‘আমি তো ভাবিনি, ঘরের পাশের এই পানিটাই আমার সন্তানকে কেড়ে নেবে। মৃত্যুর একটু আগেও উঠানে খেলছিল। চোখের আড়াল হতেই খুঁজতে শুরু করি। অনেকক্ষণ পরে যখন পানির মধ্যে পেলাম, তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না আমার তিন বছরের ছোট্ট পুষ্প আর নেই।’
একই শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকার সোলতান আহমদও। দুই বছর বয়সী ছেলে ওয়াকিমকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা বাড়ির সামনে কত আনন্দে খেলছিল। কে জানত, কয়েক মিনিটের অসাবধানতায় তাকে আর ফিরে পাব না। বন্যার এই পানি আমার বুকটাই খালি করে দিল।’ গত বৃহস্পতিবার সকালে ও বিকেলে এই দুটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় কক্সবাজারের ৯টি উপজেলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দুর্যোগে ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন, যার মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় ও ১৩ জন রোহিঙ্গা।
পানি নামতে শুরু করলেও অনেক এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা, ভাঙা রাস্তা, বিশুদ্ধ পানির সংকট ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে দুর্ভোগ কাটেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে ডুবা, সাপের কামড়, পানিবাহিত রোগ ও মানসিক আঘাত থেকে শিশুদের রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
পানিতে খেলা নয়, সার্বক্ষণিক তদারকি
বন্যার পানি দেখতে শান্ত হলেও নিচে খোলা নালা, গর্ত বা তীব্র স্রোত থাকতে পারে। অল্প পানিতেও শিশু ডুবে যেতে পারে। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) ফিল্ড টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘দুর্যোগের সময় শিশুরা ঝুঁকির মাত্রা বোঝে না। তাই অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক তদারকিই সবচেয়ে কার্যকর নিরাপত্তা। তাদের একা কোথাও যেতে দেওয়া যাবে না। আশ্রয়কেন্দ্রেও অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে।’
সাপের উপদ্রব
বন্যার সময় গর্তে পানি ঢুকে পড়ায় সাপ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর, রান্নাঘর, খড়ের গাদা কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে ঢুকে পড়তে পারে। কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখা ও শিশুদের জুতা পরে চলাফেরা নিশ্চিত করা জরুরি। সাপে কামড়ালে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।’
বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা
নলকূপ ও পুকুরের পানি দূষিত হওয়ায় শিশুদের ডায়রিয়া, জন্ডিস ও টাইফয়েডের ঝুঁকি বাড়ছে। টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন ডা. তৌসিফ উদ্দিন মিজবাহ বলেন, ‘শিশুদের সুস্থ রাখতে বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা জরুরি।’
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের জানান, বন্যা-পরবর্তী সময়ে শিশুদের নিউমোনিয়া, চোখ ওঠা ও চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়ে। জেলায় ৮৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধ মজুত আছে। যেকোনো অসুস্থতায় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
মানসিক যত্ন ও আশ্রয়কেন্দ্রে বাড়তি নজর
আশ্রয়কেন্দ্রে ভিড়ের মধ্যে শিশু হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে তাদের সঙ্গে নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর লেখা আইডি কার্ড রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি বন্যাকবলিত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
কক্সবাজার সদরের বাংলাবাজার এলাকার চাকরিজীবী সাইদুল ইসলাম তুহিন বলেন, ‘বন্যায় আমার ছোট ছেলে খুব ভয় পেয়ে গেছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শে আমরা ওর সঙ্গে বেশি সময় কাটাচ্ছি, খেলাধুলা করছি। এখন সে স্বাভাবিক হয়েছে।’
বিদ্যুৎ ও বজ্রপাত
বন্যার সময় ছিঁড়ে পড়া বৈদ্যুতিক তার কিংবা পানিতে ডুবে থাকা বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিশুদের এসব থেকে নিরাপদ রাখতে হবে। একই সঙ্গে বজ্রপাতের সময় শিশুদের বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না।
পূর্বাভাস মেনে প্রস্তুতি
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘নিয়মিত পূর্বাভাস দেখা জরুরি। সে অনুয়ায়ী দেখে আগে থেকেই শুকনো খাবার, পানি, ওষুধ ও জরুরি কাগজপত্রের ব্যাগ গুছিয়ে রাখলে দুর্যোগের সময় দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়া সম্ভব হয়।’