আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম হলো আমাদের পরম বন্ধু, যা বাইরের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস থেকে আমাদের রক্ষা করে। কিন্তু কেমন হবে যদি এই পরম বন্ধুই হঠাৎ শত্রুর মতো আচরণ শুরু করে? চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি জটিল অবস্থার নাম লুপাস। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সুস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও টিস্যুকে আক্রমণ করে বসে। এর ফলে শরীরের ত্বক, জয়েন্ট, রক্ত এবং কিডনি, ফুসফুস, মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে তীব্র প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন তৈরি হয়।
লুপাসের প্রকারভেদ
চিকিৎসকরা লুপাসকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করে থাকেন:
সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথেমাটোসাস: এটি লুপাসের সবচেয়ে সাধারণ রূপ। এর অর্থ হলো রোগটি কোনো একটি নির্দিষ্ট অঙ্গে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
কিউটেনিয়াস লুপাস: এই ধরনে লুপাস কেবল মানুষের ত্বকে প্রভাব ফেলে, ভেতরের অন্য কোনো অঙ্গের ক্ষতি করে না।
ওষুধজনিত লুপাস: নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সাময়িকভাবে লুপাসের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শে ওই ওষুধ বন্ধ করে দিলে এটি সেরে যায়।
নবজাতকের লুপাস: এটি অত্যন্ত বিরল। লুপাস আক্রান্ত মায়ের গর্ভজাত সন্তান এই রোগ নিয়ে জন্মাতে পারে, তবে সবার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না।
সাধারণ লক্ষণসমূহ
লুপাসের লক্ষণ একেক জনের শরীরে একেক রকম এবং ভিন্ন মাত্রায় দেখা দিতে পারে। এর লক্ষণগুলো সাধারণত স্থায়ী হয় না, বরং তরঙ্গের মতো আসে ও যায়। যখন রোগটি তীব্র আকার ধারণ করে তাকে ‘ফ্লেয়ার-আপ’ বলে, আর যখন লক্ষণ কমে যায় বা থাকে না, তাকে বলা হয় ‘রেমিশন’।
সাধারণ লক্ষণগুলো হলো
জয়েন্ট, পেশি বা বুকে তীব্র ব্যথা (বিশেষ করে গভীর শ্বাস নেওয়ার সময়)।
গালে ও নাকে প্রজাপতির ডানার মতো লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি।
অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথাব্যথা, জ্বর এবং চুল পড়া।
মুখের ভেতর ক্ষত বা ঘা, হাত-পা বা মুখ ফুলে যাওয়া এবং শ্বাসকষ্ট।
রক্ত জমাট বাঁধা বা মানসিক বিভ্রান্তি।
সতর্কতা
দীর্ঘদিন এই রোগ শরীরে বাসা বেঁধে থাকলে চোখের শুষ্কতা, বিষন্নতা, অ্যানিমিয়া (রক্তস্বল্পতা), অস্টিওপোরোসিস, কিডনি ও হৃদরোগের মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
কেন হয় এবং কারা ঝুঁকিতে আছেন?
বিশেষজ্ঞরা এখনো নিশ্চিত নন যে ঠিক কী কারণে লুপাস হয়। তবে কিছু বিষয়কে এর জন্য দায়ী করা হয়, যেমন- জিনগত কারণ, হরমোনের তারতম্য (বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন), অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ধূমপান এবং অতিরিক্ত সূর্যালোক বা দূষণের মতো পরিবেশগত উপাদান। যেকোনো মানুষের লুপাস হতে পারে, তবে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারী এবং আফ্রিকান, হিস্পানিক ও এশীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে এর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
লুপাস নির্ণয় করা বেশ কঠিন। কারণ এর লক্ষণগুলো অন্য সাধারণ রোগের সঙ্গে মিলে যায়। চিকিৎসকরা মূলত শারীরিক পরীক্ষা, রক্তের বিশেষ এএনএ টেস্ট, ইউরিন টেস্ট এবং ক্ষেত্রবিশেষে ত্বক বা কিডনির বায়োপসি করার মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত করেন।
আপনার শরীরে যদি নতুন কোনো ব্যথা, ত্বকে র্যাশ বা কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করেন, তবে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ আপনিই আপনার শরীরকে সবচেয়ে ভালো চেনেন। সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধের মাধ্যমে লুপাসের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখে একটি সুন্দর ও সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব।
লেখক: চিকিৎসক ও গবেষক

