ফুটবল ইতিহাসে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াই কখনোই শুধু ৯০ মিনিটের ম্যাচ ছিল না। এই দ্বৈরথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ, রাজনীতি, ইতিহাস, জাতীয়তাবোধ এবং প্রতিশোধের গল্প। তাই দুই দলের মুখোমুখি লড়াই মানেই আবেগের পারদ চড়ে যাওয়া।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় নিঃসন্দেহে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার করা বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত। সেই গোলের জন্য কোনো দিন অনুতপ্ত ছিলেন না ম্যারাডোনা। বরং আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, শতাব্দীর সেরা গোলের চেয়েও ‘হ্যান্ড অব গড’ তার বেশি প্রিয়। কারণ, তার ভাষায়, ইংরেজদের চোখের সামনে গোলটি করেছিলেন, আর তারা কিছুই করতে পারেনি।
এই ঘটনার পেছনে ছিল আরও গভীর এক প্রেক্ষাপট। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ, যেখানে আর্জেন্টিনার পরাজয় জাতির মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। ম্যারাডোনা পরে বলেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচ ছিল যুদ্ধের প্রতীকী প্রতিশোধ। তার মতে, ফুটবল ও যুদ্ধকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখার সুযোগ ছিল না।
দুই দেশের বৈরিতার শুরু আরও আগে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হারের ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিন বিতর্কিত লাল কার্ড দেখেন। সেই ম্যাচে উত্তেজনা এতটাই চরমে ওঠে যে খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতি, কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ- সব মিলিয়ে তা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচে পরিণত হয়।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে নতুন নাটক যোগ করেন ডিয়েগো সিমিওনে ও ডেভিড বেকহাম। সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেছিলেন বেকহাম, আর টাইব্রেকারে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। চার বছর পর ২০০২ বিশ্বকাপে সেই হারের প্রতিশোধ নেন বেকহ্যাম। তার একমাত্র গোলে জিতে ইংল্যান্ড।
এরপর বিশ্বকাপে দুই দল আর মুখোমুখি না হলেও সমর্থকদের বৈরিতা থেমে থাকেনি। কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার হারের পর ইংলিশ সমর্থকদের উল্লাস, আবার আর্জেন্টিনার গ্যালারিতে ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি বহন করা ‘মুচাচোস’ গান- সবই প্রমাণ করে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠের বাইরেও সমান তীব্র।
এই প্রজন্মে লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেইন সেই ঐতিহাসিক দ্বৈরথের নতুন মুখ। ম্যারাডোনার মতো ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ না হলেও, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের ঐতিহ্য ও আবেগ তাদের কাঁধেও সমানভাবে বর্তায়।
তাই আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি লড়াই শুধু সেমিফাইনাল বা ফাইনালে ওঠার হিসাব নয়- এটি এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যা ছয় দশকের ইতিহাস, অসংখ্য বিতর্ক, কিংবদন্তি এবং জাতীয় গর্বকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে। ফুটবল এখানে শুধুই একটি খেলা নয়, দুই দেশের দীর্ঘদিনের আবেগ ও ইতিহাসের প্রতিফলন। সূত্র: আনন্দবাজার