বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে আজ (১৫ জুলাই) রাতে মুখোমুখি হচ্ছে দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এই মহারণের আগে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় উঠে আসছে বিশ্বকাপের অন্যতম তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস। ১৯৬২ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপে পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। এর মধ্যে ইংল্যান্ড জিতেছে তিনবার। আর্জেন্টিনার জয় একটি এবং আরেকটি ম্যাচ ড্র হলেও টাইব্রেকারে জিতে পরের রাউন্ডে ওঠে আর্জেন্টিনা। তবে এবারের দ্বৈরথের আগে ফুটবলপ্রেমীদের মানসপটে ভেসে উঠছে ১৯৮৬ সালের উত্তপ্ত কোয়ার্টার ফাইনালের স্মৃতি। কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ ঘিরে থাকা সেই দ্বৈরথ আজও দুই দেশের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় হাইলাইট।
১৯৬২ বিশ্বকাপ: ইংল্যান্ড ৩-১ আর্জেন্টিনা
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দুই দলের প্রথম বিশ্বকাপ সাক্ষাৎ হয় গ্রুপপর্বে। শক্তিশালী ইংল্যান্ড ওই ম্যাচে ৩-১ গোলে জয় তুলে নেয়। ২ জুলাই ১৯৬২ সালে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ইংল্যান্ডের হয়ে গোলগুলো করেন রোনাড ফ্লোয়ারস (১৭), রবার্ট চ্যারিল্টন (৪২) ও পিটার গ্রেভেস (৬৭)। ম্যাচের ৮১ মিনিটে আর্জেন্টিনার একমাত্র গোলটি করেন জোসে ফ্রান্সিসকো। এটিই ছিল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের প্রথম জয় এবং দুই দেশের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা।
১৯৬৬ বিশ্বকাপ: ‘বিতর্কিত’ আতিথেয়তা
লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ১৯৬৬ সালের ২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত ম্যাচটি ইতিহাসে পরিচিতি পায় ‘যুদ্ধ’ হিসেবে। ইংলিশদের ১-০ গোলের জয়ের ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে লাল কার্ড দেখানো হলে তিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পরে ইংলিশ ম্যানেজার আলফ র্যামজে আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ওই ম্যাচের ৭৮ মিনিটে ইংল্যান্ডের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেছিলেন জিওফ হাস্ট। শেষ পর্যন্ত ওই বিশ্বকাপের ফাইনালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিকে অতিরিক্ত সময়ে ৪-২ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ জয় করেছিল ফুটবলের জনক ইংল্যান্ড।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ: ঈশ্বরের হাত ও শতাব্দীর সেরা শিল্পের দ্বৈরথ
বিশ্বকাপের ক্যালেন্ডারে কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলো শুধু দুই দলের লড়াই নয়। সেগুলো হয়ে ওঠে ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ আর কিংবদন্তির গল্প। ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার দ্বৈরথ ঠিক তেমনই। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও যখন মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই পরাশক্তি, তখন সময় যেন নিজেই ফিরে যাচ্ছে ৪০ বছর আগের সেই অবিস্মরণীয় বিকেলে। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন। মেক্সিকো সিটির বিখ্যাত আজতেকা স্টেডিয়াম। কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। মাত্র চার বছর আগে ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত তখনো টাটকা। তাই ম্যাচটি ছিল কেবল ফুটবল নয়, দুই জাতির অহংকারেরও লড়াই। সেই ম্যাচেই জন্ম নেয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বিস্ময়কর দুটি গোল। ঐতিহাসিক ম্যাচটির প্রথমার্ধে ‘হ্যান্ড অব গড’-এর ধোঁকা, আর ঠিক চার মিনিট পরই রূপকথার মতো মাঝমাঠ থেকে পাঁচ ইংলিশ ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে সেই অবিস্মরণীয় একক গোল ম্যারাডোনার। সেদিন ইংল্যান্ডের স্বপ্নভঙ্গের গল্প লিখেছিল আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচ জিতে সেমিতে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা এবং শেষ পর্যন্ত ফাইনাল জিতে হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন।
ওই ম্যাচে স্টেডিয়ামে দর্শক উপস্থিতি ছিল ১,১৪,৫৮০ জন। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার ঠিক চার বছর আগে ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ফকল্যান্ড যুদ্ধ (মালভিনাস যুদ্ধ) সংঘটিত হয়েছিল। এই রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে মাঠের লড়াইটি ফুটবল ছাড়িয়ে এক চরম মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা জার্সি না পাওয়ায় শেষ মুহূর্তে স্থানীয় মেক্সিকান বাজার থেকে হালকা ও সস্তা কাপড়ের নীল জার্সি কিনে তার ওপর লোগো বসিয়ে দল মাঠে নেমেছিল। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে ম্যারাডোনা দুটি অবিস্মরণীয় গোল করেন। বিরতির পর শুরুতেই ঘটে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় ৪টি মিনিট, যা ফুটবলের দর্শনকে বদলে দিয়েছিল।
ম্যাচের ৫১ মিনিটে ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে বল পাস দেন সতীর্থ হোর্হে ভালদানোকে। ইংলিশ ডিফেন্ডার স্টিভ হজ বলটি ক্লিয়ার করতে গেলে বলটি ওপরে বাতাসে ভেসে পেনাল্টি বক্সের দিকে চলে যায়। ম্যারাডোনা তীব্র গতিতে ছুটে যান এবং ইংল্যান্ডের লম্বা গোলরক্ষক পিটার শিলটনের আগেই লাফিয়ে ওঠেন। শিলটন হাত দিয়ে বল ফিস্ট করার চেষ্টা করার মুহূর্তেই ম্যারাডোনা নিজের বাম হাত দিয়ে বলটি শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে জালে পাঠিয়ে দেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা হ্যান্ডবলের জন্য তীব্র প্রতিবাদ করলেও তিউনিসিয়ান রেফারি আলী বিন নাসের এটি দেখতে পাননি এবং গোলটি বহাল রাখেন। পরে ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা এটিকে বলেছিলেন, গোলটি কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে হয়েছে। সেই থেকে এটি ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে বিখ্যাত।
প্রথম গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ৫৫ মিনিটে ম্যারাডোনা নিজেদের অর্ধে (মাঝমাঠের সামান্য ভেতরে) বল পান। এর পর তিনি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য একক দৌড় শুরু করেন। প্রায় ৬০ মিটার দূর থেকে দৌড়ে একে একে ইংল্যান্ডের ৫ জন খেলোয়াড়কে (পিটার বিয়ার্ডসলে, পিটার রিড, টেরি বুচার, টেরি ফেনউইক এবং টেরি বুচারকে পুনরায়) জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করেন। অবশেষে গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে ছিটকে ফেলে মাটিতে পড়ার মুহূর্তে বল জালে জড়ান। ২০০২ সালে বিশ্বফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ভোটে এটি ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ইংল্যান্ড ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ৮১ মিনিটে জন বার্নসের ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে ব্যবধান ২-১ এ নামিয়ে আনেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার। শেষের দিকে ইংল্যান্ড সমতা ফেরানোর সুযোগ পেলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় সফল হতে পারেনি। ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা।
এই জয়ের পর আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে বেলজিয়ামকে হারায় এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে তাদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে। পুরো টুর্নামেন্টে ৫ গোল ও ৫ অ্যাসিস্ট করে ম্যারাডোনা টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ জয় করেন। অন্যদিকে ৬ গোল করে ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ‘গোল্ডেন বুট’ জেতেন।
১৯৯৮: প্রতিশোধের আগুন ও পেনাল্টির রোমাঞ্চ
ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আবারও মুখোমুখি হয় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৯৮ সালের ৩০ জুন অনুষ্ঠিত ম্যাচে ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড আর আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনের ক্ষুরধার মস্তিষ্কের লড়াই ছিল উল্লেখ করার মতো। সব মিলিয়ে ম্যাচটি ছিল উত্তেজনায় ভরপুর। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা।
২০০২: বেকহামের প্রায়শ্চিত্ত ও ইংলিশ উল্লাস
২০০২ সালের ৭ জুন জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে দেখা হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের। আগের বিশ্বকাপের খলনায়ক ডেভিড বেকহাম এবার হয়ে ওঠেন নায়ক। ৪৪ মিনিটে তার করা একমাত্র পেনাল্টি গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রতিশোধের তৃপ্তি পেয়েছিল ইংলিশরা।