২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের মাঠ যখন মেতে আছে, ঠিক তখনই বেজে উঠেছে বিদায়ের করুণ সুর। ফুটবলবিশ্বকে বছরের পর বছর বুঁদ করে রাখা একঝাঁক তারকা এই বিশ্বকাপের মঞ্চেই ইতি টানলেন তাদের বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। মেক্সিকোর জাল অক্ষত রাখার অতন্দ্র প্রহরী থেকে শুরু করে জার্মানির বিশ্বরেকর্ডধারী প্রাচীর– বিদায়ের অশ্রুতে সিক্ত হয়েছেন সবাই। একই সঙ্গে দেশের জার্সি চিরতরে তুলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আলজেরিয়ার আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা, চেক রিপাবলিকের গোলমেশিন এবং সেনেগালের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার। নকআউট পর্বের হার কিংবা গ্রুপপর্বের ব্যর্থতা– ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিদায় নিলেও, বিশ্বফুটবলে এই তারকাদের রেখে যাওয়া শূন্যতা অপূরণীয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানো তেমনই পাঁচ ফুটবলারের গল্প নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন। লিখেছেন শাহনেওয়াজ পাপ্পু
গুইলারর্মো ওচোয়া (মেক্সিকো)
মেক্সিকোর ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলরক্ষক গুইলারমো ওচোয়া পেশাদার ফুটবল থেকে পুরোপুরি অবসর নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক থাকলেও, ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি সেই জায়গা হারান। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তিনি জানিয়েছিলেন এটিই হতে যাচ্ছে তার শেষ টুর্নামেন্ট।
গত ২৫ জুন চেক রিপাবলিকের বিপক্ষে ম্যাচে মেক্সিকোর জার্সি গায়ে নিজের শেষ মুহূর্তগুলো কাটান ওচোয়া। এটি ছিল তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬)। চলমান আসরে মাত্র ১২ মিনিট খেলার সুযোগ পান তিনি। শেষ ষোলোর ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে মেক্সিকো বিদায় নিলে ওচোয়া নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আজতেকা স্টেডিয়ামেই আমি আমার প্রথম ম্যাচ খেলেছিলাম, আর এখানেই আমার শেষ ম্যাচ হলো। এটি আমার ক্যারিয়ারের একটি সুন্দর অধ্যায়, আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।’ মেক্সিকোর হয়ে ওচোয়া মোট ১৫৩টি ম্যাচ খেলেছেন, যার মধ্যে ১২টি (৪টি ক্লিন শিট) ছিল বিশ্বকাপের ম্যাচ।
ম্যানুয়েল নয়্যার (জার্মানি)
২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার ২০২৪ সালেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছিলেন। ২০২০ সালের ফিফা বর্ষসেরা এই গোলরক্ষক যখন প্রথমবার অবসর নেন, তখন তার বয়স ছিল ৩৮ বছর। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে জার্মানির কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান ৪০ বছর বয়সী নয়্যারকে আবার দলে ফিরিয়ে আনেন।
কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে প্যারাগুয়ের কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে জার্মানি বিদায় নেওয়ার পর নয়্যার দ্বিতীয়বারের মতো অবসরের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ থেকে এভাবে এত দ্রুত বিদায় নেওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। আমরা দেশ এবং ভক্তদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি। জার্মানির হয়ে আরও একবার খেলার সিদ্ধান্ত আমি সচেতনভাবেই নিয়েছিলাম। কারণ জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেওয়া সব সময়ই গর্বের। চারটি বিশ্বকাপে খেলার যে অভিজ্ঞতা আমার আছে, তা দিয়ে তরুণ খেলোয়াড়দের সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। আমি ভীষণ হতাশ, তবে একই সঙ্গে কৃতজ্ঞ। এতগুলো বছর ধরে সমর্থনের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।’
২০০৯ সালে অভিষেকের পর বায়ার্ন মিউনিখের এই গোলরক্ষক জার্মানির হয়ে মোট ১২৮টি ম্যাচ খেলেছেন। বিশ্বকাপে খেলেছেন ২৩টি ম্যাচ। ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোলরক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার বিশ্বরেকর্ড তার দখলে।
রিয়াদ মাহরেজ (আলজেরিয়া)
দীর্ঘ ১২ বছর দেশের হয়ে খেলার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন আলজেরিয়ার অধিনায়ক রিয়াদ মাহরেজ। ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক এই তারকা ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়াকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তবে শেষ ৩২-এর ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নেয় তার দল।
চলতি টুর্নামেন্টে দুটি গোল করা ৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড ম্যাচ শেষে বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারে ভালো এবং কঠিন– উভয় সময়ই গেছে, তবে এটাই ফুটবল ক্যারিয়ারের অংশ। ছোটবেলা থেকেই আলজেরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করা, দেশের হয়ে খেলা আমার স্বপ্ন ছিল। আমি যে সেটি করতে পেরেছি, তা আমার জন্য অনেক বড় সম্মান ও গর্বের। এখন নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে।’
আলজেরিয়ার ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১৯টি ম্যাচ এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪০টি গোল নিয়ে অবসর নিলেন আল আহলির ফরোয়ার্ড। ২০১৯ সালে আলজেরিয়ার আফ্রিকান কাপ অব নেশন্সজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন মাহরেজ। ২০১৬ সালে তিনি সিএএফ বর্ষসেরা আফ্রিকান ফুটবলার এবং বিবিসি বর্ষসেরা আফ্রিকান ফুটবলার– উভয় পুরস্কারই জিতেছিলেন।
প্যাট্রিক শিক (চেক রিপাবলিক)
বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার ঠিক একদিন পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন চেক প্রজাতন্ত্রের তারকা স্ট্রাইকার প্যাট্রিক শিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে ৩০ বছর বয়সী এই ফুটবলার লেখেন, ‘এই সিদ্ধান্তটি হুট করে নেওয়া নয়, কিংবা রাতারাতি আমি এমন সিদ্ধান্ত নিইনি। বেশ কিছু সময় ধরেই আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলাম এবং অনেক চিন্তাভাবনা করেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি।’
জাতীয় দলের হয়ে ৫৬টি ম্যাচ খেলে ২৬টি গোল করেছেন শিক। ২০২০ সালের ইউরো কাপে চেক প্রজাতন্ত্রের হয়ে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন তিনি। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৫টি গোল করে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে আবির্ভূত হন শিক। এ ছাড়া স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাঝমাঠ থেকে নেওয়া তার অবিশ্বাস্য গোলটি ইউরোর ‘গোল অব দ্য টুর্নামেন্ট’ স্বীকৃতি পেয়েছিল।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি এই তারকা স্ট্রাইকার। গ্রুপপর্বের প্রথম তিন ম্যাচের একটিতেও জালের দেখা পাননি তিনি। ফলে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে তাকে মূল একাদশ থেকে বাদ দেওয়া হয়, যদিও দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘এ’ থেকে মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তলানিতে থেকে বিদায় নেয় চেক রিপাবলিক।
বিদায়লগ্নে শিক লেখেন, ‘জাতীয় দলের জার্সি গায়ে আমি যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে গর্বিত মনেই বিদায় নিচ্ছি। তবে একই সঙ্গে আমি মনে করি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চেক ফুটবল যেমন পারফর্ম করেছে, আদতে আমাদের দেওয়ার মতো এর চেয়েও অনেক অনেক বেশি কিছু আছে।’
সাদিও মানে (সেনেগাল)
বিশ্বকাপে দারুণ আশা জাগিয়েও শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিতে হয়েছে সেনেগালকে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আফ্রিকার যে দলটিকে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল, তাদের যাত্রা থেমেছে নকআউট পর্বের শুরুতেই। আর এই বিদায়ের সঙ্গেই অবসান ঘটে আফ্রিকান ফুটবলের এক সোনালি অধ্যায়ের। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন সেনেগালের কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড সাদিও মানে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেই দেশের জার্সি গায়ে নিজের শেষ ম্যাচটি খেলে ফেলেছেন ৩৪ বছর বয়সী এই তারকা।
সেনেগালের জনপ্রিয় সংবাদপত্র লে কোতিদিয়েনে দেওয়া এক বিবৃতিতে নিজের অবসরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মানে। তিনি বলেন, ‘দেশের এই জার্সির জন্য আমি সবকিছু ত্যাগ করেছি। সব সময় নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি এবং দেশের সম্মানের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছি।’ বিবৃতির শেষে সমর্থকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সাবেক লিভারপুল ও বায়ার্ন মিউনিখ তারকা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের কোনো মুহূর্তে সমর্থকদের হতাশ করে থাকলে, তার জন্য আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থনাও করেন তিনি।
২০১২ সালে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হওয়া সাদিও মানে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ছিলেন সেনেগালের প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২১ সালে সেনেগালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ের নেপথ্যের নায়ক ছিলেন তিনিই। দেশের হয়ে রেকর্ড ১৩০ ম্যাচে মাঠে নেমে তিনি করেছেন সর্বোচ্চ ৫৪টি গোল, পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ২৯টি গোল।
সাদিও মানের এই প্রস্থান নিশ্চিতভাবেই সেনেগালের ফুটবলের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও দেশের ফুটবল ছাড়ছেন না তিনি। মানে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে কোচিং স্টাফ, টেকনিক্যাল টিম কিংবা প্রশাসনিক কোনো দায়িত্বে যুক্ত হয়ে সেনেগালের ফুটবলের উন্নয়নে কাজ করে যেতে চান তিনি।