ঢাকা ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
স্পেন বিশ্বের সেরা দল: দে লা ফুয়েন্তে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার দাবি চাঁদপুরে ডাকাতির ঘটনায় গৃহবধূ নিহত, আহত আরেক গৃহবধূ ইস্পাহানি কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড প্রাইমারি স্কুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান স্ত্রী চলে যাওয়ায় হতাশা! সন্তানসহ বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা দুপুরের মধ্যে ৫ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের শঙ্কা বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু আজ লক্ষ্মীপুরে দাদাকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার আসামি নাতি গ্রেপ্তার ১৫ জুলাই  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি ফতুল্লায় গ্যাস পাইপ থেকে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার সময় বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪ ঈশ্বরদীতে চতুর্থ শ্রেণির শিশুকে যৌন নিপীড়ন, যুবক গ্রেপ্তার এয়ারএশিয়ার মূল দর্শনই হচ্ছে সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করা ধোনির কানে থাকা এই ছোট্ট যন্ত্রের কাজ কী? ফাঁস হলো আসল রহস্য জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর চেয়ে এগিয়ে আইজেনকট জিআই সনদ পাচ্ছে আরও ৪ পণ্য ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি আইআরজিসি কমান্ডারের অতিবৃষ্টিতে দাম বেড়েছে সবজি, মাছ ও মাংসের আল-আকসা মসজিদের সব ফটক বন্ধ করল ইসরায়েল সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: ইতিহাস, পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনার লড়াই ব্যবসায়ী শওকতের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণের অপেক্ষায় দুদক কৃচ্ছ্রসাধনে সরকারের নানা পদক্ষেপ চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়: অনিয়মই যেখানে নিয়ম ফুটবলের সীমানা ছাপানো এক লড়াই এক সপ্তাহে সাপে কেটেছে ১০৫ জনকে স্প্যানিশ সিম্ফনিতে ম্লান বাস্তিল দুর্গ ‍তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় বাসিন্দারা বন্যায় ঝুঁকিতে শিশুরা ১৫ জুলাই: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ১৫ জুলাই: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল বিশ্বকাপের মঞ্চেই শেষ অধ্যায়

এয়ারএশিয়ার মূল দর্শনই হচ্ছে সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করা

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
এয়ারএশিয়ার মূল দর্শনই হচ্ছে সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করা
মোরশেদুল আলম চাকলাদার।

বাংলাদেশ এয়ারএশিয়ার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত বাজার। গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ, পর্যটন, শিক্ষা এবং প্রবাসীকর্মীদের যাতায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে এয়ারএশিয়ার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। 

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজধানীর নিজস্ব দপ্তরে খবরের কাগজের প্রতিনিধির কাছে মালয়েশিয়াভিত্তিক এয়ারলাইনস এয়ারএশিয়া-এর বাংলাদেশ অংশের জিএসএ (GSA) এবং টিএএস (TAS)গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোরশেদুল আলম চাকলাদার সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশের বাজার নিয়ে এয়ারএশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?   

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বাংলাদেশ এয়ারএশিয়ার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত বাজার। গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ, পর্যটন, শিক্ষা এবং প্রবাসীকর্মীদের যাতায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে এয়ারএশিয়ার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। জিএসএ হিসেবে আমরা নিয়মিত বাজার বিশ্লেষণ করে এয়ারএশিয়ার গ্রুপের কাছে যাত্রী চাহিদা, নতুন গন্তব্য এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনা সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছি। আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এয়ারএশিয়ার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বাজারে পরিণত হবে।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশের বিমানবন্দর অবকাঠামো ও নীতিগত পরিবেশকে এয়ারএশিয়ার কীভাবে মূল্যায়ন করছে? বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা কেমন দেখছেন?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে বিমানবন্দর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল যাত্রীসেবা ও অপারেশনাল সক্ষমতা অনেক বাড়াবে বলে আমরা মনে করি। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে, যা আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিযোগিতামূলক বিমানবন্দর চার্জ, দ্রুত গ্রাউন্ড প্রসেসিং, ডিজিটালাইজেশন এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা আরও উন্নত হলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারগুলোর জন্য বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় বাজার হয়ে উঠবে।

খবরের কাগজ: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইরসের সঙ্গে কোড-শেয়ার বা অন্য কোনো অংশীদারত্বের সম্ভাবনা রয়েছে কি?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বিশ্বব্যাপী এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব এখন একটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কৌশল। যদি যাত্রীদের জন্য উন্নত সংযোগ, সহজ ট্রানজিট এবং পারস্পরিক বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে কোড-শেয়ার, ইন্টারলাইন বা অন্যান্য সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও এ ধরনের সিদ্ধান্ত এয়ারএশিয়ার গ্রুপে এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের নীতিগত বিষয়, আমরা বিশ্বাস করি—এ ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশের যাত্রীদের জন্য ইতিবাচক হবে।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাত্রীদের জন্য আরও সাশ্রয়ী ভাড়া নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: এয়ারএশিয়ার মূল দর্শনই হচ্ছে ‘নাও এভরিওয়ান ক্যান ফ্লাই’। আমরা পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক বিমান বহর, ডিজিটাল বুকিং প্ল্যাটফর্ম এবং নিয়মিত প্রোমোশনাল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে যাত্রীদের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের বিশ্বাস, যদি বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে বাংলাদেশি যাত্রীরা ভবিষ্যতেও আরও আকর্ষণীয় ভাড়ার সুবিধা পাবেন।

খবরের কাগজ: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এর প্রভাব বাংলাদেশগামী রুটে কতটা পড়েছে?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য, রুট পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সব আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের পরিচালন ব্যয়কে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের রুটও এর বাইরে নয়। তবে এয়ারএশিয়ার সব সময় পরিচালন দক্ষতা বাড়িয়ে এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অতিরিক্ত চাপ যাত্রীদের ওপর যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে—চ্যালেঞ্জিং বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া বজায় রাখা।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশে কি কোনো রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ বা এভিয়েশন একাডেমিতে বিনিয়োগের কথা ভাবছে?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বাংলাদেশে দক্ষ মানবসম্পদ রয়েছে এবং এভিয়েশন খাত দ্রুত বিকাশমান। যদি দীর্ঘমেয়াদে বাজারের আকার, নীতিগত সহায়তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও অনুকূল হয়, তাহলে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, অথবা এভিয়েশন দক্ষতা উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

খবরের কাগজ: পর্যটন খাতের বিকাশে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: এয়ারএশিয়া বিশ্বাস করে যে, একটি নতুন ফ্লাইট শুধু যাত্রী বহন করে না—এটি পর্যটন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগও বাড়ায়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক প্রচারণা, ডেস্টিনেশন মার্কেটিং এবং নতুন পর্যটন প্যাকেজ নিয়ে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক কর্মী ও শিক্ষার্থী বিদেশে যান। তাদের জন্য বিশেষ ভাড়া বা ট্রাভেল প্রোগ্রামের পরিকল্পনা আছে কি?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসী কর্মীরা এয়ারএশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীগোষ্ঠী। আমরা নিয়মিত বিশেষ প্রোমোশন, আগাম বুকিং অফার এবং ডিজিটাল সুবিধা দিয়ে তাদের সহায়তা করার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী, কর্মী এবং ঘন ঘন ভ্রমণকারীদের জন্য আরও লক্ষ্যভিত্তিক অফার বা বিশেষ ট্রাভেল প্রোগ্রামের সম্ভাবনা এয়ারএশিয়া গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।

খবরের কাগজ: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে এয়ারএশিয়ার আঞ্চলিক নেটওয়ার্কে কী অবস্থানে দেখতে চান?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: আমরা বাংলাদেশকে শুধু একটি গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কানেক্টিভিটি মার্কেট হিসেবে দেখতে চাই। আমাদের প্রত্যাশা, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি গন্তব্য, বেশি ফ্রিকোয়েন্সি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন শহরের সঙ্গে আরও শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হবে। এটি পর্যটন, বাণিজ্য, শিক্ষা এবং বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ সরকারকে কী ধরনের নীতিগত সহায়তা দিতে হবে বলে মনে করেন?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: আমরা মনে করি, সরকার ইতোমধ্যে এভিয়েশন খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ভবিষ্যতে যদি— প্রতিযোগিতামূলক বিমানবন্দর চার্জ, দ্রুত নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, পর্যাপ্ত স্লট সুবিধা, দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তির সম্প্রসারণ, আধুনিক অবকাঠামো এবং পর্যটন খাতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ আরও জোরদার করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের বিনিয়োগ, রুট এবং যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

খবরের কাগজ: ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এয়ারএশিয়ার সম্প্রসারণ বা ব্যবসার পরিধি আরও বড় করার পরিকল্পনা আছে কি?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: আমরা বাংলাদেশের বাজার নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। শুধুমাত্র ফ্লাইট পরিচালনাই নয়, এয়ারএশিয়া একটি সমন্বিত ট্রাভেল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে, যেখানে ডিজিটাল সেবা, ট্রাভেল টেকনোলজি, কার্গো, পর্যটন সহযোগিতা এবং গ্রাহকসেবার নতুন নতুন উদ্যোগ রয়েছে। GSA হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এয়ারএশিয়ার ব্যবসাকে বাংলাদেশে আরও বিস্তৃত করা, নতুন করপোরেট অংশীদারত্ব তৈরি করা, ভ্রমণ সংযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য আরও উন্নত ও সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করা। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এয়ারএশিয়ার সম্প্রসারণের সুযোগও আগামী বছরগুলোতে আরও উজ্জ্বল হবে।
সমাপনী বক্তব্য

‘বাংলাদেশ আমাদের জন্য শুধু একটি বাজার নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন গেটওয়েতে পরিণত হতে পারে। TAS এয়ারএশিয়ার GSA হিসেবে, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আশা করি, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশি যাত্রীরা আরও বেশি গন্তব্য, আরও উন্নত সংযোগ এবং আরও সাশ্রয়ী ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।’

এয়ারএশিয়ার মূল দর্শনই হচ্ছে সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করা

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
এয়ারএশিয়ার মূল দর্শনই হচ্ছে সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করা
মোরশেদুল আলম চাকলাদার।

বাংলাদেশ এয়ারএশিয়ার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত বাজার। গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ, পর্যটন, শিক্ষা এবং প্রবাসীকর্মীদের যাতায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে এয়ারএশিয়ার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। 

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজধানীর নিজস্ব দপ্তরে খবরের কাগজের প্রতিনিধির কাছে মালয়েশিয়াভিত্তিক এয়ারলাইনস এয়ারএশিয়া-এর বাংলাদেশ অংশের জিএসএ (GSA) এবং টিএএস (TAS)গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোরশেদুল আলম চাকলাদার সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশের বাজার নিয়ে এয়ারএশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?   

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বাংলাদেশ এয়ারএশিয়ার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত বাজার। গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ, পর্যটন, শিক্ষা এবং প্রবাসীকর্মীদের যাতায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে এয়ারএশিয়ার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। জিএসএ হিসেবে আমরা নিয়মিত বাজার বিশ্লেষণ করে এয়ারএশিয়ার গ্রুপের কাছে যাত্রী চাহিদা, নতুন গন্তব্য এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনা সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছি। আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এয়ারএশিয়ার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বাজারে পরিণত হবে।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশের বিমানবন্দর অবকাঠামো ও নীতিগত পরিবেশকে এয়ারএশিয়ার কীভাবে মূল্যায়ন করছে? বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা কেমন দেখছেন?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে বিমানবন্দর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল যাত্রীসেবা ও অপারেশনাল সক্ষমতা অনেক বাড়াবে বলে আমরা মনে করি। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে, যা আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিযোগিতামূলক বিমানবন্দর চার্জ, দ্রুত গ্রাউন্ড প্রসেসিং, ডিজিটালাইজেশন এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা আরও উন্নত হলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারগুলোর জন্য বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় বাজার হয়ে উঠবে।

খবরের কাগজ: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইরসের সঙ্গে কোড-শেয়ার বা অন্য কোনো অংশীদারত্বের সম্ভাবনা রয়েছে কি?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বিশ্বব্যাপী এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব এখন একটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কৌশল। যদি যাত্রীদের জন্য উন্নত সংযোগ, সহজ ট্রানজিট এবং পারস্পরিক বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে কোড-শেয়ার, ইন্টারলাইন বা অন্যান্য সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও এ ধরনের সিদ্ধান্ত এয়ারএশিয়ার গ্রুপে এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের নীতিগত বিষয়, আমরা বিশ্বাস করি—এ ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশের যাত্রীদের জন্য ইতিবাচক হবে।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাত্রীদের জন্য আরও সাশ্রয়ী ভাড়া নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: এয়ারএশিয়ার মূল দর্শনই হচ্ছে ‘নাও এভরিওয়ান ক্যান ফ্লাই’। আমরা পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক বিমান বহর, ডিজিটাল বুকিং প্ল্যাটফর্ম এবং নিয়মিত প্রোমোশনাল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে যাত্রীদের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের বিশ্বাস, যদি বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে বাংলাদেশি যাত্রীরা ভবিষ্যতেও আরও আকর্ষণীয় ভাড়ার সুবিধা পাবেন।

খবরের কাগজ: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এর প্রভাব বাংলাদেশগামী রুটে কতটা পড়েছে?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য, রুট পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সব আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের পরিচালন ব্যয়কে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের রুটও এর বাইরে নয়। তবে এয়ারএশিয়ার সব সময় পরিচালন দক্ষতা বাড়িয়ে এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অতিরিক্ত চাপ যাত্রীদের ওপর যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে—চ্যালেঞ্জিং বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া বজায় রাখা।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশে কি কোনো রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ বা এভিয়েশন একাডেমিতে বিনিয়োগের কথা ভাবছে?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বাংলাদেশে দক্ষ মানবসম্পদ রয়েছে এবং এভিয়েশন খাত দ্রুত বিকাশমান। যদি দীর্ঘমেয়াদে বাজারের আকার, নীতিগত সহায়তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও অনুকূল হয়, তাহলে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, অথবা এভিয়েশন দক্ষতা উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

খবরের কাগজ: পর্যটন খাতের বিকাশে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: এয়ারএশিয়া বিশ্বাস করে যে, একটি নতুন ফ্লাইট শুধু যাত্রী বহন করে না—এটি পর্যটন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগও বাড়ায়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক প্রচারণা, ডেস্টিনেশন মার্কেটিং এবং নতুন পর্যটন প্যাকেজ নিয়ে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক কর্মী ও শিক্ষার্থী বিদেশে যান। তাদের জন্য বিশেষ ভাড়া বা ট্রাভেল প্রোগ্রামের পরিকল্পনা আছে কি?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসী কর্মীরা এয়ারএশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীগোষ্ঠী। আমরা নিয়মিত বিশেষ প্রোমোশন, আগাম বুকিং অফার এবং ডিজিটাল সুবিধা দিয়ে তাদের সহায়তা করার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী, কর্মী এবং ঘন ঘন ভ্রমণকারীদের জন্য আরও লক্ষ্যভিত্তিক অফার বা বিশেষ ট্রাভেল প্রোগ্রামের সম্ভাবনা এয়ারএশিয়া গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।

খবরের কাগজ: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে এয়ারএশিয়ার আঞ্চলিক নেটওয়ার্কে কী অবস্থানে দেখতে চান?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: আমরা বাংলাদেশকে শুধু একটি গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কানেক্টিভিটি মার্কেট হিসেবে দেখতে চাই। আমাদের প্রত্যাশা, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি গন্তব্য, বেশি ফ্রিকোয়েন্সি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন শহরের সঙ্গে আরও শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হবে। এটি পর্যটন, বাণিজ্য, শিক্ষা এবং বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ সরকারকে কী ধরনের নীতিগত সহায়তা দিতে হবে বলে মনে করেন?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: আমরা মনে করি, সরকার ইতোমধ্যে এভিয়েশন খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ভবিষ্যতে যদি— প্রতিযোগিতামূলক বিমানবন্দর চার্জ, দ্রুত নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, পর্যাপ্ত স্লট সুবিধা, দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তির সম্প্রসারণ, আধুনিক অবকাঠামো এবং পর্যটন খাতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ আরও জোরদার করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের বিনিয়োগ, রুট এবং যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

খবরের কাগজ: ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এয়ারএশিয়ার সম্প্রসারণ বা ব্যবসার পরিধি আরও বড় করার পরিকল্পনা আছে কি?

মোরশেদুল আলম চাকলাদার: আমরা বাংলাদেশের বাজার নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। শুধুমাত্র ফ্লাইট পরিচালনাই নয়, এয়ারএশিয়া একটি সমন্বিত ট্রাভেল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে, যেখানে ডিজিটাল সেবা, ট্রাভেল টেকনোলজি, কার্গো, পর্যটন সহযোগিতা এবং গ্রাহকসেবার নতুন নতুন উদ্যোগ রয়েছে। GSA হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এয়ারএশিয়ার ব্যবসাকে বাংলাদেশে আরও বিস্তৃত করা, নতুন করপোরেট অংশীদারত্ব তৈরি করা, ভ্রমণ সংযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য আরও উন্নত ও সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করা। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এয়ারএশিয়ার সম্প্রসারণের সুযোগও আগামী বছরগুলোতে আরও উজ্জ্বল হবে।
সমাপনী বক্তব্য

‘বাংলাদেশ আমাদের জন্য শুধু একটি বাজার নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন গেটওয়েতে পরিণত হতে পারে। TAS এয়ারএশিয়ার GSA হিসেবে, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আশা করি, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশি যাত্রীরা আরও বেশি গন্তব্য, আরও উন্নত সংযোগ এবং আরও সাশ্রয়ী ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।’

দুই বছরে ৩৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১০:০১ এএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬, ১০:২৩ এএম
দুই বছরে ৩৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিক

দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী খাত তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপের বাজারে আমাদের রপ্তানি কমে এসেছে। অথচ সেখানে চীনের পাশাপাশি ভিয়েতনামও ভাল ব্যবসা করছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি ও তেলের মূল্য নিয়ে অস্থিতিশীলতার কারণে গত অর্থবছরে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে সুবাতাস ছিল না।

তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান রাজধানীতে নিজের দপ্তরে খবরের কাগজের রিপোর্টার সাগুফতা আফরোজের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৈরি পোশাক খাতের সাম্প্রতিক সংকটের বর্ণনা দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন।

খবরের কাগজ: পোশাক খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? 

মাহমুদ হাসান খান: অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র গ্যাসসংকট, যার ফলে অধিকাংশ কারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম ক্ষমতায় চলছে। নতুন গ্যাসসংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

ব্যাংকের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে বহাল রয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, প্রতিবছর ৯ শতাংশ হারে শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্ট দিতে হচ্ছে, রপ্তানি প্রণোদনা ৬০ শতাংশ কমেছে। এসব কারণে ব্যবসা ধরে রাখতে না পেরে ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

আরও অনেক কারখানা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামনে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ। গ্র্যাজুয়েশনের ৩ বছর পর ইইউতে ১২ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে। যেখানে ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ইইউর এফটিএ চুক্তির কারণে তারা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করতে না পারলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবে। বিষয়টি এই শিল্পসংলগ্ন সবার মধ্যেই একটি অস্বস্তি তৈরি করেছে। ডাবল ট্রান্সফরমেশন প্রস্তুতিতেও যথেষ্ট অভাব রয়েছে, বিশেষ করে ওভেন ও সিনথেটিক পণ্যের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মেনে চলতে পারলে আমাদের অর্ধেক পোশাক রপ্তানি করা যাবে না।

খবরের কাগজ: অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ কী বলে মনে করছেন? 

মাহমুদ হাসান খান: সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকট চরমে উঠেছে। এসবের সঙ্গে কারখানাগুলোকে লড়াই করতে হচ্ছে। জ্বালানিসংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং লজিস্টিকস সক্ষমতার অভাবে ২০২৩ সাল থেকে প্রায় ৩৬০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক কারখানায় উৎপাদন কমেছে। 

খবরের কাগজ: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা থামছে না। যুদ্ধ একবার থামছে তো আবার শুরু হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ সংকট কীভাবে মোকাবিলার কথা ভাবছেন?

মাহমুদ হাসান খান: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের বড় বিপদ থেকে রক্ষা করবে। তবে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাত ও মূল্যস্ফীতিতে পড়লে তা বিশ্ব পোশাকশিল্পের বাজারকে প্রভাবিত করবে।

এসবের সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের শিল্পেও। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সব অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনুভব করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বড় আকার ধারণ করলে তা আমাদের জ্বালানি আমদানি ও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

খবরের কাগজ: চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার কী গ্রহণ করছে? 

মাহমুদ হাসান খান: সরকার ৩ মাসের তেলের মজুত নিশ্চিত করতে নতুন করে আরও ৫ লাখ টন তেল আমদানি করছে। সেই সঙ্গে রিফাইনারি সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশের সব অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করে সহজ শর্তে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, চতুর্থ এফএসআরইউ (৬০০ এমএমসিএফডি) স্থাপনের উদ্যোগ, এগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করি।

খবরের কাগজ: সরকার কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে অনেক বন্ধ কল-কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, পোশাকশিল্পের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কেমন সহযোগিতা পাচ্ছেন?

মাহমুদ হাসান খান: বন্ধ কারখানা চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এসব বন্ধ কারখানায় যে অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে তা আমাদের দেশীয় অর্থনীতির একটি অংশ; এগুলোকে অলস অবস্থা থেকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে পারলে অর্থনীতি উপকৃত হবে। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সরকারের সঙ্গে কাজ করছি। আমাদের সদস্যদের সঙ্গেও কয়েক দফা মতবিনিময় করেছি এবং আমাদের পরামর্শগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও শেয়ার করেছি।

আশাবাদী এই উদ্যোগ থেকে শিল্প ও অর্থনীতি প্রত্যাশিত রিটার্ন পাবে। এর বাইরে সরকারের গৃহীত বেশ কিছু নীতি শিল্পের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করি, যেমন–৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট লোন, চলতি অর্থবছরে সব ধরনের ইনসেনটিভ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, ইনসেনটিভের ওপর আরোপিত আয়কর অর্ধেক করা হয়েছে, সোর্স ট্যাক্সকে অ্যাডভান্স ট্যাক্স হিসেবে গণ্য করে সেভাবে কর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে।

ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে একগুচ্ছ পদক্ষেপের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া করপোরেট কর হার ৫ বছরের জন্য ঘোষণা, ব্যবসা নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টায় এবং প্রত্যাবাসন ৩০ দিনের মধ্যে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবুজ রূপান্তর তহবিল থেকে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং কারখানায় সোলার রুফটপ স্থাপনে ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়া ৮ বছরের কম সুদে ঋণ প্রাপ্তির বিষয়ে বিজিএমইএ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে। আশা করি, এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে উদ্যোক্তারা এই কঠিন সময়ে স্বস্তি পাবেন এবং দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারী বাড়বে।

খবরের কাগজ: সংকট উত্তরণের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

মাহমুদ হাসান খান: সংকট উত্তরণের জন্য চারটি স্তরে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। জ্বালানির ক্ষেত্রে রূপপুর থেকে আগস্টে ৩০০ মেগাওয়াট, ডিসেম্বরে ১ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০২৭ সালের জুনে পূর্ণ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরও ১ হাজার মেগাওয়াট যুক্ত হবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে।

চতুর্থ এফএসআরইউ ২০২৮ সালে চালু হলে এবং অফশোর অনুসন্ধান শুরু হলে আমাদের জ্বালানিসংকট বহুলাংশে কেটে যাবে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে সুদহার কমানো, এনপিএল কমানোর আইনি উদ্যোগ, এনপিএল মোকাবিলায় একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো সফল হলে কস্ট অফ ফান্ড অনেকটাই কমে আসবে।

লজিস্টিকস: ঢাকা-চট্টগ্রাম ৬ লেনের এক্সপ্রেসওয়ে ২০৩২ সালের মধ্যে নির্মাণ, বে-টার্মিনাল ২০৩০ সালে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ২০২৯ সালে চালু হবে এবং হযরত শাহজালাল তৃতীয় টার্মিনাল চলতি বছর ডিসেম্বরে উদ্বোধন হবে। 

বাজার সুবিধা: ইইউর সঙ্গে এফটিএ চুক্তির জন্য আলোচনা চলছে, জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং কোরিয়ার সঙ্গেও আলোচনা চলছে। এসব উদ্যোগ ও পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন হলে আমাদের অর্থনীতিতে দ্রুত তার সুফল পাব। 

খবরের কাগজ: দেশে পোশাক রপ্তানি আগের তুলনায় কমেছে? আরও কমার আশঙ্কা করছেন কী? এ ধারা থেকে বের হয়ে আসার জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? 

মাহমুদ হাসান খান: বর্তমান রপ্তানি হ্রাস উদ্বেগজনক হলেও আমি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী। আমাদের শিল্পের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ গ্রহণে শিল্পকে প্রস্তুত করতে হবে। বিশ্ব বাজারে আমাদের শেয়ার ৬.৯% থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ১৫%-এ নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে ডাবল ট্রান্সফরমেশন নিশ্চিত করতে টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণের মান ও পরিধি বাড়াতে হবে। ইইউসহ সম্ভাব্য বাজারগুলোর সঙ্গে এফটিএ নিশ্চিত করতে হবে।

সুশাসন চর্চা থেকে অবিচল আস্থা: ব্র্যাক ব্যাংক

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৯ এএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
সুশাসন চর্চা থেকে অবিচল আস্থা: ব্র্যাক ব্যাংক
তারেক রেফাত উল্লাহ খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি

খবরের কাগজ: ব্র্যাক ব্যাংক গত ২৫ বছরের যাত্রায় কী কী অর্জন করেছে?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশের ‘মিসিং মিডল’ বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের অর্থায়ন সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে। গত ২৫ বছরের যাত্রায় আমরা ২০ লাখের বেশি এসএমই উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করেছি। এই অর্থায়ন দেশে এক কোটির বেশি কর্মসংস্থান তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। এটিই প্রমাণ করে যে, আমরা জনগণকে শুধু সাধারণ ব্যাংকিং সেবাই দিইনি, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় অবদান রাখতে পেরেছি।

দীর্ঘ সময় আমরা দেশের ২ হাজার ৩০০-এর বেশি লোকেশনে আমাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছি। যার ফলে আমাদের গ্রাহকরা এখন দ্রুততম সময়ে যেকোনো সেবা পাচ্ছেন। গ্রাহকসেবাকে আরও আধুনিক করতে আমাদের ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে। যেখানে এখন প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। গ্রাহকদের এই অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসে ব্র্যাক ব্যাংকের রিটেইল পোর্টফোলিও আজ ৫২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া আমাদের সাবসিডিয়ারি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ দেশের ৮ কোটি মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমরা দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছি।

করপোরেট ব্যাংকিংয়েও আমরা দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংকে পরিণত হয়েছি। বর্তমানে আমাদের করপোরেট গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ‘কর্পনেট’-এ প্রতি মাসে গড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে।

২৫ বছরের ব্যবধানে ব্র্যাক ব্যাংকের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ১ বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ডমার্ক পার করে পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বৃহৎ ব্যাংকে। একই সঙ্গে আমাদের শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি এবং ফরেক্স পোর্টফোলিও থাকায় আমরা বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নও করতে পারছি। এরই মধ্যে একটি ‘আফ্রাম্যাক্স অয়েল ট্যাঙ্কার’ কেনার জন্য আমরা এককভাবে প্রায় ৯৬ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন করেছি, যা এখন পর্যন্ত দেশের জাহাজশিল্পে একক কোনো ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অর্থায়ন।

সব মিলিয়ে, ব্র্যাক ব্যাংক দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ও সুশাসিত ব্যাংক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি গ্রাহকদের সর্বোচ্চ আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। আমরা দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রাসঙ্গিক ও সহজলভ্য সেবাসহ আর্থিক স্বাধীনতা নিয়ে আসতে কাজ করে যেতে চাই। এক কথায় আগামী দিনগুলোতে আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের মোস্ট ইমপ্যাক্টফুল ব্যাংক হয়ে ওঠা। পাশাপাশি আমরা ব্যাংকের কাজ করার ধরন, মনোভাব ও অনুশীলনকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে দেশীয় মালিকানাধীন প্রথম ‘মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংক’ হয়ে উঠতে পারি।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নিরাপদ ব্যাংক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনার মনে হয়েছে? 

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: নিরাপদ ব্যাংক নিয়ে বলতে গেলে আমাদের প্রথমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নজর দিতে হবে। গত কয়েক দশক ধরে সবার মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা ছিল, ব্যাংকে টাকা রাখা মানেই তা নিরাপদ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু ব্যাংকে উদ্ভূত পরিস্থিতি এই চিরাচরিত ধারণাকে বদলে দিয়েছে। ফলে আমানতকারীরা এখন তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় জমা রাখার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক ও সচেতন হয়ে উঠছেন।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলধন হয়ে উঠেছে ‘আস্থা’। শুধু চোখ ধাঁধানো ব্র্যান্ডিং বা তুমুল প্রচারণায় এই আস্থা অর্জন করা যায় না। শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন, আর্থিক স্থিতিশীলতা, নিয়মতান্ত্রিক আইন প্রতিপালন এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই শুধু গ্রাহকদের কাছে একটি ব্যাংকের বিশ্বস্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়।

একটি ব্যাংক কতটা নিরাপদ, তা বোঝার জন্য সবার প্রথমে ব্যাংকের স্পন্সরদের গুণগত মান এবং করপোরেট সুশাসনের কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। কারণ যেসব ব্যাংকের সুশাসন শক্তিশালী, তারা যেকোনো অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অন্যদের তুলনায় বেশি সক্ষম হয়। ব্র্যাক ব্যাংকের স্পন্সরশিপের একটি বড় অংশ রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’-এর অধীনে। একই সঙ্গে আমাদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বেশির ভাগই আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ স্বাধীন বা নন-শেয়ারহোল্ডার পরিচালক। ফলে ব্র্যাক ব্যাংক যেকোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা করপোরেট স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে শতভাগ সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এবং অন্যান্য স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বিবেচনায় নিতে হবে। এগুলো একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দায়বদ্ধতা মেটানোর যোগ্যতার প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে তুলে ধরে। উল্লেখ্য, ব্র্যাক ব্যাংক বিশ্ববিখ্যাত ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’ এবং ‘মুডিস রেটিংস’-এর মতো প্রতিষ্ঠান থেকে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং পাওয়া বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক।

তৃতীয়ত, একটি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান সমান গুরুত্ব রাখে। কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত বেশি হলে বুঝে নিতে হবে ওই ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা দুর্বল। ২০২৫ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেখানে ছিল ৩০%-এরও বেশি, সেখানে ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত মাত্র ২.২৭%-এ নেমে এসেছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

এ ছাড়া ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি, মূলধনের পর্যাপ্ততা, মুনাফা এবং সামগ্রিক ব্যালেন্স শিটের শক্তির মতো মূল আর্থিক সূচকগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এই সূচকগুলো ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চাপ সহ্য করার এবং গ্রাহকসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সক্ষমতা প্রকাশ করে। এই ধরনের প্রতিটি সূচকেই অনেক এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংক। যেমন: তারল্য পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান নির্ণায়ক ‘অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও’ মাত্র ৬৩%-এ নামিয়ে এনেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এর অর্থ হলো, আমরা যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতিতেও গ্রাহকদের আমানত চাহিদামাত্র তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত দেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা রাখি। এ ছাড়া আমাদের মূলধন ভিত্তি এখন ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা ব্যাংকের শক্তিশালী ভিতকে প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২,২৫১ কোটি টাকা (কর-পরবর্তী) নিট মুনাফা করেছে, যা আমাদের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন।

সবশেষে একটি ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধিও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ যেকোনো সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে আমানতকারীরা সাধারণত তাদের জমানো টাকা এমন সব ব্যাংকে সরিয়ে নেন, যেগুলোকে তারা সবচেয়ে নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য মনে করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংক খাতের আমানত প্রবৃদ্ধি যেখানে মাত্র ১১.৫১% ছিল, সেখানে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় ২৭.৫%। ২০২৫ সালে মাত্র এক বছরেই আমরা নতুন আমানত পেয়েছি ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি।

মূল কথা হলো, কোনো একক সূচক দিয়ে একটি ব্যাংকের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে আস্থা, সুশাসন, আর্থিক সক্ষমতা এবং আইনগত পরিপালনের মতো উপাদানগুলোর সমন্বিত রূপই নির্ধারণ করে কোনো ব্যাংক অনিশ্চয়তার সময়ে গ্রাহকদের জন্য ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে বিবেচিত হবে কি না।

খবরের কাগজ: জনগণের আস্থা অর্জন করে দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারা একটি নিরাপদ ব্যাংক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: এক কথায় যদি বলি– করপোরেট সুশাসন। এটি এমন এক মজবুত ভিত্তি, যার ওপর আস্থা, প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠে। সুশাসন বজায় রাখতে পারলে একটি ব্যাংক সুষ্ঠু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং টেকসই মূল্যবোধ তৈরিতে অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। আর যদি এই জায়গায় আপস করা হয়, তাহলে বিপুল মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি বা আকর্ষণীয় বিপণন কৌশল–কোনো কিছুই সেই প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে পারে না।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে বিষয়টি নিয়ে আলাদা আলোচনা হয় না। কারণ সেখানে ধরেই নেওয়া হয় যে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন থাকবেই। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোকে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী সুশাসন নিশ্চিত করতে হয়। একটি শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ, কার্যকর তদারকি, সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, রেগুলেটরি পরিপালন, স্বচ্ছতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের মতো অপরিহার্য উপাদানগুলো দিয়েই নিশ্চিত হয় এই সুশাসন।

এদের মধ্যকার সম্পর্কটা খুবই সরল। সুশাসন আস্থা তৈরি করে। আস্থা গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের আকৃষ্ট করে। আর এই ধারাবাহিক আস্থাই একটি ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যেসব প্রতিষ্ঠান আস্থার সঙ্গে আর্থিক শৃঙ্খলার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটাতে পারে, শুধু তারাই অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজারের যেকোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়।

খবরের কাগজ: দ্রুত আমানত বৃদ্ধির ফলে অনেক সময় খারাপ মানের ঋণ তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে সম্পদের গুণগত-মান কমে যায়। এমন হওয়া ঠেকাতে আপনারা কীভাবে নিশ্চিত করছেন?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যেকোনো ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত, সুদৃঢ় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণের গুণগত-মান অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা থাকলেই আমানতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে।

একটি ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একক খাতের ওপর নির্ভর না করে ভিন্ন ভিন্ন খাতে ঋণ দেওয়া। বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক এখনো অল্প কিছু বড় করপোরেট ও বাণিজ্যিক ঋণগ্রহীতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এই মডেলে সমস্যা হলো, ঋণ তহবিলের বড় অংশ যখন নির্দিষ্ট কিছু ঋণগ্রহীতা বা খাতের সঙ্গে বাঁধা থাকে, তখন সামান্যতম নেতিবাচক পরিস্থিতিও পুরো প্রতিষ্ঠানের ব্যালেন্স শিটে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

অন্যদিকে, বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও ব্যাংককে অনেক বেশি স্থিতিশীলতা দেয়। করপোরেট, কমার্শিয়াল, এসএমই, রিটেইল ও কৃষি খাতের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকিগুলো অনেক বেশি কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

অবশ্য এই বৈচিত্র্যকরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার। দেশব্যাপী শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী উপস্থিতি এবং সারা দেশের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করার মতো কাজগুলো খুব সহজ নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে এটিই সবচেয়ে টেকসই পথ।

একই সঙ্গে এই প্রবৃদ্ধিকে সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে ঋণ বিতরণের প্রতিটি সিদ্ধান্ত একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো, কঠোর মূল্যায়ন এবং শক্তিশালী আন্ডাররাইটিং মানদণ্ডের আলোকে নিতে হয়। পাশাপাশি ধারাবাহিক পোর্টফোলিও মনিটরিং থাকলে ভবিষ্যতের উদীয়মান ঝুঁকিও আগে থেকে চিহ্নিত করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

ব্র্যাক ব্যাংকে আমরা আমানতের প্রবৃদ্ধি এবং সম্পদের গুণগত মানকে দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় হিসেবে দেখি না, বরং একে অপরের পরিপূরক মনে করি এবং এসব আমানত ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকি। মূলত করপোরেট সুশাসন, ঋণ শৃঙ্খলা এবং বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিওর মেলবন্ধন থাকায় আমাদের আমানত প্রবৃদ্ধি ব্যাংকের সম্পদের মানকে উন্নত করার পাশাপাশি ব্যালেন্স শিটকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

খবরের কাগজ: পুরো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ যেখানে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে আপনার ব্যাংক কীভাবে সম্পদের গুণগত-মান বজায় রাখতে পেরেছে?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: এর অন্যতম কারণ হলো, বাজারের পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, আমরা কখনো আমাদের মূল নীতিমালার সঙ্গে আপস করি না। ব্র্যাক ব্যাংক শুরু থেকেই সুশাসন, আন্তর্জাতিক মান মেনে চলা এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা থেকে কখনো সরে না এসে সম্পদের শক্তিশালী গুণগত মান বজায় রাখার মতো মূল ভিত্তিগুলো মেনে চলেছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা এখানে অটল থেকেছি। 

বাজার মাঝেমধ্যে লোভনীয় সুযোগ সামনে নিয়ে আসে। তবে আমাদের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সরে এসেছি। ফলে সাময়িকভাবে আমাদের মুনাফা কিছুটা কম হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটিই আমাদের সম্পদের গুণগত মানকে সুরক্ষিত রেখেছে। এ ছাড়া একটি ব্যাংক জনগণকে সাধারণ ব্যাংক সেবার বাইরে গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে কতটুকু ভূমিকা রাখছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এভাবেই ব্র্যাক ব্যাংক আজ দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

খবরের কাগজ: নিরাপদ ব্যাংক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ও সাইবার সিকিউরিটির গুরুত্ব কেমন? ব্র্যাক ব্যাংক কীভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে?

তারেক রেফাত উল্লাহ খান: একটি ব্যাংক কতটা নিরাপদ, তার একটা বড় অংশ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ডিজিটাল অবকাঠামোর সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। কারণ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট তথ্য, লেনদেনের ইতিহাস, ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে শুরু করে সবকিছুই এখন ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হয়। ফলে সাইবার নিরাপত্তা এখন ব্যাংকের মূল দায়িত্বের অংশ।

ব্র্যাক ব্যাংক এই বাস্তবতাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আমরা গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের পদ্ধতি অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন নিশ্চিত করি, যাতে অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকানো যায়। একই সঙ্গে আমাদের ডেটা এনক্রিপশন ও ডেটা লস প্রিভেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের জন্য আমরা এসওসি, এসআইইএম এবং এসওএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, যাতে যেকোনো অস্বাভাবিক কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সব রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা হচ্ছে।

গ্রাহকদের সাইবার ঝুঁকি ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পরিচালিত হচ্ছে। কারণ প্রযুক্তিগত সুরক্ষা যতটা জরুরি, গ্রাহকের সচেতনতাও ততটাই জরুরি।

ব্র্যাক ব্যাংক এখানেই থেমে নেই। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে– থ্রেট ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক অ্যানালিটিক্স ব্যবহার, ইনসিডেন্ট রেসপন্স সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত ভিএপিটি ও রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম সম্প্রসারণ।

সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্সেও আমরা প্রস্তুত। আমাদের নিজস্ব সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমের যেকোনো ফিশিং, ম্যালওয়্যার ও ডেটা ব্রিচের মতো হুমকিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। বিজনেস কন্টিনিউটি ম্যানেজমেন্ট ও ডিজাস্টার রেসপন্স সক্ষমতাও আমরা নিশ্চিত করেছি। সব মিলিয়ে, ডিজিটাল নিরাপত্তাকে ব্র্যাক ব্যাংক সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই বিবেচনা করে।

আমাদের স্যার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩৭ এএম
আমাদের স্যার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের দোতলার পশ্চিম দিকটার নির্ধারিত কক্ষে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের ক্লাস। ক্লাসটা আমাদের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের। বিষয় শেক্‌সপিয়রের নাটক হ্যামলেট। স্যার পড়াচ্ছেন না বলে বলা ভালো, সেমিনারে বক্তৃতা দিচ্ছেন। কক্ষ-করিডর ভরে গেছে অন্য বিভাগের অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ভিড়ে, হাজিরা খাতায় থাকা নাম ডাকার সুযোগ নেই। বক্তৃতার বিষয় হ্যামলেট, শেক্‌সপিয়রের কালজয়ী বিয়োগান্তক নাটক। এলসিনরের প্রাসাদে যুবরাজ হ্যামলেট তার মায়ের দ্বিচারিতায়, তার চাচা ক্লডিয়াসের চাতুর্যে প্রাসাদ দখল দ্বিমুখীনতায় ত্যক্তবিরক্ত, বিব্রত ও বিভ্রান্ত। তার সামনে ওফেলিয়ার প্রেম। সংশয় সন্দেহ। ‘ফ্রেইলটি দ্যাই নেম ইজ ওম্যান’–হ্যামলেট তার মা কুইন গার্টুডের ওপর ক্ষোভ ও হতাশা থেকে এই স্বগতোক্তিটি করেছিলেন। মানসিক দ্বন্দ্ব। টু বি অর নট টু বি দ্যাট ইজ দ্য কোশ্চেন। হ্যামলেটের এ প্রশ্ন তাবৎ দুনিয়ার সব সম্ভাবনাময় মানুষের সামনে। বইয়ের পাতা থেকে প্রসঙ্গ চলে এল সমাজ, সংসার রাজনীতি এমনকি পুঁজিবাদের মধ্যকার অসঙ্গতিগুলোর ক্ষেত্রেও। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে সবাই। স্যারের একক সেমিনারে হ্যামলেট নাটকের সেই সর্বজনীন স্বগোতোক্তি টু বি অর নট টু বির ব্যাখ্যা ডালপালা ছড়াচ্ছে। আপাতত সে সময় আমাদের ক্লাসে। বর্তমানে বিশ্ব সংসারে। 

আমরা তখন আশির দশকের একেবারে গোড়ার বাংলাদেশে। পঁচাত্তরের পট-পরিবর্তনের পর বহুদলীয় গণতন্ত্র যাত্রার কৈশোরকাল। আমরা হতে চেয়েছিলাম ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি কিংবা কলেজে। শিক্ষক হব তার মতো, ক্লাসে সবাইকে সম্মোহিত করব তার মতো। পারলে কলম ধরব পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। মাইনে ছাড়া মার্কসের ভাবশিষ্য বনে যাব। স্যার উপদেশ দিলেন–‘না। তোমরা ডেপুটিদের দলে ঢুকে পড়ো’। অর্থাৎ সরকারি আমলা হও। কেননা, যুক্তি দিলেন তিনি–আসন্ন সমাজে এই শিক্ষক সেই শিক্ষক হতে পারবে না। কেননা, দূরদৃষ্টিতে দেখছেন তিনি, পুঁজিবাদের মন্ত্রতন্ত্র শিক্ষক সমাজে ঢুকে গেছে ইতোমধ্যে। নানা প্যাঁচ-পোঁচ, এগেইন টু বি অর নট টুবির ফ্যাসাদে, প্রাসাদে। শিক্ষকতার মানমর্যাদা নিয়ে মফস্বল কলেজে ইংরেজির প্রভাষক হয়ে টিকতে পারবে না। অনার্স পাস করে এমএর প্রান্তিক পর্যায়ে আমরা, ১৯৭৯ সালে, তখনো বছর বছর বিসিএস দেওয়ার চল চালু হয়নি। অতএব, অনার্স পাস করেই বিসিএস দাও, দিলাম। আমাদের ক্লাসের ৩০ জনের মধ্যে ২৯ জনই বিসিএসে প্রবেশিলাম। টু বি অর নট টুবি করতে করতে দেশের সর্বোচ্চ আমলা হলাম অনেকেই। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গিয়ে, মব না হয়েও কলম ধরতে স্যারের সহযাত্রী হলাম। কিন্তু তেমন কিছু করতে পারলাম কই। তবে কিছু তো হয়েছে বা হচ্ছে। মার্কিনিদের মধ্যে তো অনেকে যেমন পুঁজিবাদের পোষ্যপুত্র ইলন মাস্ক দুনিয়ার সেরা ধনী হচ্ছে, মেলিন্ডা ও বিল গেটস টাকা রাখার জায়গা পাচ্ছে না। কিন্তু মার্কিনিদের মাতবরির বিশ্বব্যাপী বদনাম থামানো যাচ্ছে না। শেষমেষ ফুটবল খেলায় মাতিয়ে পুঁজিবাদের পতন কিংবা বোধন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। ইরানি দলের সঙ্গে উপেক্ষার প্রেক্ষাপট পাল্টানো যাচ্ছে না। এদিকে পুঁজিবাদের জাত শত্রু রাশিয়া ও চীন এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থানে। টু বি অর নট টু বি।

নতুন দিগন্ত পত্রিকায় স্যারের সম্পাদকীয় এখনো দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিশাল। আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে কত কিছু সম্পাদকীয় স্তম্ভে ভিড় জমাচ্ছে। জাতীয় দৈনিকগুলোয় স্যার বিস্তর লেখালেখি করেছেন। সেসব পুনরোক্তি হলেও তিনিই এখন একমাত্র বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর;  দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, সামাজিক সংহতি এবং বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলার ক্ষেত্রে  তিনিই এখন আমাদের বাতিঘর, মেন্টর। 

একজন সমাজসচেতন বুদ্ধিজীবী হিসেবেও স্যার সক্রিয়। বিভিন্ন অন্যায় ও অসংগতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। একজন যথার্থ বুদ্ধিজীবীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি সচেতন। শুধু অবগত নন, নিজে সেই বৈশিষ্ট্যের ধারকও। 

মননচর্চার ক্ষেত্রে স্যারের ক্ষেত্র সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, সংস্কৃতি এমনকি অর্থনীতি পর্যন্ত তার কৌতূহল বিস্তৃত। লেখকজীবনের শুরু থেকেই সাম্যবাদী জীবনদর্শনের প্রতি তার আনুগত্য। এ দর্শন থেকেই তিনি সমাজদেহের বিভিন্ন রোগের অনুসন্ধান করেন। রোগের কারণ হিসেবে প্রায়ই শনাক্ত করেন পুঁজিবাদকে। রোগ নিরাময়ের পদ্ধতি নিয়ে নানা মত থাকতে পারে; কিন্তু রোগ নির্ণয়ে তার অধ্যবসায় বহমান। 

স্বতন্ত্র ভাষাশৈলীর কারণে স্যারের লেখা সহজেই শনাক্ত করা যায়, চেনা তো যায়ই। গুরুগম্ভীর, গুরুত্বপূর্ণ কিংবা জটিল কোনো বিষয়ের অবতারণা করেন গল্পের ভঙ্গিতে। বলার ভঙ্গি একই সঙ্গে সরল ও সরস। এমনকি শিরোনাম কখনো কখনো কাব্যিক ব্যঞ্জনামণ্ডিত। 

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী জীবনদর্শনে আস্থাবান আমাদের স্যার বরাবরই তার লেখনিতে দার্শনিক গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছেন। তার সব রচনার দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার সৃষ্টিশীল জীবন ও সামাজিক কর্মতৎপরতা এ সাক্ষ্য দেয়। 

দর্শনের অপরিহার্যতাকে স্বীকার করেন বলেই স্যার ‘সাহিত্যের দর্শনানুসন্ধান’ করে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন ‘সাহিত্যকে বাদ দিয়ে দর্শন চলতে পারে, কিন্তু দর্শনকে বাদ দিয়ে সাহিত্য চলতে পারে না।’ সাহিত্য মানুষের ভেতরে সংবেদনশীল সত্তাকে জাগিয়ে রাখে। তাই সাহিত্য শ্রেণিবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী। বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় বাংলা সাহিত্যে রাষ্ট্রবিরোধিতার পরিচয় যৎসামান্য। ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের পেছনে সাহিত্যের যেমন বড় ভূমিকা ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেক্ষাপটে সাহিত্য তেমন বড় ভূমিকা পালন করেনি। রাষ্ট্রের সঙ্গে সাহিত্যের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক স্পষ্ট করতে না পারা সাহিত্যের একটি দুর্বলতা। এ কারণেই স্যার বরাবরই প্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনেন সমাজ ও রাজনীতিকে। সংস্কৃতি ও স্বাধীনতাকে তিনি পরিপূরক মনে করেন। সংস্কৃতির বিকাশ ও পরাধীনতা পরস্পরবিরোধী। সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য যে মূল্যবোধ ও আত্মপ্রকাশ প্রয়োজন তা স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়। সংস্কৃতিসেবীদের মনে স্বাধীনতার অনুপস্থিতি সংকট বৃদ্ধি করে। দারিদ্র্য নিঃসন্দেহে এ দেশের বড় সমস্যা। কিন্তু দৈন্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, চিন্তার ক্ষেত্রেও। তাই তিনি প্রত্যাশা করেন সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বরাবরই নির্ণয়কের ভূমিকা পালন করেছে। তার মতে, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য মধ্যবিত্তের দ্বারা, মধ্যবিত্তকে নিয়ে এবং মধ্যবিত্তের জন্য রচিত।’ তনি মনে করেন সমষ্টিগত জীবনকে যথার্থভাবে ধারণ করতে না পারা সাহিত্যের ব্যর্থতা। এর মূলে রয়েছে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকট।

স্যারকে ৯১তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

গ্রাহক আস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় সাফল্যের চূড়ায় পূবালী ব্যাংক

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ১০:০১ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ১০:১১ এএম
গ্রাহক আস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় সাফল্যের চূড়ায় পূবালী ব্যাংক
খবরের কাগজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী। ছবি: খবরের কাগজ

দেশের ব্যাংক খাত যখন উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধনসংকট ও আস্থাহীনতার চাপে টালমাটাল, তখন ব্যতিক্রম হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক। 

চ্যালেঞ্জপূর্ণ বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও ২০২৫ সালে শক্তিশালী আর্থিক প্রবৃদ্ধি, সুদৃঢ় সম্পদমান, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকটি। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে, কোনো ধরনের প্রভিশন ঘাটতি নেই, মূলধন পর্যাপ্ততা দেশের অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে এবং ধারাবাহিকভাবে ভালো মুনাফা ও লভ্যাংশ প্রদান–এসব সূচকে ইতিবাচক ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি। সুশাসন, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমেই এমনটি সম্ভব হয়েছে বলে জানান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আলী।

খবরের কাগজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, গ্রাহকের আস্থা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলনের ফলে গত তিন বছরে পূবালী ব্যাংক শুধু ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিই অর্জন করেনি, বরং শেয়ারহোল্ডারদের জন্যও উল্লেখযোগ্য মূল্য সৃষ্টি করেছে। ২০২২ সালে যেখানে ব্যাংকের শেয়ারদর ১৬ থেকে ২০ টাকার মধ্যে অবস্থান করছিল, বর্তমানে তা ৩৭ টাকারও ঊর্ধ্বে উন্নীত হয়েছে। একইসঙ্গে ধারাবাহিক স্টক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এক হাজার ৫৬০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা শেয়ারহোল্ডারদের অংশীদারত্বের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকের মূলধনী ভিত্তিকেও আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে ২০২২ সালের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের বাজারমূল্য তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, গ্রাহকের আস্থা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পূবালী ব্যাংক সুশাসন, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মূল্য সৃষ্টি করে যাচ্ছে।

মোহাম্মদ আলী বলেন, পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পূবালী ব্যাংক শুধু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। শাখাভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে ব্যাংকটি একটি শক্তিশালী ‘ফিজিটাল ব্যাংকিং ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলছে, যেখানে গ্রাহক তার পছন্দের মাধ্যমে, সুবিধাজনক সময়ে এবং নিরাপদ উপায়ে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।

ডিজিটাল রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পিআই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ২০২৫ সালের শেষে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২৭৬ জন সক্রিয় ব্যবহারকারী অর্জন করেছে। প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে মোট ১ দশমিক ৮৬ কোটি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। বছরওয়ারি হিসাবে ব্যবহারকারী বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৮ শতাংশ এবং লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৫ শতাংশ, যা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন।

ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সালে মার্চেন্ট পিওএস টার্মিনাল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৫২৫-এ এবং ১ দশমিক ৪৫ লাখেরও বেশি বাংলা কিউআর স্থাপনের মাধ্যমে নগদহীন লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও বিস্তৃত করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার বেড়েছে।

পূবালী ব্যাংকের বিস্তৃত নেটওয়ার্কও এই রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের ৫১৭টি শাখা, ২৭৪টি উপশাখা, ২২টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো এবং ৯০১টি এটিএম/সিআরএম কার্যকর ছিল। সেল্ফ সার্ভিস ব্যাংকিং ও ডিজিটাল অনবোর্ডিং সুবিধা গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিংকে আরও দ্রুত, সহজ ও স্বনির্ভর করেছে।

আর্থিক সূচকেও ব্যাংকটি শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, ২০২৫ সালে ব্যাংকের মোট সম্পদ ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিম বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ১৪০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। একই সময়ে একীভূত পরিচালন মুনাফা ২ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। শেয়ারহোল্ডার ভ্যালুর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ন্যূনতম সীমার চেয়ে অনেক বেশি এবং ব্যাংকের মূলধনী শক্তি ও স্থিতিশীলতার পরিচায়ক।

শুধু তা-ই নয়, অ্যাসেট কোয়ালিটির ক্ষেত্রেও পূবালী ব্যাংক শিল্প খাতের তুলনায় ব্যতিক্রমী অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ, যেখানে খাতভিত্তিক গড় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ডাটা-নির্ভর মনিটরিং, বিচক্ষণ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও পূবালী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত রপ্তানি ব্যবসা ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা, আমদানি ব্যবসা ৪৭ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স ১১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ব্যাংকের সেবার মান, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহক আস্থার প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ আলী। 

তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইএসজি ও টেকসই উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে পূবালী ব্যাংক। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় ৩০ শতাংশ টেকসই অর্থায়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী বলেন, ২০২৬-২০২৮ কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় পূবালী ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ব্যাংকিং মডেল বাস্তবায়নে কাজ করছে। ২০২৬ সালে ব্যাংকটি একটি বছরব্যাপী ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করবে, যার মাধ্যমে রিটেইল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং করপোরেট খাতে ডিজিটাল লেনদেন আরও সম্প্রসারিত হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবার বাইরে রয়েছে। শাখার বিস্তৃতি, উপশাখা, সেল্ফ সার্ভিস পয়েন্ট, পিআই অ্যাপ এবং বাংলা কিউআরের সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা গ্রাহকদের সেবার আওতাভুক্ত করার  লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে দেশের আরও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে চায় পূবালী ব্যাংক। মোহাম্মদ আলীর মতে, প্রযুক্তিনির্ভর, নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিংই ভবিষ্যতের পথ। ঐতিহ্য, সুশাসন, উদ্ভাবন এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার সমন্বয়ে পূবালী ব্যাংক আগামী দিনগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।