রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, সচ্ছতা এবং দূরদর্শিতা নির্ধারণ করতে পারে একটি শহর জলাবদ্ধতা ও বন্যার কাছে কতটা অসহায় হবে অথবা শহরগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে এবং নগর অব্যবস্থাপনা দূর করে জলাবদ্ধতা ও বন্যামুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত শহর গড়ে তুলতে ও এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তাই এবারের ভয়াবহ নগরবন্যায় আমাদের প্রত্যাশা হোক– প্রতিটি প্লাবিত সড়ক, নগর ও জনপদ এবং দুর্গত মানুষের হাহাকার ও কষ্ট যেন কেবল আমাদের বর্ষার অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর হতাশার গল্প না বলে; মনে করিয়ে দেয় যেন ভবিষ্যতের প্রত্যাশিত সুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও।...

প্রতি বছরের মতো এবারের বর্ষাতেও ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো বন্যার পানিতে ডুবেছে এবং লাখ লাখ মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। এমন নয় যে শুধু সড়ক নদীতে পরিণত হয়েছে; হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে গেছে; ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে; আর লাখো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকছে। আমরা অনেকেই মনে করি এটা বর্ষা মৌসুমের একটি অতি পরিচিত দৃশ্য। আমরা চাইলেই বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে, অন্তত এর তীব্রতা আমারা কমাতে পারি এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগের কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারি।
এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, জলবায়ু পরিবর্তন অনেকাংশেই অস্বাভাবিক ও অতি বৃষ্টির কারণ। দেশের বড় বড় শহরগুলোয় প্রায়ই যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় তার প্রকৃত কারণ কিন্তু বন্যা নয়। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতি ও অপশাসনের ফল। বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সরকারের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, দুর্নীতি, অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশের প্রতি যত্নবান না হওয়ায় প্রতি বছর নগরগুলো বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। প্রতি বছর ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আমরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হই তা নতুন করে সুশাসনের অভাব ও আমাদের দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। আমরা কি এগুলো থেকে শিক্ষা নিই? শিক্ষা নিলে প্রতি বছর এরকম ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি হতো না। হলেও পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেত না। প্রতি বছরের মতো এবারও বড় শহরগুলোর বন্যা পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে যে, লাগাতার ভারী বর্ষণ এসব শহরের অবকাঠামো ও দুর্যোগব্যবস্থাপনাকে পরীক্ষার মুখে ফেলছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে অতি বৃষ্টিপাতের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে। অতএব, এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য জলবায়ু-সহনীয় শহর পরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বাস্তবে তা হচ্ছে না। কারণ আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা মূলত উন্নয়নের রাজনীতির নামে পরিকল্পিত ও টেকসই নগর পরিকল্পনার বিষয়টি অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন না। যেসব প্রকল্প মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং যেসব প্রকল্পে নিজেদের স্বার্থ আছে, সেগুলোই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এজন্যই ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড হাইওয়ে, বড় সেতু কিংবা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার প্রতি রাজনীতিকদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়। যাতে এগুলোকে রাজনৈতিক সাফল্যের এবং উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া যায়। সরকার এবং রাজনীতিবিদরা এজন্যই ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি ধারণের জলাধার কিংবা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ–এসব বিষয়ে গুরুত্ব এবং অগ্রাধিকার কম দেন। ফলে টেকসই উন্নয়নে একটি গুরুতর ভারসাম্যহীনতা প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে।
শহরগুলোর পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো অতি গুরুত্বপূর্ণ, যা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। নতুন নতুন অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ হয়েছে, পুরোনো রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে, রাস্তা উঁচু করা হয়েছে, কিন্তু ড্রেনের সক্ষমতা বাড়েনি। নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে ভারী বর্ষণে আবাসিক এলাকাগুলো কৃত্রিম জলাধারে পরিণত হচ্ছে।
একটি টেকসই, বাসযোগ্য ও স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তুলতে নির্বাচনি চক্রের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত পরিকল্পনা দরকার। বর্তমান সংসদ পাঁচ মাস হলো চলছে। একবারের জন্যও সরকারি কিংবা বিরোধী দলের কোনো সদস্যই নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তারা শুধু ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের সুযোগ-সুবিধা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় এবং তাদের রাজনৈতিক সুবিধা ও ক্ষমতা কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। হামে ৭৫০-এর অধিক শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু এবং দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়নি। জনগণের স্বার্থ রাজনীতিকদের কাছে গৌণ হয়েছে। নগরবন্যা ও ক্রমবর্ধমান জলাবদ্ধতা এসবেরই ফল। বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা ও বন্যা সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ব্যাপক দুর্নীতি। দেশে জলাভূমি, খাল এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের এলাকা সংরক্ষণের জন্য আইন রয়েছে। কিন্তু এসব আইনের বাস্তবায়ন প্রায় নেই বললেই চলে কিংবা থাকলেও অতি দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দারা এখনো মনে করতে পারেন, একসময় এ শহরে অসংখ্য খাল, পুকুর ও জলাভূমি ছিল। ভারী বৃষ্টির সময় এসব প্রাকৃতিক জলাধার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত এবং পরে ধীরে ধীরে নদীতে প্রবাহিত হতো। বছরের পর বছর খাল, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দখল করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে জমা হওয়ার স্থানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প, বিপণিবিতান, শিল্পকারখানা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা। দুর্নীতির কারণেই ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ, ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে বৃষ্টির পানি ধারণের স্থান। এর দায়ভার ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে নগরায়ণের কারণে কংক্রিটের বিস্তার ঘটায় মাটি ও সবুজ এলাকা ক্রমে সংকুচিত হয়ে বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পথ বন্ধ হচ্ছে। ফলে রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর প্লাবিত হচ্ছে।
জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা। শহরের বন্যা ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক বিভাগ, বিভিন্ন ইউটিলিটি সংস্থা নিয়োজিত। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি একটি চিরাচরিত সমস্যা। এ সমন্বয়হীনতা জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশনের জন্য বড় বাধা। বিষয়টি সবার জানা থাকলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কখনো দেখেনি। জলাবদ্ধতা নিরসন ও কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা।
সব জলাবদ্ধতার কারণ অবকাঠামো নয়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণও দায়ী। আমাদের দেশের মানুষের জীবন-প্রণালি ও ব্যক্তি অভ্যাসও এর জন্য দায়ী। আমরা অনেকটা উদাসীন। প্লাস্টিক বর্জ্য, নির্মাণসামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ এবং গৃহস্থালির আবর্জনা পরিবেশগত দিক মেনে ব্যবস্থাপনা করা উচিত। খারাপ অভ্যাসের কারণে অনেকই এসব বিষয়ে যত্নবান নন এবং অনেকেই এগুলো ড্রেন ও খালে ফেলে দেন, ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রমও অনিয়মিত এবং বর্ষা মৌসম শুরুর ঠিক আগে সীমিত উদ্যোগে সম্পন্ন না করার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাম্পিং স্টেশনের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা অথবা সেগুলোর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানি নিষ্কাশন অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিতেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সড়ক প্লাবিত হয়ে যায়, যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে।
জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যার অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক। এটা দেশের অর্থনীতির এক বিশাল বোঝা তৈরি করে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অনেক উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা হারায়, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, পণ্যের ক্ষতি হয় এবং সার্বিকভাবে ব্যবসা ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। স্বাস্থ্যসেবা দান ও গ্রহণে সমস্যা সৃষ্টি হয়, শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। জলাবদ্ধতার কারণে সড়ক, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামোর অনেক ক্ষতি হয় এবং এর মেরামতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নগরের ভঙ্গুর জনগোষ্ঠী ও নিম্নআয়ের মানুষ। তারা বস্তিতে ও নিচু এলাকায় বসবাস করেন এবং এসব জায়গায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকা বা অপর্যাপ্ত হওয়ায় বন্যার পানি সহজেই তাদের ঘরবাড়ি, বিশুদ্ধ পানির উৎস এবং জীবিকা সবকিছুকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
জলাবদ্ধতা ও বন্যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। ড্রেন উপচে পড়ার কারণে বৃষ্টির পানি মিশে যায় পয়ঃবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য এবং গৃহস্থালি আবর্জনার সঙ্গে। এতে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, লেপ্টোস্পাইরোসিস, চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে, স্থির পানি ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগের বিস্তার ঘটায়। অতএব, নগরবন্যা কেবল অবকাঠামোগত এবং অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা ও অব্যবস্থাপনাগত সমস্যা নয়; এটা একই সঙ্গে পরিবেশগত সংকট এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা।
সুশাসন নিশ্চিতকরণ জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যা নিরসন ও প্রশমনের সবচেয়ে বড় উপায়। এজন্য দরকার স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, পেশাদার ও পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক তদারকি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা। এসব নিশ্চিত করলেই জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যা নিরসন এবং প্রশমনে যেসব অবকাঠামো তৈরি হবে তা হবে টেকসই ও কার্যকর। এজন্য দরকার সচ্ছ ও সৎ রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকারকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারলেই আমরা জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যা অনেকাংশেই কমাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, সচ্ছতা এবং দূরদর্শিতা নির্ধারণ করতে পারে একটি শহর জলাবদ্ধতা ও বন্যার কাছে কতটা অসহায় হবে অথবা শহরগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে এবং নগর অব্যবস্থাপনা দূর করে জলাবদ্ধতা ও বন্যামুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত শহর গড়ে তুলতে ও এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তাই এবারের ভয়াবহ নগরবন্যায় আমাদের প্রত্যাশা হোক–প্রতিটি প্লাবিত সড়ক, নগর ও জনপদ এবং দুর্গত মানুষের হাহাকার ও কষ্ট যেন কেবল আমাদের বর্ষার অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর হতাশার গল্প না বলে; মনে করিয়ে দেয় যেন ভবিষ্যতের প্রত্যাশিত সুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
.jpg)