স্কুল-কলেজ, আবাসিক ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা উত্তরা। সামনেই ঢাকা-ময়মনসিংহ প্রধান সড়ক এবং সার্ভিস রোড। ঢাকা-ময়মনসিংহ প্রধান এই সড়কের সার্ভিস রোডটি প্রায় দুই বছর ধরে রয়েছে বেহাল অবস্থায়। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
সার্ভিস রোডটি ভাঙা, বড় গর্ত, বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেম, রাস্তার পানি বের না হতে পারায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও যানবাহন চালকদের।
রাস্তাটি অসমান আর বড় গর্ত থাকার কারণে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। ময়লা-আবর্জনা আর জলাবদ্ধতার জন্য ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ; যা পরিণত হচ্ছে ডেঙ্গু মশার আবাসস্থলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু দায়সারা কাজ করছে সিটি করপোরেশন।
সরেজমিনে উত্তরা রাজলক্ষ্মী এলাকার ঢাকা-ময়মনসিংহ প্রধান সড়কের সার্ভিস রোডটিতে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তাটি ভাঙা আর খানাখন্দ থাকায় মালামাল বহনকারী ভ্যান, রিকশা, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার- কোনো যানবাহনই রাস্তাটি ব্যবহার করতে পারছে না। বৃষ্টি হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পরেও রাস্তায় জমে রয়েছে পানি।
জানা যায়, সিটি করপোরেশনের লোকেরা এসে রাস্তার ময়লাগুলো নিয়ে যায়, তবে সড়কটি ঠিক করার কোনো উদ্যোগ নেয় না।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাস্তাটি নিচু হওয়ায় সড়কের পানি ড্রেনে নামতে পারে না। উল্টো ড্রেনের নোংরা পানি রাস্তায় জমা হয়।
হিমেল বঙ্গবাজারের কাপড় ব্যবসায়ী মো. কাসেম বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে রাস্তাটি বেহাল অবস্থায়। প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। সড়কটি ঠিক না করায় প্রায় দুই বছর ধরে এখানের ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। রাস্তা ঠিক থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের এত ক্ষতি হতো না। কিছুদিন পর পর ড্রেন পরিষ্কার করলে ড্রেনের আবর্জনা ও ময়লা পানি রাস্তায় নামে। এতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে কুশল সেন্টার, হিমেল বঙ্গবাজার, বেলি কমপ্লেক্সে গড়ে ওঠা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
বেলি কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী মো. জীবন বলেন, এই সার্ভিস রোড দিয়ে কোনো মালামালের গাড়ি আসতে পারে না। সামনে গিয়ে আবার উল্টো পথে আসতে হয়। এজন্য অনেক সময় পুলিশ ধরে মামলা দেয়। তাই সামনে গাড়ি রেখে আলাদা মজুরি দিয়ে মালামাল আনতে হয়।
তিনি বলেন, এ ছাড়া রাস্তায় পানি জমলে দুর্গন্ধ ছড়ায়, ক্রেতা আসতে চায় না। দুর্গন্ধের কারণে ফুটপাত দিয়ে সাধারণ জনগণও ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। সার্ভিস রোড থেকে মানুষ যাতে ফুটপাতে উঠতে পারে, এজন্য কয়েকজন ব্যবসায়ীর উদ্যোগে ইটের খোয়া, বালি দিয়ে সরু আইল তৈরি করেছি।
সার্ভিস রোডটি ঠিক করতে সিটি করপোরেশন থেকে কোনো উদ্যোগ বা কোনো লোক এসে পর্যালোচনা করে কি না, জানতে চাইলে বেইলি কমপ্লেক্সের গার্ড মো. আবদুল মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টিতে রাস্তাটিতে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে। সিটি করপোরেশনের লোকেরা এসে দেখে গেছে অনেকবার। রাস্তা ঠিক না করে ইট দিয়ে গর্ত ভরাট করেছে, বুলডোজার দিয়ে সমান করেছে। এতে রাস্তা আরও নিচু হয়ে গেছে। রাস্তাটি করার সময় অল্প এই রাস্তার কাজ করেনি।’
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চললেও স্থানীয় মানুষদের ব্যবহারের জন্য সার্ভিস রোডগুলো যে কতটা জরুরি, তা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনো আলোচনা বা গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে না। অথচ সামান্য সদিচ্ছা এবং বড় কোনো বাড়তি বিনিয়োগ ছাড়াই এই সড়কগুলোকে পুনরায় কার্যকর করা সম্ভব। সড়ক নির্মাণ বা উন্নয়ন-সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালাতেই স্পষ্ট বলা আছে প্রকল্পের কাজ যাই হোক না কেন, কাজ শেষে রাস্তাটিকে পূর্বের সচল অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু উত্তরার সার্ভিস রোডের ক্ষেত্রে এই নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না, যা কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির প্রমাণ। অবশ্যই কর্তৃপক্ষকে এর জবাব দেওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘১০-১২ বছর আগেও ঢাকার উত্তরার সার্ভিস রোডগুলো ছিল পুরো শহরের মধ্যে অন্যতম সেরা এবং আদর্শ উদাহরণ। এই সড়কগুলো অত্যন্ত কার্যকর ছিল এবং স্থানীয় যোগাযোগের প্রাণ হিসেবে কাজ করত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিআরটি প্রজেক্টসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে উত্তরার পুরো সড়ক ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে এই সার্ভিস রোডগুলোর দিকে কর্তৃপক্ষের কোনো নজর নেই। সার্ভিস রোডের নিরবচ্ছিন্নতা এবং কার্যকারিতা কোন পর্যায়ে থাকা প্রয়োজন, সেই মৌলিক কাজটা কর্তৃপক্ষ করতে ব্যর্থ হলে এ শহরের ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম ঠিক রাখা সম্ভব হবে না।’
অমিয়/