কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থাকাকালে তিনি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বাজার ব্যবস্থাপনা, বাজার নিয়ন্ত্রণে মধ্যস্বত্বভোগীদের অবস্থা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র সহসম্পাদক শেহনাজ পূর্ণা
খবরের কাগজ: সরকারের বর্তমান বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট কিনা?
এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: আমার দৃষ্টিতে সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনায় কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। সরকার রমজান সামনে রেখে শুল্ক ও ভ্যাট কমানো, আমদানি সহজ করা এবং টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির মতো উদ্যোগ নিয়েছে এটি প্রশংসনীয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এসব উদ্যোগের সুফল ভোক্তার কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না। রমজানের আগে সরকার ভোজ্য তেল ও চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার কথা বললেও বাস্তবে খুচরা বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়তে দেখা গেছে। অনেক এলাকায় টিসিবির পণ্য সীমিত সংখ্যক মানুষ পেয়েছে, কিন্তু সাধারণ বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এতে বোঝা যায়, পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে।
খবরের কাগজ: অভিযোগ আছে, সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, এর কারণ কী মনে করেন?
এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে এমন অভিযোগ পুরোপুরি অমূলক নয়। এর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত ও বাস্তব কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা পর্যাপ্ত শক্তিশালী নয়। দ্বিতীয়ত, অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট অনেক সময় আগেভাগে পণ্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, যা সরকার সময়মতো শনাক্ত করতে পারে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম স্থিতিশীল বা কম থাকলেও দেশে হঠাৎ করে ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে যায়। পরে দেখা যায়, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দাম না বাড়ালেও ব্যবসায়ীরা আগেভাগে বাড়তি দামে বিক্রি শুরু করেছে। এ পরিস্থিতি দেখায় যে, সরকারের সিদ্ধান্তের চেয়ে বাজারে অসাধু গোষ্ঠীর প্রভাব বেশি কাজ করছে।
খবরের কাগজ: বাজার নিয়ন্ত্রণে মধ্যস্বত্বভোগীরা একটা বড় বাধা, আপনিও কি তা মনে করেন?
এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: হ্যাঁ, বাজার নিয়ন্ত্রণে মধ্যস্বত্বভোগীরা একটি বড় ও কাঠামোগত বাধা বলে মনে করি। উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছাতে একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত থাকায় পণ্যের দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। এতে একদিকে উৎপাদক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে ভোক্তাকে অতিরিক্ত দাম দিতে হয়।
কৃষক পর্যায়ে যখন কাঁচা মরিচ, শাকসবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্য তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়, তখন শহরের খুচরা বাজারে সেই একই পণ্য কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা যায়। এর মাঝখানে ফড়িয়া, আড়তদার ও পাইকার প্রতিটি স্তরে পণ্যের শুধু হাত বদল হয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো মূল্য সংযোজন না করেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
বিশেষ করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এ প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে। রমজান, কোরবানির ঈদ বা অন্যান্য উৎসবকে সামনে রেখে কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী বাজারে ঢুকে পণ্য কিনে একাধিকবার হাত বদল ঘটিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করে। এতে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও দামের ওপর অস্বাভাবিক চাপ পড়ে। রমজানের আগে ছোলা, চিনি বা ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমদানি ও মজুত স্বাভাবিক থাকার পরও বাজারে দাম বাড়ে। মধ্যস্বত্বভোগী ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পণ্য ধরে রেখে ধাপে ধাপে বাজারে ছাড়ে, ফলে দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আমার মতে, উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ বাড়ানো, মৌসুমি ও অনিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম তদারকির আওতায় জরুরি। মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা সীমিত না করলে বাজারে ন্যায্যমূল্য ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
খবরের কাগজ: জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হয়, এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: জিনিসপত্রের দাম বাড়ার পেছনে বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব সমস্যা। যদিও বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচসহ একাধিক কারণ থাকতে পারে, তবে বাস্তবে দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে এসব কারণ না থাকলেও স্থানীয় বাজারে হঠাৎ করে দাম বেড়ে যায়। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, বাজারে কিছু প্রভাবশালী অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে দাম বাড়িয়ে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে বড় আমদানিকারক ও মজুদকারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এ পর্যায়ে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী একসঙ্গে পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে দেয় বা গুদামে পণ্য ধরে রেখে ধাপে ধাপে বাজারে ছাড়ে, তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এ সংকট বাস্তব না হলেও সাধারণ ভোক্তার কাছে তা বাস্তব সংকট হিসেবে প্রতীয়মান হয় এবং তারা বাড়তি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হয়।
উদাহরণ হিসেবে ভোজ্য তেল, চিনি ও ডালের বাজারের কথা বলা যায়। অনেক সময় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম স্থিতিশীল বা কম থাকলেও দেশের বাজারে দাম বাড়ছে। পরে জানা যায়, কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী একসঙ্গে দাম সমন্বয় করে নিয়েছে বা সরবরাহ সীমিত রেখেছে। এতে খুচরা ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ ভোক্তা।
মূল্যবৃদ্ধির দায় শুধু সিন্ডিকেটের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। সরকারের দুর্বল নজরদারি, সময়মতো তথ্য প্রকাশ না হওয়া এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াও সিন্ডিকেটকে শক্তিশালী করে তোলে। কার্যকর বাজার মনিটরিং ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর এ অস্বাভাবিক প্রভাব অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সার্বিকভাবে বলা যায়, বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রাখছে এবং ভোক্তা-স্বার্থ রক্ষায় এ সিন্ডিকেট ভেঙে কার্যকর প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিমূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
খবরের কাগজ: মুসলিম দেশগুলোতে রমজানের সময় দ্রব্যমূল্য কমানো হয়, আমাদের দেশে কেন বেড়ে যায়?
এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: রমজানকে ঘিরে বাংলাদেশে একটি ভিন্নধর্মী ব্যবসায়িক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনেক দেশে রমজানকে কেন্দ্র করে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দাম কমানো হয়, কিন্তু আমাদের দেশে রমজানকে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। রমজানের আগেই খেজুর, ছোলা, তেল ও চিনি এই পণ্যগুলোর দাম বাড়তে শুরু করে। অথচ এই চাহিদা নতুন নয়; প্রতি বছরই রমজানে চাহিদা বাড়ে। আগাম প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়ার অর্থ হলো এটি বাজার ব্যবস্থাপনার নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতার সংকট।
খবরের কাগজ: রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী?
এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কোনো সাময়িক বা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের বিষয় নয় বরং এটি একটি পরিকল্পিত, সমন্বিত এবং দায়িত্বশীল বাজার ব্যবস্থাপনার ফল। প্রতি বছর রমজানকে ঘিরে যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ে, সেগুলোর বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আগাম প্রস্তুতি থাকা অত্যন্ত জরুরি। যদি রমজানের অনেক আগেই প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, মজুত ও পরিবহন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হঠাৎ চাহিদা বাড়লেও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ কমে যায়। বাস্তবে দেখা গেছে, যেসব পণ্যের সরবরাহ আগে থেকেই পর্যাপ্ত থাকে, সেগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।
রমজানে বাজার তদারকি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে নিয়মিত ও দৃশ্যমান মনিটরিং থাকতে হবে। যখন বাজারে মোবাইল কোর্ট ও তদারকি কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হয় এবং ব্যবসায়ীদের দামের তালিকা প্রদর্শনে বাধ্য করা হয়, তখন অতিরিক্ত দাম আদায়ের প্রবণতা কমে আসে। বিপরীতে, নজরদারি দুর্বল হলে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সাধারণ ভোক্তাকে বাড়তি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য করে।
রমজানে দাম বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো মজুতদারি, সিন্ডিকেট এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের তৎপরতা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় পণ্য আগেভাগে গুদামে ঘরে রেখে ধাপে খাপে বাজারে ছাড়া হয়, যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দাম বাড়ে। এসব কর্মকাণ্ড চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা না গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অন্য ব্যবসায়ীরাও অনৈতিকভাবে দাম বাড়াতে নিরুৎসাহিত হবে।
এ ছাড়া পণ্যের একাধিক হাত বদল রমজানে দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। কৃষক বা উৎপাদক পর্যায়ে যে পণ্য তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়, তা শহরের বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কয়েক গুণ দাম বেড়ে যায়। এ অবস্থায় উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কৃষিপণ্য সরাসরি উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগী ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ কমে যাবে এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
সরকারি বিক্রয় ব্যবস্থাকে রমজানে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। টিসিবি ও অনুরূপ উদ্যোগগুলো যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য নিয়ে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকে, তাহলে খোলা বাজারে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
সবশেষে, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, রমজান শুধু ব্যবসার মৌসুম নয়; এটি সংযম, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের মাস। যদি ব্যবসায়ীরা এ সময় অতিরিক্ত মুনাফার পথ পরিহার করে ন্যায্য লাভে সন্তুষ্ট থাকেন এবং সরকার কার্যকরভাবে বাজার তদারকি করে, তাহলে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কোনো অসম্ভব বিষয় নয়। সম্মিলিত উদ্যোগ ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমেই ভোক্তাদের স্বস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ।