রমজান মাস এলেই সুন্নাতি ফল খেজুরের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। খুচরা বাজারে ইরাকের বস্তার কম দামের জাহিদি খেজুরের দাম বেড়ে যায়। ২০০ টাকার খেজুর আড়াই শ টাকা হয়ে গেছে। অভিজাত বা ধনী মানুষের জন্য মরিয়ম ও আজুয়ার মতো ভালো খেজুরের দাম এখনো বাড়েনি। গত বছর থেকেই খেজুরের দাম চড়া। এ জন্য সম্প্রতি সরকার শুল্ক কমিয়েছে। কারণ মানুষের অবস্থা ভালো নেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। এবারে খেজুরের দাম কি কমবে? রমজানে মানুষ খেজুর খেতে পারবে তো। এসব ব্যাপার জানতে খবরের কাগজ কথা বলেছে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর আলম।
খবরের কাগজ: গত রমজান থেকেই খেজুরের দাম বেশি। ১০ দিন পরই রমজান শুরু। বর্তমানে দাম কেমন?
সিরাজুল ইসলাম: গত বাজেট থেকেই খেজুরকে বিলাসী পণ্য হিসেবে গণ্য করে এর ওপর বিভিন্নভাবে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। তবে অ্যাসেস ভ্যালুর কারণে দাম কিছুটা কমেছে। বর্তমানে দাম কমেনি। ইরাকের বস্তার জাহিদি খেজুরের কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা ও কার্টুনের জাহিদি খেজুরের কেজি ২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কার্টুনে ৫ কেজি খেজুর থাকে। তিউনেশিয়া খেজুর ৩০০ টাকা কেজি। তবে ভালোটার দাম বাড়েনি। আগের মতোই আছে। শুক্কারি খেজুরের কেজি ৫৫০ টাকা, আজুয়া ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা, মরিয়ম ৯৪০ থেকে ৯৫০ টাকা, আম্বারা ৯০০ টাকা, মেডজুল ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খবরের কাগজ: সরকার আগামী রমজান মাস উপলক্ষে গত ২৩ ডিসেম্বর খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ৪০ শতাংশ কমিয়েছে। রমজান মাসে খেজুরের সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্বাভাবিক রাখার উদ্দেশ্যে খেজুরের কাস্টমস শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), যা আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ সুবিধা বহাল থাকবে। তাহলে কি খেজুরের দাম কমবে?
সিরাজুল ইসলাম: সরকার খেজুরের উপর শুল্ক কমিয়েছে এটা সত্য। তবে গত বছরের তুলনায় বেশি না। ২৫ থেকে ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ১০ শতাংশ সিডি (কাস্টম ডিউটি) কমিয়েছে। এতে তেমন দাম কমবে না। কারণ হচ্ছে গত বারের তুলনায় শুল্ক কম কমেছে। ডলারের দামও ১৫ থেকে ১৮ টাকা বেড়েছে। কাজেই কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এবারও রমজানে নাগালের বাইরে থাকবে খেজুর। গত বছরের তুলনায় কমবে না খেজুরের দাম। এবারও নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের নাগালে থাকবে না খেজুরের দাম। কারণ কম দামের খেজুরের দাম বেড়েছে। তবে মরিয়ম ও জাহিদি খেজুরের দাম কিছুটা কমেছে। তাই তারা ভালো করেই খেজুর খেতে পারবেন।
খবরের কাগজ: এবার রমজানে এলসি কেমন খোলা হয়েছে। আমদানি কেমন হচ্ছে।
সিরাজুল ইসলাম: এবার খেজুরের ভালোই এলসি খোলা হয়েছে। আমদানিও ভালো হয়েছে। চাহিদার তুলনায় বেশি আমদানি হয়েছে। রমজানে চাহিদা ৫০ থেকে ৬০ হাজার টনের মতো। আমদানি হয়েছে ৮০ হাজার টনের মতো। ইতোমধ্যে আমদানির অর্ধেক খেজুর আমাদের কাছে চলে এসে গেছে। বাকি অর্ধেক জাহাজ ও বন্দরে রয়েছে। বন্দরের কোনো সমস্যা না হলে দাম স্বাভাবিক থাকবে। টিসিবিও খেজুর আমদানি করেছে। সেগুলোও চলে এসেছে। কাজেই সমস্যা হওয়ার কথা না।
খবরের কাগজ: সরকার কি করলে খেজুরের দাম কমতে পারে। যাতে সবাই খেজুর খেতে পারেন।
সিরাজুল ইসলাম: বাংলাদেশে ফল আমদানিতে ট্যারিফ ভ্যালু খুবই বেশি। এর ফলে খেজুর আমদানিতে দাম বেশি পড়ে। তাই নতুন করে ট্যারিফ ভ্যালু নির্ধারণ করতে হবে। তবে সরকার ডিসেম্বরে কিছু শুল্ক কমিয়েছে। এর ফলে কেজিতে ৩ থেকে ১২ টাকা কমতে পারে। কম দামেরটা ৩ থেকে ৫ টাকা ও ভালো খেজুরে ১০ থেকে ১২ টাকা দাম কমবে কেজিতে। শুল্ক কমানোর পরও কম দামের খেজুরে কেজিতে ৩৫ টাকা ও ভালোগুলোতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা কর দিতে হচ্ছে। কাজেই সরকার আরও কর কমালে ভোক্তারা কম দামে খেজুর খেতে পারবেন।
খবরের কাগজ: দাম কমানোর ব্যাপারে সমিতির পক্ষ থেকে কি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন?
সিরাজুল ইসলাম: সরকার খেজুরকে বিলাসী আইটেম উল্লেখ করে অযৌক্তিক ট্যারিফ ভ্যালু আরোপ করেছে। এই সমিতির সদস্য ৫০০-এর মতো। সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। তাই ভোক্তাদের কথা চিন্তা করে আমরা সমিতির পক্ষ থেকে এনবিআর, ট্যারিফ কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাবি জানিয়েছি, যেন যৌক্তিক পর্যায়ে শুল্ক আরোপ করা হয়। মিলেমিলে কাজ করতে পারি। কারণ আরও শুল্ক ও ট্যারিফ ভ্যালু না কমালে খেজুরের দাম কমবে না।
খবরের কাগজ: রমজানে খেজুরের চাহিদা কেমন?
সিরাজুল ইসলাম: অন্যান্য মাসে ৫ হাজার টন খেজুর লাগে। তবে রমজান মাসে এই পণ্যটির চাহিদা বহু গুণ বেড়ে যায়। কারণ ধনী-গরিব সবাই সুন্নাতি ফল খেজুর দিয়ে ইফতার করেন। এ জন্য বিভিন্ন দামের খেজুর আমদানি করা হয়। ইরাকের বস্তার জাহিদি খেজুর বর্তমানে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। সেটা বাজারে কিছু বেশি দামে খুচরা ব্যবসায়ীরা বিক্রি করেন, যা দিয়ে গরিব মানুষ ইফতার করেন। আবার ধনী মানুষের জন্য মরিয়ম ও আজুয়ার মতো ভালো খেজুরও আমদানি করা হয়। যা ৯৫০ টাকা থেকে ১৪০০ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। তবে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
খবরের কাগজ: রমজানে ভোক্তারা কম দামে কীভাবে খেজুর খেতে পারবেন?
সিরাজুল ইসলাম: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রমজানে পণ্যের দাম কমায়। আমাদের দেশে তা ভিন্ন চিত্র। তবে খেজুরে সরকার শুল্ক কমালে কম দামে খেতে পারবেন। এ ছাড়া ১০০ শতাংশ মার্জিন দিয়ে ব্যাংকে এলসি খুলতে হচ্ছে। এটা কমালে আমরাও কম দামে বেশি আমদানি করতে পারি। বর্তমানে বাড়তি শুল্কের কারণে ফলের যে দাম তাতে রমজানে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের পাতে জুটবে না খেজুর। স্বাদ থাকলেও সাধ্য হবে না তাদের। এর ফলে গরিবরা আরও পুষ্টিহীনতায় ভুগবে।