অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরস্পরের ‘অল্টার ইগো’। তার ভাষায়, এরা মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ। তিনি মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ টিকে থাকলে জামায়াতও থাকবে এবং জামায়াত থাকলে আওয়ামী লীগও টিকে থাকবে। এই পারস্পরিক অস্তিত্বের সম্পর্ক অক্ষুণ্ন থাকলে দেশে নতুন কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক-এর ইউটিউব চ্যানেলে গত বৃহস্পতিবার প্রচারিত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। আসন্ন নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনেও এই রাজনৈতিক সমীকরণই মূল কারণ বলে জানান তিনি।
মাহফুজ আলম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি তরুণ শক্তিগুলোকে একত্র করে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় বিকল্প’ বা থার্ড অল্টারনেটিভ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তার মতে, নতুন প্রজন্মের রাজনীতি পুরোনো দলীয় কাঠামোর বাইরে গিয়ে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারত। তবে সেই সম্ভাবনা আর বাস্তবায়ন হয়নি। এনসিপি যখন পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন করে, তখন তার ভাষায়, তৃতীয় শক্তি গড়ার স্বপ্ন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে মাহফুজ আলম বলেন, যাদের সঙ্গে জোট করা হয়েছে, তারা সবাই পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ। জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট করলে এমন বহু প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে, যার কোনো সন্তোষজনক উত্তর নেই। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশকে নিয়ে জামায়াতের কোনো সুস্পষ্ট ভিশন বা পরিকল্পনা নেই। নীতিগত, সামাজিক ও শ্রেণিগত বহু বিষয়ে তাদের অবস্থান অস্পষ্ট এবং এই আদর্শিক দুর্বলতার কারণে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে জামায়াতের কোনো টেকসই মেলবন্ধন সম্ভব নয়।
একপর্যায়ে তিনি হতাশা ও আক্ষেপ প্রকাশ করেন। মাহফুজ আলম বলেন, গত দেড় বছরের রাজনৈতিক যাত্রা ছিল এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার অভিজ্ঞতা। তার দৃষ্টিতে, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুন মোড়কে আবার ফিরে আসছে, যা আন্দোলনের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভবিষ্যৎ সরকার ব্যবস্থা নিয়েও সতর্কবার্তা দেন তিনি। মাহফুজ আলম বলেন, ক্ষমতায় যে দলই আসুক– বিএনপি কিংবা জামায়াত, সমাজের ভেতরে জমে থাকা ক্ষত সারাতে না পারলে কোনো সরকারই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে না। তার মতে, শুধু কাগজে-কলমে সংস্কার যথেষ্ট নয়। সমাজে ভিন্নমত ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যদি সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া বা নতুন করে ‘রিনেগোসিয়েশন’ না হয়, তাহলে মব ভায়োলেন্স ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে।
সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন মাহফুজ আলম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বর্তমানে গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করে না। এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হলে গণমাধ্যমকে তাদের অতীত ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনার জায়গায় যেতে হবে এবং জনগণের সঙ্গে এক ধরনের বোঝাপড়া ও দায় স্বীকারের প্রক্রিয়ায় আসতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ এবং আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে জানান, তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না এবং কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ারও পরিকল্পনা নেই। তার ভাষায়, এটি নির্বাচনে যাওয়ার উপযুক্ত সময় নয়। বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর জোটকে তিনি আদর্শগতভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন।
বর্তমানে রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে আছেন মাহফুজ আলম। সময় কাটাচ্ছেন বই পড়ে এবং হতাশ তরুণদের সঙ্গে কথা বলে। রাজনৈতিক সংলাপ ও পাঠচর্চার মাধ্যমে তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন, কেন জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি এবং সামনে বাংলাদেশের জন্য কোন ধরনের পথরেখা প্রয়োজন।
মাহফুজ আলমের মতে, একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে শুধু রাজনৈতিক সংস্কার নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। সমাজের সঙ্গে নতুন করে সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া বা পুনর্নেগোসিয়েশন ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।