বিশ্বকাপের ক্যালেন্ডারে কিছু ম্যাচ থাকে, যেখানে বাঁশি বাজে মাঠে, কিন্তু প্রতিধ্বনি শোনা যায় ইতিহাসের পাতায়। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ঠিক তেমনই এক মহারণ। ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, ম্যারাডোনার জাদু, বিতর্ক আর প্রতিশোধ। এবার তাতে যোগ হয়েছে মেসির নতুন অধ্যায়। সব মিলিয়ে ম্যাচটি শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়, ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি মহাকাব্য রচনার মঞ্চ। তুঙ্গস্পর্শী উত্তেজনা আর রোমাঞ্চের কাঁপন তুলে আজ আটলান্টায় মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। জিতলে ফাইনাল, হারলে বিদায়। এমন আবহ ছাপিয়েও থাকবে গৌরব, অহংকার আর ইতিহাসকে নতুন করে লেখার সুযোগও।
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুরু ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে। কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। কিন্তু ফলাফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে দেখানো বিতর্কিত লাল কার্ড। আর্জেন্টিনার অনেকের বিশ্বাস, ওই সিদ্ধান্তই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। এমনকি ইংল্যান্ডের জয়সূচক গোল নিয়েও বিতর্ক ছিল। অনেক আর্জেন্টাইন আজও সেই ম্যাচকে ‘শতাব্দীর সেরা ডাকাতি’ বলেই মনে করেন।
এরপর আসে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ, যা আর্জেন্টিনায় ‘মালভিনাস যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। দক্ষিণ আটলান্টিকের দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ওই সংঘাতে প্রাণ হারান ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং তিনজন দ্বীপবাসী। যুদ্ধ শেষ হলেও দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর তার ছায়া আজও রয়ে গেছে। যুদ্ধের মাত্র চার বছর পরই মেক্সিকো বিশ্বকাপে সেই আবেগের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথমে ‘হ্যান্ড অব গড’। এরপর পাঁচজনকে কাটিয়ে করা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’; দুটি গোলেই ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। পরে জেতে শিরোপাও। ফলে মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর ম্যারাডোনা শুধু ফুটবল নায়ক নন, অসংখ্য আর্জেন্টাইনের কাছে জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড এবং টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের বিদায় এই দ্বৈরথে নতুন মাত্রা যোগ করে। আর ২০০২ বিশ্বকাপে বেকহামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে কিছুটা প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর বিশ্বকাপে আর দেখা হয়নি দুই দলের। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিতে মুখোমুখি দুই দল। শেষ চারের লড়াইটি একদিক থেকে বিশেষ। তা হলো লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ। ছয়টি বিশ্বকাপ খেললেও কখনো থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে মাঠে নামা হয়নি তাঁর। বিশ্বকাপে তৃতীয়বারের মতো সেমিফাইনাল খেলতে নামা আর্জেন্টাইন অধিনায়কের সামনে এখন দলকে সপ্তমবারের মতো ফাইনালে তোলার সুযোগ। ইতিহাস আর্জেন্টিনার পক্ষে, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কখনো হারে না আলবিসেলেস্তারা।
আটলান্টায় যুদ্ধের আমেজ থাকলেও আর্জেন্টিনার প্রবীণ যুদ্ধ-সেনাদের সংগঠন ‘এপ্রিল টু ওয়ার ভেটেরানস ফেডারেশন’ এবার সমর্থকদের ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। তাদের ভাষায়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই সেমিফাইনাল ‘সশস্ত্র প্রতিশোধ কিংবা ইতিহাসের ক্ষতিপূরণ নয়।’ তারা সমর্থকদের ঘৃণা বা উগ্র জাতীয়তাবাদ নয় বরং যুদ্ধে নিহতদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ম্যাচটিকে কেবল ফুটবলের চোখেই দেখার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সমাধান হয় কূটনীতির টেবিলে; ফুটবল মাঠে নয়।
তবে এমন আহ্বান কতটা প্রভাবিত করতে পারবে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার চোখ টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনাল। গ্রুপ সেরা হয়ে নক আউট পর্ব; সব ম্যাচেই অবশ্য ভীষণ লড়তে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। কেপ ভার্দে থেকে শুরু করে, মাঝে মিসর, শেষটা সুইসদের বিপক্ষে মেসিদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই বিশ্বকাপে বাড়তি রোমাঞ্চ তৈরি করেছিল।
আর্জেন্টিনার স্বস্তি, দলটিকে মেসিনির্ভর বলা যাচ্ছে না। আর্জেন্টিনার শক্তি অবশ্য তাদের অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং কঠিন মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা। মেসির সঙ্গে হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরোদের নিয়ে গড়া দলটি সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় রয়েছে।
তবে দুই দলের কোচ ও খেলোয়াড়রা অতীতের উত্তাপকে মাঠে টেনে আনতে চান না। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, এই ম্যাচে ফুটবল ছাড়া অন্য কোনো বিষয় জড়িত নয়। ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের কণ্ঠেও একই সুর, ‘এটা দুই গর্বিত জাতির লড়াই। তবে মাঠে ফুটবলই কথা বলবে।’
অন্যদিকে ইংল্যান্ডও দুর্দান্ত ছন্দে আছে। জুড বেলিংহাম, হ্যারি কেইন, বুকায়ো সাকা, ফিল ফোডেন ও ডেকলান রাইসদের নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়ে তুলেছে থ্রি লায়ন্সরা। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসও আকাশছোঁয়া। তবে ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর ইংলিশরা সেমির গেরোতে আটকা। ঘরের মাঠে সেবার বিশ্বকাপ জয়ের পর আর কোনোবারই ফাইনালে উঠতে পারেনি থ্রি লায়ন্সরা। ১৯৯০ সালে সেমিতে উঠলেও তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয়। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১৮ বিশ্বকাপে আবারও সেমিতে নাম লেখায় কাগুজে বাঘ খ্যাত ইংল্যান্ড। এবার ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন তাদের ধূলিসাৎ হয় ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে।
চলমান বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বেশ ভারসাম্য দল। ইংলিশ মিডিয়াও অনেকটা সংযত। হুলিগান নামে একটা সময় উগ্র সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল ইংলিশ শিবিরে। এবার সেখানেও ব্যতিক্রম। ইংল্যান্ডের ম্যাচে তেমন উগ্র আচরণ দেখা যায়নি তাদের মধ্যে। সব মিলিয়ে নীরবে-নিভৃতে যেন এগিয়ে চলেছে দলটি। যেখানে দলের দুই কান্ডারি হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যাম। দুজনই করেছেন ৬টি করে গোল। যা একটি দলের আক্রমণভাগের বলিষ্ঠ রূপেরই বহিঃপ্রকাশ। লক্ষ্য একটাই–সেমির বৈতরণি পার হয়ে ষাট বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখা।
হেড টু হেডের হিসাব স্বস্তি দিচ্ছে ইংল্যান্ডকে। ১৪ বারের মোকাবিলায় ইংল্যান্ডের জয় ছয়টিতে। আর্জেন্টিনা জিতেছে তিনটিতে। বাকি পাঁচ ম্যাচ ড্র। বিশ্বকাপের ইতিহাসও ইংল্যান্ডে পক্ষে। বৈশ্বিক মঞ্চে দুই দল পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে। ইংল্যান্ডের জয় তিনটি, আর্জেন্টিনা জিতেছে দুটি ম্যাচ। তবে পরিসংখ্যান অনেক সময় হিসাবের খাতাতেই লিপিবদ্ধ থাকে। মাঠের খেলাই আসল কথা।
আটলান্টার রাতে এটি শুধু আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের একটি সেমিফাইনাল নয়। এটি ম্যারাডোনার স্মৃতির সঙ্গে মেসির স্বপ্নের মিলন, ইংল্যান্ডের নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাস বদলে দেওয়ার সুযোগ এবং বিশ্বকাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোর আরেকটি নতুন অধ্যায়। যে দল জিতবে, তারা শুধু ফাইনালে উঠবে না; নিজেদের নামও লিখে রাখবে ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি স্মরণীয় রাতে।