দেশের সাতটি জেলায় অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৬ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। বন্যায় ৫৯টি উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাকবলিত ৭টি জেলায় ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দেশের সাত জেলায় ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে ১০ হাজার ৮৫৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ৩১ জনের প্রাণহানি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবারের বন্যায় কক্সবাজার জেলায় সর্বোচ্চ ৩১ জনের প্রাণ গেছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছেন। এ জেলায় গতকাল পর্যন্ত ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা ও ৩৭৬ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রামে ১৫ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জন মারা গেছেন।
খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলায় ৩৮টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ জেলায় ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ৩০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। রাঙামাটির ৯টি উপজেলায় ৪৩টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জেলায় ৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। এই জেলায় ২০ লাখ টাকা ও ২৯৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জেলায় ৬ জন মারা গেছেন। এ জেলায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ২৩০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলায় ১২২টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে ১৫ জন মারা গেছেন। জেলায় ৭০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। মৌলভীবাজারের ৩টি উপজেলায় ২১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ক্ষতি হয়েছে। এখানে একজন মারা গেছেন। জেলায় ৫ লাখ টাকা ও ১১০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। হবিগঞ্জের ৩টি উপজেলায় ৫টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই জেলায় ২ লাখ টাকা ও ৩০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
‘বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজার’
এবারের বন্যায় কক্সবাজার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। গতকাল সচিবালয়ে পিআইডি সম্মেলন কক্ষে বন্যাজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা, জরুরি সাড়াদান ও সমন্বয় বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা শেষে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান।
জানমাল সুরক্ষা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলবে
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম এলাকাগুলো থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর যৌথ তৎপরতা চলছে। ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন চট্টগ্রাম, হাটহাজারী ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিস্থিতি সার্বিক পর্যবেক্ষণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে একটি কন্ট্রোল রুম (নিয়ন্ত্রণ কক্ষ) খুলেছে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি নিবিড় মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে
চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী, মুহুরী, গোমতী ও সেলোনিয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি হ্রাস পাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে। গতকাল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এই তথ্য জানিয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদ-নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় হ্রাস পেয়েছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টা স্থিতিশীল থেকে পরবর্তী সময়ে হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই অঞ্চলে যাদুকাটা, ভুগাই-কংস ও সারিগোয়াইন নদীর পানিও হ্রাস পেয়েছে। তবে সোমেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই আগামী ৪৮ ঘণ্টায় নেত্রকোনা জেলায় বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারী, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার নদ-নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে চারটি নদীর পাঁচটি স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর ডালিয়া (নীলফামারী) স্টেশন, সুরমা নদীর ছাতক (সুনামগঞ্জ) স্টেশন, কুশিয়ারা নদীর মার্কুলি (সুনামগঞ্জ) ও ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) স্টেশন এবং সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া তিস্তা নদীর ডালিয়া স্টেশন এবং কপোতাক্ষ নদের ঝিকরগাছা (যশোর) স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে।
উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় তিস্তা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে রংপুর জেলায় তিস্তা নদীর কাউনিয়া স্টেশনে পানি সাময়িকভাবে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলায় নদ-নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা স্পর্শ করতে পারে। এ ছাড়া রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের টাঙ্গন, পুনর্ভবা, ঘাঘট, আত্রাই, আপার আত্রাই, মহানন্দা, যমুনেশ্বরী, আপার করতোয়া ও করতোয়া নদীর পানি আগামী তিন দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
ঢাকা বিভাগের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও টঙ্গীখাল এবং রাজশাহী বিভাগের আত্রাই, মহানন্দা, যমুনা ও করতোয়া নদীর পানিও আগামী তিন দিন বৃদ্ধি পেতে পারে।