পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল, বহু প্রতীক্ষিত চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পাওয়া, কিংবা ভয়াবহ কোনো সড়ক দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে অক্ষত শরীরে বেঁচে ফেরা–আমাদের জীবনে এমন মুহূর্ত প্রায়ই আসে। এই চরম আনন্দ আর স্বস্তির মুহূর্তে আমরা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ি। কেউ কেউ খুশিতে চিৎকার করি, আবার কেউ প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু একজন মুমিন হিসেবে এই বিশেষ মুহূর্তে আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, আনন্দের সেই সর্বোচ্চ মুহূর্তেও বিনম্র হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে মাথা নত করতে, যাকে শরিয়তের পরিভাষায় বলা হয় শুকরিয়ার সিজদাহ।
জীবনে কোনো আকস্মিক সুসংবাদ, সুখবর, সম্পদ লাভ কিংবা বড় কোনো বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি পেলে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে একটি সিজদাহ করা মুস্তাহাব বা উত্তম আমল। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি বান্দার পরম আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। নবি কারীম (সা.) যখনই কোনো আনন্দদায়ক বা শুভসংবাদ পেতেন, তখনই আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায়ের জন্য সিজদায় লুটিয়ে পড়তেন।
শুকরিয়ার সিজদাহ আদায়ের জন্য সাধারণ সালাতের মতো দীর্ঘ কোনো নিয়মের প্রয়োজন হয় না। হাদিসের আলোকে এর সহজ কিছু দিক নিচে দেওয়া হলো-
শুকরিয়া আদায়ের জন্য কেবল একটি সিজদাহ করতে হয়।
হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) বর্ণনা করেন, একবার নবি (সা.) একটি দীর্ঘ সিজদাহ করলেন। এর পর মাথা তুলে বললেন, জিবরাইল (আ.) আমার কাছে এসেছিলেন এবং আমাকে একটি শুভসংবাদ দিয়েছেন, তাই আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের জন্য সিজদাহ করলাম। (বুলুগুল মারাম, ৩৪৮)।
কোনো সুসংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিজদাহ করা সুন্নাহ। হযরত আলী (রা.) যখন নবি (সা.)-কে হামাযান গোত্রের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ লিখে পাঠালেন, তখন তিনি তাৎক্ষণিক সিজদাহ করলেন এবং মাথা তুলে বললেন, হামাযানের ওপর সালাম। (সালাতে মুবাশ্শির)
সাধারণত ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত সালাত আদায় করা নিষেধ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮০৫)। তবে আকস্মিক কোনো নিয়ামত বা বিপন্মুক্তির কারণে এই নিষিদ্ধ সময়েও শুকরিয়ার সিজদাহ দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ উলামা এই সময়েও সিজদাহ আদায়ের পক্ষে জোরালো মত দিয়েছেন। কারণ এটি একটি তাৎক্ষণিক আমল।
সিজদাহ ছাড়াও মুমিন ব্যক্তি তিনটি উপায়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন:
১. এই নেয়ামত সম্পূর্ণ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা।
২. মৌখিকভাবে আলহামদুলিল্লাহ বলে আল্লাহর প্রশংসা করা।
৩. প্রাপ্ত নেয়ামতকে আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যয় না করে তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা (সালাতে মুবাশ্শির)।
সুখ ও দুঃখ–উভয় অবস্থায় আল্লাহর স্মরণই মুমিনের আসল পরিচয়। তাই জীবনের যেকোনো খুশির খবরে চাটুকারিতা বা অহংকারে মত্ত না হয়ে আসুন আমরা সিজদাহর মাধ্যমে আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়ার তাওফিক লাভ করি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক