জনসংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়াও মানুষের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সে জিনিসপত্র ভোগ করছে আগের চেয়ে বেশি এবং ফেলে দিচ্ছে অল্প ব্যবহারের পরই। এতে বর্জ্য ফেলার স্থান কমে গিয়ে তার একটি অংশ স্তূপকৃত হচ্ছে রাস্তায় ও খোলা স্থানে। একটি অংশ পড়ছে পয়ঃপ্রণালির ভেতর। এগুলো সবই তরল নয় যে, জলীয় অংশের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। শক্ত, আঠালো অংশ ও মৃত্তিকা স্থবির থেকে পয়ঃপ্রণালির আয়তন দিন দিন সংকুচিত করছে।...

একই বিষয় বারবার বলাকে পুনরুক্তি বলে। পুনরুক্তি করলে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য হারায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ যদি বারবার ঘটে তাহলে পুনরুক্তি না করে উপায় নেই। এতে বোঝা যায় পুনরুক্ত বিষয় বা ঘটনাবলি হয় গুরুত্বপূর্ণ নয় অথবা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোর সমাধান করা হয়নি। এর আবার দুটি দিক থাকতে পারে। এক. অবহেলাজনিত কারণে সমাধান হয়নি, দুই. সমাধানের সামর্থ্য নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে। ষড়ঋতুর এই দেশে শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে বারিপাত তথা ‘বরিষধারা মাঝে শান্তির বারি’র আগমনকে অবধারিত হিসেবে ধরে তার প্রস্তুতি ও প্রাক-প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। গত বছর বা আরও ২০ বছর আগে এমনি ডম্বরু দিনের কথা যদি মনে করি তাহলে দেখতে পাব সারা দেশের প্রায় সর্বত্র বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা শহরে তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে এসেছে জলাবদ্ধতা। তা মৌসুমি বৃষ্টির একাদিক্রমের কারণে নয়, আধা বা এক ঘণ্টার হঠাৎ বারিপাতজনিত কারণে। তার মানে এমন ঘটনার স্বাভাবিকতা আমাদের রোজনামচার বিষয়। আধ ঘণ্টা বা ৪০ মিনিটের ৫০ মিমি বৃষ্টিতে শহরের নিম্নাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এবারও হয়েছে।
প্রথমে পয়ঃপ্রণালির পানি ফুটপাথে, তার পর সুয়ারেজের পানি পথচারীর পায়ের পাতা ছাপিয়ে জুতা পার হয়ে হাঁটু অবধি উঠে আসছে। এর মধ্যে বৃষ্টির স্থায়িত্ব বেশি হলে পানি রওনা দিচ্ছে দোকানের নিচতলার ওপরে। তৈজসপত্র, জেনারেটর, গদি ভিজে নষ্ট হচ্ছে। আর রাস্তায় যানবাহন নাকসমান পানিতে ডুবসাঁতার দিয়ে চলছে। কারণ পানি নামতে পারছে না। কেন? মাদানি সাহেব শহরের যে জনসংখ্যা ও তার ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি হিসাব করে পয়ঃপ্রণালি বানিয়ে ছিলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তার চেয়ে ১২ গুণ। লভ্য খালি জমিতে পরবর্তী সরকারগুলো সাধ্যমতো পয়ঃপ্রণালি সম্প্রসারিত করেছে কিন্তু ৩৬৫ লাখ মানুষের ময়লা ফেলা ও তা জলাশয়ে ধাবিত করার চাহিদার চেয়ে তা অনেক কম। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়াও মানুষের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সে জিনিসপত্র ভোগ করছে আগের চেয়ে বেশি এবং ফেলে দিচ্ছে অল্প ব্যবহারের পরই। এতে বর্জ্য ফেলার স্থান কমে গিয়ে তার একটি অংশ স্তূপকৃত হচ্ছে রাস্তায় ও খোলা স্থানে। একটি অংশ পড়ছে পয়ঃপ্রণালির ভেতর। এগুলো সবই তরল নয় যে, জলীয় অংশের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। শক্ত, আঠালো অংশ ও মৃত্তিকা স্থবির থেকে পয়ঃপ্রণালির আয়তন দিন দিন সংকুচিত করছে।
পলিথিন, প্লাস্টিক, রাবার, চামচ, কাঁটা চামচ, জুতা, জায়নামাজ, খাবার প্লেট, কলম, পাইপ, ফাইল কভার, রেইনকোট, রিকশার কভার, লাখ লাখ রিকশাভ্যান ও ট্রাকের পলিথিন কভার, সেমিনারের ব্যানার, সোফা, গার্মেন্টের কভার, গাড়ির চাকা, কাচ, মেডিকেল বর্জ্য, বিয়ে বাড়ির বর্জ্য ইত্যাদির অধিকাংশই অনুপযোগী হওয়ার পর রাস্তায়, খোলা স্থানে ও শেষে ড্রেনে স্থান পাচ্ছে। কারণ এর সামান্য অংশই রিসাইকেল করা সম্ভব এবং নির্ধারিত বিনে ময়লা ফেলার পর উদ্বৃত্ত ময়লা সমস্যার সৃষ্টি করছে। কারণ সর্বোচ্চ বহন আয়তনের চেয়ে সাত গুণ বেশি মানুষ বহন করার ফলে তার উৎপাদিত নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা স্তূপ পানিকে আর ড্রেনে ঢুকতে দিতে পারছে না। তা উঠে আসছে পানির প্লাবতাতত্ত্ব অনুসরণ করে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, ঊর্ধ্ব দিকে; কিন্তু অধঃতে নয়। গতকাল বৃষ্টিতে সে দৃশ্যের পুনর্মঞ্চায়ন দেখেছে নগরবাসী। দোতালা সড়ক থেকে যানবাহন এসে নামছে নাকডোবা খালে। তার পর সাইলেন্সারে পানি ঢুকে দুর্বল গাড়ি অচল হচ্ছে। চিটাগাং শহরেও একই দৃশ্য ও কার্যকারণ। বিশ্লেষণ করে উপকার হবে না।
চাকতাই খাল খনন শেষ হলে উন্নতি হবে, এটা একান্তই অবাস্তব ধারণা। মূল কথা পানি সরবারহ স্থান কম, আবর্জনা বেশি, কারণ মানুষ বেশি। সব নির্মাণকাজ বন্ধ করতে হবে, তাহলেই সমস্যা লঘু হতে পার। পয়ঃপ্রণালির ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমানো ছাড়া কখনোই জলাবদ্ধতা কমবে না। অপ্রাসঙ্গিক হবে না, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করি। ঘটনাটি গতকালের। সরকারপ্রধান উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে এক ছাত্রী স্রোতবিরোধী আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ঢাকা মেডিকেলে একটি করে গ্রুপে ৩০ জন ছাত্রছাত্রীর ভিড়ে কিছু বিষয় শেখানো হয়। এই ভিড়ে এগুলো ঠিকভাবে শেখা সম্ভব নয়। আপনি এই মেডিকেলের আসন সংখ্যা কমানোর পদক্ষেপ নিন।’
সারা দেশে প্রাইমারি স্কুলকে মাধ্যমিক, মাধ্যমিককে হাই স্কুল, কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়, আসনসংখ্যা বৃদ্ধির তথা মনোনয়নের (নোয়াখালী বিভাগ চাই) দাবির এই সমুদ্র স্রোতের মধ্যে এমন দাবি কেন এল? নিজের স্বার্থের অসুবিধা হচ্ছে বলেই। জনচাপে কোথাও আরাম নেই, স্বস্তি নেই। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির এই লগ্নে গণবিরোধী এক্সক্লুসিভ রাজনীতির দাবি ওই ছাত্রী করেছেন। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি লেক ও উত্তরায়ও তেমনি পানি উঠেছে। বৃষ্টি হলে আবার তা হবে। এটা না চাইলে বা কমাতে চাইলে বসবাসকারীর সংখ্যা কমাতে হবে, যেমন ভালো চিকিৎসক চাইলে শিক্ষার্থী আসনসংখ্যা কমাতে হবে। ১ লাখ ঘনমিটারের চৌবাচ্চায় ২ লাখ ঘনমিটার পানি রাখার সুযোগ নেই। আমরা সেই চেষ্টা করছি। স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার, করপোরেশন–কেউ কোনো কাজ বোঝেন না, বুঝি শুধু আমরা–এটা ঠিক না। তারা বরাবরই জলাবদ্ধতা দূরীকরণে যথেষ্ট করছেন।
পানিতে অর্ধেক ডুবে যাওয়া ছোট ব্যবসায়ীর ৫ লাখ টাকা ক্ষতি, রিকশাচালকের ৩০০ টাকা ক্ষতি, মজুরের সম্পূর্ণ আয় বন্ধ, যাত্রীদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচের কষ্ট বোধগম্য কিন্তু ৩৩০০ বছর ধরে টিকে থাকা থিওরি–ত্রিভুজের যেকোনো দুই বাহুর সমষ্টি তৃতীয় বাহুর চেয়ে বেশি হবে–এক অমোঘ, অকাট্য, অপরিহার্য সত্যি। তাই, ‘সরকার একটা কিছু কইরা দেক, অনেক কথা শুনছি কিন্তু এই পানির সমস্যাটা যায় নাই, ড্রেন কাইটা দিক’ ধরনের আবেদনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা ও তজ্জনিত সমস্যা ও ক্ষয় দূর হবে না। কারণ, কারিগরিভাবে বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান নেই। মানুষ যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলে–কথাটা অন্যায়। সত্যি হচ্ছে, আবর্জনা ফেলার পর্যাপ্ত স্থান নেই।
রাজারবাগ মোড়ে একবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা এবং আবার সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা গৃহস্থালি আবর্জনা যেভাবে সংগৃহীত হচ্ছে তা প্রশংসার কারণ। এর চেয়ে শ্রেয় কিছু করা অবাস্তব। ওই সময়ের অসাধারণ সুগন্ধ গবাদিপশু সুলভ। এর মধ্যদিয়েই যেতে হয়। ১৯৯০ সালে এ অবস্থা ছিল না। পরিবেশ সচেতন হোন, যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলেবেন না তখন বলতে হতো না। কারণ অধিবাসী সংখ্যা এমন ছিল যে, আবর্জনা নিঃশব্দে, গোপনীয়তা ও শিল্পের সঙ্গে যথাস্থানে চলে যেত। যথেষ্ট স্থান ছিল। ওয়াশিং ডার্টি লিনেন ইন দ্য পাবলিক-এর মতো কাজ করার দরকার হতো না। জলাবদ্ধতাও হতো না। কনসালট্যান্টের পেছনে অর্থ অপচয় করতে হতো না। সে অবস্থায় ফেরা সম্ভব। অধিবাসীর সংখ্যা কমান। ঢামেকের আসনসংখ্যা কমানোর আবেদন আরামে পড়াশোনার জন্য। জলাবদ্ধতা কমানোর জন্য অধিবাসী তথা আবর্জনা উৎপাদকের সংখ্যা কমানো সমীচীন।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]

