রহমত সাহেব বউকে ফোন দিয়ে বললেন, বউ, আমি কই?
রাহেলা বেগম অবাক হয়ে বললেন, মর জ্বালা! আপনে কই মানে কী? আপনে না ঢাকায় গেলেন?
রহমত সাহেব চিন্তিত গলায় বললেন, সেইটা তো ঠিক আছে। কিন্তু বউ, আমি বোধহয় ভুল কইরা আর্জেন্টিনা আইয়া পড়ছি। বাসে না উইঠা রাতের বেলা বিমানে উইঠা গেছি।
রাহেলা বেগম বিরক্ত গলায় বললেন, কী বলেন এসব পাগল-ছাগলের কথা! নিশা-ফিসা করেন নাই তো! গাঁজায় দম দিছেন? মাথাটা কি পুরাই গেছে গা? এই জন্যই কইছিলাম, একা ঢাকা যাইয়েন না।
রহমত সাহেব ফোন রেখে হাঁটা শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর আবার বউকে ফোন দিয়ে বললেন, বউ, আমি যেন কই যাইতেছিলাম?
রাহেলা এবারও বিরক্ত গলায় বললেন, আপনের হইছে কী, পথ হারায়ে ফেলছেন? আপনে এখন কোন চিপায়?
রহমত সাহেব কাঁচুমাচু মুখে বললেন, বউ, আমি বোধহয় ব্রাজিল চইলা আসছি। আলমারি খুইলা দেখ তো, আমার পাসপোর্টটা জায়গামতো আছে কি না, নাকি আমি সঙ্গে করে লইয়া আসছি!
রাহেলা আলমারি খুলে দেখে বললেন, পাসপোর্ট তো বাসায় আছে। আপনের হইছে কী? একবার বলেন আর্জেন্টিনা, আবার ব্রাজিল! মাথামোতা গেছে গা?
রহমত বিড়বিড় করে বললেন, বউ, আমার মাথাটা বোধহয় আউলায় গেছে। কিছুই বুঝতেছি না। আমারে বোধহয় পাগলের ডাক্তার দেখাইতে হইব।
কথা শুনে রাহেলা হায় হায় করতে লাগলেন, আপনে গেলেন ভালো মানুষ, ঢাকায় গিয়া পাগল হয়ে গেলেন! হায় রে! আমার কী হবে গো!
বলেই তিনি কাঁদতে বসে গেলেন। তিনি ধরে নিলেন স্বামীর মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। চিন্তিত মুখে সব ছেলেমেয়েকে ফোন করতে লাগলেন। বড় ছেলে ঢাকায় থাকে, সে ফোন ধরছে না। মনে হয় সবাই ঘুমে।
রহমত সাহেব অজপাড়াগাঁয়ের সহজ-সরল একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক। ভাঙাচোরা স্কুলে প্রায় বিনা বেতনে পড়িয়েছেন। তাদের গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছে নাই, দুনিয়ায় খবর তেমন জানেন না। তার দুই ছেলে এক মেয়ে। কষ্ট করে সবাইকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার পুরো জীবন কেটেছে গ্রামে সৎভাবে জীবনযাপন করে।
তার এক ছেলে চাকরিসূত্রে ঢাকায় থাকে। এক ছেলে সৌদি আরব। তিনি রাহেলা বেগমকে নিয়ে গ্রামে বাস করেন। ছেলে বলেছিল ঢাকায় এসে থাকতে। তিনি রাজি হননি।
সহজ-সরল মানুষ তিনি। এর আগে শহর বলতে মাত্র দুইবার ঢাকায় এসেছিলেন, যখন ছেলে নতুন বাসা নিয়েছে। অবশ্য চিকিৎসার জন্য একবার তাকে ভারত যেতে হয়েছিল, ছোট ছেলে নিয়ে গিয়েছিল।
শহরের হাবভাব তিনি কিছুই জানেন না। ছেলের অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি একাই তড়িঘড়ি করে বাসে চড়ে বসেছেন।
গতকাল রাতে তিনি রংপুর থেকে বাসে উঠেছেন, ছেলের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। সকালে ঢাকায় নেমে তিনি হাঁটা শুরু করেছেন। বাসস্ট্যান্ড থেকে এতটুকু পথ তিনি হেঁটেই ছেলের বাসায় যেতে চান। প্রতিদিন সকালে তার হাঁটার অভ্যাস।
বাস থেকে নেমে তিনি তাকিয়ে দেখেন প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছাদে পতপত করে আর্জেন্টিনার পতাকা উড়ছে। তিনি অবাক হয়ে ভাবলেন, এ আমি কোথায় এলাম! ভুল করে অন্য কোথাও আসি নাই তো!
সকালবেলা রাস্তাঘাট ফাঁকা, কাউকে কিছু জিগ্যেস করার উপায় নাই। হাঁটতে হাঁটতে দেখেন, একটা বাড়িতে আর্জেন্টিনার বিশাল পতাকা উড়ছে। বাড়িটাও আর্জেন্টিনার পতাকার মতো রং করা। দুইটা বাচ্চাকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতে দেখলেন। তাদের গায়ের গেঞ্জির কালার আর্জেন্টিনার পতাকার মতো। তিনি বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। তার পর বউকে ফোন দিলেন।
কিছুদূর হাঁটার পর দেখলেন এ পাড়ার অন্য একটা বিল্ডিংয়ে ব্রাজিলের পতাকা উড়ছে। এই বিল্ডিং ব্রাজিলের পতাকার আদলে রং করা। তিনি আশপাশের বিল্ডিংয়ে তাকিয়ে অনেকগুলো ব্রাজিলের পতাকা দেখতে পেলেন। ছাদে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে, তার গেঞ্জিতে ব্রাজিলের পতাকা দেখা যায়। তার মাথা গেল আউলাইয়া। তিনি আবার বউকে ফোন দিলেন।
বউয়ের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি অসুস্থ বোধ করতে লাগলেন। টলতে টলতে কোনোরকমে ছেলের বাসায় উপস্থিত হলেন। গিয়ে দেখেন, বাসার সবাই তখনো ঘুমে। তখন তার বিশ্বাস হলো, নাহ, তিনি বাংলাদেশেই আছেন। এই তো ছেলের বাড়ি!