ঢাকা ১ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
বরিশালে ১১ দলীয় জোটের সমাবেশ ঘিরে প্রস্তুতি জোরদার মাগুরায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত জয়পুরহাটে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত লিবিয়ার বন্দিশিবির থেকে দেশে ফিরলেন ১৭১ বাংলাদেশি বিশ্বকাপ ফাইনাল: জেনে নিন আর্জেন্টিনা-স্পেন মহারণের সব তথ্য শ্রীমঙ্গলে ওয়ালটন ক্যাবলসের বার্ষিক ডিলার কনফারেন্স-২০২৬ অনুষ্ঠিত অসুস্থ মির্জা ফখরুল আলমগীর ডিএনসিসির ৪ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা বাংলাদেশ কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের জন্য নয়: মির্জা ফখরুল স্পিডবোট রক্ষণাবেক্ষণের সময় নদীতে পড়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি নিখোঁজ প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতের বৈঠক চেক প্রতারণার মামলায় সালমান এফ রহমানের জামিন স্বাস্থ্যসেবার দাবিতে হাঁটু পানিতে নিঝুমদ্বীপবাসী ৫০০ শিক্ষাবৃত্তি দেবে সৌদি আরব: মাহাদী আমীন বগুড়ায় উৎসবমুখর পরিবেশে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত নতুন উপজেলা ও পৌরসভার দাবিতে শৈলকুপায় মানববন্ধন গুগল পিক্সেল ওয়াচের ছবি ফাঁস ব্রিডিং গ্রাউন্ডের অফলাইন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ময়মনসিংহ মেডিকেলে দালালবিরোধী অভিযান, আটক ১৪ তরুণদের দক্ষতায় বদলে যাবে আগামীর বাংলাদেশ জয়ধ্বনি আর উচ্ছ্বাসে মানিকগঞ্জে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা দুর্নীতির মামলায় বেনজীরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহন সিসা দূষণে ঝুঁকিতে কোটি কোটি শিশু, কার্যকর পদক্ষেপের দাবি রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত শহিদ আবু সাঈদের স্মরণসভায় অর্ধেক চেয়ার খালি, হতাশ মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী সুশাসনের সঙ্গে টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা জরুরি হামের উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু রক্ষক যখন ভক্ষক সংগঠন অধ্যায়ের ১৫টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, এইচএসসির ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র জাহাঙ্গীর হত্যায় ‘ভাড়াটে খুনি’ গ্রেপ্তার, পুলিশের দাবি ঢাকা থেকে আনা হয়েছিল

সুশাসনের সঙ্গে টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা জরুরি

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
সুশাসনের সঙ্গে টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা জরুরি
ড. খলিলুর রহমান

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, সচ্ছতা এবং দূরদর্শিতা নির্ধারণ করতে পারে একটি শহর জলাবদ্ধতা ও বন্যার কাছে কতটা অসহায় হবে অথবা শহরগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে এবং নগর অব্যবস্থাপনা দূর করে জলাবদ্ধতা ও বন্যামুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত শহর গড়ে তুলতে ও এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তাই এবারের ভয়াবহ নগরবন‍্যায় আমাদের প্রত‍্যাশা হোক– প্রতিটি প্লাবিত সড়ক, নগর ও জনপদ এবং দুর্গত মানুষের হাহাকার ও কষ্ট যেন কেবল আমাদের বর্ষার অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর হতাশার গল্প না বলে; মনে করিয়ে দেয় যেন ভবিষ‍্যতের প্রত‍্যাশিত সুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও।...

প্রতি বছরের মতো এবারের বর্ষাতেও ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো বন‍্যার পানিতে ডুবেছে এবং লাখ লাখ মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টের মধ‍্যে দিনাতিপাত করছে। এমন নয় যে শুধু সড়ক নদীতে পরিণত হয়েছে; হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে গেছে; ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে; আর লাখো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকছে। আমরা অনেকেই মনে করি এটা বর্ষা মৌসুমের একটি অতি পরিচিত দৃশ্য। আমরা চাইলেই বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে, অন্তত এর তীব্রতা আমারা কমাতে পারি এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগের কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারি।

এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, জলবায়ু পরিবর্তন অনেকাংশেই অস্বাভাবিক ও অতি বৃষ্টির কারণ। দেশের বড় বড় শহরগুলোয় প্রায়ই যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় তার প্রকৃত কারণ কিন্তু বন্যা নয়। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতি ও অপশাসনের ফল। বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সরকারের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, দুর্নীতি, অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশের প্রতি যত্নবান না হওয়ায় প্রতি বছর নগরগুলো বন‍্যায় প্লাবিত হচ্ছে। প্রতি বছর ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আমরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হই তা নতুন করে সুশাসনের অভাব ও আমাদের দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। আমরা কি এগুলো থেকে শিক্ষা নিই? শিক্ষা নিলে প্রতি বছর এরকম ভয়াবহ সমস‍্যার সৃষ্টি হতো না। হলেও পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেত না। প্রতি বছরের মতো এবারও বড় শহরগুলোর বন্যা পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে যে, লাগাতার ভারী বর্ষণ এসব শহরের অবকাঠামো ও দুর্যোগব্যবস্থাপনাকে পরীক্ষার মুখে ফেলছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে অতি বৃষ্টিপাতের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে। অতএব, এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য জলবায়ু-সহনীয় শহর পরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বাস্তবে তা হচ্ছে না। কারণ আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা মূলত উন্নয়নের রাজনীতির নামে পরিকল্পিত ও টেকসই নগর পরিকল্পনার বিষয়টি অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন না। যেসব প্রকল্প মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং যেসব প্রকল্পে নিজেদের স্বার্থ আছে, সেগুলোই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এজন‍্যই ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড হাইওয়ে, বড় সেতু কিংবা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার প্রতি রাজনীতিকদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়। যাতে এগুলোকে রাজনৈতিক সাফল্যের এবং উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া যায়। সরকার এবং রাজনীতিবিদরা এজন‍্যই ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি ধারণের জলাধার কিংবা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ–এসব বিষয়ে গুরুত্ব এবং অগ্রাধিকার কম দেন। ফলে টেকসই উন্নয়নে একটি গুরুতর ভারসাম্যহীনতা প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে।

শহরগুলোর পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো অতি গুরুত্বপূর্ণ, যা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। নতুন নতুন অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ হয়েছে, পুরোনো রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে, রাস্তা উঁচু করা হয়েছে, কিন্তু ড্রেনের সক্ষমতা বাড়েনি। নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে ভারী বর্ষণে আবাসিক এলাকাগুলো কৃত্রিম জলাধারে পরিণত হচ্ছে।

একটি টেকসই, বাসযোগ্য ও স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তুলতে নির্বাচনি চক্রের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত পরিকল্পনা দরকার। বর্তমান সংসদ পাঁচ মাস হলো চলছে। একবারের জন্যও সরকারি কিংবা বিরোধী দলের কোনো সদস‍্যই নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তারা শুধু ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের সুযোগ-সুবিধা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় এবং তাদের রাজনৈতিক সুবিধা ও ক্ষমতা কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। হামে ৭৫০-এর অধিক শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রতিরোধযোগ‍্য মৃত্যু এবং দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ‍্য চুক্তি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়নি। জনগণের স্বার্থ রাজনীতিকদের কাছে গৌণ হয়েছে। নগরবন্যা ও ক্রমবর্ধমান জলাবদ্ধতা এসবেরই ফল। বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা ও বন্যা সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ব্যাপক দুর্নীতি। দেশে জলাভূমি, খাল এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের এলাকা সংরক্ষণের জন্য আইন রয়েছে। কিন্তু এসব আইনের বাস্তবায়ন প্রায় নেই বললেই চলে কিংবা থাকলেও অতি দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দারা এখনো মনে করতে পারেন, একসময় এ শহরে অসংখ্য খাল, পুকুর ও জলাভূমি ছিল। ভারী বৃষ্টির সময় এসব প্রাকৃতিক জলাধার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত এবং পরে ধীরে ধীরে নদীতে প্রবাহিত হতো। বছরের পর বছর খাল, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দখল করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে জমা হওয়ার স্থানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প, বিপণিবিতান, শিল্পকারখানা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা। দুর্নীতির কারণেই ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ, ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে বৃষ্টির পানি ধারণের স্থান। এর দায়ভার ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। অন‍্যদিকে নগরায়ণের কারণে কংক্রিটের বিস্তার ঘটায় মাটি ও সবুজ এলাকা ক্রমে সংকুচিত হয়ে বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পথ বন্ধ হচ্ছে। ফলে রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর প্লাবিত হচ্ছে।

জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যার অন‍্যতম কারণ হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা। শহরের বন্যা ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক বিভাগ, বিভিন্ন ইউটিলিটি সংস্থা নিয়োজিত। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের মধ‍্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি একটি চিরাচরিত সমস্যা। এ সমন্বয়হীনতা জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশনের জন‍্য বড় বাধা। বিষয়টি সবার জানা থাকলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কখনো দেখেনি। জলাবদ্ধতা নিরসন ও কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা।

সব জলাবদ্ধতার কারণ অবকাঠামো নয়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণও দায়ী। আমাদের দেশের মানুষের জীবন-প্রণালি ও ব‍্যক্তি অভ্যাসও এর জন্য দায়ী। আমরা অনেকটা উদাসীন। প্লাস্টিক বর্জ্য, নির্মাণসামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ এবং গৃহস্থালির আবর্জনা পরিবেশগত দিক মেনে ব‍্যবস্থাপনা করা উচিত। খারাপ অভ‍্যাসের কারণে অনেকই এসব বিষয়ে যত্নবান নন এবং অনেকেই এগুলো ড্রেন ও খালে ফেলে দেন, ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রমও অনিয়মিত এবং বর্ষা মৌসম শুরুর ঠিক আগে সীমিত উদ্যোগে সম্পন্ন না করার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাম্পিং স্টেশনের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা অথবা সেগুলোর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানি নিষ্কাশন অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিতেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সড়ক প্লাবিত হয়ে যায়, যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে।

জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যার অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক। এটা দেশের অর্থনীতির এক বিশাল বোঝা তৈরি করে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অনেক উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা হারায়, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, পণ্যের ক্ষতি হয় এবং সার্বিকভাবে ব‍্যবসা ও ব‍্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। স্বাস্থ্যসেবা দান ও গ্রহণে সমস্যা সৃষ্টি হয়, শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। জলাবদ্ধতার কারণে সড়ক, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামোর অনেক ক্ষতি হয় এবং এর মেরামতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নগরের ভঙ্গুর জনগোষ্ঠী ও নিম্নআয়ের মানুষ। তারা বস্তিতে ও নিচু এলাকায় বসবাস করেন এবং এসব জায়গায় পানি নিষ্কাশন ব‍্যবস্থা না থাকা বা অপর্যাপ্ত হওয়ায় বন্যার পানি সহজেই তাদের ঘরবাড়ি, বিশুদ্ধ পানির উৎস এবং জীবিকা সবকিছুকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জলাবদ্ধতা ও বন্যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। ড্রেন উপচে পড়ার কারণে বৃষ্টির পানি মিশে যায় পয়ঃবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য এবং গৃহস্থালি আবর্জনার সঙ্গে। এতে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, লেপ্টোস্পাইরোসিস, চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে, স্থির পানি ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগের বিস্তার ঘটায়। অতএব, নগরবন্যা কেবল অবকাঠামোগত এবং অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা ও অব‍্যবস্থাপনাগত সমস্যা নয়; এটা একই সঙ্গে পরিবেশগত সংকট এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা।

সুশাসন নিশ্চিতকরণ জলাবদ্ধতা ও নগরবন‍্যা নিরসন ও প্রশমনের সবচেয়ে বড় উপায়। এজন‍্য দরকার স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, পেশাদার ও পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক তদারকি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা। এসব নিশ্চিত করলেই জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যা নিরসন এবং প্রশমনে যেসব অবকাঠামো তৈরি হবে তা হবে টেকসই ও কার্যকর। এজন্য দরকার সচ্ছ ও সৎ রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকারকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারলেই আমরা জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যা অনেকাংশেই কমাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। 

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, সচ্ছতা এবং দূরদর্শিতা নির্ধারণ করতে পারে একটি শহর জলাবদ্ধতা ও বন্যার কাছে কতটা অসহায় হবে অথবা শহরগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে এবং নগর অব্যবস্থাপনা দূর করে জলাবদ্ধতা ও বন্যামুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত শহর গড়ে তুলতে ও এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তাই এবারের ভয়াবহ নগরবন‍্যায় আমাদের প্রত‍্যাশা হোক–প্রতিটি প্লাবিত সড়ক, নগর ও জনপদ এবং দুর্গত মানুষের হাহাকার ও কষ্ট যেন কেবল আমাদের বর্ষার অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর হতাশার গল্প না বলে; মনে করিয়ে দেয় যেন ভবিষ‍্যতের প্রত‍্যাশিত সুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম
রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত
শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবতার প্রতি এক আহ্বান–ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে এই উৎসব সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে পারে। আসুন, আমরা সবাই এই পবিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে সমাজে প্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দিই।...

আষাঢ়ের বৃষ্টিভেজা আকাশের নিচে যখন লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি, তখন বোঝা যায়, এ কেবল একটি উৎসব নয়, এ এক জাতির হৃদয়ের স্পন্দন। শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রতি বছর নতুন করে প্রমাণ করে দেয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠানও কীভাবে মানুষে মানুষে মিলনের বন্ধন তৈরি করতে পারে।

উৎসবের সূচনা ও তাৎপর্য: আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ওড়িশার পুরীধামে শুরু হয় এই মহাযাত্রা। জগন্নাথদেব, বলদেব ও সুভদ্রা–এই তিন বিগ্রহ কাঠ নির্মিত তিনটি সুবিশাল রথে চড়ে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে আসেন জনসমুদ্রের মাঝে। প্রতি বছর নতুন কাঠ দিয়ে তৈরি হয় এই রথ, আর তা টেনে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য পান হাজার হাজার ভক্ত। এই দৃশ্য যেন এক জীবন্ত ছবি, যেখানে ভগবান নিজেই মন্দিরের বদ্ধ প্রাচীর ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছে চলে আসেন।

সাধারণত মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা নিয়মকানুন থাকে, কিন্তু রথযাত্রার দিনগুলোতে সে সীমাবদ্ধতা থাকে না। রাজপথই তখন হয়ে ওঠে দর্শনের স্থান। এখানেই এই উৎসবের গভীরতম বার্তা লুকিয়ে আছে–ভগবান কারও জন্য অপেক্ষা করেন না, বরং নিজেই এগিয়ে আসেন সবার কাছে, বিনা ভেদাভেদে।

সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত: রথযাত্রার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এখানে কোনো জাত-পাতের বাছবিচার নেই। ধনী-গরিব, ব্রাহ্মণ-শূদ্র, এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষও একসঙ্গে রথের রশি ধরে টানতে পারেন। এই দৃশ্য সমাজের বুকে সাম্যের এক জীবন্ত পাঠ তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিকটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। রথযাত্রার দিন প্রায়ই দেখা যায়, জাতি-ধর্মনির্বিশেষে মানুষ উৎসাহ নিয়ে রথের যাত্রাপথে ভিড় জমান, স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধাবোধই প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে।

বাংলাদেশে রথযাত্রার ঐতিহ্য: বাংলাদেশে রথযাত্রার ইতিহাস বেশ পুরোনো ও সমৃদ্ধ। ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ের রথযাত্রা এ দেশে সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় আয়োজনগুলোর একটি, যেখানে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের ৬৪টি জেলাতেই ইসকনসহ বিভিন্ন সনাতনী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় রথযাত্রা পালিত হয়ে থাকে। প্রতি বছর এ আয়োজনের ব্যাপ্তি বাড়ছে, যা প্রমাণ করে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে এই ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা কতটা গভীর।

বিশ্বজুড়ে বিস্তৃতি: ১৯৬৭ সালে শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে প্রথম রথযাত্রা আয়োজন করে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তোলেন। তার সেই প্রচেষ্টার ফল আজ দৃশ্যমান লন্ডন, নিউইয়র্ক, মস্কো, বার্লিন থেকে শুরু করে পৃথিবীর অসংখ্য শহরে। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ যখন একই কীর্তনের সুরে রথের রশি টানেন, তখন তা প্রমাণ করে দেয় যে ভক্তি ও প্রেমের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবতার প্রতি এক আহ্বান–ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে এই উৎসব সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে পারে। আসুন, আমরা সবাই এই পবিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে সমাজে প্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দিই।

জয় জগন্নাথ!

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসকন বাংলাদেশ

সুশাসনের সঙ্গে টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা জরুরি

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
সুশাসনের সঙ্গে টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা জরুরি
ড. খলিলুর রহমান

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, সচ্ছতা এবং দূরদর্শিতা নির্ধারণ করতে পারে একটি শহর জলাবদ্ধতা ও বন্যার কাছে কতটা অসহায় হবে অথবা শহরগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে এবং নগর অব্যবস্থাপনা দূর করে জলাবদ্ধতা ও বন্যামুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত শহর গড়ে তুলতে ও এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তাই এবারের ভয়াবহ নগরবন‍্যায় আমাদের প্রত‍্যাশা হোক– প্রতিটি প্লাবিত সড়ক, নগর ও জনপদ এবং দুর্গত মানুষের হাহাকার ও কষ্ট যেন কেবল আমাদের বর্ষার অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর হতাশার গল্প না বলে; মনে করিয়ে দেয় যেন ভবিষ‍্যতের প্রত‍্যাশিত সুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও।...

প্রতি বছরের মতো এবারের বর্ষাতেও ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো বন‍্যার পানিতে ডুবেছে এবং লাখ লাখ মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টের মধ‍্যে দিনাতিপাত করছে। এমন নয় যে শুধু সড়ক নদীতে পরিণত হয়েছে; হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে গেছে; ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে; আর লাখো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকছে। আমরা অনেকেই মনে করি এটা বর্ষা মৌসুমের একটি অতি পরিচিত দৃশ্য। আমরা চাইলেই বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে, অন্তত এর তীব্রতা আমারা কমাতে পারি এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগের কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারি।

এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, জলবায়ু পরিবর্তন অনেকাংশেই অস্বাভাবিক ও অতি বৃষ্টির কারণ। দেশের বড় বড় শহরগুলোয় প্রায়ই যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় তার প্রকৃত কারণ কিন্তু বন্যা নয়। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতি ও অপশাসনের ফল। বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সরকারের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, দুর্নীতি, অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশের প্রতি যত্নবান না হওয়ায় প্রতি বছর নগরগুলো বন‍্যায় প্লাবিত হচ্ছে। প্রতি বছর ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আমরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হই তা নতুন করে সুশাসনের অভাব ও আমাদের দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। আমরা কি এগুলো থেকে শিক্ষা নিই? শিক্ষা নিলে প্রতি বছর এরকম ভয়াবহ সমস‍্যার সৃষ্টি হতো না। হলেও পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেত না। প্রতি বছরের মতো এবারও বড় শহরগুলোর বন্যা পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে যে, লাগাতার ভারী বর্ষণ এসব শহরের অবকাঠামো ও দুর্যোগব্যবস্থাপনাকে পরীক্ষার মুখে ফেলছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে অতি বৃষ্টিপাতের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে। অতএব, এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য জলবায়ু-সহনীয় শহর পরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বাস্তবে তা হচ্ছে না। কারণ আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা মূলত উন্নয়নের রাজনীতির নামে পরিকল্পিত ও টেকসই নগর পরিকল্পনার বিষয়টি অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন না। যেসব প্রকল্প মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং যেসব প্রকল্পে নিজেদের স্বার্থ আছে, সেগুলোই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এজন‍্যই ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড হাইওয়ে, বড় সেতু কিংবা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার প্রতি রাজনীতিকদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়। যাতে এগুলোকে রাজনৈতিক সাফল্যের এবং উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া যায়। সরকার এবং রাজনীতিবিদরা এজন‍্যই ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি ধারণের জলাধার কিংবা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ–এসব বিষয়ে গুরুত্ব এবং অগ্রাধিকার কম দেন। ফলে টেকসই উন্নয়নে একটি গুরুতর ভারসাম্যহীনতা প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে।

শহরগুলোর পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো অতি গুরুত্বপূর্ণ, যা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। নতুন নতুন অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ হয়েছে, পুরোনো রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে, রাস্তা উঁচু করা হয়েছে, কিন্তু ড্রেনের সক্ষমতা বাড়েনি। নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে ভারী বর্ষণে আবাসিক এলাকাগুলো কৃত্রিম জলাধারে পরিণত হচ্ছে।

একটি টেকসই, বাসযোগ্য ও স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তুলতে নির্বাচনি চক্রের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত পরিকল্পনা দরকার। বর্তমান সংসদ পাঁচ মাস হলো চলছে। একবারের জন্যও সরকারি কিংবা বিরোধী দলের কোনো সদস‍্যই নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তারা শুধু ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের সুযোগ-সুবিধা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় এবং তাদের রাজনৈতিক সুবিধা ও ক্ষমতা কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। হামে ৭৫০-এর অধিক শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রতিরোধযোগ‍্য মৃত্যু এবং দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ‍্য চুক্তি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়নি। জনগণের স্বার্থ রাজনীতিকদের কাছে গৌণ হয়েছে। নগরবন্যা ও ক্রমবর্ধমান জলাবদ্ধতা এসবেরই ফল। বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা ও বন্যা সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ব্যাপক দুর্নীতি। দেশে জলাভূমি, খাল এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের এলাকা সংরক্ষণের জন্য আইন রয়েছে। কিন্তু এসব আইনের বাস্তবায়ন প্রায় নেই বললেই চলে কিংবা থাকলেও অতি দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দারা এখনো মনে করতে পারেন, একসময় এ শহরে অসংখ্য খাল, পুকুর ও জলাভূমি ছিল। ভারী বৃষ্টির সময় এসব প্রাকৃতিক জলাধার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত এবং পরে ধীরে ধীরে নদীতে প্রবাহিত হতো। বছরের পর বছর খাল, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দখল করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে জমা হওয়ার স্থানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প, বিপণিবিতান, শিল্পকারখানা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা। দুর্নীতির কারণেই ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ, ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে বৃষ্টির পানি ধারণের স্থান। এর দায়ভার ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। অন‍্যদিকে নগরায়ণের কারণে কংক্রিটের বিস্তার ঘটায় মাটি ও সবুজ এলাকা ক্রমে সংকুচিত হয়ে বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পথ বন্ধ হচ্ছে। ফলে রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর প্লাবিত হচ্ছে।

জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যার অন‍্যতম কারণ হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা। শহরের বন্যা ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক বিভাগ, বিভিন্ন ইউটিলিটি সংস্থা নিয়োজিত। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের মধ‍্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি একটি চিরাচরিত সমস্যা। এ সমন্বয়হীনতা জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশনের জন‍্য বড় বাধা। বিষয়টি সবার জানা থাকলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কখনো দেখেনি। জলাবদ্ধতা নিরসন ও কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা।

সব জলাবদ্ধতার কারণ অবকাঠামো নয়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণও দায়ী। আমাদের দেশের মানুষের জীবন-প্রণালি ও ব‍্যক্তি অভ্যাসও এর জন্য দায়ী। আমরা অনেকটা উদাসীন। প্লাস্টিক বর্জ্য, নির্মাণসামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ এবং গৃহস্থালির আবর্জনা পরিবেশগত দিক মেনে ব‍্যবস্থাপনা করা উচিত। খারাপ অভ‍্যাসের কারণে অনেকই এসব বিষয়ে যত্নবান নন এবং অনেকেই এগুলো ড্রেন ও খালে ফেলে দেন, ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রমও অনিয়মিত এবং বর্ষা মৌসম শুরুর ঠিক আগে সীমিত উদ্যোগে সম্পন্ন না করার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাম্পিং স্টেশনের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা অথবা সেগুলোর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানি নিষ্কাশন অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিতেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সড়ক প্লাবিত হয়ে যায়, যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে।

জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যার অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক। এটা দেশের অর্থনীতির এক বিশাল বোঝা তৈরি করে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অনেক উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা হারায়, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, পণ্যের ক্ষতি হয় এবং সার্বিকভাবে ব‍্যবসা ও ব‍্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। স্বাস্থ্যসেবা দান ও গ্রহণে সমস্যা সৃষ্টি হয়, শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। জলাবদ্ধতার কারণে সড়ক, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামোর অনেক ক্ষতি হয় এবং এর মেরামতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নগরের ভঙ্গুর জনগোষ্ঠী ও নিম্নআয়ের মানুষ। তারা বস্তিতে ও নিচু এলাকায় বসবাস করেন এবং এসব জায়গায় পানি নিষ্কাশন ব‍্যবস্থা না থাকা বা অপর্যাপ্ত হওয়ায় বন্যার পানি সহজেই তাদের ঘরবাড়ি, বিশুদ্ধ পানির উৎস এবং জীবিকা সবকিছুকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জলাবদ্ধতা ও বন্যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। ড্রেন উপচে পড়ার কারণে বৃষ্টির পানি মিশে যায় পয়ঃবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য এবং গৃহস্থালি আবর্জনার সঙ্গে। এতে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, লেপ্টোস্পাইরোসিস, চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে, স্থির পানি ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগের বিস্তার ঘটায়। অতএব, নগরবন্যা কেবল অবকাঠামোগত এবং অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা ও অব‍্যবস্থাপনাগত সমস্যা নয়; এটা একই সঙ্গে পরিবেশগত সংকট এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা।

সুশাসন নিশ্চিতকরণ জলাবদ্ধতা ও নগরবন‍্যা নিরসন ও প্রশমনের সবচেয়ে বড় উপায়। এজন‍্য দরকার স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, পেশাদার ও পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক তদারকি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা। এসব নিশ্চিত করলেই জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যা নিরসন এবং প্রশমনে যেসব অবকাঠামো তৈরি হবে তা হবে টেকসই ও কার্যকর। এজন্য দরকার সচ্ছ ও সৎ রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকারকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারলেই আমরা জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যা অনেকাংশেই কমাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। 

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, সচ্ছতা এবং দূরদর্শিতা নির্ধারণ করতে পারে একটি শহর জলাবদ্ধতা ও বন্যার কাছে কতটা অসহায় হবে অথবা শহরগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে এবং নগর অব্যবস্থাপনা দূর করে জলাবদ্ধতা ও বন্যামুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত শহর গড়ে তুলতে ও এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তাই এবারের ভয়াবহ নগরবন‍্যায় আমাদের প্রত‍্যাশা হোক–প্রতিটি প্লাবিত সড়ক, নগর ও জনপদ এবং দুর্গত মানুষের হাহাকার ও কষ্ট যেন কেবল আমাদের বর্ষার অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর হতাশার গল্প না বলে; মনে করিয়ে দেয় যেন ভবিষ‍্যতের প্রত‍্যাশিত সুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত
ডা. ইকবাল আনোয়ার, লেখক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, সাবেক সভাপতি, বিএমএ, কুমিল্লা

সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর এ কেন্দ্রে গিয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে, যা তাদের শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেহেতু বিষয়টি সামনে চলে এসেছে: তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা; পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। তার চেয়েও সহজ উপায় আমার কাছে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলো বর্ষাকালের পরিবর্তে শুষ্ক মৌসুমে নেওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই চিন্তাভাবনার মধ্যে রাখা উচিত ছিল। আশা রাখছি সামনে এমনটিই হবে।

এখন এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখছি বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের কারণে আমাদের আগামী প্রজন্মের কিশোর তরুণরা ক্ষোভে রাস্তায় নেমে এসেছে। বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিচ্ছে; এমনকি মন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে।

তাদের এ গণতান্ত্রিক চর্চা কোনো অসুস্থ আচরণ নয়; তবে তাদের মুখের ভাষা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চোখ রাঙানোসহ আরও অনেক কিছু এই কিশোর বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়; তেমনভাবে ধমকের সুরে কথা বলা কাম্য নয়। আমি মনে করি, পানির মধ্যে বসে পরীক্ষা দেওয়ার চাইতেও তাদের মনে কষ্ট লেগেছে মন্ত্রীর একটি উক্তি। উক্তিটি ম্যাচের শলাকার মতো কাজ করেছে।

এমনকি তারা অতীতের একটি বন্দোবস্তের নমুনায় ‘তুমি কে আমি কে’ বলে ওই উক্তিটি প্রতিস্থাপন করছে আগের উক্তিটির বদলে, এর মাধ্যমে কি তারা কোনো কিছু অর্জন করতে চায়? এই বিষয়টি নিয়ে কি ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে কেউ ঢুকে পড়েছে?

এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের আরেকটি অভিযোগ আমার কানে এসেছে–সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার দুটি প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের মতে সিলেবাসের বাইরে থেকে এসেছে। মুক্তচিন্তা এবং সৃজনশীলতার বাতাবরণে আমরা যখন চিন্তা করছি; তখন ‘সিলেবাসের বাইরে’ বলতে কী বোঝায়–এ নিয়ে প্রশ্ন রাখা যায়। প্রশ্ন কমন না পড়লেই তা সিলেবাসের বাইরে এমনটা বলাও যুক্তিযুক্ত নয়। আর যদি প্রশ্নটি সত্যিই সিলেবাসের বাইরে হয়ে থাকে বা প্রশ্নের বক্তব্যের ভুলে তা অস্পষ্টতা ও অর্থহীনতার বেড়াজালে আক্রান্ত একটি প্রশ্ন হয়, তাহলে অবশ্যই এটি নিন্দনীয়। আমরা জানি যে প্রশ্ন করার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ও মডারেটর থাকেন এবং এটাকে বারবার মূল্যায়ন করা হয়। এ প্রসঙ্গে যারা এ জন্য  দায়ী, তদন্ত করে তাদের অবশ্যই যথাযথ বিচার করতে হবে। কারণ দেশের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় কোনোভাবেই গাফিলতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এটি জাতি গঠনের সঙ্গে জড়িত। সামগ্রিক বিষয়টি মূল্যায়ন করে এর অতিসত্বর সমাধান জরুরি। আমাদের শিশুরা বিবেকবান; তাদের ভালোবাসা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা দিলে সহজেই নমনীয় হতে দেখেছি।

এমনিতেই আমাদের দেশে কিশোর-তরুণদের উপযুক্ত নার্সিং করা যাচ্ছে না। বিশ্বের যেসব দেশ উন্নতি করেছে, তারা তাদের সবচেয়ে প্রধান বিনিয়োগ, সবচেয়ে সুন্দর সম্ভাষণ, সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা, সুনজর, সু-সেবা দিয়েছে তাদের শিশু-কিশোরদের।

কিশোর-তরুণদের মনে আশার আলো জ্বালাতে হবে। তাদের পজিটিভ মটিভেশনের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মনস্তত্ব বুঝে তাদের বুকে টেনে নিতে হবে। তারা কচি মনের। তাদের আবেগ বেশি। তাদের রক্ত চঞ্চল। তাদের যা ইচ্ছা তা বলা যায় না, যাবে না। তারা অভিমানী। এমনিতেই তারা ভেতরে ভেতরে নীরব কান্না বুকে পুষে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলে।

শিশু চিকিৎসক হিসেবে তাদের চোখে তাকিয়ে আমি পড়তে চেষ্টা করি। সেখানে  হাসি, স্বতঃস্ফূর্ততা আমি দেখি না। সংসদে তাদের নিয়ে কথা তেমন হতে দেখি না। তাদের মধ্যে বহু শিশু-কিশোর-তরুণ ডিপ্রেশনের রোগী। তারা অনেকে আছে, ভেতরে জ্বলছে, বাইরে ধীর থাকতে মনকে কোনো রকম শাসিয়ে রাখছে। বড়রা দুর্নীতি করে, শিশু-কিশোররা এর জন্য  দায়ী নয়, তবু তাদের ভুগতে হয় সবচেয়ে বেশি। প্রথমে সবচে বড় ধাক্কাটা লাগে তাদের গায়ে।

তাদের বাড়ন্ত দেহ। তারা বিষযুক্ত খাদ্য খেতে বাধ্য হয়। কিছুদিন পরপর তাদের ওপর দিয়ে নানা গবেষণা–এভাবে নয়, ওভাবে! নানা রকম পরিবর্তন, নানা পদ্ধতি! এমনকি তাদের বইয়ের বিষয়, বিশ্বাস এবং ইতিহাসও বদলে যায়। অসম ব্যবস্থায় তারা ‘মন খারাপের সময়’ পার করে।

একদম না বোঝা বয়সে শিশুরা হাসে, ছোটাছুটি করে। তারা বড় হলেই তো এ হাসিটা আর হাসতে পারবে না। তারা দেখবে একটা দরিদ্র দেশ। তার চেয়ে বেশি দেখবে একটা দুর্নীতির দেশ। মারামারির দেশ। দেখবে, যারা দুর্নীতি করে তাদেরই পোয়াবারো। দেখবে, স্কুল-কলেজসহ সবখানে দ্বিচারিতা। তাদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কী ভাষা ব্যবহার করতে হবে, তা না জেনে, মুখ ফসকে কিছু বলে ফেলা উচিত না। তারাই আমাদের সম্পদ।

একজন শিক্ষার্থীর বাবা 

এই আন্দোলন শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
এই আন্দোলন শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা
জিয়াউল কবির দুলু, সভাপতি, অভিভাবক ঐক্য ফোরাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ছাত্রদলকে যেতে দেখলাম। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের সেভাবে দেখিনি। এই ভিড়ের মধ্যে আমি শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের খুঁজেছি। বোর্ড চেয়ারম্যানদেরও খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও দেখতে পাইনি। সোমবার (১৩ জুলাই) সরকারের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। আর কাদের ফার্মের মুরগি বলা হলো। তারা কাদের সন্তান? আমাদেরই তো। বাচ্চাদের এভাবে বললে আমাদের খারাপ লাগে। বাচ্চাদের মধ্যেও এ মন্তব্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র ভুল হয়। এই ঘটনায় চার শিক্ষককে কারণ দর্শানো হয়। কিন্তু ভুল প্রশ্ন কেন? এই সময়ে এটাও সম্ভব! প্রশ্ন সংশোধন-পরিমার্জনের দায়িত্বে যারা ছিলেন এটা তাদের চরম গাফিলতির প্রমাণ। গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা রয়েছেন তাদের কাছ থেকে এমন দায়িত্বহীন আচরণ মোটেও কাম্য নয়। অতীতেও প্রশ্নপত্রে ভুলের ঘটনা আমরা দেখেছি। অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন গড়ে ওঠা শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

সভাপতি, অভিভাবক ঐক্য ফোরাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা

করোনাকাল ও কোচিং সেন্টার দায়ী থাকতে পারে

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৫ এএম
করোনাকাল ও কোচিং সেন্টার দায়ী থাকতে পারে
আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার, সাবেক অধ্যক্ষ, ঢাকা কলেজ

করোনার সময় থেকেই শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রান্তিকাল চলছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রভাব ক্লাসরুমেও পড়েছে। করোনার পর থেকে সে ভাবে লেখাপড়াই হয়নি। এর জন্য একটি বড় কারণ শিক্ষকসংকট। আমি দেখছি মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে ১ লাখ শিক্ষক পদ খালি। এগুলো তো পূরণের উদ্যোগ দেখছি না। আবার প্রাথমিকে ৩৫ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ খালি। একটি প্রতিষ্ঠানে প্রধান না থাকলে সেখানে লেখাপড়া হয় না। আমি ঢাকা কলেজে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানে এক দিন না গেলেই খবর পেয়েছি ক্লাস হয়নি। আমার মনেও প্রশ্ন ওঠে-প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে কীভাবে? পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় এক শিক্ষার্থীকে বলতে শুনলাম, এসব বিষয় তো শিক্ষক আমাকে পড়াননি, আমি উত্তর দেব কীভাবে। এ ঘটনা তো সত্যি। এসব কলেজের কমিটিপ্রধান ইউএনওরা। তারা কী জবাব দিতে পারবেন? তবে এই আন্দোলনে কোচিং সেন্টারের ইন্ধন থাকবে, আমার অভিজ্ঞতা এটাই বলে।

সাবেক অধ্যক্ষ, ঢাকা কলেজ