জুলাই বিপ্লবে নিহত ফয়সাল আহমেদ শান্ত’র মা-বাবা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে শান্তর মা কহিনুর আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, আমার কলিজার ধনকে এভাবে হারাবো কল্পনাও করিনি। ছেলের লেখাপড়ার কথা চিন্তা করে বরিশালে যায়নি। নিজে কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করছিলাম।
খবরের কাগজের কাছে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজ আমার স্বপ্ন অর্থাৎ আমার ছেলেসহ অন্যান্য শহিদদের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতা, আরাম-আয়েস পেয়েছে। আমাদেরকে নিয়ে তাদের আর ভাবার সময় নেই।
শান্তর মা কহিনুর বেগম জানান, সময় যত গড়াচ্ছে তারা তত আশাহীন হয়ে পড়ছেন। ভরসাহীন হয়ে পড়ছেন। এমনকি দুই মাস পর তারা কোথায় থাকবেন তাও জানেননা। কারণ সিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে তাদের এককালিন দেড় বছরের বাসা ভাড়া দিয়েছিল। আর দুইমাস পর সেই মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এরপর তারা বাসা ভাড়া কোথায় পাবেন এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
তিনি জানান, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী যখন আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তখন আমরা তাকে সরকারি বাসা বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়েছিলাম। উপদেষ্টা তৎকালীন জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে তিন দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। উপদেষ্টা চলে যাওয়ার পর জেলা প্রশাসক আমাদেরকে আর পাত্তা দেননি।’
পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে শান্তর মা বলেন, ‘আমাদের বাসায় এখন বিভিন্ন ধরনের লোকজন আসা শুরু করেছে। কিছুদিন আগেও একজন এসে তাকে মামলা থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলেছেন। অথচ বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের ব্যাপার। আমি কি চাইলেও কাউকে বাদ দিতে পারি? এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এসব লোক আমাদের জন্য বিপজ্জনক। তিনি সরকারের কাছে জানমাল এবং আর্থিক নিরাপত্তা চান।’
শান্তর বাবার জন্য সরকারি চাকরির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি একটি স্কুলে চাকরি করেন। কিন্তু সেখান থেকে যে বেতন পান তা দিয়ে মেয়ের লেখাপড়া এবং সংসার চালানো কঠিন।’
শান্তর হত্যা মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে মামলাগুলোর যে গতি ছিল এখন তা নেই। আগামি ৪ আগস্ট সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ঢাকায় যাওয়ার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আমিনুর রশিদ খবরের কাগজকে জানান, গত জানুয়ারীতে ২২ জনের নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদন ট্রাইবুনালে জমা দেওয়া হয়েছে। মামলাটি এখন বিচারাধীন। সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর গ্রামের জাকির হোসেন সিইপিজেডে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে শান্ত ও তার বোন মা বাবার সঙ্গে লালদিয়ার চর এলাকায় থাকতেন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালালে শান্তর বাবা নিজের জন্মস্থান বরিশালে গিয়ে নতুন ব্যবসা শুরু করেন। তবে শান্ত এবং তার বোন মায়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে যান। এখানেই লেখাপড়া করেন। শান্ত চট্টগ্রামের বাকলিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন ওমরগণি এমইএস কলেজের (অনার্স) ম্যানেজমেন্ট বিভাগে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মঙ্গলবার চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহর চত্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ছাত্ররা একত্রিত হয়। সেখানে শান্তও
ছিলেন। বিকেল ৪টার দিকে ষোলশহর ২নং গেইট এলাকায় অতর্কিত হামলা গুলিতে নিহত হন শান্ত।
এদিকে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শান্ত’র মাকে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে চাকুরি পান। সেখানে তার বোন সুমাইয়া জান্নাত বৃষ্টি নবম শ্রেণিতে পড়ে। পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায় থাকেন তারা।
রিফাত/