বাস্তিল দিবসের বিকেলে ফ্রান্সজুড়ে ছিল উৎসবের আবহ। ১৭৮৯ সালের এই দিনেই বাস্তিল দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে বদলে গিয়েছিল ফ্রান্সের ইতিহাস। স্বাধীনতা, সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের স্বপ্নে নতুন পথচলা শুরু হয়েছিল তাদের। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক দিনের আবেগকে ফুটবলের মঞ্চে আনন্দে রাঙাতে পারল না ফ্রান্স। স্পেনের ছন্দময় ফুটবলের কাছে থেমে গেল তাদের বিশ্বকাপের স্বপ্নিল যাত্রা। স্প্যানিশ সিম্ফনিতে ম্লান হয়ে গেল বাস্তিল দুর্গের উৎসব।
টানা দুই বিশ্বকাপে ফাইনালে খেলার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিল ফ্রান্স। কিন্তু শেষ চারেই থামতে হলো অপ্রতিরোধ্য কিলিয়ান এমবাপ্পেদের। দিদিয়ের দেশমের দলকে ২-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল স্পেন। ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ড।
চলমান বিশ্বকাপে অদম্য গতিতে ফরাসিরা এগোলেও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে এগিয়ে ছিল স্পেনই। ফ্রান্সের বিপক্ষে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সর্বশেষ ১০ ম্যাচে তাদের জয় সাতটি, হার দুটি, একটি ম্যাচ ড্র। সর্বশেষ ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালেও ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল স্পেন। এরপর ২০২৫ সালের নেশন্স লিগের রোমাঞ্চকর ম্যাচেও ৫-৪ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল লা রোজারা। সেই ধারাই বিশ্বকাপের মঞ্চেও ধরে রাখল তারা।
শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের হাতে। বলের দখল, আক্রমণের ধার এবং আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে থাকা দলটি ২০ মিনিটেই পেয়ে যায় পেনাল্টি। ফ্রান্সের বক্সে লুকাস দিনিয়ে বুঝতেই পারেননি তার ঠিক পেছনে ছিলেন লামিনে ইয়ামাল। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ইয়ামালের পায়ে আঘাত করেন তিনি। স্পষ্ট ফাউলের কারণে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি।
২২ মিনিটে সেই পেনাল্টি থেকে স্পেনকে এগিয়ে দেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁ সঠিক দিকেই ঝাঁপিয়েছিলেন। কিন্তু ওইয়ারসাবালের জোরালো শট ছিল তার নাগালের বাইরে। এই গোলের মাধ্যমে নতুন ইতিহাসও গড়েন ওইয়ারসাবাল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৪-তে। এর আগে এক মৌসুমে স্পেনের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ছিল ডেভিড ভিয়ার। ২০০৮-০৯ মৌসুমে তিনি করেছিলেন ১৩ গোল। সেই রেকর্ড এখন ওইয়ারসাবালের।
গোল হজমের পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল ফ্রান্স। কিন্তু প্রথমার্ধে নিজেদের চেনা ছন্দ খুঁজে পায়নি তারা। বরং চোটের কারণে উইলিয়াম সালিবাকে হারানোয় আরও বিপদে পড়ে দেশমের দল। ৪১ মিনিটে অবশ্য সমতায় ফেরার দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন এমবাপ্পে। দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাওয়া ফরাসি অধিনায়ককে থামাতে স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমনের ঝাঁপিয়ে পড়া রক্ষা করে দলকে।
দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সের প্রত্যাবর্তনের আশা আরও কঠিন করে দেন পেদ্রো পোরো। ৫৮ মিনিটে দানি ওলমোর সঙ্গে ওয়ান-টু পাস খেলে বক্সে ঢুকে দুর্দান্ত স্থিরতায় মাইক মাইনিয়ঁকে পরাস্ত করেন তিনি। স্পেন এগিয়ে যায় ২-০ গোলে।
৬৪ মিনিটে লামিনে ইয়ামাল গোল করে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু অফসাইডের কারণে তার গোল বাতিল হয়। এরপর ফ্রান্স আক্রমণে মরিয়া হয়ে ওঠে। ৭২ মিনিটে মাইকেল ওলিসে ও লুকাস দিনিয়েকে তুলে রায়ান শেরকি ও থিও হার্নান্দেজকে মাঠে নামান দেশম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্পেনের রক্ষণ ভাঙতে পারেনি তারা। শেষ দিকে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে ম্যাচ। তবে আর কোনো গোল হয়নি। ২-০ গোলের জয় নিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে স্পেন।
গ্যালারিতেও ছিল স্পেনের ইতিহাসের সাক্ষী অনেক মুখ। ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াস, জাভি, কার্লোস পুয়লদের উপস্থিতি যেন নতুন প্রজন্মের স্প্যানিশ দলের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হয়ে ছিল।
২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালের মঞ্চে ফিরল। ২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল তারা। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে বিদায়। তবে ২০২৪ সালের ইউরো জয়ের পর নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিশ্বকাপে আসা লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের সামনে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লেখার সুযোগ।