বিশ্বকাপ এলেই আমাদের পাড়ার বাতাসে এক অদ্ভুত জীবাণু ভেসে বেড়ায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো বইয়ে তার নাম নেই, কিন্তু লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট। যে মানুষটি সারা বছর ফুটবলকে গোলাকার বলের বেশি কিছু মনে করেন না, তিনিও হঠাৎ এমন ভঙ্গিতে খেলার ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন, যেন ফুটবল দেবতা অবসরে যাওয়ার আগে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে তাকেই মনোনীত করে গেছেন।
আমাদের পাড়ার হাশেম সাহেব এই বিরল প্রতিভার অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিনিধি। বিশ্বকাপ শুরু হলেই তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে যায়। মনে হয়, তিনি চায়ের দোকানে যাচ্ছেন না; আন্তর্জাতিক ফুটবলের ভাগ্যরেখা সংশোধন করতে বেরিয়েছেন।
সেদিন ভোরে তিনি চায়ের কাপ হাতে এমন একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যেন ব্রাজিলের পরাজয়ের ব্যক্তিগত দায় তার কাঁধেই এসে পড়েছে।
বললেন, দেখলে তো? আমি আগেই বুঝেছিলাম।
আমি বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলাম, কী বুঝেছিলেন?
তিনি চায়ে এক চুমুক দিয়ে এমনভাবে তাকালেন, যেন প্রশ্নটি মানবসভ্যতার প্রতি অপমান। বললেন, আনচেলত্তি ভুল করেছে।
কোথায়?
যারা গোল দেয়, তাদের আরও আগে গোল দিতে বলা উচিত ছিল।
কথাটি এমন নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বলা হলো যে মুহূর্তের জন্য আমারও সন্দেহ হলো– বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত সহজ সমাধান কেউ এতদিন কেন ভাবল না!
ঠিক তখনই খবর এল, ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচ বজ্রঝড়ের কারণে এক ঘণ্টা পিছিয়ে গেছে।
হাশেম সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় কণ্ঠে বললেন, প্রকৃতিও তাড়াহুড়ো পছন্দ করে না।
চায়ের দোকানে সঙ্গে সঙ্গে আরেক দফা আন্তর্জাতিক সম্মেলন বসে গেল।
করিম সাহেব ঘোষণা করলেন, বৃষ্টি ইংল্যান্ডের বন্ধু।
রশিদ সাহেব সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন ভেজা ঘাসে মেক্সিকোর পা কথা বলে।
দুজনের কণ্ঠ এমন দৃঢ় যে মনে হলো, বজ্রপাতের দিকটিও বুঝি তাদের পরামর্শ নিয়েই ঠিক হচ্ছে।
আমি চুপচাপ বসে রইলাম। বহুদিনের অভিজ্ঞতায় শিখেছি, ফুটবল নিয়ে বিতর্কে সত্যের চেয়ে স্মৃতিশক্তির মূল্য বেশি। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর যে আগে বলতে পারে, আমি তো আগেই বলেছিলাম– ইতিহাস তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করে।
এক সময় ম্যাচ শুরু হলো। মাঠে বাইশজন ফুটবলার বল নিয়ে ছুটছেন, আর চায়ের দোকানে দশজন মানুষ তাদের চেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছেন। যে রেফারিকে প্রথমার্ধে সাধু বলা হচ্ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে তিনিই জাতীয় বিপর্যয়ের প্রধান নায়ক হয়ে উঠলেন।
বাড়ি ফেরার পথে আকাশে শেষবারের মতো বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। আমার মনে হলো, প্রকৃতি বুঝি হাসছে। মাঠে বজ্রপাত খুব কম হয়; আসল বজ্রপাত ঘটে মানুষের মতামতে। সেখানে প্রতি মিনিটে সিদ্ধান্ত বদলায়, ভবিষ্যদ্বাণী জন্ম নেয়, আর পরাজয়েরও নতুন নতুন ব্যাখ্যা আবিষ্কৃত হয়।
সেদিন বুঝলাম, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিস্ময় কোনো অঘটন নয়। সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, চার বছর অন্তর আমাদের পাড়ার চায়ের দোকানেই এমন সব মহাজ্ঞানীর জন্ম হয়, যাদের পরামর্শ শুনলে পৃথিবীর সব দলেরই একসঙ্গে বিশ্বকাপ জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকত।