গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর আলোচিত হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে অর্থ পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। সুউচ্চ রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ প্রকাশ করে সম্প্রতি তিনি আলোচিত হয়েছেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট হরিদাসকে গ্রেপ্তারের পর সোমবার (১৩ জুলাই) রিমান্ডে নিয়েছে।
এর আগে হরিদাসের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার ‘মানি লন্ডারিং’-এর অভিযোগ এনে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করে। সেই মামলায় গত রবিবার দিনগত রাতে গাইবান্ধা থেকে সিআইডির একটি দল হরিদাসকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় আনে। পরে গতকাল হরিদাস চন্দ্রকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ডের আবেদন জানান। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কবীর হোসেন।
হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পুরোনো শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ কালীমন্দির চত্বরে ৮১ ফুট উচ্চতার একটি রামমূতি নির্মাণের উদ্যোক্তা হিসেবে আলোচনায় আসেন। এ ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা কর্মসূচি ও আন্দোলন হয়েছে।
হরিদাসের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা ও গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি, বদলি, হুন্ডি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিষয়ে অভিযোগ থাকায় সিআইডি প্রাথমিক অনুসন্ধান করে।
অনুসন্ধানকালে জানা যায়, তার বৈধ কোনো আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও তার বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসাবে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে এবং তিনি প্রায় সমপরিমাণ টাকা উত্তোলন করেছেন, যা সন্দেহজনক। তার ব্যাংক হিসাবগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করা হয়েছে, যা তার পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় উত্তরা পশ্চিম থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে। তার সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সিআইডি সদর দপ্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, হরিদাসের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে বনানী থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ একাধিক ধারায় মামলার তথ্য পাওয়া যায়।
এতে আরও বলা হয়েছে, হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানার মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের গোপীনাথ তরণী দাসের ছেলে। তিনি ২০০৬ সালে পলাশবাড়ীর হাসবাড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০০৮ সালে ঢাকা ক্যামব্রিয়ান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০১০ সালে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে দেশে ফেরেন।
সিআইডির দাবি, ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তৌহিদ ইসলাম নাম ধারণ করেন হরিদাস। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন সময়ে নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার পরিচয় দিতেন এবং বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিজের এডিট করা ছবি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে ‘সেভ’ করা ভুয়া ফোন কল প্রদর্শন করতেন।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নিন্দা-প্রতিবাদ
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ গতকাল এক প্রতিবাদ বিবৃতিতে বলেছে, বেশ কিছুদিন ধরে উগ্র সাম্প্রদায়িক মহল মূর্তি নির্মাণের বিরোধিতা করে এসেছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে, দেশজুড়ে অহেতুক ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। সেখানে সাম্প্রদায়িক হুমকির শিকার হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক ও অগ্রহণযোগ্য এবং তা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের নির্লজ্জতম পরিপন্থি। ঐক্য পরিষদ অনতিবিলম্বে হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসের আশু মুক্তির দাবি জানিয়েছে।