২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনকালীন বহুল আলোচিত-সমালোচিত ঘটনা রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ছাত্র আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড। ওই বছরের ১৬ জুলাই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে তিনি পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ওই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে বেরোবির সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদসহ মোট ৩০ আবু সাঈদকে সাজা দেওয়া হয়।
দণ্ডিতদের মধ্যে চারজন খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই)। তাদের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু গতকাল বুধবার দৈনিক খবরের কাগজকে এই তথ্য জানান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে পাঁচটি যুক্তি তুলে ধরে তাদের খালাস চেয়ে এই আপিল করা হবে।
তিনি জানান, যুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে–ভুক্তভোগী আবু সাঈদের পরনে ঘটনার সময় থাকা পোশাকে কোনো ছিদ্র ছিল না, কিন্তু বুকে বা পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলে তো পরনের পোশাক ছিদ্র হওয়ার কথা।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, গুলিবিদ্ধ হয়ে কেউ মারা গেলে তার শরীরে গুলি প্রবেশের ছিদ্র থাকার কথা। তা ছিল না। আবার শরীরে গুলি প্রবেশ করলে গুলিটি বের হওয়ার একটি ছিদ্র থাকার কথা। তাও ছিল না। সুরতহাল বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে ভুক্তভোগীর পোশাক বা ত্বকে গুলির কোনো উল্লেখ নেই। অথবা গুলি যদি বের না হয়ে শরীরের ভেতরে থেকে যায়, তবে তা প্রমাণে এক্স-রে বা রেডিওগ্রাফিক টেস্টের প্রতিবেদনে থাকার কথা। তবে প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে তেমন কিছু উপস্থাপন করতে পারেনি। সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মাথার পেছন দিকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ভুক্তভোগী মারা গেছেন। ভুক্তভোগীর বাবাও লাশের গোসল দেওয়ার সময় মাথার পেছন দিকে আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন বলে ট্রাইব্যুনালে বলেছেন।
এসব যুক্তি ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরা যেত–এই কথার জবাবে আইনজীবী বলেন, ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছি। তবে রায়ে এ নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। আশা করি সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ তা শুনবেন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। ন্যায়বিচার শুধু আসামিদের জন্য না, ভুক্তভোগীর পরিবারের জন্যও দরকার। সন্তান হারানো মা-বাবা তো ন্যায়বিচারটুকু চাইতেই পারেন। কে তাদের সন্তানকে হত্যা করেছে–এই সত্য জানা তাদের অধিকার। উল্লেখ্য এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।
গত ১৪ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় প্রকাশ করেন। এর আগে গত ৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন, পাঁচজনকে ১০ বছর করে, আটজনকে ৫ বছর করে এবং ১১ জনকে ৩ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া একজনের হাজতবাসের সময়কে সাজার মেয়াদ হিসেবে গণ্য করা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই দুজনসহ মোট চারজনের পক্ষে আজ আপিল করবেন বলে জানান আইনজীবী।
যাবজ্জীবনপ্রাপ্তরা হলেন- সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।
১০ বছর করে সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ ও ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া। তারা সবাই পলাতক।
৫ বছর করে কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- আরএমপির সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন মো. মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামীম। আসামিদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন আমিনুল গণি টিটো, আজিজুর রহমান দুলুসহ আরও কয়েকজন। পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী সুজাদ মিয়া।