবকিছুর (তদন্তের) জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশনা দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলছি না, পত্রিকাটি এখন আমার কাছে নেই; সবাই দেখেছেন।... তারা তো দায়মুক্তি পেতে পারে না।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেকেই নতুন আশায় বুক বেঁধেছিল। তারা মনে করেছিল, এবার হয়তো রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা আসবে, প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দুর্নীতির দীর্ঘ ছায়া কিছুটা হলেও সরে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো হিসেবে এখন আমাদের সামনে তথ্য আসছে। তারা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বললেও কিছুদিন পরেই তাদের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ উঠতে শুরু করে। ফলে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে–সমস্যা কি ব্যক্তি, নাকি পুরো ব্যবস্থার?

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তাকে ঘিরে দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ এই সরকারের প্রধান ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ব্যবসা, দারিদ্র্যবিমোচন এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ফলে অনেকেই মনে করেছিলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। কিন্তু ওই সরকারের দেড় বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার, স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার অস্বচ্ছ ব্যবহারের অভিযোগ জনপরিসরে বারবার আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু অভিযোগগুলোর ব্যাপকতা এবং জনমনে সৃষ্ট সংশয় উপেক্ষা করার সুযোগও নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন টকশো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নিয়োগ ও পদায়ন, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, উপদেষ্টাদের ভূমিকা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ওই সরকারের সমর্থকরা দাবি করেছেন, এসব অভিযোগের বড় অংশই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট–অভিযোগের উৎস যাই হোক না কেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভিযোগের জবাব তদন্ত ও তথ্যের মাধ্যমে দিতে হয়, রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে নয়।

বাংলাদেশে কখনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, কখনো প্রশাসনিক প্রভাব, কখনো ব্যবসায়িক স্বার্থ–বিভিন্ন রূপে দুর্নীতি টিকে থেকেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির প্রশ্নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে এ সরকারকে স্বাগত জানিয়েছিল, সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, যদি পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতি তদন্ত করা হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিযোগগুলোও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কারণ আইনের শাসনের মূলনীতি হলো–কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ব্যক্তি যত জনপ্রিয়ই হোন না কেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তও জনসমালোচনা ও জবাবদিহির আওতায় থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। সেসব অভিযোগও এখন তদন্ত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। দুর্নীতির অভিযোগ শুধু রাজনৈতিকভাবে যেমন হওয়া উচিত নয়, তেমনি শুধু রাজনৈতিক কারণে এড়িয়ে যাওয়াও উচিত নয়।

দুর্নীতির আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চাঁদাবাজি ও প্রভাব-বাণিজ্য। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ আশা করেছিল যে, দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজির সংস্কৃতি ভেঙে পড়বে। কিন্তু ড. ইউনূস সরকারের সময় সব রেকর্ড ভঙ্গ করে চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, পরিবহন খাত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো বন্ধ করতে পদক্ষেপ নেয়নি বললেই চলে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও জনগণের প্রত্যাশা ছিল অনেক। ব্যাংক খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে নামতে সুযোগ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার দৃশ্যমান প্রভাব সীমিত ছিল। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা জনগণের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। সেখান থেকে জনগণ এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সমস্যা হলো আমরা প্রায়ই ব্যক্তিনির্ভর মূল্যায়ন করি। কোনো নেতা জনপ্রিয় হলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে চাই না, আবার কোনো নেতা অজনপ্রিয় হলে অভিযোগ প্রমাণের আগেই তাকে দোষী ধরে নিই। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা, তদন্ত সংস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি নয়, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। কারও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের স্তূপ গড়ে ওঠে আবার কাউকে কাউকে ছেড়ে দেওয়া হয় হাজার অভিযোগ থাকলেও। তাছাড়া আমরা সহজেই অতীতের কথা ভুলে যাই। আমারা যথাযথ মূল্যায়ন করতে জানি না। কে আমাদের জন্য কল্যাণকর, আর কে আমাদের জন্য কম কল্যাণকর, সে মূল্যায়নও আমরা যথাযথ করতে পারি না। সবকিছুই রাজনৈতিক বিবেচনায় চিন্তা করি।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিযোগগুলোর যে স্বাধীন তদন্ত হওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। এমন সব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত। সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো কোনো এমপি বলেন, তার নামে এক টাকারও দুর্নীতি নেই, অন্যদিকে কোনো কোনো গণমাধ্যম তার বিরুদ্ধেই অনবরত দুর্নীতির খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে। তাহলে সেগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত। আর আমাদের মনে রাখতে হবে, তদন্তের উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়; বরং সত্য উদ্ঘাটন করা। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তাহলে তদন্ত সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। আর যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে কখনোই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার দেখেছে, এক সরকার অন্য সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে একই ধরনের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও ওঠে। এ চক্র ভাঙতে হলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

ডিজিটাল জুয়ার মরণফাঁদ

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম
ডিজিটাল জুয়ার মরণফাঁদ
আলম শাইন

দেশের তরুণদের মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্ন যেন কোনো প্রতারণার ফাঁদে নষ্ট না হয়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে তরুণরা নিজেদের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। তরুণদের শক্তিকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি দক্ষ, সচেতন ও সমৃদ্ধ প্রজন্ম।...

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু এর অপব্যবহার নতুন কিছু সংকটও তৈরি করেছে। অনলাইন জুয়া তারই একটি ভয়াবহ উদাহরণ। একসময় জুয়া ছিল নির্দিষ্ট কিছু স্থান ও মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েক ক্লিকেই তা মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই ফাঁদের প্রধান শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার একসময় নীরবে ঘটলেও বর্তমানে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, খেলাধুলার ম্যাচ ঘিরে বাজির প্রলোভন এবং অনলাইন গেমের নামে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেখিয়ে অনেক তরুণকে এতে যুক্ত করা হচ্ছে। শুরুতে অল্প অর্থ দিয়ে বড় লাভের স্বপ্ন দেখানো হয়। কেউ কেউ সামান্য লাভ করলেও পরে সেই আশাই তাদের আরও বড় ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে একসময় তারা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে।

এই প্রবণতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো আসক্তি। মাদকের মতো এটিও ধীরে ধীরে মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। দ্রুত ধনী হওয়ার মোহে অনেক তরুণ পড়াশোনা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে দূরে সরে যায়। সারাক্ষণ বাজির হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাড়ে মানসিক চাপ ও হতাশা। অনেক ক্ষেত্রে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

অনলাইন জুয়ার প্রভাব পড়ে পারিবারিক জীবনেও। অনেক তরুণ পরিবারের অজান্তে টাকা খরচ করে, ঋণ করে কিংবা গোপনে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করে। কেউ কেউ পরিবারের সঞ্চিত অর্থও ব্যবহার করে। সেই সত্য গোপন করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ায় পারিবারিক বিশ্বাস নষ্ট হয় এবং তৈরি হয় অশান্তি।

শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, সমাজও এ সমস্যার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সহজে অর্থ উপার্জনের মানসিকতা তরুণদের পরিশ্রম ও সৎ উপার্জনের মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কেউ কেউ আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে গিয়ে প্রতারণা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। অথচ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তরুণদের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার ওপর। সেই শক্তি যদি ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অনলাইন জুয়া ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো এর সহজলভ্যতা এবং এ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। অনেকেই এটিকে নিছক বিনোদন বা সহজে অর্থ আয়ের মাধ্যম মনে করেন। বাস্তবে অধিকাংশ জুয়ার প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে পরিচালিত হয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয় এর পরিচালকরাই। ব্যবহারকারীরা সাময়িকভাবে কিছু অর্থ পেলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশই ক্ষতির মুখে পড়ে।

এই অবৈধ ব্যবসার বিস্তারে বিদেশি সার্ভারনির্ভর ওয়েবসাইট ও অ্যাপের ভূমিকাও রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্ম দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হওয়ায় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেনের সহজ ব্যবস্থার কারণে অল্প সময়ে অর্থ জমা ও উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। তাই শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই হবে না, এর সঙ্গে জড়িত অর্থ লেনদেনের পথও চিহ্নিত করে বন্ধ করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে এসব প্ল্যাটফর্মের প্রচারণা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। জনপ্রিয় ব্যক্তিদের প্রচারণা দেখে অনেক তরুণ এসবকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে যুক্ত হয়। অথচ এর পেছনে থাকে বাণিজ্যিক স্বার্থ। তাই ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আইনের কার্যকর প্রয়োগ অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অবৈধ ওয়েবসাইট, অ্যাপ এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যম বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং যুক্তি, সচেতনতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ডিজিটাল নিরাপত্তা, আর্থিক সচেতনতা এবং অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করা দরকার।

নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষাও এ সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। জুয়া মানুষের মধ্যে পরিশ্রম ছাড়া অর্থ লাভের প্রবণতা তৈরি করে, যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সততা, পরিশ্রম এবং দায়িত্বশীলতার শিক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

গণমাধ্যমেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনলাইন জুয়ার প্রকৃত চিত্র ও এর ক্ষতিকর দিক সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি এসব প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

তরুণদের এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে তাদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিকচর্চা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়ানো গেলে তারা নিজেদের দক্ষতা বিকাশে মনোযোগী হবে। নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের সুযোগ পেলে ভাগ্যনির্ভর আয়ের প্রতি আকর্ষণ কমে আসবে।

অনলাইন জুয়ার আসক্তিতে যারা ইতোমধ্যে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের প্রতিও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শুধু তিরস্কার বা শাস্তি দিয়ে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। কাউন্সেলিং, মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

অনলাইন জুয়া কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটেরও একটি কারণ। তরুণ সমাজকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আইনের প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত নজরদারি, পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ–এই বিষয়গুলো কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা গেলে এর বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

দেশের তরুণদের মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্ন যেন কোনো প্রতারণার ফাঁদে নষ্ট না হয়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, ভালো পরিবেশ এবং গঠনমূলক কাজে যুক্ত করার সুযোগ দিতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে তরুণরা নিজেদের যোগ্যতা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, শিক্ষা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তরুণদের শক্তিকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি দক্ষ, সচেতন ও সমৃদ্ধ প্রজন্ম।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও 
জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ এবং ট্রাম্পের হাসি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ এবং ট্রাম্পের হাসি
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইরানের ওপর হামলার সময় ট্রাম্প কিন্তু ন্যাটো তার সঙ্গে থাকবে কি থাকবে না তা নিয়ে চিন্তাও করেননি, নেমে পড়েছেন মানুষ হত্যার অভিযানে। ভয় কীসের? খামেনি ও তার কমান্ডারদের ভয় থাকে আক্রান্ত হওয়ার এবং প্রাণ হারানোর, বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে মার্কিনি ও ইসরায়েলি গুপ্তচররা সক্রিয় থাকায়, ট্রাম্প তো নিরাপদে হাসছেন এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন মেঘের আড়ালে থেকে।...

অ্যান ফ্রাঙ্কের প্রাণ হরণের ৮০ বছর পরে ২০২৬ সালে নিপীড়িত ইহুদি জনগোষ্ঠীর জায়নবাদী অংশের নায়ক নেতানিয়াহুর সহযোগী এবং তার চেয়েও ভয়াবহ রকমের দানবীয় এক ব্যক্তি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত এক হামলায় অ্যান ফ্রাঙ্কেরই বয়সী (অনেকেরই হয়তো কিছু কম হবে) ১৬৫ জন ইরানি কন্যাশিশু ও কিশোরী প্রাণ হারিয়েছে। অ্যানের মতোই তারাও ছিল সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, এবং অ্যানের মতোই তাদের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল তাদের সম্প্রদায়গত পরিচয়। কিশোরী অ্যান ফ্রাঙ্কের নাম এক সময়ে অনেকেই জানতেন, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। ইহুদি বংশোদ্ভূত মেয়েটি তার পরিবারের সঙ্গে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর লোকদের হাতে বন্দি হয়েছিল, একটি নির্যাতনশালায়। বন্দি অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘটে, যেমনটা ঘটেছিল তার পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে অসংখ্য ইহুদি বন্দির। নির্যাতনের অবধি ছিল না। অ্যান ফ্রাঙ্ক অসামান্য ছিল বিশেষ করে এদিক থেকে যে, চরম নির্যাতন ও হতাশার মধ্যেও সে ভেঙে পড়েনি। স্থির চিত্তে নিজের অভিজ্ঞতাগুলো তার ডায়েরিতে লিখে রেখেছে। জন্ম তার ১৯২৯-এ, প্রাণ হারায় ১৯৪৫-এ; অর্থাৎ বেঁচে ছিল মাত্র ১৬ বছর। অত অল্পবয়সে প্রাণ না হারালে মেয়েটি নিশ্চয়ই আরও বড় মাপের সাহিত্যসৃষ্টি করতে পারত, যার সম্ভাবনা তার দিনলিপির পাতায় পাতায় পরিস্ফূট। অ্যান চলে গেছে, কিন্তু তার ডায়েরিটি বেঁচে গেছে। নাৎসিদের পরাজয়ের পর ১৯৪৭ সালে ডায়েরিটি মুদ্রিত হয়ে প্রকাশ পায়। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ভাষায় তার অনুবাদ হতে থাকে, এবং বিশ্ববাসীর কাছে নাৎসিদের বর্বরতার একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে গৃহীত হয়।

অ্যান ছিল ইহুদি; ইরানের ওই ১৬৫ জন কন্যাশিশু জন্মগত পরিচয়ে ছিল মুসলমান। বেঁচে থাকলে কে জানে এদের মধ্যে কেউ অ্যান ফ্রাঙ্কের মতো অসাধারণ একজন হয়ে উঠতে পারত কি না। তা বিশ্বখ্যাতি অর্জন করুক বা না-ই করুক, এদের প্রত্যেকেরই তো ছিল বেঁচে থাকার অধিকার, যে অধিকার নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছে অ্যান ফ্রাঙ্কেরই ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত নেতানিয়াহু এবং তার বড় ভাই খ্রিষ্টান ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেপণাস্ত্রের এক আঘাতে। যিশু খ্রিষ্ট এসেছিলেন শান্তির বাণী নিয়ে, ডোনাল্ড ট্রাম্পও দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে এবং ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিয়ে আগ বাড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন ‘অন্তহীন’ যুদ্ধগুলোর অবসান ঘটিয়ে বিশ্বে তিনি শান্তির বন্যা বইয়ে দেবেন। এবং শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পাবেন বলেও আশা রেখেছিলেন, কেবল যে বুকের গোপন কুঠরিতে তা নয়, মুখর মুখেও। সেটা না পাওয়ায় তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। পুরস্কারটি পেয়েছেন অবশ্য তারই আজ্ঞাবহ হতে সর্বদা-প্রস্তুত ভেনেজুয়েলার এক রাজনীতিবিদ; তবে সে পাওয়াতেও ট্রাম্প সাহেবের শান্তি কোথায়? নোবেল না পাওয়ার ক্রোধেই যে তিনি বিশ্বকে ছারখার করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা নিশ্চয়ই নয়। তার আবির্ভাব আসলে যিশু খ্রিষ্টের উল্টো ভূমিকা পালনের জন্যই, এবং সেটা হচ্ছে মানবিক ও প্রাকৃতিক উভয় বিশ্বকেই যতটা পারা যায় নষ্ট করে ফেলবার। নষ্টের রাজা তিনি। যৌন-নিপীড়নসহ নানা ধরনের অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত এপেস্টাইন নামে অধুনা-জগৎবিখ্যাত এক সফল ব্যবসায়ীর সঙ্গেও তার খাতিরের নথি প্রকাশিত হওয়া শুরু করেছে। সমগ্র বিশ্বের বিরুদ্ধে তিনি যে শুল্কযুদ্ধ জারি করেছেন, তাতে মানুষের জীবন-ব্যয় খোদ আমেরিকাতেও বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং তার জনপ্রিয়তার পারদ দ্রুত নিচের দিকে নামছিল। এ অবস্থায় দুকান কাটা যাওয়াদের মতো মানসম্মানের ক্ষেত্রে তিনি অবশ্য প্রায় সর্বহারাই। কেউ কেউ বলছেন লোকটি উন্মাদ, কেউ বলছেন মাতাল; মনে হয় দুটোই সত্য। ক্ষমতালোলুপতার উন্মাদনা তাকে গ্রাস করেছে, এবং আচরণ তিনি করছেন আত্মনিয়ন্ত্রণহীন মাতালের মতো। তাকে গুন্ডা বললেও অপমান করা হয় না। আসলেই তার অনেক মুখ, তদুপরি মুখোশও বিবিধ।

ইতোমধ্যে আমেরিকার মানুষ, সবাই না হলেও অনেকেই, টের পেয়ে গেছেন যে লেজে আগুন লাগা হনুমানের মতো ট্রাম্প সাহেব যে খেলাটা খেলছেন সেটা আমেরিকার যুদ্ধ নয়, ইসরায়েলের ফিলিস্তিন দখলের প্রচেষ্টা মাত্র এবং এটাও তাদের কাছে অস্পষ্ট নেই যে, যেটাকে যুদ্ধ বলা হচ্ছে, সেটা মোটেই যুদ্ধ নয়; নির্লজ্জ এবং বর্বর হামলা বটে। হামলার প্রথমটিই ছিল এমন অতর্কিত যে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠজনসহ ৪২ জন একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন। পরবর্তী হামলাগুলোতে নিহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ, এবং স্কুলে পড়তে আসা ১৬৫ জন কন্যাশিশু।

আমাদের একটি জাতীয় দৈনিক শিশুহত্যার ওই খবরটি দিয়েছে এভাবে: ‘তারা পড়ত, খেলত একসঙ্গে, শুয়ে থাকবে পাশাপাশি। মাত্র কয়েকদিন আগে তাদের চাঞ্চল্যে মুখর থাকত যে পরিবেশ, সেটা ভারী হয়ে উঠেছে পাথরের মতো তাদেরই নীরবতায়। ডুকরে কেঁদে উঠেছেন হাজারো মানুষ [...] ইরানের পতাকায় ছোট ছোট কফিনগুলো ঢেকে দেওয়া হয়েছে।’ ওই শিশুদের তো অন্য কোনো অপরাধ ছিল না, ইরানি পরিচয়টি ছাড়া; কিন্তু সে পরিচয়টি ওই শিশুরা মুছে ফেলবে কী করে? মৃত্যুর পরে অবশ্য তাদের অতিরিক্ত এই পরিচয়টিও রয়ে যাবে যে, তারা শহিদ হয়েছে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের নৃশংস অস্ত্রাঘাতে।

শিশু হত্যাকারী কাপুরুষরা অস্ত্র হাতে স্থলপথে আসেনি; এলে প্রতিহত হতো; তারা হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে দূরে বসে, নিরাপদে থেকে, আকাশপথে মিসাইল ছুড়ে। এমন হত্যাকাণ্ড অনুন্নয়নের যুগে সম্ভব ছিল না, আজ সভ্যতা ও বিজ্ঞান উভয়েই যখন উন্নতির চূড়ান্ত স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে, তখনই এটা সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞান এখন অত্যাচারীদের ক্রীতদাস বৈ নয়। ইসরায়েলের নেতানিয়াহুর একার পক্ষে ওই তাণ্ডবলীলা অসম্ভব হতো, যদি বড় ভাই ট্রাম্পের সহায়তা না পেত। তাদের তাণ্ডব কেবল যে বস্তুগত ধ্বংসলীলা ও গভীর অর্থনৈতিক ক্ষতেরই সৃষ্টি করছে তা নয়, শিশু ও নারীসহ নিরীহ মানুষকে হত্যার ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের একটি রেকর্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৪ মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে, যৌথ হামলায় ইরানে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৪৪২ জন; লেবাননে ৮২৬ জন। এর বিপরীতে ইরানের জবাবে ইসরায়েলিদের মৃত্যুসংখ্যা সর্বমোট ১৪ জন। ১৪ জনের বেশি মানুষ তো আমাদের এ অনুন্নত দেশে একদিনেই প্রাণ হারাচ্ছেন। একটি মাত্র সড়ক-দুর্ঘটনাতেই।

জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাক আক্রমণ করেন তার আগে অন্তত এক মাস তিনি আমেরিকার মানুষের সমর্থন আদায়সহ বিশ্বজনমতকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রচার কার্য চালিয়েছিলেন; ট্রাম্প সাহেবের কর্মসূচিতে ওই সবের বালাই নেই। জর্জ বুশের আচরণ দেখে মনে হয়েছিল নতুন হিটলারের অভ্যুদয় ঘটেছে, কিন্তু ট্রাম্পের কাণ্ডকারখানা দেখে তো স্বয়ং হিটলারই লজ্জা পাচ্ছেন, কবরে শুয়ে।

হিটলার তবু দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ইহুদিরা জার্মানদের অর্থনৈতিক জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করছে। তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ওই সম্প্রদায়ের ধনীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা। কিন্তু কোথায় ইরান আর কোথায় আমেরিকা? ইরানের মানুষ তো আমেরিকার জন্য বিন্দুমাত্র হুমকি তৈরি করেনি। গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে, ইরাকের বিরুদ্ধে বুশ এই অভিযোগ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন; সেটা যে ভুয়া ছিল তা প্রমাণিত হওয়ায় এবং ইরাকে ধ্বংস ছাড়া তার পক্ষে অন্যকিছু ঘটানো যে সম্ভব হয়নি, তা দেখে পরবর্তীতে তিনি কিছুটা লজ্জাতেও পড়েছিলেন; কিন্তু আমেরিকার নতুন নায়কের না আছে লজ্জা না আছে ভয়। তার জন্য হারানোর কিছু নেই, এবং জগৎ খোলা রয়েছে জয় করার। সেটাই তিনি করতে চান। ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে তিনি অপহরণ করে নিয়ে আসেন, বলেন বিচার করবেন; বেচারার অপরাধ প্রতিবেশী হয়েও ট্রাম্প সাহেবকে নিয়মিত সালাম না জানানো, আরও বড় অপরাধ ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেলের মজুতের ওপর মার্কিনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সুযোগদানে অসম্মতি। ইরানকে ট্রাম্প কাবু করবেন; কারণ ইরান বেয়াদবের মতো আচরণ করে এবং ইরানকে দমাতে পারলে তেলসমৃদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্য মার্কিনি আধিপত্য একচ্ছত্র হবে। ইরানের পরে বিশাল আমেরিকার অতিশয় ক্ষুদ্র প্রতিবেশী ‘বেয়াদব’ কিউবার ওপর যে হামলা চালাবেন, সে ঘোষণা তো দিয়েই রেখেছেন। গ্রিনল্যান্ডই বা স্বতন্ত্র থাকবে কেন, আমরা নিয়ে নেব। প্রতিবেশী-অনুগত কানাডাকে দখলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। এসব কথা বলে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখবেন, এবং পারলে ক্ষেপিয়ে তুলবেন, এই হলো অভিসন্ধি। ওদিকে ইউরোপই বা বাদ যাবে কোন দুঃখে, তার মেরুদণ্ডও ভেঙে দেওয়া দরকার। সারা দুনিয়া হবে আমেরিকার পদানত। সে লক্ষ্যে ইউরোপকেও ভাগ করে ফেলা চাই। পুতিন যে ইউক্রেন আক্রমণ করেছিলেন সে কাজের অজুহাতে ছিল ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেবে এই শঙ্কা। চিন্তাটা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল তাও নয়। ন্যাটোর বাহুতে মূল শক্তি জোগাত আমেরিকা। আমেরিকার সমর্থনই ছিল ইউক্রেনের জন্য ভরসা। ইউক্রেন আক্রান্ত হলে সেখানকার মানুষ যে দুর্দশায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, তাতে ইউরোপজুড়ে প্রতিবাদ তো বটেই, ক্রন্দনের ধ্বনিও শোনা গেছে। আমেরিকাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যত প্রকার সাহায্য প্রয়োজন দুহাতে তা সরবরাহ করবে। ইরানের ওপর হামলার সময় ট্রাম্প কিন্তু ন্যাটো তার সঙ্গে থাকবে কি থাকবে না তা নিয়ে চিন্তাও করেননি, নেমে পড়েছেন মানুষ হত্যার অভিযানে। ভয় কীসের? খামেনি ও তার কমান্ডারদের ভয় থাকে আক্রান্ত হওয়ার এবং প্রাণ হারানোর, বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে মার্কিনি ও ইসরায়েলি গুপ্তচররা সক্রিয় থাকায়, ট্রাম্প তো নিরাপদে হাসছেন এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন মেঘের আড়ালে থেকে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল গতি প্রয়োজন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল গতি প্রয়োজন
ড. আবদুর রহমান

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার গতিময়তা বাড়াতে হবে এসএমই প্লাটফর্ম চালু করা, ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, বিনিয়োগকারীদের শেয়ারব্যবস্থা বিষয়ে প্রতিটি ব্রোকার হাউসে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা ছাড়া জাতীয় অর্থনীতিতে রক্ত প্রবাহের গতি বেগবান করা অসম্ভব।...

প্রত্যেক দেশের পুঁজিবাজারের স্থিতিশীল অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট দেশের শিল্পায়নকে এগিয়ে নিয়ে ওই দেশের জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালন করে থাকে। দুনিয়ার অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের তুলনা করলে কোনোভাবেই মেলানো সম্ভব নয়। এর কারণ হচ্ছে, বিশ্বে এমন কোনো দেশ আছে কি যেখানে সকালবেলা অর্থমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করলে বিকেলে শেয়ারমূল্য বেড়ে যায় কিংবা বিকেলে উল্লিখিত ব্যক্তিদের কুশপুত্তলিকা দাহ করলে পরের দিন শেয়ারমূল্য বাড়ে? লোকের ধারণা এমন বিষয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রস্তুত করার জন্য হয়তোবা প্রয়াত অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে একটা যোগসাধনের চেষ্টা করলেও করা যেতে পারে। বর্তমানে বেঁচে থাকা অর্থনীতিবিদদের পক্ষে বাংলাদেশে সংঘটিত উপরোল্লিখিত কর্মযজ্ঞের কোনো খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করানো সম্পূর্ণভাবেই অসম্ভব। আর এসব কারণেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনয়নের কাজ জরুরি। সরকার ইতোমধ্যে কমিশনের চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগও দিয়েছে।

আমরা চলমান শেয়ারবাজারের গতিবিধি যথার্থভাবে বোঝার জন্য গত কয়েকটি অর্থবছরের হালহকিকত একটু বুঝে এলে ভালো হয়। ভয়াবহ কোভিড-পরবর্তী ২০২০-২১ অর্থবছরে পুঁজিবাজারের দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ২ হাজার  থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা (বছরের শুরুতে ভালোই ছিল কিন্তু বছরের শেষের দিকে পতনের প্রবণতা দেখা গেল)। আস্থাহীনতা ও তারল্যসংকটের প্রভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১.৩ অংশে নেমে ৬০০-৮০০ কোটি টাকায় চলে আসে। পরবর্তী অর্থবছরে (২০২৩-২৪) দীর্ঘমেয়াদি মন্দাভাব ও বিনিয়োগকারী সংকটের কারণে আরও হ্রাস পেয়ে ওই অর্থ ৫০০-৭০০ কোটি টাকায় নেমে আসে; যা ২০২০-২১ সালের তুলনায় মোটামুটি ১.৪ অংশ।

বিভিন্ন সময়ের গড়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাজারে স্থবিরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৈনিক লেনদেনের গড় ৪০০-৬০০ কোটি টাকায় নেমে আসে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (CDBL) তথ্যানুযায়ী, বিও (Beneficiary Owner) হিসাব খোলার প্রবণতা পুঁজিবাজারে ২০২১ জুন থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২৮-৩০ লাখ থেকে ৩৭-৩৮ লাখে পৌঁছায়। তবে এ ক্ষেত্রে একটি কথা এড়িয়ে যাওয়া যথার্থ হবে না যে, উল্লিখিত বিও হিসাবধারীরা সব সময় কর্মদিবসে কতটা Active থেকে শেয়ার বেচাকেনায় ভূমিকা রাখছেন, সেটাও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার বিষয়।

এ ক্ষেত্রে আমরা মামুন রশীদের (অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সেলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান) উক্তি–‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্বলতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রতীক হলো ২০২৫ সালে বছরজুড়ে একটি নতুন আইপিও না আসা। এটা নিছক বাজার মন্দা নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকেত। আইপিও মানে শুধু শেয়ার নয়, এর অর্থ নতুন উদ্যোক্তা, নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। যখন একটি অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় নতুন আইপিও বন্ধ থাকে, তখন তা বোঝায় যে, উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারকে আর কার্যকর মূলধন সংগ্রহের প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করছেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর। অর্থাৎ আইপিও-সংকট আসলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক গতিশীলতার সংকট’। বিষয়টি বিশেষভাবে প্রবিধানযোগ্য।

আমরা এ পর্যায়ে যদি বিগত পাঁচ বছরের পুঁজিবাজারের প্রধান সমস্যাগুলো মোটাদাগে চিহ্নিত করি তাহলে দেখতে পাব যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লোকসান এবং বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সূচকের পতন। যদি ধরে ধরে কথা বলি তাহলে এভাবে বলা যায় যে, অনেক কিছু উপেক্ষা না করেই বলা যায়, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ অতীতে শুধু ব্যর্থই হয়নি বরং যে কথা নিকট অতীতে বলেছি, কুশপুত্তলিকা দাহভিত্তিক প্রশাসন ও শেয়ারের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধিতে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। 
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লোকসান তো শুধু শেয়ারবাজারের মধ্যেই থাকে না বরং তার বিস্তৃতি অনেক দূরে।  ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সীমিত নিজস্ব অর্থ, ভাইবোন ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া অর্থই তার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে এবং যখন শেয়ারবাজার মন্দা অবস্থায় পড়ে যায় তখন তো তারা অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়!
রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান কেন জানি পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে। এটা পুঁজিবাজারের জন্য আদৌ ভালো নয়। শুধু সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠানই নয়, বেসরকারি বড় বড় লাভজনক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তাদের শেয়ার নিয়ে আসছে না।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেট-ভিত্তিক লেনদেনের অভিযোগ আছে। প্রসঙ্গত, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জাতীয় সংসদে দেওয়া একটি বক্তব্য মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘পুঁজিবাজারে সংগঠিত লুটপাটের বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছেন এবং অভিযুক্ত রাঘববোয়ালরা তার আশপাশেই আছেন।’ তার এমন বক্তব্যে বুঝতে আর অসুবিধা হয় না যে, রাজনৈতিক এবং ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়াবিহীন সিন্ডিকেট পরিচালনা করা অসম্ভব। সাংবাদিক মুন্নী সাহার একটি উক্তি স্মরণে এসে যায়–‘আপনি কি সেই দরবেশ...’।

তারল্যসংকট পুঁজিবাজারে সংকট সৃষ্টিতে আর একটি বাধা। এজন্য ব্যাংকিং খাতে বজায় থাকে উচ্চ সুদের হার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমে যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ হ্রাস পায়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রায়শই ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তনসহ ফ্লোর প্রাইস আরোপ ও প্রত্যাহার বিষয়গুলোও পুঁজিবাজারের জন্য মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে।

দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও অতি মূল্যায়নের বিষয়টি পুঁজিবাজারের শেয়ার ব্যবসার মূলে আঘাত করে। যে অভিঘাতে বিনিয়োগকারীদের রাতারাতি পথে বসতে হয়।

পুঁজিবাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাজারে রয়েছে গভীরতার অভাব। ডলারসংকট ও মুদ্রাবিনিময় ঝুঁকি তো এ খাতকে মনে হয় স্থায়ীভাবে ঘ্রাস করে বসে আছে। উল্লিখিত কারণে বিদেশি বিনিয়োগও কমে যায়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বিষয়ে প্রবন্ধে আমার নিজের একটু অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যথার্থ বলে মনে করছি। ২০০৭ সালে মশিহর সিকিউরিটি কোম্পানির (তখনকার সময়ের টপ টেনের একটি সংশ্লিষ্ট হাউস) অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে বেশ কিছু দিন কাজ করেছি। কর্মকালীন বাস্তব অভিজ্ঞতা এ কথা বলে যে, একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারের শেয়ার ব্যবসা বিষয়ে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাবিহীন এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে এবং হুজুগে নিজে না বুঝেই শেয়ার বেচাকেনা করে। মূলত, হুজুগটা যারা ছড়ায় তারাই সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি এবং অভিজ্ঞতাহীন বিনিয়োগকারীরা যথাযথ অভিজ্ঞতার অভাবে প্রায়শই ঝুঁকিতে পড়ে এবং একসময় বিনিয়োগের অর্থ হারিয়ে নামে রাজপথে বিক্ষোভে!

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার গতিময়তা বাড়াতে হবে এসএমই প্লাটফর্ম চালু করা, ডিজিটাল ট্রেডিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা, করপোরেট ব্যবসায় সুশাসন বিধিমালা শক্তিশালী করাসহ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিও হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি, বন্ড মার্কেট উন্নয়নের প্রচেষ্টা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যারা জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে তাদের পুঁজিবাজারের ব্যবসায় সম্পৃক্ত করাসহ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারব্যবস্থা বিষয়ে প্রতিটি ব্রোকার হাউসে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। পরিশেষে বলব, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা ছাড়া জাতীয় অর্থনীতিতে রক্ত প্রবাহের গতি বেগবান করা অসম্ভব এবং স্থিতিশীলতা আনয়নও অসম্ভব।

লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) ও কোষাধ্যক্ষ
প্রাইম ইউনিভার্সিটি, অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট

পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি
ইকবাল হাবিব

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মনুষ্যসৃষ্ট ঝুঁকিও বাড়ছে। অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ, জোনিং বিধি লঙ্ঘন, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমনব্যবস্থার ঘাটতির কারণে অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও তদারকির অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নগরকে অনিরাপদ করে তুলছে।...

বিকেন্দ্রীকৃত নগরায়ণ নিশ্চিতে, আগামীর লক্ষ্য হওয়া উচিত জেলা ও উপজেলা শহরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলে সেবার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। এ জন্য নগরায়ণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, স্থল, বিমান ও সমুদ্রবন্দরভিত্তিক সংযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় ‘হাব-অ্যান্ড-স্পোক’ মডেলে জেলা শহরগুলোকে আঞ্চলিককেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে গণপরিবহনের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত করা গেলে রাজধানীমুখী চাপ কমবে এবং দেশজুড়ে উন্নয়নের ভারসাম্য তৈরি হবে।

বাংলাদেশের নগরসংকট কোনো একক শহরের সমস্যা নয়; দীর্ঘদিনের বৈষম্যপূর্ণ উন্নয়ন কাঠামোর ফল। শিল্প, কর্মসংস্থান ও সেবার কেন্দ্রীকরণের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে বড় শহরমুখী হচ্ছে, ফলে নগরগুলো অতিরিক্ত চাপে পড়ছে এবং জেলা ও উপজেলা শহরগুলো তাদের সম্ভাবনা হারাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ঢাকা। যেখানে দেশের মাত্র ১ শতাংশ ভূমিতে প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ বসবাস করে এবং জাতীয় জিডিপির এক-তৃতীয়াংশের বেশি উৎপন্ন হয়। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু চাপের প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট, কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া নগরসংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের শহরগুলোয় যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা ও গণপরিবহনে পথচারীবান্ধব পরিকল্পনার অভাব। নগরের সড়কগুলোতে ফুটপাত, সাইকেল লেন ও কার্যকর গণপরিবহন উপেক্ষিত থাকা। ঢাকায় এর চরম উদাহরণ দেখা যায়। মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের ৭৭ শতাংশ দখল করে আছে, অথচ ৮৫ শতাংশ মানুষ হাঁটা, রিকশা ও গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। শহরের অধিকাংশ যাতায়াত হেঁটে হলেও উপযোগী ফুটপাতের অভাব স্পষ্ট করে যে, বর্তমান পরিবহননীতি টেকসই নয়।

গণপরিবহন ও পথচারীবান্ধব নগরী গড়ে তুলতে, স্থায়িত্বশীল নগরায়ণের ভিত্তি হিসেবে গণপরিবহন, হাঁটা ও সাইকেলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমাতে না পারলে যানজট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বিধায় বড় সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির লেন সীমিত রেখে গণপরিবহনের জন্য অধিকাংশ লেন নির্ধারণ করে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। বাস মালিকদের সিন্ডিকেট ভেঙে যৌক্তিক ভাড়ায় সব রুটে নগরের বাসব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় কার্যকর চলাচল নিশ্চিত করতে হবে; একই সঙ্গে সরকারি খাতেও দক্ষভাবে পর্যাপ্ত বাস পরিচালনার ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, ফুটপাত দখল ও অসংগতিপূর্ণ ব্যবহার বন্ধ করে সেগুলোকে পথচারীবান্ধব করতে হবে এবং আলাদা সাইকেল লেন ও কর রেয়াতের মাধ্যমে সাইকেলকে সহজলভ্য করে তুলতে হবে। সর্বোপরি, যাতায়াত ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করে নির্বিচার অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে সুচিন্তিত নীতি ও তার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই নগরের পরিবহন সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।

জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকি এখন নগরের নিত্য বাস্তবতা, যার প্রধান কারণ খাল, জলাশয় ও সবুজ এলাকার দখল ও ধ্বংস। ফলে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ও তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। একটি বাসযোগ্য নগরীতে কমপক্ষে ১২ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান ও ১৫ শতাংশ সবুজ আচ্ছাদন থাকা প্রয়োজন। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য প্রধান প্রধান নগরীর প্রণীত মহাপরিকল্পনায় ‘উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, খেলার মাঠ’ এবং ‘ব্লু ও গ্রিন নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুপস্থিত। একই সঙ্গে পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জলাশয় ভরাট ও বর্জ্য পানি প্রবেশ বন্ধের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ঢাল অনুযায়ী পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। খেলার মাঠ ও পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ, ভূমিতথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সরকারি সংস্থাও নাগরিকদের অভিভাবকত্বে জবাবদিহিমূলক শাসন কাঠামোর মাধ্যমে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরজীবনের ভিত্তি তৈরিতে কার্যকর ও টেকসই ‘ব্লু ও গ্রিন নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা সম্ভব।

নগরে বায়ু ও শব্দদূষণ বর্তমানে ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার বর্জ্য নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা ও ইটভাটার কারণে বিশেষ করে শীতকালে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বায়ুর মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত হর্ন, নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানার শব্দে শহরের মানুষ ক্রমাগত শব্দচাপে রয়েছে। এর ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাসের পাশাপাশি মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ছে এবং শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে।

নগরে বায়ু ও শব্দদূষণ হ্রাসে করণীয়, বায়ু ও শব্দদূষণ কমাতে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। নগরের আশপাশের বেআইনি ইটভাটা দ্রুত বন্ধ করে অনুমোদিত ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও মানসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহারে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি উন্নত ও কম দূষণকারী ইট ব্যবহারে উৎসাহ দিতে উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ ও কর রেয়াত দিতে হবে। ধোঁয়া নির্গতকারী যানবাহনের ফিটনেস নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং প্লাস্টিকবর্জ্য থেকে বায়ুদূষণ ও মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ানো রোধমূলক বর্জ্যব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মনুষ্যসৃষ্ট ঝুঁকিও বাড়ছে। অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ, জোনিং বিধি লঙ্ঘন, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমনব্যবস্থার ঘাটতির কারণে অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও তদারকির অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নগরকে অনিরাপদ করে তুলছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও সবুজ জলাশয় ধ্বংস যুক্ত হয়ে নগরের তাপদাহ তীব্রতর করছে। গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় গড়ে প্রায় সাড়ে ৩ ডিগ্রি বেশি, যা হিট আইল্যান্ড প্রভাবের স্পষ্ট উদাহরণ।

নগরকে ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ও তাপদাহের মতো বহুমাত্রিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষিত করতে, দুর্যোগ মোকাবিলায় ঝুঁকি নিরূপণভিত্তিক সামঞ্জস্যপূর্ণ আপদকালীন পরিকল্পনা (কন্টিনজেন্সি), বিদ্যমান ভবনের ভূমিকম্প সহিষ্ণুতা জরিপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দ্রুত সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি। ভূমি ব্যবহার ও জোনিং বিধি কঠোরভাবে মানা, বহু মন্ত্রণালয়ভিত্তিক টাস্কফোর্স গঠন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ, বার্ষিক ভবন ব্যবহারযোগ্যতা সনদ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স শক্তিশালীকরণ, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলা এবং সচেতনতা ও প্রস্তুতি বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে তাপদাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় নগরবন সৃষ্টি, দেশজ বৃক্ষরোপণ, কাচনির্ভর ভবনসংস্কৃতি পরিহার এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত নগর সবুজায়ন নীতিমালা বাস্তবায়নের মধ্যদিয়েই একটি নিরাপদ, সহনশীল ও মানবিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব।

পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার–এ তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ অর্জন করতে হয়। বাংলাদেশে অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং অনেকাংশে অপরিকল্পিত ও অসম নগরায়ণের ফলে নগর অভিঘাতগুলো বৃহৎ আকার ধারণ করছে। এ বাস্তবতায় স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ ও সুষ্ঠু নগরব্যবস্থাপনা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তাই স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ ও সুষ্ঠু নগরব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে, জাতীয় ও নগর–দুই পর্যায়েই কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আগামীর নগরায়ণে, জাতীয় পর্যায়ে কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি আলাদা বিভাগ গঠন জরুরি। নগর পর্যায়ে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে ডেভেলপার নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করতে হবে এবং নগর পরিচালনায় পেশাজীবী, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নগর সুব্যবস্থাপনায় এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে, ‘উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময় বা ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর)’ এবং ‘ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন বা ব্লক ডেভেলপমেন্ট’–এ দুটি ধারণাকে উপাদান হিসেবে শহরের পুনঃউন্নয়নকল্পে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। জমির মালিকার অধিকার থেকে উন্নয়ন করার অধিকার, স্থানান্তর বা বিক্রির ব্যবস্থা। কৃষিজমি, জলাধার বা সংরক্ষিত এলাকায় উন্নয়ন সীমিত থাকলে মালিকরা তাদের অব্যবহৃত এফএআর অন্য এলাকার ডেভেলপারের কাছে বিক্রি করতে পারেন। এতে সংবেদনশীল এলাকা সুরক্ষিত থাকে, মালিক আর্থিক ক্ষতি এড়ায় এবং নির্ধারিত এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব হয়।

নগরায়ণ মানেই কেবল ভবন ও রাস্তা নয়–এটি একটি গভীর সামাজিক প্রক্রিয়া, যা মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ বাংলাদেশকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ ও অমানবিক শহরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুষম বিকেন্দ্রীকরণ, গণপরিবহননির্ভর চলাচল, সাশ্রয়ী আবাসন, জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর বর্জ্যব্যবস্থাপনা ও সবুজ নগর গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। সঠিক নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে একটি নিরাপদ, মানবিক ও স্থায়িত্বশীল নগর ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।

লেখক: পরিবেশকর্মী ও নগরবিদ